চিত্রকাহনে ঋত্বিক ভট্টাচার্য – ২

এভাবেই আস্তে আস্তে উত্তরবঙ্গকে ভালোবাসতে শুরু করলাম। যে অজানা অভিমানে আমি বাড়ি ছেড়ে উত্তরবঙ্গ গিয়েছিলাম সেটাই আশীর্বাদ হয়ে উঠলো। আস্তে ক্যাম্পাস হাতের তালুর মত চিনে ফেললাম। কৃষিবিজ্ঞান অনুষদের বাগানে কোথায় গেলে সিঁদুরে মৌটুসী(Crimson sunbird) পাওয়া যায়, কোথায় রাতে কালপ্যাঁচা(Brown hawk owl) আসে, কোন গাছের কোটরে কুটুরে প্যাঁচা(Spotted owlet) থাকে, কোথায় কাদাখোঁচা(snipe) থাকে, কোথায় গেলে ইন্ডিয়ান স্পটেড ঈগল দেখা যায় বা কোন গাছে মুনিয়ার বাসা আছে, সব একরকম হাতের মুঠোয় চলে এল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা এখনও সেই বাগান, যেখানে সিঁদুরে মৌটুসীরা বিকেল হলেই চলে আসে এবং উড়ে উড়ে ফুলের মধু খায়। পুরুষ সিঁদুরে মৌটুসীর উজ্জ্বল লাল রঙ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। লাল রঙের তীব্রতা কতটা হতে পারে, একে না দেখলে বোঝা মুশকিল। কত বিকেল এই বাগানে কাটিয়েছি আর কত হাজার ছবি এই পাখির জন্য খরচ করেছি, তার সত্যিই কোনো ইয়ত্তা নেই।
তবে অস্বীকার করব না, পড়াশোনার চাপের মাঝেও যে ভাবেই হোক, ছবি তোলায় সময় দিতাম। কারণ মানুষের শখ বা হবিই মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য ধনাত্মক শক্তির জোগান দেয়। আমার ক্ষেত্রে সেই ধনাত্মক শক্তি প্রকৃতি থেকে আসে। ছবি তোলা আমার কাছে শুধু মাত্র শখ নয়, এটা আমার বেঁচে থাকার অন্যতম কারণ।

তবে আমি শুধুই পাখির ছবি তুলতাম এমনটা বললে সত্যের অপলাপ হবে। তবে সে অপলাপ মার্জনীয় কি না তার বিচার পাঠক করবেন। পাখির সাথে আমি প্রজাপতি এবং সাপও ভালোবাসি। কিন্তু কথায় আছে না, অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকায়ে যায়। তবুও হঠাৎ করে দুইবার পেয়ে গিয়েছিলাম আমার প্রিয় সাপ শঙ্খিনীকে। উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পাখির সাথে সাপেরও ডেরা। কোরাল কুকরি স্নেক, কমন কুকরি স্নেক, গোখরো, দাঁড়াশ, ঘরচিতি, শঙ্খিনী, হেলে, জলঢোঁড়া এসব মোটামুটি দেখা যায়। এছাড়া খুব কম সংখ্যায় বার্মিজ অজগরও আছে বলে অনুমান করা হয়। অবশ্য গোটা কোচবিহারই বার্মিজ অজগরের জায়গা। তাই অজগর থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমি মাত্র দুইবারই শঙ্খিনীর দেখা পেয়েছি। শঙ্খিনী এমনিতে খুব শান্ত সাপ। কিন্তু এর বিষ স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সময় মত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মৃত্যুও হতে পারে। যদিও শঙ্খিনীর কামড়ে মৃত্যু খুবই বিরল কারণ এই সাপটি দিনের বেলায় অত্যন্ত শান্ত হয়ে থাকে এবং সহজে কামড়াতে চায় না। রাত হলে অবশ্য এই স্বভাব পাল্টে যায়। তখন এরা ক্ষিপ্র শিকারী হয়ে ওঠে। শঙ্খিনী মূলত অন্য সাপের শিকার করে। এরা অন্য বিষধর সাপ খেয়ে পরোক্ষ ভাবে আমাদের রক্ষা করে। কোচবিহারে কমন ক্রেট বা ওয়ালস ক্রেট জাতীয় অন্য ক্রেট সাপও দেখা যায়। শঙ্খিনী এদের শিকার করে পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করে।
তবে আমার আফসোস হয় কোরাল রেড কুকরি সাপ দেখতে না পাওয়ার জন্য। বেশ কয়েকবার মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য সাপটির দেখা পাইনি। উজ্জ্বল কমলা রঙের এই সাপটি প্রত্যেক সর্পপ্রেমীর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। আশা করি ভবিষ্যতে দেখতে পাব কখনও।
সরীসৃপ বলতে আমাদের প্রথমেই সাপের কথা মনে পড়লেও সাপই একমাত্র সরীসৃপ নয়। তুলনামুলক ভাবে বিরল হলেও কচ্ছপও আমাদের পরিচিত সরীসৃপগুলির মধ্যেই আসে। পুন্ডিবাড়ি থেকে গাড়িতে ৩০-৪০ মিনিট গেলে পৌঁছান যায় বানেশ্বরে। স্থানীয় উপকথা অনুযায়ী অসুররাজ বান ছিলেন দেবাদিদেব শিবের ভক্ত। শিবকে পাতালে নিজের কাছে রাখার পণ নিয়েছিলেন কিন্তু ভুলবশত শিবলিঙ্গ যেখানে রেখে দিয়েছিলেন সেখান থেকে আর শিবকে সরানো যায়নি। সেই স্থানেই আজ বানেশ্বর শিব মন্দিরের অবস্থান। এই বানেশ্বর শিব মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ কিন্তু আদতে শিব নন। এই মন্দিরের মূল আকর্ষণ হল শিবমন্দির সংলগ্ন পুকুরের কচ্ছপেরা, যাদের স্থানীয় ভাষায় মোহন বলা হয়। ব্ল্যাক সফটশেল প্রজাতির এই কচ্ছপ ভীষণ বিরল। আইউসিএন রেডলিস্টে ইতিমধ্যেই এই কচ্ছপকে EW(Extinct in Wild) ক্যাটেগরিতে রাখা হয়। মন্দিরের বোর্ডে লেখা তথ্যানুযায়ী এই কচ্ছপ বা মোহনগুলির মধ্যে শতাধিক বছর পুরনো মোহনও আছে। তবে শুধু বানেশ্বরেই এই মোহন পাওয়া যায় সেরকম নয়। উত্তরপূর্ব ভারতের অনেক মন্দির সংলগ্ন পুকুরেই এই ব্ল্যাক সফটশেল কচ্ছপের দেখা মেলে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অসমের হয়গ্রীব মাধব মন্দির। সেখানে এরা বোষ্টমি কচ্ছপ নামে পরিচিত। এছাড়া বাংলাদেশের চট্টগ্রামেও দেখা যায়। সেখানে আবার মাজারি কচ্ছপ বলে ডাকা হয়ে থাকে এদের। এছাড়া কামাখ্যা মন্দিরের পাশে নীলাচল পাহাড়ে একটি মন্দিরসংলগ্ন পুকুরেও কয়েক বছর আগে এই কচ্ছপ পাওয়া গিয়েছে। আইউসিএন রেডলিস্টে ইডব্লিউ লিস্টে থাকলেও পরিবেশপ্রেমীদের উদ্যোগে আজকাল বন্য পরিবেশেও ব্ল্যাক সফটশেল কচ্ছপ খুজে পাওয়া গিয়েছে। কাজিরাঙ্গা জঙ্গলে একটি ক্ষুদ্র বন্য পপুলেশনের অস্তিত্ব জানা গিয়েছে।

চলবে…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।