আমাদের সেই ছোট শহরে শরত কেমন ছিল বলতে পারব না। কারণ জীবনের অন্তত প্রথম ষোলটি শরত কেটেছে আরও দক্ষিণের এক গ্রামে। আমাদের শহরে অনেক বাহারি পুজো, অনেক থিমের প্রতিমা তখনি, সেসবও আমি কখনো দেখিনি। আমার ছিল একটাই পুজো বছরের পর বছর।
বিকেল মানেই বাস রাস্তা। ধার ধরে ধরে কতদূর চলে যাওয়া। কানপুর, দলনঘাটা, রত্নেশ্বরপুর। রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটলেও অসুবিধে নেই। অনেকক্ষণ অন্তর অন্তর বাস। একটাই বাস এ রুটে। ৮৯। সে আবার এমন বাস, উঠলে ভাড়া লাগে না বেশিরভাগ সময়। ‘সত্যেন ভটচাজের মেয়ে তো? বড়দি, আমায় চিনতে পারছেন না?’কন্ডাক্টর ঢিপ করে প্রণাম করে মার পায়ে। শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, রাজা, জমিদার, মন্ত্রী, বড় চাকুরে-কিচ্ছু নন। তিনি একজন সঙ্গীতশিল্পী, তাও ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী। গান শেখানো ছাড়া তাঁর আর কোন উপার্জন নেই। সেই গান শিখিয়েই তিনি দশ ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, মা আর নিত্য অতিথি অভ্যাগত ভরা সংসার টানছেন কোন জাদুতে জানি না। এ বাড়ির এলাহি খাওয়া দাওয়া দেখলে সেসব মালুম হয় না অবশ্য।
সকালে আমি যখন উঠি, তখন সবার দু রাউন্ড চা খাওয়া হয়ে গেছে। দেখি দাদু বারান্দায় বেঞ্চে বসে মাখা সন্দেশ দিয়ে চা খাচ্ছেন। আমাকে দেখে বাসি মুখেই সন্দেশ গুঁজে দেন। এরপর দিদা হাতে পয়সা দিয়ে বলে বাজার থেকে পাঁউরুটি কিনে আনতে, সেই মোটা পাউন্ড রুটি।সকালের শিশির মাড়িয়ে সেই পাঁউরুটি কিনতে যাওয়া আর ফেরা, পুকুরের হাঁসগুলো ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, সনকার মা বলে ‘কবে এলে’? কেউ আবার থুতনি নেড়ে দিয়ে বলে ‘আঙ্গার বাকুলি যাবিনি?’ এইসব নানাবিধ ডিস্ট্র্যাকশন পেরিয়ে পাঁউরুটি নিয়ে ফেরা এক রীতিমত অভিযান। ফেরার পর দিদা সেটা বঁটি দিয়ে (অবশ্যই নিরামিষ হেঁসেলের বঁটি)দিয়ে চৌকো চৌকো করে কেটে সেঁকে ঘি চিনি মাখিয়ে খেতে দেয়। এটা প্রাক-জলখাবার প র্ব। এর পর তো লুচি/পরোটা, আলুর ছেঁচকি আছে, তার সঙ্গে মিস্টি মাস্ট। অনেক পরে বুঝতে পেরেছি এই জলখাবারটা সবার জন্যে ছিল না। থাকা সম্ভব ছিল না। অনেকেই আগের রাতের রুটি ডালডা বা রেপসিড তেলে ভেজে খেত। সেও অবশ্য ভারি উপাদেয় খেতে। দুধভক্তরা দুধে রুটি ছিঁড়ে গুড় বা চিনি দিয়ে ফুটিয়ে খেত, কখনো তাতে পড়ত আম বা কলা, সে সত্যিই দেবভোগ্য জিনিস। মাঝে মাঝে দেখতাম কেউ এককোণে বসে চুপিচুপি পান্তা খেয়ে নিচ্ছে, পেঁয়াজ, লংকা আর লেবুপাতা ডলে, সঙ্গে পঞ্চার দোকানের আলুর চপ। হাজার কান্নাকাটিতেও আমি পাই না সে খাবার, নাকি ঠান্ডা লেগে যাবে। আরও একটা অন্যরকম খাবার পাওয়া যেত বিশেষ বিশেষ তিথিতে।, যার জোগান দিতেন মায়ের দিদি।
মায়ের আবার দিদি কী? মা-ই তো দশ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। এই দিদি আসলে মায়ের ঠাকুমা, তিনি আবার দাদুর নিজের মা-ও নন, সৎমা, এমন মা যিনি দাদুর চেয়ে এক বছরের ছোট। দাদু অবশ্য তাঁকে মা বলেই ডাকতেন, বিজয়া বা বছরের বিশেষ দিনে পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করতেন। সেই দিদির কাছে পাওয়া যেত সাবুর ফলার, কলা নারকেল কুরো দিয়ে মাখা এক অপূর্ব খাদ্য।
দাদু মানুষটা ভারি রাশভারি, দিদা থেকে শুরু করে সব মামা, মাসী তাঁকে আপনি সম্বোধন করে। বাড়িতে তিনি খড়ম পরতেন, সেই খড়মের আওয়াজ কানে এলে অতি বড় সাহসীরও হাড় হিম হয়ে যেত। একবার আমার ছোটমাসী কিছু একটা অন্যায় করেছে, তাকে বলা হল বাবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে। সে তো বলির পাঁঠার মত কাঁপতে কাঁপতে গেল আর গিয়ে বলল ‘বাবা আমি আপনাকে ক্ষমা করলাম!’
এই দাদুর কাছে সারাদিন ধরে যত ছাত্রছাত্রী আসত, সবার চা-জলখাবার ছিল বাঁধা। অনবরত চা এবং পরোটা- তরকারি –মিস্টি, পি সি সরকারের ওয়াটার অব ইন্ডিয়ার মত সাপ্লাই দিতে দিতে দিদা মাঝে মাঝে খুব নিরীহ ভঙ্গিতে বলে পাঠাত ‘এককেজি চিনি আনিয়ে দিতে হবে’ অমনি ক্রুদ্ধ বাঘের মত সারা উঠোন খড়ম পায়ে ঘুরতে ঘুরতে দাদু বলতেন ‘আগুন জ্বালিয়ে দেব এ সংসারে’। যদিও তারপর যথারীতি চিনি এবং দরকারি জিনিস সবই আসত।দিদা নিচু স্বরে বলতেন ‘ঘরজ্বালানে পরভোলানে’ আজকাল মনে হয় ওই চিনি চাওয়াটা ছিল দিদার নিজস্ব প্রতিবাদের ভাষা।
পাড়াগাঁ। বেশিরভাগই আসত বিয়ের পারানি হিসেবে গান শিখতে, সারেগামা ভালো করে গলায় বসতে না বসতেই সবাই চাইত ‘এসো মা লক্ষ্মী বোসো ঘরে’ শিখতে, কারণ ওইটা ছিল বিয়ের বাজারে সবচেয়ে হিট গান, আর সেই গান নিজের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে আমার বিষ্ণুপুরী ঘরানার ধ্রুপদী গানের শিল্পী দাদু, শিখে নিয়েছিলেন, বলা যায় শিখতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর মেয়েদের কাছ থেকে। নইলে ওই গ্রামদেশে তাঁকে টিউশন করে খেতে হত না।দাদু অনেক রকম বাজনা বাজাতে পারতেন। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙ্গে যেত তাঁর বাঁশি বাজানোর আওয়াজে, শিল্পীর যন্ত্রণা বাঁশির সুরে আছড়ে আছড়ে পড়ত, এখন বুঝি ওই একটুখানি জায়গা তাঁর ছিল, যা কাউকে বেচতে হয়নি, আপস করতে হয়নি।
অথচ এভাবে বাঁচার কথা ছিল না তাঁর। দাদুর বাবা ছিলেন এক্সাইজ ইন্সপেক্টর। তাঁর প্রথম স্ত্রী যখন পাঁচটি ছেলে রেখে মারা গেলেন, তখন তিনি বিয়ে করে আনলেন বালিগঞ্জের এক বনেদী ন্যায়রত্ন পরিবারের মেয়েকে, যে মেয়ে তাঁর বড় ছেলের চেয়ে বয়সে এক বছরের ছোট! সেই মেয়ে এক আশ্চর্য ক্ষমতায় এই পাঁচটি ছেলের মা হয়ে উঠেছিলেন। দাদুর বাবা যখন অকালে মারা গেলেন, সেই সময় দাদু এক অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিমান শিল্পী, টকিতে গান গাওয়ার জন্য ডাক আসছে তাঁর। তাঁর বিমাতা এতে বিপদসঙ্কেত দেখলেন। রূপালি পরদার টানে কত সংসার যে ভেসে গেছে। তাই তিনি বয়সে বড় ছেলেকে পা ছুঁইয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলেন, সে আর কখনো স্টুডিওপাড়ায় পা রাখবে না। এদিকে সরকার বাহাদুর পরিবারটির ভরণপোষণের জন্যে একটি এক্সাইজ শপ দিয়েছেন ডায়মন্ডহারবারের একটি গ্রামে। মায়ের আদেশে উজ্জ্বল কেরিয়ার ছেড়ে দাদুকে সেখানে চলে যেতে হল। অন্য কেউ হলে এই দোকান থেকে লালে লাল হয়ে যেত। কিন্তু আমার শিল্পী দাদু সে দোকানটি কয়েকবছরের মধ্যেই লাটে তুলে দেন।কিন্তু সে ইতিহাসের দায় অনেকদিন পর্যন্ত বহন করতে হয় তাঁর ছেলেমেয়েদের। গ্রামের লোক মামা মাসীদের দেখে বলত ‘ওই যে গেঁজা বেপারির ছাওয়াল’!অবশ্য ইতিহাসবিস্মৃত বাঙালি পরে স্বভাবতই সে পরিচয়টি ভুলে যায়। ততদিনে দাদু হয়ে উঠেছেন দক্ষিণ ২৪ পরগণা অঞ্চলে সংস্কৃতির ভগীরথ। শুদ্ধ সঙ্গীত চেতনার প্রসার তো আছেই, এছাড়া ফ্লাওয়ার শো, গ্রামীণ হস্তশিল্প মেলা, হিন্দু মুসলমান একত্রিত করে রথযাত্রা, সবের প্রাণপুরুষ তিনি। গান্ধীজি এক শীতে কুঁকড়াহাটি থেকে নদীপথে ডায়মন্ডহারবার আসেন, তাঁর স্মরণে সেই জায়গাটির নাম এখন গান্ধীর মাঠ, সেই কানায় কানায় ভরা সভায় গান্ধীজিকে ভজন শোনানোর জন্যেও তাঁরই ডাক পড়ে।
এ হেন মানুষটিকে ভয় করত এমনকি ইয়াকুবমামাও। সব গ্রামেই দু চারজন প্রথিতযশা মাতাল থাকে। ইয়াকুবমামা তাদেরই একজন। তবে সে কোন মামুলি পেঁচি মাতাল ছিল না যারা মদ খেয়ে ড্রেনে পড়ে থাকে বা বউঝিদের নিয়ে টানাটানি করে। তখনো বাংলার ঐতিহ্য কান্ট্রি লিকার, যাকে চোলাই, ধেনো, ধান্যেশ্বরী যাই বলা হোক কেন, বিষমদ কখনো নয়, তা খেয়ে কাউকে মারা যেতে শুনিনি, আর মারা গেলে টাকাও পাওয়া যেত না! ইয়াকুবমামা নিশিদিন তরল মার্গেই থাকত আর জীবনে স্কুলের মুখ না দেখলেও বিশুদ্ধ ইংরেজি বলত। গ্রামে কত ধনী, প্রভাবশালী লোক , ইয়াকুবমামা তাদের কাউকে আমল দিত না, কিন্তু দাদুর প্রসঙ্গ এলেই সে দুহাত জোড় করে বলত ‘এই একটা লোক আছে, যাকে আমি র-রেস্পেক্ট করি’ রেস্পেক্ট বলতে গিয়ে র-টি ছররার মত ছড়িয়ে দিত।
আমি কিন্তু এই ইয়াকুবমামাকে কোনদিন চোখে দেখিনি। হয়তো কুমারী পুজো হবার পর আমাকে সাজিয়ে গুজিয়ে মনুমামার স্টুডিয়োতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই বিখ্যাত মনুমামা যে একটি মৃতদেহর ছবি তোলার সময় তাকে বলেছিল ‘ইস্মাইল প্লিজ!’ এই মনুমামা সাধারণ ফোকাস ঠিক করতে ঘন্টা তিনেক নিত, ততক্ষণে তার শিকারী ঘেমে নেয়ে জল। (সেই সময়ের সবাইকেই দেখবেন ছবিতে বেজায় গম্ভীর। তবে কি সে আমলের লোকে হাসত না? আসলে ক্যামেরার পেছনে, খোঁজ নিয়ে দেখবেন অবশ্যই মনুমামা ছিল!) এই স্টুডিওতে অপেক্ষা করতে করতে আমি শুনছি ইয়াকুবমামার গল্প। ইয়াকুবমামা নাকি বলেছে ‘আই অট টু লিভ মাই কান্ট্রি দ্যাট ইজ ইন্ডিয়া!’ আমার কপালের চন্দন গলে জল হয়ে যাচ্ছে, তাতে আমার ভ্রূক্ষেপ নেই। আমি এই না দেখা লোকটির প্রতি শ্রদ্ধায় অভিভূত হয়ে পড়ছি। বাবা এত যত্ন করে গ্রামার পড়িয়েছে, তবু আমি অট ভার্বটাকে সযত্নে এড়িয়ে চলি। আর সেখানে গ্রামের প্রায় নিরক্ষর একজন বলছে আই অট টু! বলছে না আই শুড। দেশকে ভালবাসা উচিত বলছে না , বলছে দেশকে ভালবাসতেই হবে। এক প্রত্যন্ত গ্রামের ঘুপচি স্টুডিওয় বসে আমি এক লহমায় দেখতে পাই গোটা ভারতবর্ষকে। তার নদী, নালা, পর্বত, মালভূমি, তার গরবা, ছৌ, বিহু, তার সিন্ধি, গুজরাটি, মালয়ালম- নানা ভাষা, নানা বেশ, নানা পরিধান । ভারতবর্ষকে আমার মধ্যে প্রথম চারিয়ে দেন সেই ইয়াকুবমামা। আজকের শাইনিং ইন্ডিয়া যার বা যাদের খবর রাখে না।