জন-জনি জনার্দন সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে তৃষ্ণা বসাক (পর্ব – ২৩)

বহুদিনের চিনা বলে মনে হতিছে

পর্ব ২৩

মেয়েদের অনেক বদনামের কথা শোনা যায়। এদিকে মনু, ওদিকে শেক্সপিয়র, আরও কত তাবড় তাবড় পুরুষমানুষ  মেয়েদের সম্পর্কে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা বলেছেন, বলছেন এবং বলবেন। আর যত এসব বলা হচ্ছে, ততই শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে মেয়েদের বাড় বাড়ন্ত হচ্ছে। কথায় আছে, নিজের কানে নিজের প্রশংসা শোনা নাকি মৃত্যুর সমান, বরং নিন্দেমন্দ  শোনা মাঝে মাঝে ভালো। কে যেন বলেছিলেন না, ভোর বেলা উঠে প্রথমে শত্রুপক্ষের খবরের কাগজখানা একবার দেখতে হয়? 
তা মেয়েদের যত বদনাম, তার মধ্যে একটু কৌতূকরস মাখানো আছে বোধহয়  তাদের বয়স নিয়ে দুর্বলতায়। জগতে যে কটি জিনিস নিয়ে কৌতূহল দেখাতে নেই, তাদের সর্বাগ্রে  ছেলেদের মাইনে আর মেয়েদের বয়স(যেন মেয়েরা মাইনে ছাড়া চাকরি করে আর ছেলেদের বয়স হয় না!) অনেকদিন পর্যন্ত (প্রতিভা পাটিল-পূর্ব ভারতবর্ষে) জোক চালু ছিল কোন মেয়ে নাকি কোনদিন ভারতের রাষ্ট্রপতি হতে পারবে না, কারণ ভারতের রাষ্ট্রপতি হতে গেলে ন্যূনতম বয়স হতে হবে ৩৫ বছর আর কোন মেয়েরই নাকি ৩৫ বছর বয়স হয় নি!
এর থেকেও তীব্র  আর একটি রসিকতা আছে। ট্রেন চলেছে, দুই সহযাত্রিণির মধ্যে গল্প জমে উঠেছে। একজন বললেন, দিদি আপনার কটি ছেলেমেয়ে, অন্যজন হারনেওয়ালি নেহি। তিনি বললেন, আমার একটিই মেয়ে বড়দি।  এদের চাপানউতোর শুনতে শুনতে আর থাকতে না পেরে ওপরের বাংক থেকে একটি তরুণ নেমে এসে বলল ‘আমি এই সবে ভূমিষ্ঠ হলাম!’
খেয়াল করে দেখবেন, যে সব রসিকতাগুলো নিয়ে আমরা হেসে গড়াগড়ি দিই, তা বেশিরভাগ সময়ই কোন না কোন সম্প্রদায়কে কটাক্ষ করে বানানো।অনেকসময়ই এর টার্গেট ‘বোকা’ পাঞ্জাবি , জীবন ‘অতিষ্ঠ’ করে তোলা বউরা, কিংবা ইংরেজি না বলতে পারা বাঙাল।
আমি কিন্তু প্রচুর পুরুষ দেখেছি, যাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আয়নার সামনে কাটিয়ে দেন, কিংবা বয়সের ব্যাপারে ভীষণ স্পর্শকাতর। এক পুংকে জানতাম, যিনি স্নানের পরে চুল শুকিয়ে তবে আপিস যেতেন, আর তার জন্যে তাঁকে রোজই লেট খেতে হত। সম্ভবত সেই অন্ধকার মফস্বলে তিনিই প্রথম হেয়ার ড্রায়ারের প্রবর্তন করেন। শুনেছি ইদানীং তিনি সগগে গেছেন। সমস্ত কেশবিলাস/ বিলাসিনীর তরফ থেকে তাঁর আত্মার শান্তি ও তাঁর চুলের শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি।  আরো এক ডাক্তার (পুং) ছিলেন, তিনি কলে বেরোনর আগে পাক্কা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে স্নো পাউডার লিপস্টিক সহযোগে পরিপাটি মেকআপ করতেন। সেই যে জগবন্ধু লেন থেকে চারমাসের আমাকে মফস্বলে নিয়ে আসা হল, সে কথা নিশ্চয় স্মরণে আছে। কোন মাসে জানেন তো? ডিসেম্বর মাস। বেলেমাটির মফস্বলে তখন হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। সেই ঠান্ডায় এক রাতে একদিন আমার যায় যায় অবস্থা। কথিত আছে, আর কাউকে অত রাতে না পেয়ে সেই ডাক্তারবাবুকেই কল দেওয়া হয় এবং তিনি অত রাতেও পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে মেকআপ করেই আমাকে দেখতে আসেন। হ্যাঁ, তার পরেও, হে পাঠক আমি বেঁচে আছি। অবশ্য বলতেই পারেন, এ জিনা কোয়ি জিনা হ্যায় লাল্লু!  
যাই বলুন, বয়স  একটা রহস্যময় শব্দ, যার জাদু ঘিরে রাখত ছোটদেরও।  ছোটরা একজায়গায় হলে খানিক খেলাধুলোর পর ঠিক বয়সের প্রসঙ্গ উঠত। ধরা যাক হাত টানাটানি করে খেলা হচ্ছে ‘আনি বানি জানি না/ পরের ছেলে মানি না’ এই খেলাটায় বোধহয় হঠাৎ করে ঘুরতে ঘুরতে হাত ছেড়ে দেওয়া হয়। ব্যালেন্স না রাখতে পারলে পড়ে মাথা ফাটার সম্ভাবনা। আর তার মধ্যে অতর্কিতে-
 ‘এই, তোর বয়স কত রে?’ 
এ নিয়ে একটা জোকই ছিল। ‘আমার বয়স? বাও কি তেও, মা বলে আলো কম’ যাই হোক, আমি আমার  প্রকৃত বয়স বলার পর চিরকালই দেখে এসেছি, আমার দিকে সবাই সন্দেহের চোখে তাকায়। আমি আট বললে ভাবে নির্ঘাত দশ, দশ বললে ভাবে তেরোর কম না, পনেরো বললে মনে করে হাতে তিন চারবছর রেখেছি!  আমি যতই প্রতিবাদ করি, ততই তাদের সন্দেহ বেড়ে যায়। অনেক তর্কাতর্কি, হাতাহাতি, শেষে কান্নাকাটি পর্যন্ত গড়াবার পর একজন বিজ্ঞ নেতা গোছের কেউ এসে নিষ্পত্তি করে এইভাবে- ‘ছাড় তো, নে, বয়স নিয়ে আলুভাতে!’
ব্যাপারটা আমার ছোটবেলার কান্নাভুলোনো ‘দেখ না ওর গরম ভাতে ঘি দিয়ে কেমন জব্দ করি’ গোত্রের সন্দেহজনক মনে হয়।
সেইসময় সাময়িক শান্ত হয়ে গেলেও, এ প্রশ্নটা আমাকে তাড়া করে বেড়াত যে বয়সের সঙ্গে আলুভাতের সম্পর্ক কী। আজো বেড়ায়। এখানে বক্তা কী বলিতে চাহিয়াছেন? উক্তিটির সপ্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করো। আচ্ছা, আলুভাতে বলতে আমরা কী বুঝি? এটা তো সত্যি আমাদের ক্যাংলাসপার্টির পাতে ভাত আর আলুভাতে জুটলেই যথেষ্ট। তার সঙ্গে নুন, তেল আর কাঁচালংকা হলে তো কথাই নেই।  তার মানে দাঁড়াচ্ছে আলুভাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। সেই হিসেবে বয়েস নিয়ে মোটেই ছেলেখেলা করা উচিত না। তাহলে, যে মধ্যস্থতাকারী, সে আমাকে কী বলতে চাইল? যে বয়স কমিয়ে ( !!) আমি মোটেই ঠিক কাজ করিনি? নাকি আলুভাতে একটা অতি তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর জিনিস, তার মানে বয়স নিয়ে আলোচনা করাই অর্থহীন? আমি পেন্সিল চিবোতেই থাকি। এই দুটো সম্ভাবনার কথা উত্তরপত্রে লেখার সাহস হয় না। মায়া প্রকাশনীর বইয়ের ডায়েটে অভ্যস্ত পেটরোগা মাস্টাররা এত কথা দেখলে ভিরমি খাবেন। তাঁদের চিন্তা চলে বাইনারি সংকেতে। ইয়েস অর নো, সাদা কিংবা কালো, ভালো অথবা খারাপ। মাঝামাঝি কিছু নেই! 
বয়স নিয়ে সন্দেহ করার মধ্যে অবশ্য কোন দোষ ছিল না। ইয়ে মানে কিঞ্চিৎ হৃষ্টপুষ্ট বরাবরই। ঠিক বরাবর নয়, ক্লাস ফোর অব্দি চেহারা দেখলে বোঝা যেত দেশে দুর্ভিক্ষ লেগেছে, আর উত্তর- ক্লাস ফোর চেহারা দেখে বোঝা যেত দুর্ভিক্ষের কারণ কী। আমি একা নই, সেই জিরো ফিগার-পূর্ব মফস্বলে, আমরা অনেকেই সুযোগ পেলে যথেচ্ছ ঘি আলুভাতে সম্বলিত ফেনাভাত খাই টিফিনে, তাই এইরকম গোলুমোলু চেহারাই ছিল। যা দেখে বয়স নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ স্বাভাবিক তো বটেই।  পথেঘাটে মেল গেজের যেসব কথা ছুটে আসত তা এইরকম-
‘কোন চালের ভাত খায় বলতো?’ ( এই মন্তব্য শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়েই হয়তো এখনকার মেয়েরা ভাত খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে)
‘পাঞ্জাব লরি মাইরি’
আমরা, এসব শুনেও না শোনার ভান করতাম। একটি মেয়ে ছিল ছ ফিটের কাছাকাছি লম্বা, তার ওপর সাইকেল চালিয়ে যাবার সময় জ্যামে যখন দাঁড়িয়ে থাকত, তখন সে পাশের বেঁটে ছেলেদের মাথায় চাঁটিও মারত! এহেন মেয়েকে দূর থেকে আসতে দেখলে ছেলেরা বলত, ওই দেখ তালগাছ আসছে। সে মেয়ে থানায় রিপোর্ট করে সবকটাকে অ্যারেস্ট করিয়েছিল! এইসব টোন টিটকিরির বিবর্তন নিয়ে গবেষণার কাজে লাগতে পারে। 
বস্তুত, জীবনে যে কটি প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পাইনি, তার অন্যতম এই বয়স নিয়ে আলুভাতে। এর থেকে প্রমাণ হয়, আমার মোটেই বয়স বাড়েনি, একজায়গাতেই থেমে আছে।
এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে পাইনি, যে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, রাজপ্রাসাদ থেকে পর্ণকুটির, ব্যারিস্টার থেকে বেদেনি- সবার কেন আমাকে দেখলেই মনে হয়, আমার মতো তাদেরও একটা ভাইঝি কিংবা বোনঝি, কিংবা মামাতো বোন কিংবা সইয়ের বৌয়ের বকুলফুলের কিছু একটা ছিল। তারা আমাকে খুব তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করে বলে ‘একেবারে সেই মুখ! সেই চোখ, সেই নাক, নাকের তিলটা পর্যন্ত কেটে বসানো। এক্কেরে সে’ আপনারা কি ভাবছেন, এরপরও আমি এত হৃদয়হীন, তাদের সেই ভাইঝি কিংবা বোনঝি কিংবা যাই হোকগে-র কথা জানতে চাইনি? বিশ্বাস করুন, ইয়োর অনার, আমি জানতে চেয়েছি তাদের কথা। তাদের নাম কী, তারা কোথায় থাকে? তাদের বয়স(আবার সেই আলুভাতে) কত?  আর, শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে, প্রত্যেকবার আমার সেই একটুর জন্যে ফস্কে যাওয়া আত্মীয়রা ছলছল চোখে আমাকে বলেছেন সে/তারা/তাহারা মরে গেছে। একবার ট্রেনে একদল সাপুড়িয়া রমণী তাদের সাপের চুপড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। বহুক্ষণ থেকেই বুঝতে পারছিলাম আমাকে নিয়ে তাদের চাপা ফিসফিস। আন্দাজ করতে পারছিলাম কোন দিক থেকে তীর ধেয়ে আসছে। এলও তাই। তাদের এক বুনঝি, অবিকল আমার মত দেখতে, কেউ একজন একটা সাদা কালো ছবিও বার করে দেখাল, সে ছবিটি এতি ঝাপসা যে, তাদের বুনঝি না ওসামা বিন লাদেন না মীনাকুমারি- বোঝা শক্ত। তবে একথাও নিশ্চয় বলে দিতে হবে না, সে আর ইহলোকে নেই!
এইভাবে, নিজের কোন কৃতিত্ব ছাড়াই, শুধুমাত্র চান্স ফ্যাক্টরের জন্যে, আমি পৃথিবীতে এক জন্মে অনেক জন্ম বেঁচে চলেছি। আমার এই জাতক সমগ্র- এ তো অতি উচ্চমার্গের কথা। ক্যাংলাসপার্টিরা এসব বোঝে না। তারা শুধু বলে- 
‘তুমি কে?
যেন পাগলপারা হে
বহুদিনের চিনা বলে মনে হতিছে’
আমি মাঝে মাঝে আঁতকে উঠে ভাবি, যদি সেইসব তাহারা বেঁচে থাকত, কি কাণ্ডই না হত! আমি ধরুন  ভজন দত্তকে বলছি, এই সপ্তার কিস্তিটা দিতে পারলাম না, বেজায় অসুখ করেছে, তিনি তখন দেখলেন তাঁদের বাড়ির সামনে তিন মাথার মোড়ে আমি সাপের খেলা দেখাচ্ছি নাগিনের গানের তালে তালে, কিংবা আইনক্সে তাঁরই পাশে বসে পপকর্ন  খেতে খেতে যে মেয়েটি ‘শুভ মঙ্গল জাদা সাবধান’ দেখছে, সেই মেয়েটি আর কেউ নয়, আমি। কেস পুরো জমে ক্ষীর বস। হিট সিনেমার মশলা রেডি। 
মাঝে মাঝে রাতে শুয়ে শুয়ে দেখি সেই অগণিত লুক অ্যালাইকরা কুম্ভ মেলার হারানো বোনের মতো আমাকে ঘিরে নাচছে। এতো জুড়ুয়া! ধুত, জুড়ুয়া বলা যাবে কী করে? এ তো ক্লোন। এ নিয়ে  যদি কেউ সিনেমা বানায়, তবে একটা নামও আমার ভাবা আছে। ‘কোণে কোণে মে ক্লোন।’ আর সিরিয়াল হলে ‘ক্লোন রাখি না কুল রাখি?’

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।