গল্প কথায় ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত

ভোম্বল

ভোম্বলের একেবারেই পড়াশুনোয় মন নেই। এদিকে বাপ নিবারণ সামন্তর সঙ্গে গিয়ে জমিতে লাঙ্গল দেবার তদারকি করতেও তার গায়ে জ্বর আসে। ঠাকুমার আদরে আদরে উচ্ছন্নে গেছে ছেলেটা। কয়েকদিন ধরেই সে মনে মনে একটা ব্যাঙ্ক ডাকাতির ছক কষছে।
তিনকড়ি সামন্ত ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ারবাবু। পোড় খাওয়া লোক। তাকে ভড়কানো অত সোজা নয়। আর পড়বি তো পড়, ভোম্বল কিনা গিয়ে পড়েছে তারই পাল্লায়।
বেলা তিনটে নাগাদ ভোম্বল ভারত বাণিজ্য ব্যাঙ্কের এই মফঃস্বল শাখাটার উলটো দিকে দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর রাখছিল। ছোট শহর, গঞ্জ এলাকা। আজ বিষ্যুদবার। গত দুই বিষ্যুদবারও হুবহু একই জায়গায় সে দাঁড়িয়েছিল। পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখে তবেই না ডাকাতি! গত দুই বিষ্যুদবারের মতো আজও রাস্তা ফাঁকা। যা করতে চাইছে তার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সময় সে আর পাবে না। অবশ্য ওখানেই কনস্টেবল দিনু মণ্ডলের ডিউটি। বেশিরভাগ সময়েই সে আফিঙের নেশায় ঢুলতে থাকে। চোরটোর ধরা তার কম্মো নয় বলেই ধরে নিয়েছে ভোম্বল।
এবার রুমালটা কোনাকুনি ভাঁজ করে মুখটা ঢেকে মাথার পেছনে গিঁট মেরে নিলো সে। আগেই আয়নায় নিজেকে দেখে নিয়ে মহড়া দিয়ে নিয়েছে ভোম্বল। এভাবে মুখ ঢাকলে কেউ তাকে চিনতে পারবে না। প্যান্টের পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে হাতে নিয়ে নিলো। দুনম্বরি। লোডেড। দুই লাফে একেবারে তিনকড়ি সামন্তর সোজাসুজি। মাঝে কয়েক হাতের ফারাক।
সামন্তর দোহারা চেহারা, কিন্তু কেমন একটা খেঁকুরে ভাব। তারও পেছনে হাত কুড়ি দূরে ম্যানেজার সাহেব, একটা হাফ পার্টিশন খুপরিতে। ম্যানেজারের হাইটও মাঝারি কিন্তু চেহারাটা মোটা সোটা। নাড়ুগোপাল ভাব। অবশ্য হিসেবের গরমিল নজরে এলে সেই মিহি ভাবটা আর থাকে না। তখন ভুরু দুটো নাচতে থাকে আর মুখটা যতটা সম্ভব বিকৃত করে হিসেব মেলাবার চেষ্টা করেন। আজও হিসেবটা ঠিক মিলছে না। ব্যাঙ্কেও আর তেমন কর্মচারী বিশেষ নেই। খদ্দেরও নেই। ছোট ব্রাঞ্চ।
আমার রিভলভার তো ঠিকই আছে।
যে মুহূর্তে ভোম্বল .৪৪টা পরীক্ষা করে দেখতে গেছে, তিনকড়ি সামন্ত এক লহমায় ড্রয়ার থেকে ছোট্ট একটা পিস্তল বের করে ভোম্বলের দিকে তাক করে বলল, হ্যান্ডস আপ। আমার পিস্তলটাও ঠিকই আছে। এসব রাখতে হয়। একে ব্যাঙ্কের চাকরি তারপর গাঁয়ের জমিজমা, তেজারতি কারবার। বিপদ আপদ তো বলে কয়ে আসে না। বুঝতেই তো পারছ বাপু।
ভোম্বল তো হতভম্ব।
এসব ডাকাতি ফাকাতি তোমার দ্বারা হবে না হে। গুলি বন্দুক চালাতে গেলে অনেক প্র্যাকটিস দরকার। ঠিকমতো রিভলভার ধরতে না জানলে কব্জিতে উলটে ধাক্কা মারবে। তোমার যা এলেম আমাকে তাক করে গুলি চালালেও সেগুলি আমার গায়ে কতটা লাগবে সন্দেহ আছে। এদিকে আমার পিস্তল তোমার দিকে এমন তাক করা যে হৃদপিণ্ড ফুটো করাটা কেবল সময়ের অপেক্ষা। তা তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি ধারেপাশেই থাকো। তাই না? মরতে এ লাইনে এলে কেন, ট্রেনিং ফেনিং ছাড়া? আচ্ছা আপদ যা হোক। ও ম্যানেজারবাবু, এটাকে নিয়ে কী করি বলুন তো?
ম্যানেজারবাবু তার হিসেবের খাতায় এতোই ব্যস্ত ছিলেন যে এদিকে কী হচ্ছে মোটেই টের পান নি।
কেন, হলোটা কী?
এই ছেলেটা যে ডাকাতি করতে এসেছে, কী করা যায় বলুন তো?
আচ্ছা জ্বালা তো! আমি মরছি আমার হিসেব পত্তর নিয়ে। কিছুতেই মিলছে না, আর তিনি এসেছেন ডাকাতি করতে? ইয়ার্কি মারার আর জায়গা পেল না? অন্য একদিন আসতে বলুন।
ম্যানেজারবাবু কী বললেন শুনলে তো? অন্য যে কোন দিন হলে আমি তোমাকে বেঁধে রেখে ভাবতাম কী করা যায় তোমাকে নিয়ে, কিন্তু আজ তোমার ভাগ্য ভালো। মানে মানে কেটে পড়ো বাছা। এই মুহূর্তে শহর ছেড়ে ভাগো। নয়ত তোমার সর্বাঙ্গে আমার এই পিস্তলের পুরো কার্তুজ খালি করে দেব।
রিভলভার ফেলে ব্যাঙ্ক ছেড়ে দৌড়ে পালানো ছাড়া ভোম্বলের আর কিছুই করার ছিল না। সে তাই করল। একটু দুরেই বাবার মোটর বাইকটা রাখা ছিল। তাক বুঝে কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি নিয়ে এসেছিল পালাবার সুবিধে হবে বলে। হিন্দি সিনেমার কায়দায় সোজা একলাফে সিটে বসার চেষ্টা করল এবং অবধারিত ভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ধপাস করে পড়ে গেল। কোমরে চোট লেগেছে। একটু সামলে সুমলে ওঠার সময়ে একেবারে সরাসরি পুলিশ কনস্টেবল দিনু মণ্ডলের মুখোমুখি।
দিনু তো সবই জানে। ক্যাশিয়ারবাবুই তাকে যা বলার বলে দিয়েছেন, আর দিনুও ভোম্বলের পিছু নিয়েছে। ভোম্বলের ফেলে যাওয়া রিভলভারটাও দিনুর জিম্মায়। অতএব পেছনে এক মোক্ষম রুলের বাড়ি।
এই শহরে ঢুকে শান্তি বিঘ্নিত করার কারণটা জানতে পারি কি? আর পিস্তল নিয়েই বা কী করছিলে?
না, মানে পিস্তলটা আত্মরক্ষার জন্য।
লাইসেন্স আছে? আত্মরক্ষা না ব্যাঙ্ক ডাকাতি। হাজতে চলো।
বলেই আবার রুলের গুঁতো।
ভোম্বলের এবার সত্যি সত্যি কান্না পেয়ে গেল। কি কুক্ষণেই যে ব্যাঙ্ক ডাকাতির ছক করতে গেছিল!
বলছি বলছি, আর মারবেন না।
ভোম্বল এক নিঃশ্বাসে হড় হড় করে সমস্ত পরিকল্পনা বলে গেলো।
অন্য কেউ হলে গ্রেপ্তার করতাম তবে আমার বেশি চালান লেখালেখি করতে ভাল লাগে না। গুলিটুলি করতেই পছন্দ করি। তোমাকে গ্রেপ্তার করলে আমার অনেক খাটনি বাড়বে। তার চেয়ে এনকাউন্টার করে শেষ করে দিই, কী বলো! আর এই মোটরবাইকটা তোমার তো।
না আমার বাবার। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আর জীবনে কোনদিনই এ পথে পা বাড়াব না। বড় ভুল হয়ে গেছে।
বেশ তাই না হয় হলো। এবারের মতো ছেড়েই দিলাম। তোমার বন্দুক বন্দুক খেলনাটাও তো আমার হাতে। এবার লোকজন তেমন বুঝে ওঠার আগেই কেটে পড়তে হবে। পাবলিকের প্যাঁদানির চোটেই অক্কা পাবে। আর বেঁচে থাকলে চালান করা ছাড়া আমার আর উপায় থাকবে না। আর কখনই ডাকাতি ফাকাতি করার কথা ভেবো না। তোমার দ্বারা হবে না। সৎপথে থাকো। বাবার চাষবাস দেখো।
কিন্তু ততক্ষণে কোথা থেকে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। পাবলিকের থেকে আওয়াজ আসছে, আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। সব মারকুটে লোকজন। যাদেরকে দেখা যাচ্ছে কেউই সুবিধের নয়, প্রত্যেকেরই নামে থানায় দুয়েকটা ডায়েরি করা আছে। এটাই হয়। ক্রিমিনালরাই ক্রাইম দেখলে সবচেয়ে বেশি খেপে যায়। দিনু মণ্ডলের এসব জানা আছে।
তবে রে, সব কটাকে ভরবো, বলেই দিনু তেড়ে গেল জনতার দিকে। জনতা ছত্রভঙ্গ আর সেই ফাঁকে সোজা মোটরবাইকে করে দিনু ভোম্বলকে নিয়ে হাজির বাপ নিবারণ সামন্তর কাছে।
সামন্তমশাই সবার দ্বারা পড়াশুনো হয় না। চাষবাসও সবাই পেরে ওঠে না। ছেলেটা যখন একটা স্বাধীন ব্যবসা করতে চাইছে, ওকে কিছু টাকার জোগাড় করে দিন না মশাই। আপনি গ্যারান্টি থাকলে ব্যাঙ্ক তো এমনিই টাকা দেবে। ডাকাতি ফাকাতি করতে যাবার দরকারটা কী। চুরি ডাকাতি করাটাও কঠিন কাজ। সবার দ্বারা হয় না।
বাপ টাকার জোগাড় করুক বা না করুক, এমন পুলিশও আছে আজকাল! আছে তিনকড়ি সামন্তর মতো ক্যাশিয়ার আর ম্যানেজারবাবুর মতো ব্যাঙ্ক ম্যানেজার! ভোম্বল নত হয়ে প্রণাম করল দিনুকে। আর শূন্যে দুটো প্রণাম ঠুকল গঞ্জের ক্যাশিয়ার আর ম্যানেজারবাবুর উদ্দেশ্যে।

শেষ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।