প্রান্তিক পুরুষ শিক্ষক, প্রুডেনশিয়াল কাপ এবং রূঢ় উপত্যকা
পর্ব ১৬
পীড়িত পুরুষ পতি পরিষদ বলে একটি সংগঠন আছে সত্যি সত্যি? বুদ্ধদেব গুহের লেখায় ছাড়া বাস্তবে এর অস্তিত্ব আছে বলে শুনিনি। নির্যাতিত নারীদের জন্যে কত মঞ্চ, সংগঠন, কিন্তু পুরুষদের ওপর অত্যাচারের কথা বলার লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল।কেউ ভুলেও বলে না, এইসব মূক মুখে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে ভাষা ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ব্যাপারটা প্রথম নজরে এল নতুন স্কুলে এসে, যখন দেখলাম প্রশস্ত আলোকিত টিচার্স রুমে দিদিমনিরা ফুলের মতো ফুটে আছেন, আর এক কোণে ঘুপচি অন্ধকার ঘরে গুটি তিনেক বিরসবদন পুরুষ নেহাতই গালে হাত দিয়ে বসে আছেন। নিজেদের মধ্যে কথা বলার ইচ্ছেটুকুও যেন তাঁদের কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এঁরা হচ্ছেন বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু পুরুষ শিক্ষক, দিদিমণিদের চাপে আক্ষরিক অর্থেই কোণঠাসা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুকুন্দ স্যার, পণ্ডিত স্যার এবং দুলাল স্যার- যথাক্রমে অংক, সংস্কৃত আর ফিজিক্স।
আমি যখন সেই স্কুলে পড়তে গিয়েছি, তখন মুকুন্দ স্যার আর পণ্ডিত স্যার খুবই প্রাচীন, অবসরের দ্বারপ্রান্তে। মুক্তির সবুজ তীর তাঁরা খুব কাছ থেকে দেখতে পান বলেই কি তাঁরা বেশ ফুরফুরে, তাঁদের কথাবার্তায় হুল ফোটানো ব্যাপারটা আছে ঠিকই, কিন্তু সে হুলের কামড় মধুর রসে চোবানো। এই স্কুলের অনেক দিদিমনিকেই তাঁরা পড়িয়েছেন, ফলে তাঁদের একটা অভিভাবকত্ব কাজ করে কোথাও। অন্যদিকে দুলাল স্যার সদ্য তারুণ্যদশা কাটিয়ে মাঝ বয়স ছুঁয়েছেন, তাঁর সামনে দীর্ঘ ঊষর মরুভূমির মতো পথ, পরিত্রাণের কোন রাস্তা দেখতে পান না তিনি, তাই তিনি সর্বদাই বিরস, তিক্ত, কটুভাষী।
তিনজনেই তুখোড় পড়ান। কিন্তু কেন জানি আমরা কেউই তাঁদের সিরিয়াসলি নিই না। প্রথম থেকেই জেনে যাই, এঁরা হচ্ছেন আমাদের প্রার্থিত খোরাক।অবশ্য সে শুধু প্রথম দুজনের বেলায়। দুলাল স্যারকে নিয়ে যত হাসাহাসি গোপনে গোপনে। কারণ তিনি খুবই কড়াধাতের মানুষ। যদিও তাঁকে আমরা বেশ উঁচু ক্লাসেই পেয়েছি, সম্ভবত ক্লাস ইলেভেন আর টুয়েলভে তিনি ফিজিক্স পড়াতেন, আর পড়াতে এসেই প্রথম দিনই তিনি ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলেছিলেন তোমরা তো আগ মার্কা ক্লাস।এটা ঠিক, রেজাল্ট বা আচার আচরণে আমাদের একটা উচ্চতা ছিল, যা আমরা বেরিয়ে আসার অনেকদিন পরেও কোন ব্যাচ ছুঁতে পারেনি।তার ওপর, আমার ইয়ে মানে একটু কবিখ্যাতি ছিলই।একবার আমার ছবি দেখে ইউনিভার্সিটিতে এক বন্ধু বলেছিল – এ তো সবে ডিম ফুটে বেরিয়েছে! লুকস আর ডিসেপ্টিভ মশাই! ওসামা বিন লাদেনেরও তো নিষ্পাপ সন্তের চেহারা ছিল! আমার মাথায় সবসময়ই নানা আইডিয়া কিলবিল করত। যেসব মেনে নেওয়া কোন অচলায়তনের পক্ষে সম্ভব নয়।যার ফলে সংঘাত ছিল অনিবার্য।
বালক রবিকে যেমন সোনার টুকরো ছেলে সতীশের উদাহরণ দেখিয়েও কোন লাভ হয়নি তেমনই আমার চোখের সামনে সতীশকে নিত্য দেখেও আমার কোন উন্নতি ঘটেনি। ক্লাস ফাইভে রাসমনিতে এসে সেই সতীশকে বেঞ্চের ধার থেকে একটু ভেতরে ঢুকতে বললে সে গম্ভীর গলায় বলেছিল ‘মা বলেছে সবসময় ধারে বসতে’!বুঝলাম এখানে আজ ধার, কালও ধার, নগদের বালাই নেই! তো এই মাতৃতন্ত্র ক্লাস টুয়েলভ অব্দি বজায় ছিল। ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টুয়েলভ তার মা নিরলস অধ্যাবসায়ে স্কুলের ব্যাগ বয়ে গেটে ঢুকিয়ে দিয়ে উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে তবে ক্ষান্ত হতেন, বরাবর পাঁচ সাতখানা বই ঘেঁটে মেয়ের নোটস তৈরি করে দিতেন,ক্যালরি মেপে খাওয়াদাওয়া করানো, কার সঙ্গে মিশবে, কার সঙ্গে মিশবে না, প্রায় শিন্ডলার্স লিস্টের মত একটা তালিকা তৈরি করা- এসব তো ছিলই, বেচারা বাবাকেও আপিস ছুটির পর রাস্তাঘাটে ঘুরে ফিরে গভীর রাতে চোরের মতো ফিরতে হত, যাতে মেয়ের পড়াশনার ক্ষতি না হয়!
মনে রাখতে হবে, এটা সেই সময়ের কথা, যখন রাস্তাঘাটে এত মার্ক্সবাদী মায়েদের দেখা মিলত না, যারা এক-দু মার্ক্সের জন্যে ছেলেমেয়েদের জিনা হারাম করে দিতে পারেন। আমার মা জীবনে আমার কোন স্কুলের চৌকাঠ মাড়ান নি। যদিও বঙ্গে বর্গীর মতো পড়ার মাঝে অতর্কিতে হানা দিয়ে ভুল বানান শুধরে দিয়েছেন বারবার। এমনকি বাবার কাছে চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির যেসব ছাত্ররা আসত, তারাও মার ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। মা যখন তখন তাদের খাতা কেড়ে নিয়ে বানান ভুল ধরত। একবার আমার টয়ফেল –জি আর ই পরীক্ষার জন্যে পাসপোর্টের আবেদন করা হয়েছে, পুলিশ ভেরিফিকেশনে এসেছে, মা তাকে উলটে এমন জেরা করল যে দুদিনের মধ্যে বাড়িতে পাসপোর্ট হাজির, কোন উৎকোচ ছাড়াই!তবে মার যত হম্বিতম্বি, সব ছিল বাড়িতেই সীমাবদ্ধ।বাজার দোকান বা আমাদের স্কুলে যেতে মার চূড়ান্ত অনীহা।
সেই হিসেবে সোনার টুকরো সতীশের মা সেই পিছিয়ে পড়া মফস্বলে একটা নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তী তিন দশক বাংলার শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যাকে বলেছিলেন, এখনকার শিক্ষাব্যবস্থা মায়েদের পথে বসিয়েছে!
একবার স্কুল থেকে শান্তিনিকেতন, বক্রেশ্বর, মাসানজোর, তারাপীঠ নিয়ে যাওয়া হল। কি আশ্চর্য, সতীশও দেখলাম মাইনাস মা, আমাদের সঙ্গে চলেছে। বাস ছাড়ার মুহূর্তে রাস্তায় মা, বাসের মধ্যে মেয়ের কান্নার দৃশ্য, যাকে বলে অশ্রুসজল সামাজিক পালা। অগত্যা সেই ট্যুরে আমিই হয়ে উঠলাম সতীশের জননী। তার বদলে বেচারার সঙ্গে নতুন গামছায় বেঁধে দেওয়া মায়ের হাতের নাড়ু, নিমকি, চিঁড়েভাজার সবটাই আমাদের পেটে গেল। তাতে আমাদের বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না। শান্তিনিকেতনে যে হোটেলে আমাদের তোলা হয়েছিল তার নাম ছিল পৌষালি। এই বটবৃক্ষের তলায় বসে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি লিখেছিলেন, এই শেষের কবিতা সেলুনে উনি নিয়মিত দাড়ি ট্রিম করতে আসতেন- গাইডের এইসব মূল্যবান জানকারি শুনে পেট চুঁইচুই করছে, হোটেলে ফেরার পর জলখাবারে দেওয়া হল চারটে লুচি, তরকারি আর একটা মিস্টি । সেসময় যে রবিবার ছ খানা লুচি খাই, মা ভাবে শরীর খারাপ বুঝি। চারখানা লুচি খেয়ে আমরা স্বভাবতই মনক্ষুণ্ণ হয়ে এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি, তখন সতীশ দেড়খানা লুচি ছিঁড়ে খেয়ে বলল পেট একদম আই ঢাই। এরপর ওর গামছার ওপর না ঝাঁপিয়ে আমাদের উপায় কী?
জীবনে কখনো বাংলা বা ইংরেজি রচনা মুখস্থ করে লিখিনি। এরজন্যে দিদিরা প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলতেন, ওরে একটু মুখস্থ কর, নম্বর বেশি উঠবে। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই সোনার টুকরো সতীশের উদাহরণ দেওয়া হত। তবে এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সেসব আর কোনদিন শুনতে হয়নি।
হয়েছে কি, সেসময় ভাব সম্প্রসারণ বলে একটা ব্যাপার ছিল। একবার এসেছে বিখ্যাত সেই লাইন ‘পুষ্প আপনার জন্যে ফোটে না। অপরের জন্যে আপনার হৃদয়কুসুম বিকশিত করিও’। সতীশ শুরুতেই লিখল- ‘পরশ্রীকাতরতা মানুষের একটি প্রধান গুণ।’ বাংলার মিনতিদি পাক্কা তিনমিনিট ওর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু আগে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেছিলেন। এই ঘটনায় আমার মস্ত উপকার হল এই যে- আমাকে কেউ কিছু মুখস্থ করার কথা আর কোনদিন বলেনি। আমি পাখির মুখের উড়ো বীজ থেকে গজানো চারার মতো একা একা যেমন ইচ্ছে বেড়ে উঠছিলাম। এই যেমন ইচ্ছের চরম উদাহরণ দেখল ১৯৮৩। ২৫ জুন সম্ভবত। প্রুডেনশিয়াল কাপ জয় ভারতের। বাড়িতে টিভি নেই।শুধু রেডিওর কমেন্ট্রি আর পাড়ার ছেলেদের উল্লাস। পরেরদিন খবরের কাগজ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ।এদিকে ক্লাস এইটের হাফ ইয়ারলি চলছে। আনন্দের চোটে ভুলে গেছি সোমবার পরীক্ষা। একটা না, দু-দুটো এমন পরীক্ষা যা দিতে যাওয়ার আগে আমাকে মাঝে মাঝেই হোমিওপ্যাথি নার্ভাসনেসের ওষুধ অ্যানাকারডিয়াম খাওয়াতে হত। ইতিহাস আর ভূগোল। সোমবার নটা নাগাদ ভাবছি একটু পড়তে বসা যাক, কান খাড়া আছে বড়দের উত্তেজক আলোচনায়, খেলার পাতা খোলা। হঠাত পরিচিত রিক্সার হর্ন , সুরেনদা এসে হাজির। আমি মহা ক্ষেপে তাকে বলি, ‘আজ এসেছ কেন? পরীক্ষা তো কাল’ সে আমার ওপর চেঁচিয়ে বলল ‘উটিন খুলে দেখো।পরীক্ষা আজ। ডাক্তারবাবুর মেয়ে বলেছে’। ডাক্তার গোবিন্দ পালের মেয়ে সুস্মিতা একই ক্লাস, একই সেকশন, এক রিক্সায় যাই আমরা। রুটিন খুলে দেখে চক্ষুস্থির।হায়!এ কোন সকাল,এ যে রাতের চেয়েও অন্ধকার! তিনদিন ছুটি ছিল, সব তো পামোলিভ কা জবাব নেহি-কপিলদেবের চরণে গেছে। আজই পরীক্ষা তো। বাড়িও মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি নিঃসন্দেহে, এমন একপিস খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেউ জানে না আমার পরীক্ষা আজ!সত্য সেলুকাস,কি বিচিত্র এই বাড়ি! মার রান্নাও চড়েনি তখনো। অস্নাত, আধসেদ্ধ চালে মাখন দিয়ে দু এক গরাস গিলে বলির পাঁঠার মতো কাঁপতে কাঁপতে যাই পরীক্ষা দিতে। ক্লাসে রোজের পড়া শোনার সুবাদে ইতিহাস দিয়েই ফেলি। সেকেন্ড হাফে ভূগোল। চিরকালের বিভীষিকা রূঢ় উপত্যকা চোখের সামনে কপিলের ইয়রকারের মতো দোলে। ভারি ক্লান্ত, অবসন্ন আমি ততক্ষণে, পঞ্চাশ নম্বর উত্তর করে পেন বন্ধ করি, ফাঁসির ঘোষণা করে বিচারক যেভাবে কলম ভেঙে দেন, অনেকটা সেই স্টাইলে। পাশে বসা ক্লাস নাইনের কথাকলিদি শিউরে ওঠে ‘আর একটু লেখ, আমি বলে দিচ্ছি’। আমি তার কথায় কর্ণপাত না করে জানলা দিয়ে সোনাঝুরি গাছ দেখি। মাতৃ-আজ্ঞাঃ বেল না পড়লে বাইরে যেতে পারবে না, তাই বসেই থাকি খাতা আগলে। সে যাত্রা ইতিহাসে বাহাত্তর আর ভূগোলে সাতচল্লিশ। আগমার্কা ক্লাস নাহলে এমনটা হতে পারত?