গুচ্ছকবিতায় উজ্জ্বল সামন্ত

১। ইতিকথা

দুটি মানুষের ভালোবাসার দূরত্বটা কোনখানে ?
দূরত্ব হার মানে ভালোবাসার অটুট বন্ধনে
বন্ধন ফস্কাগেরো মনের দূরত্বের ব্যবধানে
দূরত্ব যেখানে আলোকবর্ষ সম্পর্কে অন্ধকার নামে
অন্ধকার যেখানে অমাবস্যা ঢাকে কৃষ্ণগহ্বরে
কৃষ্ণগহ্বরে নিখোঁজ সৃষ্টির সত্য রহস্যময়ে
রহস্য যেখানে শিহরিত করে দৃষ্টিকে ভিন্নখাতে
দৃষ্টি যখন ছায়াকে লক্ষ্য সদ বা অসদবিম্বে

লক্ষ্য যেখানে অবিচল আস্থা ভালোবাসা অর্জনে
ভালোবাসার তরী ডোবে অভিমানের মাঝখানে
অভিমানের সম্পর্ক এলোমেলো মুহুর্তের সন্ধিক্ষণে
মুহুর্তেরা হেসে বা কেঁদে ওঠে স্মৃতির রোমন্থনে

স্মৃতিরা আনন্দ কখনো বেদনার বীণ ভূমিকাতে
ভূমিকা যেখানে শুরুর মাঝখানে উপসংহার টানে
উপসংহারে জীবন গল্পের শুরুর ইতিকথা ইতিহাসে
ইতিহাসের সাক্ষী সাক্ষ্য হয়ে পাতায় সযত্নে লিখে রাখে…

২। “মা”

পৃথিবীর প্রথম আলো দেখা তোমার কোলে এসে
দশ মাস দশ দিন ছিলাম সযত্নে গর্ভে সস্নেহে
ভূমিষ্ঠ হয়ে আমার কান্নায় তোমার মুখে হাসি
মাতৃত্বের স্বাদে ধন্য তুমি সৃষ্টিতে তুমিই নারী
তোমার বুকের অমৃত পানে ক্ষুধা মিটেছে শৈশবে
তুমিই প্রথম ডাকে সাড়া দিয়েছিলে আমার অশ্রুতে
তোমার হাত ধরে পথ চলা প্রথম শিক্ষকের ভূমিকাতে
ঝড়ঝঞ্ঝা বিপদে-আপদে তুমি রেখেছো বুকে আগলে
সুখ-দুঃখ স্বার্থ আত্মত্যাগে সংসারে তোমার মহিমা তে
যত বড়ই হোক না কেন তোমার চোখে ছোট্টতে
ঈশ্বর হয়তো প্রকট না হয়ে করেছেন তোমার সৃষ্টি
প্রণাম মন্ত্রে জননী জন্মভূমিশ্চ: স্বর্গাদপি গরীয়সী

৩। ভাষাহীন

কথা সব হয়নি তো বলা
কিছু কথা রয়ে গেছে বাকি
অক্ষরশিল্পী হারিয়েছে শব্দ
ভাষাহীন শব্দ গুলো মনে আঁকি
তোমাকে জীবনের গল্পে সাজিয়ে
না বলা কথাগুলো সযত্নে রেখেছি
অনুভূতি আবেগ অলিখিত সম্পর্কে
ভাষাহীন শব্দের জালে মুখ ঢেকেছি
অনুভূতিগুলো কি সত্যিই কৃত্রিমতায় হারিয়েছে ?
বোবা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চোখের জল ?
মুহূর্ত থমকে যায় নিশুতি রাতের স্মৃতি রোমন্থনে
আয়নায় প্রতিচ্ছবি অচেনা অন্য অবয়বে
আমি অক্ষরহীন তুমি ভাষাহীন কেন ?
সম্পর্কের বাঁধনে বৃষ্টির বারিধারা নামে
দুজন দুজনের কাছে অপরিচিতের মত
ভাবলেশহীন অনুভূতিগুলো কখন ইতি টানে?

৪। সবজান্তা পাবলিক

আমি মানুষ খুঁজি মনুষ্যত্ব খুঁজিনা এই সমাজে
আমি সবজান্তা পাবলিক বুদ্ধিজীবীদের মাঝে
আমি অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াই সমালোচনা করে
জ্ঞানের আলো জ্বালাই রাস্তাঘাটে চায়ের দোকানে আডডার ঠেকে
আমি সমালোচনা করি নেতা-মন্ত্রীদের কাজে
কাউকে সম্প্রদায়িক কাউকে দাম্ভিক বলি অকপটে
আমি ডাক্তার পেটাই পুলিশকে আহত করি ইট পাথরে
আমিই কখনো আইন অমান্য করে উপঢৌকন দি নিজেকে বাঁচাতে
আমি সাম্প্রদায়িকতার বিষ অহরহ ছড়াই সমাজে
হিন্দু মুসলমান নারী পুরুষ নির্বিশেষে
নারীকে বাধা দি মন্দিরে মসজিদে প্রার্থনাতে
মহামারীর দাওয়াই খুঁজে ফিরি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে
সরকারি কর্মচারীকে অকর্মণ্য বলি শিক্ষক কে বলি
ফাঁকিবাজ
নিজ কাজ উদ্ধারে তাদের পায়েই আমিই তেল লাগাই
আমি উক্তি করি বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ না হলে
আমি পাবলিক সবজান্তা সমালোচনাকারী সরকারের কাজে
আমি সুযোগ খুঁজি সরকারি অনুদানের বিনা বাক্যব্যয়ে
আমি ট্যাক্স ফাঁকি দিই তথ্য গোপনে ভিন্ন অজুহাতে
আমি কাতর হই লকডাউনে শ্রমিকের কথা ভেবে
সকাল হতেই লাইন দি বাজারে ও মদের দোকানে সুনাগরিকের পরিচয়ে…

৫। শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই

অহংকারী বলে আমিই শ্রেষ্ঠ বিচার ও বুদ্ধিতে
সৃষ্টি ধ্বংসে এই পৃথিবীতে আমিই আমার দৃষ্টিতে
প্রকৃতি তখন মুচকি হাসে পৃথিবী দেখে আড়চোখে
লড়ছে মানুষ মরছে মনুষ্যত্ব শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে
উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেখে একাকীত্ব মুখ ঢাকে
বড় হওয়ার লড়াইয়ে কেউ কি সঙ্গে আছে
মুখোমুখি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে যখন আয়নাতে
এপার-ওপারের সাদৃশ্য কি রয়েছে প্রতিবিম্বে ?
লড়াইয়ে ধ্বংস বিনাশ আছে নেই কারো অজানা
শক্তির আস্ফালনে অন্ধ মানুষ সহজে হার মানেনা
মিথ্যে অহংকারের পাহাড় গড়ে আপন খেয়ালে
বাস্তবের ব্যঙ্গ হাসি যখন পিঠ ঠেকে দেওয়ালে
আজ যে ছোট কাল সে বড় প্রকৃতির নিয়মে
জন্ম হলে মৃত্যু অনিবার্য সৃষ্টি যার হয়েছে
ছোট-বড়র লড়াইটা চলে আসছে যুগান্তরে
শক্তিই কখনো বিকল্প কি অস্তিত্বের লড়াইয়ে ?
দলাদলি উঁচু-নিচু করে যাকে ফেলছো পিছিয়ে
সময় বুদ্ধির বলে বলীয়ান যাচ্ছে দেখো এগিয়ে
মিথ্যে বড়াই মিথ্যে অহংকার যাবে একদিন মুছে
লড়াইটা স্তব্ধ হবে ‌শেষ নিঃশ্বাসে শ্মশানের ভষ্মিভূত ছাইয়ে…

 

৬। পরিযায়ী

ওরা অন্যের আশ্রয়ে আশ্রিত হয়ে ঘর বাঁধে
কখনো গাছের শাখা প্রশাখায় কখনো মাটিতে
ভোরবেলায় দল বেঁধে উড়ে যায় দূর দূরান্তে
শস্যের দানায় বেঁচে থাকে বিনা বাধায় ঝাঁকে ফেরা ঘরে

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বাসা ভাঙে বৃষ্টিতে ভেজে
খড়কুটো কে আশ্রয় করেই বেঁচে থাকে নীড়ে
নদী সমুদ্র পার হয়ে উড়ে আসে ঋতু বৈচিত্রে
পরিযায়ী নানান প্রজাতির ভীড় পাখিরালয় খাল-বিলে

ওরা মুক্ত সীমান্তের সীমানা জানা নেই ওদের
পৌঁছায় ডানায় ভরসা করে পাড়ি দূর দূরান্তে
শ্রমিকের মত আটকে নেই দূররাজ্যে রাজপথে
অনিদ্রা আতঙ্কে দুশ্চিন্তায় ঘরে ফেরার আশাতে

সব পথ বন্ধ নেই বাস ট্রেন চলাচল স্বাভাবিকে
সব বাধা উপেক্ষা করে হাঁটাপথে পারি নিজদেশে
অনাহারে অনিদ্রায় রাস্তা যেন আলোকবর্ষ দূরত্বে
পথে কেউ মারা যায় কেউবা নিদ্রায় রেললাইনে

নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে গৃহবন্দীও পরিযায়ী
জীবন জীবিকার টানে শ্রমিকরা দূর রাজ্যে পাড়ি
দায়িত্ব নিতে অস্বীকার মানবিকতার যেখানে ফাঁসি
ওরাও ভোটার কখন ভুলে যায় অকৃতজ্ঞ রাজনীতি ?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।