জন-জনি জনার্দন সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে তৃষ্ণা বসাক (পর্ব – ২৮)

রঙ, রঙ, তোমার রূপ নাই কুসুম?

পর্ব ২৮

‘সুন্দর কাকে বলে?পৃথিবী কি গেছে ভুলে? তাই কি আমায় দিল বিদায়, চাইল না মুখ তুলে?’ ১৯৭৯ সালের সুপারডুপার হিট সিনেমা সুনয়নী। উত্তমকুমার, শুভেন্দু অভিনীত এই সিনেমার বিখ্যাত গানটি গেয়েছিলেন সম্ভবত শৈলেন্দ্র সিং।গানটি বেশ। তার থেকেও জরুরি এই প্রশ্ন- সুন্দর কাকে বলে? খুবই গোলমেলে প্রশ্ন সন্দেহ নেই। সৌন্দর্য জিনিসটা  ঠিক কী?  তা কি থাকে নাক, চোখের , ঠোঁটের মাপে, নাকি কোন ধরাছোঁয়ার অতীত কোন ইন্ট্যানজিবল মায়া হয়ে? নাকি সে থাকে দর্শকের চোখে?অর্থাৎ গোলাপের দিকে চেয়ে বললাম সুন্দর, সুন্দর হল সে!  এই প্রশ্নের কোন জবাব হয় না। কোন জবাব আমি চাইছিও না। আমি শুধু আমার চিন্তাগুলোকে জোরে জোরে বলছি। যাকে বলে থিঙ্কিং অ্যালাউড। সৌন্দর্যের কি কোন সর্বজনগ্রাহ্যতা আছে? মানে একই মানুষ কি সবার চোখে সুন্দর হতে পারে? সর্ব দেশে, সর্বকালে? দ্রৌপদীকে কি এযুগেও সুন্দরী বলা যাবে? নাকি ক্যাটারিনা কাইফ অর্জুনের কাছে কলকে পেতেন?
ভেবে দেখুন সানিয়া মির্জাও সুন্দরী, আবার সেরেনা উইলিয়ামসও সুন্দরী। পেলেও সুন্দর আবার প্লাতিনিও সুন্দর। আবুল কালামও সুন্দর, আবার মার্ক জুকেরবার্গ সুন্দর। এসব দেখে শুনে মনে হয়েছে সৌন্দর্য জিনিসটা হেভি গোলমেলে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের মতো সৌন্দর্যও খুব আপেক্ষিক।
আবার ভেবে দেখুন জিনিসটা রাজনৈতিকও বটে। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি বিউটি ইজ পলিটিকাল, আর একে পলিটিকাল কে করল? করল, এমন একটা বস্তু, যার ওপর মানুষের কোন হাত নেই। সেটি হচ্ছে ত্বকের পিগমেন্টেশন। সেই পিগমেন্টেশন ঠিক করল কারা পৃথিবী শাসন করবে, কারা শাসিত হবে, কারা মাছের মুড়োটা পাবে, কারা কাঁটাকোটা, কোন মেয়ের ডাক্তার পাত্র জুটবে, আর কোন মেয়ের মুদি দোকানী দোজবরে বিয়ে হবে, এমনকি রান্নার কাজ থেকে ভালো চাকরি পেতে গেলেও গায়ের রঙ একটা বড় নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়। গায়ের রঙ সাদার দিকে না হলে রাঁধুনী রাখে না, এমন বাড়ির সংখ্যা কম নেই!
আমি দেখেছি, আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এক একটা মিনি অ্যাপারথেইড আঁতুড়ঘর। আমার মেজমাসী ও সেজমাসী, দুজনেই উচ্চ শিক্ষিতা, দুজনেই সেলাই, পিঠে করা, গান, নাচ, সবেতেই পটীয়সী, কিন্তু মেজমাসীর গায়ের রঙ শুধুমাত্র কালো হওয়ার জন্যে তাঁর জীবন অন্য খাতে বইল।তাঁকে বহু নিগ্রহ ও বৈষম্যের শিকার হতে হল শুধুমাত্র এই কারণে। এইরকম ভূরি ভূরি উদাহরণ দেওয়া যায়। একেই মা বলত ‘সর্বদোষ হরে গৌরী’ 
সারা বাংলা সাহিত্য জুড়ে দেখুন গৌরবর্ণ বালকদের রাজত্ব। সে অতিথির তারাপদই হোক, কিংবা পথের পাঁচালীর অপু। সাহিত্যের মতো জীবনেও কালো মেয়েরা অরক্ষণীয়ার জ্ঞানদার মতো গুমরে গুমরে মরে। 
‘বেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো, 
শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো
তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে
বেণীমাধব আমার বাবা দোকানে কাজ করে…’
কালো মেয়ের বাবা, দোকানে কাজ করলে কী যে হয়, ভাবতেও ভয় করছে। 
একসময় ভারতবর্ষ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন কিন্তু কয়েকজন কালো নারী পুরুষ- দ্রৌপদী, বেদব্যাস, অর্জুন এবং অবশ্যই কৃষ্ণ।বাঙালি অবশ্য সেই পুরাকাল থেকেই কেন্দ্র বিরোধী। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় বঙ্গ যোগ দিয়েছিল কৌরবপক্ষে। দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক গোষ্ঠীর রক্ত শরীরে, কিঞ্চিৎ খর্বকায়, শ্যামলা রঙের বাঙ্গালির কিন্তু ফরসা রঙের প্রতি মোহ থেকেই গেছে। আর শ্রীচৈতন্য  এই বঙ্গদেশে জন্মে সেই গৌর প্রীতিকে একদম পাগলামির পর্যায়ে নিয়ে গেলেন।
‘তোমায় হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না। একবার ছেড়ে দিলে সোনার গৌর আর তো পাব না’
 ‘ঢলঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি নবনী বহিয়া যায়’
‘দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা’
এই  গৌরাঙ্গ পিরিতি পরবর্তীকালে গোরাসাহেব ভজনায় বদলে গেল।
আমার ঠাকুমা একবার ট্রামের ফার্স্ট ক্লাসে চড়েছেন কলকাতায় এসে। পাশে এক মেমসাহেব, রোমাঞ্চিত ঠাকুমা মেমসাহেবের অনাবৃত বাহতে আঙ্গুল ঠেকিয়ে দেখেছিলেন রংটি কাঁচা না পাকা, তারপর,  মেমকে ইমপ্রেস করতে সেই নিরক্ষর, কিন্তু শ্রুতিধর মহিলা ফার্স্ট বুক অব ইংলিশ থেকে বলতে শুরু করেছিলেন, ‘ওয়ান ডে আই মেট আ লেম ম্যান’। এই ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় সাহেবদের গায়ের রঙ আর মুখের ভাষার প্রতি কীরকম মোহ ছিল ভারতবাসীর। আমার শ্যামলা রঙের হৃষ্টপুষ্ট চেহারার মা যখন তাঁর অতি ফর্সা ছেলের পুত্রবধূ হিসেবে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়েছিল, এবং র‍্যাগিং-র চরম নমুনাগুলি  অর্থাৎ দুধ উথলোনো, ল্যাটা মাছ ধরা এইসব পেশ করা হচ্ছে, তখন ঠাকুমা নাকি সর্বসমক্ষে বলেছিলেন, ‘একটা কালো হাতি নিয়ে এলি বাবা?’
বাবার নিজের সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব ছিল, গায়ের রঙ নিয়ে তো বটেই। তবে সেটা কখনো কারো মনে হীনমন্যতার বোধ জাগিয়ে নয়। কেউ যদি বাবার রঙের সঙ্গে তুলনা করে আমার রঙ নিয়ে  খারাপ কিছু বলত, বাবা বলত ‘আমার মেয়ের রঙ দ্রৌপদীর মতো’ আশৈশব মহাভারতে নিমজ্জিত আমাকে এই দ্রৌপদীর মতো তুলনাটি  এতটাই আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল যে সারাজীবন কখনো নিজের গায়ের রঙ বা চেহারা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগিনি, এবং আমার অধিকাংশ বন্ধুরা এবং আত্মীয়ারা যখন ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি জাতীয় ফর্সা হবার ক্রিম মাখত, তখন আমি সচেতনভাবেই সেটা বর্জন করে এসেছি। 
একটা কথা আছে- নিজের ছেলেটি খায় এতকটি/ পরের ছেলেটা খায় এতটা’ সেইরকম নিজের মেয়ের গায়ের রঙ হয় উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, অন্যের মেয়ের গায়ের রঙ মিশমিশে কালো। কালো মানুষদের জন্যে যে কত অবমাননাকর শব্দ আছে! কেলে, কেলো, কেল্টি, কালোমানিক, কালোকিষ্টি। অথচ আমাদের প্রেমের ঠাকুরটির রঙ তো কালো।  আমাদের যিনি আইকনিক টি ডি এইচ, অর্থাৎ টল ডার্ক হ্যান্ডসাম সেই অমিতাভ বচ্চন কিনা গাইলেন ‘জিসকে বিবি কালি, উসকা ভি বড়া কাম হ্যায়, বাত্তি কি তরা জ্বলা  দো, বিজলি কা কেয়া কাম হ্যায়?’ –র মতো অবমাননাকর একটি গান!
আমাদের বড় প্রিয় নায়ক মিঠুন,  তাঁর নির্মেদ কালো শরীরের কি যে  সৌন্দর্য সে তো মৃণাল সেনের (আর এক বড় মাপের কালো মানুষ) ‘মৃগয়া’য় দেখেছি আমরা। মজার কথা দেখুন তাঁর আসল নাম কিন্তু গৌরাঙ্গ! আর  চিররহস্যময়ী রেখা, তিনি ফর্সা হলে তাঁর কি এত সম্মোহন থাকত?
এইসবের পরেও কিন্তু খবরের কাগজে পাত্রী চাই-র কলামে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়- প্রকৃত গৌরবর্ণা পাত্রী চাই। এই প্রকৃত গৌরবর্ণার মধ্যেও কিন্তু একটু গোলমাল আছে। ক পোঁচ সাদা হলে তাকে প্রকৃত গৌরবর্ণা বলা যায়? আপনার চোখে দিব্যি ফর্সা মেয়েটিকে শ্বশুরবাড়ির লোক বলতেই পারে –তুমি তো তেমন গৌরী নও! যে বয়সে মেয়েরা নিজের গায়ের রঙ, ফিগার ইত্যাদি নিয়ে বিনিদ্র রজনী কাটায়, সে বয়সটা আমি কবিতায়, মেঘে বৃষ্টিতে কাটিয়েছি, আমার মাথাটি খেয়ে রেখে দিয়েছিলেন বাবা আর রবীন্দ্রনাথ। বহু সাধ্যসাধনা করে বাবার কাছ থেকে একটি ন্যাচারাল কালারের লিপ্সটিক মিলেছিল, যা পরলে ঠোঁট শুধু চকচকে দেখাত। ধামুয়া নামের এক গ্রামে একবার বিয়েবাড়িতে গিয়ে সেটি বহু যত্নে পরেছি, ক্লাস এইট তখন, এক মেসোমশাই গোত্রের লোক এসে বললেন ‘মা তুমি তো এমনিই সুন্দর, এসব ছাইপাঁশ মাখার দরকার কী?’ ব্যস হয়ে গেল। সেই লিপস্টিক সঙ্গে সঙ্গে পাশের পুকুরে বিসর্জিত হল দুর্গার চুরি করা পুঁতির মালার মতো। বহুদিন পর্যন্ত সেই ছিল আমার  প্রথম ও শেষ প্রসাধনী। একবার মুজফরপুরে গিয়ে মাস খানেক ছিলাম।বাবা তখন ওখানে পোস্টেড।  অফিসের পাশেই গেস্ট হাউসে থাকতাম। কারণে অকারণে চলে যেতাম বাবার কাছে। ক্লাস সিক্স তখন। অফিসে গেলেই শুরু হয়ে যেত  বাঙালি মেয়েদের সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা। আমাকে দেখিয়ে তাঁরা বলতেন ‘বাঙালি মেয়েরা কাশ্মীরী মেয়েদের থেকেও সুন্দর’ সেই আমাকেই পরবর্তীকালে সংসার সীমান্ত পেরিয়ে অন্য পরিবারে গিয়ে শুনতে হল ‘অমুকের রঙ তোমার চেয়েও কালো, বা তোমার মতোই কালো কিংবা তোমার চেয়ে কম কালো।’ অর্থাৎ  বাবার ভাষায় ‘উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা’ আমি হয়ে গেলাম কালোর রেফারেন্স পয়েন্ট! আবার আমার এই দুধে আলকাতরা রঙ দেখে জনৈক আয়া একবার বলেছিল ‘রঙ একেবারে ফেটে পড়ছে!’ এইসব বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা শুনে আমার তত্বই প্রতিষ্ঠিত হয়- 
১ সৌন্দর্য জিনিসটা ভারি সাবজেক্টিভ
২ এই পোড়া বাংলায় সুন্দর বলতে নব্বই শতাংশ লোক গায়ের রঙ বোঝে
৩ সাহিত্যবোধের মতো সৌন্দর্যবোধও সবার থাকে না। 
৪ সৌন্দর্য বলতে লোকে মেয়েদের কথাই বোঝে, যেন ছেলেরা সুন্দর হয় না।
যাঁর লেখা ‘যুবকের স্নান’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম এই পুরুষ সৌন্দর্যের চেতনায়, সেই কবি দেবারতি মিত্রের গোটা যৌবন কেটেছে নিজেকে মোটা ভেবে চরম হীনম্মন্যতায়। ফরসার পরেই এই স্থূলতা সৌন্দর্যবোধের আরেক শত্রু। 
যাঁরা বলেন, আমাদের কালে সব ভালো ছেল, তাঁদের মনে করিয়ে দিই, খুব কালো মেয়েদের লাল শাড়ি পরার উপায় ছিল না, পরলে বলা হত, বয়লারে আগুন লেগেছে, তারা যদি ঝকঝকে দাঁত বার করে হাসত, বলা হত ভাল্লুকে শাঁখালু খাচ্ছে, পৃথুলারা জিন্স পরলে ট্রোল্ড হতে হত। এখন যে যা ইচ্ছে পরতে পারে, মলগুলোতে ওভারসাইজড লোকেদের পোশাক পাওয়া যায়।  গায়িকা জোজো বিন্দাস মেজাজে বলতে পারেন ‘আমি হ্যাপিলি মোটা!’ কে কী পরবে তা সমাজ ( সমাজ এখন ব্রহ্মের মতো, আছে কি নেই, বোঝাই যায় না) ঠিক করে দিতে চাইলেও কেউ পাত্তা দ্যায় না। সালোয়ার কামিজ পরা নিয়ে ফতোয়া মাঝে মাঝে জারি হয় বটে, কিন্তু তাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে ফেলেছে মেয়েরা। মেয়েদের কথাই বারবার বলছি, কারণ মেয়েদের পোশাক আর প্রসাধন ঠিক করে দেবার মাতব্বরি এ সমাজ দেখিয়ে চলেছে অনলস ভাবে। আমি কত মেয়েকে জানি, যারা বিয়ের পর কালো শাড়ি, কালো টিপ পরতে পারেনি, কারণ এয়োস্ত্রী মেয়ের কাছে কালো একটা ট্যাবু, অনেকে ঐ একই কারণে সাদা পরতে পারেনি, কারণ সাদা বিধবার পোশাক। তারা তাদের প্রিয় শাড়িটি আলমারিতে অনেক শাড়ির নিচে গোপনে লুকিয়ে রেখেছে প্রেমিকের চিঠির মতো। 
যে মাসিমার বাড়ি আমাকে একমাস ফেলে মা তার ঠাকুমার পারলৌকিক কাজে গেছিল, তাঁর পাঁচটি মেয়ে, আমার পাঁচ দিদি, তাদের স্নেহচ্ছায়া আজো অনুভব করি আমি। পাঁচজনই চমৎকার দেখতে, কিন্তু তাদের গায়ের রঙ  শ্রাবণের মেঘের মতো মায়াবী কালো। একজন আমাকে জিগ্যেস করেছিল, ‘তুই খুব ঐ বাড়িটায় যাস, তাই না? ঐ যে পাঁচটা কালো মেয়ে থাকে যে বাড়িটায়?’ 
সেই দিদিদের মধ্যে যে মেজ, তার ডায়েরিতে একবার লেখা দেখেছিলাম ‘আমার খুব ইচ্ছে ছিল, একটা সালোয়ার কামিজ পরি জীবনে একবার’
সেই বাক্যটা আমার কাছে অবদমনের শেষ কথা হয়ে থেকে গেছে।  

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।