গল্পে আশরাফুল মন্ডল

জন্ম ঐতিহ্যমন্ডিত বাঁকুড়া জেলার সুপ্রসিদ্ধ সোনামুখী শহরের কাছাকাছি কামারগড়িয়া গ্রামে। বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। পেশা শিক্ষকতা। কর্মসূত্রে দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর চন্ডীদাস এভিনিউ-তে স্থায়ীভাবে বসবাস। নব্বইয়ের দশক থেকে লেখালিখি শুরু। দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল, বিভিন্ন জেলা, কলকাতা সহ আসাম, ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের কিছু পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: " কান পেতেছি উৎসমুখে" ( প্রান্তর প্রকাশনী, দুর্গাপুর ) " নাবিক হব ঝড়ের পাখি" ( পাঠক, কলকাতা )।

সম্পর্ক

বোশেখ- জষ্ঠির জ্বলন পুড়ন কমে গেছে অনেকটাই। গতকাল থেকে বৃষ্টি ঝরছে। কখনো মুষলধারায়, কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি। আদমের দুনিয়ায় আপাতত স্বস্তি। তবুও গরমের হাঁসফাঁস। সামন্তগঞ্জ শহরের এই ঘুপচি মহল্লায় টেকা দায়। পশ্চিম আকাশে এখনো জমে আছে কালো মেঘ।
হানিফ মাস্টার থলে হাতে চলেছেন বাজারে। পিছন থেকে কে যেন বলল: “আসসালামু আলাইকুম মাস্টারজি”।
হানিফ মাস্টার “ওআলায়কুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু” বলে তাকিয়ে দেখেন তাঁদেরই মহল্লার মসজিদের ইমাম সাহেব।
মসজিদের গলিটা পেরিয়ে তারা গিয়ে দাঁড়ালেন বিধান বেপারির চালের আড়তের বারান্দায়। একে একে এসে জুটল মোহন, লাল্টু, গৌরাঙ্গ, বিভূতি ও আলিমুদ্দিন। গৌরাঙ্গ ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল: ইমাম সাহেব গতকাল জুম্মার নামাজের সময় আমি মসজিদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে খুব হইচই শুনলাম। ব্যাপারটা কি বলুন তো?
হানিফ মাস্টারও ব্যাপারটা জানার জন্য ইমাম সাহেবের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেন।
ইমাম সাহেব বার দুই তার মেহেদী রাঙা দাড়িতে হাত বুলিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন:  অশিক্ষা কুশিক্ষার জন্যই মুসলমানের ঈমান হারিয়ে যাচ্ছে। খোদা মেহেরবান এই সমাজটাকে লেখাপড়া করার তৌফিক দান করুন।
হানিফ মাস্টারের মুখ খুশিতে ভরে উঠল।
মোহন সেন স্টীল প্ল্যান্টের কর্মী, খুব ভালো কবিতা লেখেন। মোহনবাবু বললেন: শুধু মুসলিম সমাজের কথা বলছেন কেন ইমাম সাহেব, এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থাও প্রায় একই রকম। এদেরও চাই শিক্ষা, প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষা। অবশ্য মুসলিম সমাজে লেখাপড়া আরও জরুরি। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো এখনো গ্রামে – গঞ্জে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার অত্যন্ত কম।এ ব্যাপারে সরকারি ও প্রশাসনিক স্তরে আন্তরিক যাবতীয় উদ্যোগের যেমন প্রয়োজন, তেমনি গণসচেতনতাও বেশ জরুরি। কুসংস্কার দেশের মানুষের বুকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। মুক্তির উপায় শিক্ষা। শিক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা। অশিক্ষা কুশিক্ষা মানব সমাজের অভিশাপ।
মোহন সেনের কথাগুলো সবাই মন দিয়ে শুনে সহমত পোষণ করলেন।
ইমাম সাহেব জানালেন যে “তাজদারে মদিনা,” ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ সাল্লেআলাহে ওয়া সাল্লাম জ্ঞানচর্চাকে একান্ত জরুরি বলে মনে করতেন এবং তিনি তাঁর অনুগামী শিষ্যদের এ ব্যাপারে বারবার উৎসাহিত করতেন। সেকথা হাদীস শরীফেও রয়েছে।
আলিমুদ্দিন পেশায় কসাই। এই সামন্তগঞ্জ শহরে ছাগলের মাংসের দোকান আছে তার। সে বলল: ঠিক বলেছেন আপনারা। টাকা থাকলেই মানুষ হওয়া যায় না। ধর্ম ধর্ম করে বড়াই করলেও নয়। ঠাকুরকে – আল্লাকে বুঝতে হলেও তো শিক্ষা প্রয়োজন।
পোল্ট্রি মুরগির দোকানি বিভূতি বাঁড়ুজ্যে খুক খুক করে কেসে একটা বিড়ি লাল্টু দাসকে দিয়ে নিজে একটা বিড়ি ধরিয়ে জুত করে সুখটান দিয়ে বললেন: গোটা ব্যাপারটা খুলে বলুন তো ইমাম সাহেব। ঘটনাটা আমি আবছা আবছা শুনেছি। আমার পাশের বাড়ির তোতলা হাসমত আলী এই নিয়ে কী যেন বলছিল। ভালো করে বুঝতে পারি নি। শুধু বুঝলাম মসজিদে জুম্মার দিন মোজাম্মেলের কি ব্যাপার নিয়ে যেন সবাই প্রচন্ড রেগে চিৎকার চেঁচামেচি করেছেন। সকলেই নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোজাম্মেলকে উচিত শিক্ষা দেবেন।
– গত পরশু মোজাম্মেল মিঞা তার বিবি ও বিয়ের লায়েক দুই বেটিকে বেধড়ক পিটিয়েছে। তার বড় বেটি কুলসুম নাকি মহল্লার ছেলেদের সাথে হেসে কথা কয়। এতে নাকি মোজাম্মেল মিঞার ঈমান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেয়ানা বেটির এই কসুর যথেষ্ট গোনাহের। বেটির এই না- জায়েজ কাজের জন্য মৃত্যুর পর মোজাম্মেলের কবরের আজাব চলবে রোজ- কেয়ামত পর্যন্ত – বলে মনে করে মোজাম্মেল মিঞা।
গতকাল জুম্মার নামাজের পর মসজিদে কথাটা তোলে মোজাম্মেলের পড়শী ভ্যানচালক রব্বানি। ঘটনাটা শোনার পর মসজিদের অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মোজাম্মেলের উপর। উপস্থিত নামাজীদের রেগে যাওয়ার কারণ মোজাম্মেল মদ খায়। যা মুসলমানদের কাছে হারাম। মাতাল মোজাম্মেল রাতে ঘরে ফিরে তার বিবি মাহফুজা ও দুই বেটি কুলসুম ও নূরন্নেশাকে পেটায়, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে। প্রতিদিন রাতে তার ঘরে সে যে শয়তানি কর্মকাণ্ড করে – যাতে তিতিবিরক্ত মহল্লার লোকজন।
-কথাগুলো বলার সময় বুজুর্গ ইমাম সাহেবও উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
মোহন সেন বলেন: আমরা একই মহল্লায় থাকি। মোজাম্মেলের মেয়েরা তো আমাদেরই মেয়ে। আর মেয়ে দুটি সত্যিই খুব ভালো। সাকিনাজানের লেডিজ টেলার্সে সেলাই টেলাইয়ের অর্ডার নেয়। বাড়িতে বসে টেলার্সের অর্ডারের শাড়িতে পিকো করে, ফলস্ পাড় বসানোর কাজ করে কোনো রকমে পেটের ভাতের যোগাড় করে। মোজাম্মেল শহরের বাবুদের কোয়ার্টারে বাগানের কাজ করে। যা রোজগার করে নেশাভাং করেই উড়িয়ে দেয়। মেয়ে দুটোর বিয়ের জন্যে তেমন ছেলে পাওয়া গেলে আমরা সবাই যথাসম্ভব হেল্প করতাম, কী বলেন বিভূতিদা?
বিভূতি বাঁড়ুজ্যে বিড়িতে শেষ টান দিয়ে নীরবে ঘাড় নেড়ে সায় দেন।
গৌরাঙ্গ হাজরা চোখের সামনে দেখতে পায় রুমকির মুখটা। রুমকি – তার একান্ত আদরের ভাইঝি। দুই বাচ্চার মা। বছর তিনেক আগে সে আত্মহত্যা করেছে। রুমকির বর সুহাস স্পঞ্জ আইরন কারখানায় কাজ করত। এই শহরের লাগোয়া ধোবিঘাট বস্তিতে থাকত। সুহাস প্রতিদিন রাতে মদ খেয়ে ঘরে এসে রুমকির উপর অকথ্য নির্যাতন করত। অথচ সুহাস নাকি ভালো ঘরের বি. এ. পাশ করা ছেলে। লজ্জায়, ঘৃণায়, মানসিক যন্ত্রণায় রুমকি একদিন গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করে। গৌরাঙ্গের চোখে নেমে আসে শ্রাবণের ধারা। গৌরাঙ্গের এই যন্ত্রণাটা উপস্থিত সকলেরই জানা।
লাল্টু দাস বলে :  আসলে শিক্ষা চাই- উপযুক্ত শিক্ষা – মানুষ জাতটার। তার বয়স চল্লিশ বছর। এই বয়সেও সে কম কিছু দেখে নি। লেখাপড়া না থাকার কারণে এক শ্রেণির মানুষ কীভাবে আর এক এক শ্রেণির সোকল্ড্  শিক্ষিত মানুষের কাছে মুরগি হয়, তা জানতে বাকি নেই তার। চারদিকে কেমন ধর্মের নামে মানুষকে ছোট করার, হিংসা ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে তা বেশ বোঝে উচ্চমাধ্যমিকে দু’ বার ব্যাক পাওয়া লাল্টু দাস। সংসারের হাল ফেরাতে জলের পাইপ লাইনের কাজ শিখে এখন সে ভালো টাকা রোজগার করে। বয়স্ক বাপ – মাকে সুখে রেখেছে। বনেদি ঘরে বিয়ে করেছে। এখন সে এক মেয়ের বাপ। নিজের সংসার চালিয়েও সে তাদের পাড়ার মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ায়।
এই তো কিছুদিন আগে লাল্টু দাস এই শহরের সবচেয়ে বড়লোকদের পাড়া সিটি সেন্টারে একজন অফিসারের ফ্লাটে রোদে পুড়ে জলের পাইপ লাইনের কাজ করেছিল। অফিসার তার নিজের প্রচুর লেখাপড়া আর স্টেটাসের কথা ফলাও করে লাল্টুকে বলেছিলেন। অথচ কাজ শেষে অফিসার তাকে কথামতো মজুরি না দিয়ে দুশো টাকা কম দিয়েছিলেন। লাল্টু লেখাপড়া জানা অফিসার বাবুর অবিবেচনা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল।
গৌরাঙ্গ, বিভূতি বাঁড়ুজ্যে, আলিমুদ্দিন, লাল্টু, মোহন সেন সবাই ইমাম সাহেবেকে অনুরোধ করে মোজাম্মেল মিঞার দুই মেয়ের জন্যে পাত্র দেখতে। তারা কথা দেয় যে, তারা বিয়ের সব খরচ দেবে। ইমাম সাহেব পানিতে টলমল চোখে বলেন: আলহামদুলিল্লাহ। খোদা মেহেরবান।
কিছুটা আবেগ সামলে নিয়ে হানিফ মাস্টারকে বললেন : মাস্টারজি ওয়াক্ত গড়িয়ে যাচ্ছে, চলুন, বাজার করবেন কখন!
হানিফ মাস্টারের মুখ রমজানের চাঁদের খুশবু মাখা আলোকের ঝরনাধারার মতো খুশিতে ভরে ওঠে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই “জ্যোতির্গময়” অখন্ড ভারতবর্ষ – যেখানে জাত বিচার নেই, দাঙ্গাবাজদের কুমতলব নেই, মানুষকে ভিটে ছাড়া করার দুরভিসন্ধি নেই, যেখানে সবাই ভাবে সবার কথা। মানুষ যেখানে মানুষের জন্য। এক মানবপ্রাচীর যেন বাংলার এই সামান্য শহর সামন্তগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে অচিরেই।
হানিফ মাস্টার বাজারের পথে পা বাড়াতে বাড়াতে দেখে পশ্চিম আকাশে জমা হওয়া কালো মেঘ সরে গিয়ে সোনালি রুপালি ঝিলমিল আলোয় ভরে উঠেছে যেন!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।