‘এই যে দাদা কেমন আছেন?’
সাইকেলে যেতে যেতে একটি লোক টুক করে নেমে পড়ল আমার পাশে।
আমি হনহন করে হাঁটছিলাম। থমকে গেলাম। ঘেমো শরীরে গন্ধ ওঠে। একটু তফাতে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘ভালো’।
‘তা সোসাইটির মিটিংয়ে আর দেখছি না আপনাকে?’
আমি এবার লোকটির মুখের দিকে তাকালাম। চেনা মনে হল না। মধ্যবিত্ত সংগ্রামের চিহ্ন লোকটার চোখেমুখে। তবে বড্ড বেশি প্যাকাটি চেহারার। লিকলিকে হাত-পা। তুলনায় কান দুটো বড়। দাড়িগোঁফ নেই। মাকুন্দা নাকি!
সোসাইটির মিটিংয়ে আমি যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি সেই কবে। দু-বছরের সোসাইটি, তার দু-গন্ডা দল। গ্রুপে গ্রুপে ঠোকাঠুকি। আর সোসাইটির কাজ তো দুটি। দুর্গাপূজা আর সরস্বতীপূজার আয়োজন। ভুরি ভুরি চাঁদা নিয়ে খাবার সম্ভ্রান্ত ব্যবস্থা। মন্ডপে পূজার দিনগুলোতেও লোক থাকে না খাবার সময় ছাড়া। আমার মতো চুনোপুঁটি লোক ঠিক ম্যাচ করে না এই সোসাইটিতে।
বললাম, ‘সময় পাই না মশাই। অফিস থেকে ফিরে মেয়েকে টিউশানি দেওয়া। আবার নিয়ে আসা। গানের ক্লাস, কম্পিউটার ক্লাস।’
‘তা বটে। ভালই করেছেন।’ লোকটা বলল।
‘মানে, কি ভাল করেছি!’
‘ওই মিটিং-ফিটিংয়ে না গিয়ে। ফিট না করলে না যাওয়াই ভাল। আর ফিট করবে কি মশাই!’ বলেই লোকটা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল!
লোকটাকে কেন যেন আমার মতো মনে হল। পোশাক-আশাক সাধারণ। কথাবার্তায় আহাম্মকি নেই। বরং অনেকটা এভারেজ বাঙালি টাইপ। পরচর্চায় অত্যুৎসাহী যেন। লোকটা আমার মনোযোগ পাওয়ার জন্য ওর সাইকেলের বেল বাজাল। বা, বেশ অন্যরকমের আওয়াজ তো! অবাক হলাম, এলাকায় যেখানে অধিকাংশ লোকের গাড়ি আছে, নিদেনপক্ষে মোটর বাইক, সেখানে এই লোকটা সাইকেল নিয়েই দিব্যি আছে!
লোকটা বলতে লাগল, ‘অধিকাংশই নন-বেঙ্গলি মশাই! বাংলায় আছি না ইউপি-তে আছি বোঝা মুশকিল। আর মিটিংয়েও কথাবার্তার বেশিটাই হিন্দি আর ইংরেজিতে! ভাবুন একবার! বলি, আমরা বাঙালিরা কি মরে গেলাম নাকি!’
মনে হল কিছু বলি। কিন্তু লোকটা আমাকে বলার চান্স না দিয়ে বলতে লাগল, ‘আরে মশাই, দূর্গাপুজোয় বাঙালিরা বলে এক রকমের মেনু তো নন-বেঙ্গলিরা সাজেস্ট করে অন্যরকম। ওরা তো হোলি উৎসবটাও করে দেখিয়ে দিল। ন্যাড়াপোড়া, হোলি কা দালে, আরও কত কী!’
লোকটা তারপর থেমে গেল হঠাৎ। সাইকেলে চাপল। ‘একটু আসছি মশাই’ বলেই ধাঁ করে চলে গেল।
যা বাবা, এ যে অবিকল আমারই মতন। বেশি ক্ষণ কারও সাথে থাকতে পারে না। আমার বউ বলে আমারই দোষ। বলে, কুয়োর ব্যাং। লোকের সঙ্গে মেলামেশা করার ক্ষমতাই নেই। একটা গাঁইয়া কোথাকার। বলে, সাতপুরুষের পুণ্যির জোরে এমন জায়গায় ঘর করতে পেরেছি। ওর না আমার সাতপুরুষের পুণ্যির জোর- এটা অবশ্য বলেনি।
লোকটার জামার বুক পকেটের ভিতরের দিকে ঠাকুরদা মার্কা আরও একটা পকেট ছিল। রংচটা জিন্স প্যান্ট। বাঁ হাঁটুর কাছটা একটু ছেঁড়া-ছেঁড়া। পায়ে চামড়ার চপ্পল। কানের দু-পাশে জুলপির চুল একজাতীয় ক্যাকটাসের মতো খোঁচা খোঁচা। আমার বেশ হাসি পেল জুলপির কথাটা ভেবে। ওটাই কেবল আমার সাথে মেলে না। না হলে আমার মতো গোবেচারা মার্কা মানুষের জুড়ি ওর থেকে আর ভাল পাওয়া যাবে না এই তামাম শহরে। লোকটার সাথে আমি একরকমের একাত্মতা খুঁজে পাচ্ছিলাম। ঠিক কী কারণে, এটা অবশ্য আমার কাছে খুব একটা স্পষ্ট নয়।
আমার এই এক পিকিউলিয়ার স্বভাব। একটু নরম-সরম গোছের মানুষ দেখলেই তার ভিতরে ঠিক ঢুকে পড়ি। আরে, নরম-সরম কী বলছি, আমাদের অফিসের কলিগ চৌধুরীবাবু বেশ হোমরা-চোমরা, তার মধ্যেও ঢুকে পড়েছি মাঝে মাঝে।
আসলে চৌধুরীবাবু বস্কেও রেয়াত করেন না। মাথা হেঁট করার বালাই নেই। আর আমি ঠিক এই অবস্থানের উল্টোদিকে সদর্পে বিরাজমান। সব সময় মিইমিই করি। বসের ফরমান মাথাটা তিন ফুট নিচু করে মেনে নিই। অপমান করলে পালাবার পথ খুঁজি। অফিসের গাছতলায় টিফিন খেতে খেতে হাপুস নয়নে মনখারাপ করি।
আর চৌধুরীবাবু সবকিছুতেই ফাইট করতে জানেন। অন্যায়কে মেনে নেওয়ার বান্দা উনি নয়। বসের সঙ্গে যখন তর্ক করেন, মুখের ওপর দুমদাম ইংরেজি বলেন, টেবিল চাপড়ে দাবি প্রতিষ্ঠা করার হিম্মত দেখান। তখন মনে হয়- ওই, ওই লোকটাই তো আমি। আমারই ভিতর থেকে বেরিয়ে আমার ভায়োলেন্ট সত্ত্বাটা চৌধুরীবাবুর মুখে কথা বলছে। বাড়িতে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজের ভিতরের অন্য একটা আমি-কে খুঁজে পাই। চোখে কাঠিন্য। মুখে গাম্ভীর্য। হাতের মুষ্টি দৃঢ়। সারা শরীরে একটা কাঁপুনি মুহুর্মুহু টের পাই।
বউ হঠাৎ এসে বলে, ‘কী হল তোমার বলো তো!’
আমি বলি, ‘অফিসে মাথাটা বিক্রি করে দিয়ে বউয়ের কোলে শুয়ে কাঁদা আমার স্বভাব নয়, বুঝলে!’
বউ তো অবাক। লোকটার হল কী! একটা কঠোর দাবড়ানি দিয়ে হুড়মুড় করে টানতে টানতে আমাকে বাথরুমে নিয়ে যায়। মাথায় জল ঢেলে দেয়। আর আমি পুনরায় মিস্টার শান্তিগোপাল মান্না হয়ে যাই।
কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজে মেটে না। আমার ভিতরের একটা লোক বাইরে দেখা অন্য একটা লোককে কখন যে নিজের মতো ভাবতে শুরু করে দেয়! এই তো দিন পনেরো আগে শহরের বাসস্ট্যান্ড থেকে কলকাতাগামী বাসে চাপতে যাব, আর চোখ চলে গেল একটা চায়ের দোকানে। এক ভদ্রলোক। চোখে হালকা চশমা, মুখে দাড়ি, উশকোখুশকো চুল, গায়ে ঢলা পাঞ্জাবি আর পাজামা। কাঁধে নকশা করা শান্তিনিকেতনি ব্যাগ ঝোলানো। হাতে একটা জ্বলা সিগারেট নিয়ে যুব কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিটা বড্ড উদাসীন। রোমান্টিক। কবি-কবি।
আমার ভেতরটা ঝকমকিয়ে উঠল। আমি না! লোকটার মধ্যে নিঃসন্দেহে একটা রোমান্টিক অ্যাপ্রোচ আছে। কবি-সাহিত্যিকদের মতো হাবভাব। নিজের সুড়ঙ্গে ঢুকিয়ে রাখা সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল আমার। পঁচিশে বৈশাখের আগের রাতে ট্রেন ধরে খড়্গপুর। বন্ধুর রেল কোয়ার্টারে রাত্রিযাপন। ভোরবেলায় ট্রেন ধরে হাওড়া। তারপর রবীন্দ্রসদন। হাতে নতুন পত্রিকা। নতুন পত্রিকার গন্ধটা তখন আবার পাচ্ছিলাম যেন।
আমার বাস ছাড়ব ছাড়ব করছিল। কিন্তু ওই কবি-কবি মানুষটার চা-পান, ধুমপান থেকে শুরু করে এক গভীর আশ্লেষে কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকা তক সব কিছুই যেন আমার, আমারই। এমনকি নির্বিকার ভাবে পকেট থেকে খুচরো পয়সা বের করে ভিখিরিকে দেওয়ার মধ্যেও আমি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিলাম।
আমি হাঁটতে হাঁটতে জগার্স লেন-এ পৌঁছলাম।
ওখানে এসে দাঁড়াতেই দেখলাম, ব্রজদা সকাল সকাল গাছপালার পরিচর্যা করছে। ব্রজদা আমার প্রতিবেশী। ব্রজদা এবং বৌদি দুজনেই ত্রিপুরার। ওদের বাংলা উচ্চারণে এক অদ্ভুত রকমের মিষ্টি টান আছে।
আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বলল, ‘শুনেছ তো সব?’
জানতে চাইলাম, ‘কী ব্যাপারে?’
‘আরে এখানে একটা মেয়েকে, তুমি চেন, শ্রাবণী, লিটল রোজ স্কুলে পড়াত, তো ওকে, বুঝলে রেপ, তুমি শোন নাই বলছ…’
আমি সকালবেলায় এমন একটা বাজে খবর শুনে বেশ মুষড়ে গেলাম। আমাদের স্ট্রিট থেকে দুটো স্ট্রিট পরে ঘটনাটা ঘটেছে, অথচ আমি জানি না!
ব্রজদা নিজেই বলতে শুরু করল, ‘কাল গভীর রাতে পুলিশ ওদের বাড়ি এসেছিল। ঘটনাটা তার আগের রাতে ঘটেছে।’
আমি দুম করে বলে ফেললাম, ‘রেপ করে খুন?’
‘আরে খুন তো অন্য একজন হয়েছে শহরে। খুনি লোকটা ধরাও পড়েছে। এটা আলাদা কেস। কী সাংঘাতিক ব্যাপার একবার ভাবো!’
আমি জগার্স লেনে আক্ষরিক অর্থেই জগিং করা শুরু করলাম। কেমন একটা পালপিটেশন হচ্ছিল আমার। একটা অচেনা অস্বস্তি। আমি ব্রজদার ব্লিডিং হার্ট ফুলগাছটার দিকে তাকিয়ে সাদা ফুলের মাঝে লাল অংশটাকে দেখে কেবলই ভাবতে লাগলাম হৃদয় থেকে রক্তক্ষরণ। ওখান থেকে চোখ সরতেই দেখি সেই লোকটা এখানেও। আমাকে দেখামাত্র সাইকেল থেকে নামল। বিড়ি ধরাল। সাইকেলের বাস্কেটে রাখা পেপারটাকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইল পড়ব কিনা।
আমি হ্যাঁ বা না কিছু বলার আগেই ওর একটা ফোন এল। সংক্ষিপ্ত কথা বলে ওটাকে আবার বুকপকেটের ভিতর দিকে চালান করে দিল। কম দামি পাতি একটা সেলফোন।
লোকটা আমার শ্রেণিচরিত্রটাকে যেন টেনেহিঁচড়ে বের করে দিচ্ছে। ওই লোকটাই যেন আসল আমি। নিজেকে কেবল পালিশ করে ঘষামাজা করে অন্যরকম সাজিয়ে রেখেছি।
লোকটা আমার হাতে পেপারটা গুঁজে দিয়ে বলল, ‘পড়ুন মশাই। এই শহরের খবরটা পড়ে দেখুন জেলার পাতায়।’
জেলার পাতায় চোখ আটকে গেল। শহরে যে লোকটা খুন হয়েছে তার ছবি এবং ধরা পড়া খুনির ছবি বড় করে ছাপা হয়েছে। আর কী আশ্চর্য, আমাদের কলোনির যে মেয়েটি রেপ্ড হয়েছে, তার ছবি। আর ওর পাশেই রেপিস্টের ছবি। তার মানে ধরা পড়েছে রেপিস্ট!
খবর দুটো পড়তে পড়তে একরকমের ক্রোধ ও পরে অসহায়তার অনুভূতি হচ্ছিল আমার। কিন্তু আমি জোর করে অন্য দিকে মন ঘুরিয়ে নিতে চাইলাম। লোকটাকে পেপারটা ফেরত দিয়ে আমি ব্রজদার কাছে এসে দাঁড়ালাম। একটা ছোট রংগনগাছের তলার মাটি আলগা করছিল ব্রজদা। বললাম, ‘আপনার বাগানে রক্তকরবী নেই তো, নেবেন?’
ব্রজদা মজা করে বলল, ‘ফুল ফুটলে নন্দিনী আসবে তো?’
বললাম, ‘তখনও যদি রঞ্জন হয়ে থাকতে পারেন।’
‘হয়ে কী লাভ। সেই তো রাজার হাতে মরতে হবে।’
‘আর নন্দিনীর কী হবে তবে!’
‘রেপ্ড হবে। খুন হবে তারপর। তার জন্য রাজাকে দরকার হবে না। আমরা সকলেই কিন্তু ধর্ষক। এবং খুনিও।’
আমার মাথাটা কেমন ঘেঁটে যেতে লাগল। আমি আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে হাঁটা দিলাম। আজ অনেক ঘাম ঝরাতে হবে। মনের ভেতর যাবতীয় নোংরা চর্বি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। বড্ড বেশি মেদ জমে আছে শরীরে আর মনে।
আজ অফিসেও প্রচুর ধকল গেল। ঘরে এসে মেয়েকে দু-জায়গায় টিউশানি দিয়ে আবার নিয়ে এসেছি। বাজারে গিয়ে আমার বউ রীতার জন্য লাল টকটকে গোলাপ কিনে এনেছি। কারণ ওই পাপড়ি শুকিয়ে গুঁড়ো করে সিঁদুরের মতো পরবে সিঁথিতে। চর্ম চিকিৎসকের নির্দেশ মতো।
এত সবের পর মাথাটা আমার টনটন করছিল। খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়লাম। ঘুমোতে পারলেই যেন বাঁচি। কিন্তু চোখ বুজলেই ভেসে উঠছে পেপারে দেখা খুনি লোকটার ছবি। রেপিস্টের ছবি। আর অদ্ভুত একটা মানসিক আবহে আমি ওদের জায়গায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছি। যেন আমারই ভিতর থেকে আমার কোনও সত্ত্বা বেরিয়ে গিয়ে রেপ করে এসেছে ওই মেয়েটাকে। খুন করে এসেছে শহরের লোকটাকে আমারই ভিতর অজস্র আমি-র একজন। আমরা সকলেই ধর্ষক! আমরা সকলেই খুনি! ব্রজদার কথাগুলো প্রচন্ড শব্দে আমার কানে বেজে উঠতে লাগল। প্রত্যেকটা মানুষের ভিতরেই কি তবে ওই অপরাধপ্রবণতার বীজ সুপ্ত হয়ে আছে! জানি না আমি, জানি না। ওই তো জানালা পেরিয়ে, অন্ধকার পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমি। ওই তো যে লোকটা খুন করেছে, তার মধ্যে আমি। ওই তো আমার আগুনরঙা ক্রোধ। ওই তো আমার রগরগে কামনা-লালসা। গলির নিরালা থেকে যুবতীকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে যে দু-চারজন উন্মাদ যুবক, তাদের একজন কি আমিই!