গল্পে অর্পিতা বোস

“পাঞ্চালী ও জানকী”

নারী’-আবহমানকাল ধরে সভ্যতার জয়যাত্রার দিকে তাকালে নারীর অগ্রগতি আমাদের চোখে পড়ে বৈকি। চোখে পড়ে সংসারের সীমানা ছাড়িয়ে সর্বক্ষেত্রেই নারী আজ তার অস্তিত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ রেখেছে। তবে সেই অগ্রগতি কতটা সামগ্রিক তা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে কাছে গেলেই বোঝা যায় বহিরঙ্গের এই উজ্জ্বল আলোকছটার পিছনে লুকিয়ে থাকা গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা পড়া নারীর আসল ছবিটা।
”হিন্দু কিংবা মুসলিম
ইহুদী কিংবা খ্রিস্টান
সব শেয়ালের এক রা
চাই নারীর সম্মান।
নারী হল দেবী
নারী হল মা।
নারী গনিমতের ভোগ্যা
শুধু নারী মানুষ না।”
তবে কি দিনবদলের নতুন ভোর কোনদিনই দেখবে না নারী? এই লিঙ্গবৈষম্যের সমাজ, এই মিসোজিনির সমাজ, এই নির্যাতনের সমাজ, এই অপমানের সমাজই নারীর চিরকালের অদৃষ্ট!
ঠিক এই প্রশ্নগুলোর ইতিহাস আর উত্তর খুঁজতেই আজ এক অন্য ধরনের কল্পকথা লেখার চেষ্টা ।
আমাদের গীতায় আছে আত্মা অবিনশ্বর আর তাই আমরা কল্পনা করলাম ভারতীয় দুই প্রধান মহাকাব্যের দুই প্রধানা নারী চরিত্রকে। আজকের কোনো এক সন্ধ্যায় ভাগীরথীর তীরে তাদের হঠাৎ দেখা হয়ে গেছে। আর তাদের কাল্পনিক কথোপকথন-
জানকী– এমন সায়াহ্নে এই নির্জন ভাগিরথী তীরে কে তুমি?
পাঞ্চালী– আমি পঞ্চপান্ডব রাজ্ঞী দ্রৌপদী। তুমি কে?
জানকী– আমি! আমি জনক নন্দিনী।

পাঞ্চালী– জানকী তুমি! তোমার কথা তো শুনেছি আমি বহুবার। পঞ্চস্বামী ও মাতা কুন্তীর কাছে শুনেছি। প্রভু বিশ্বামিত্রও বলেছিলেন, ত্রেতা যুগে এক অযোনিসম্ভূতা নারীর কাহিনী। যাকে অসম্মানের ফলেই স্বর্ণলঙ্কা ধ্বংস হয়েছিল। তুমি কি সেই!

জানকী– হ্যাঁ, আমিই সেই রমা। যে অনেক অনেক মৃত্যুর কারণ আর যে নিজে জনমদুখিনী..
পাঞ্চালী– না। তুমি জনমদুখিনী হবে কেন! তুমি তো আজও সমাজে সর্বংসহা নারীর প্রকৃত উদাহরণ হিসেবে পূজিত হও।

জানকী– সর্বংসহা! হয়তো বা তাই। সহ্য করতেই বোধহয় আমার জন্ম।

পাঞ্চালী– সত্য যে তাই বৈদেহী। তুমি তো ক্ষমা ও দয়ার প্রতিমূর্তি।
জানকী– জানা নেই পাঞ্চালী। বলতে পার এমন ক্ষমা ও দয়ার প্রতিমূর্তি হয়ে আমি কি পেয়েছি জীবনে? এমনকি স্বামীর কাছেও নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাটুকুও অর্জন করতে পারি নি।

পাঞ্চালী– সে তোমার অপরাধ নয় জানকী। সে নারীর অদৃষ্ট। শুধু তুমি বা আমি নই যুগে নারী অসম্মানিত হয়েছে শুধু। পায়নি মানুষের মর্যাদা। অথচ এই নারীই কিন্তু সর্বকালে সর্বত্র সৃষ্টি অথবা ধ্বংসের কারণ হয়েছে।

জানকী– সত্য সে কথা কৃষ্ণা। আমাদের উপলক্ষ্য করেই শত শত প্রাণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। আর সেই ধ্বংসলীলার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমাদের স্বামীর বিজয় পতাকা।

পাঞ্চালী– সহমত মৈথেলি। তোমার আমার সাদৃশ্য যে অনেক। দুজনেই জন্মান্তরের শত্রু নিধনের উদ্দেশ্যে অযোনিসম্ভূতা কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেছি। আমাদের জন্যই লঙ্কা ও কৌররবকূল ধ্বংস হলো। সমাজ আমাদের দেবী রূপে, মাতৃরূপে পুজো করল। তবুও কখনও ভেবে দেখেছো কী আমরা নিজেরা কী পেলাম!
জানকী– হ্যাঁ দেখেছি। আমরা দুই নারী সুখী হতে পারিনি। অপমানিত হয়েছি বারবার। হারিয়েছি অনেক কিছু। তাও তুমি হয়তো কিছু প্রতিবাদ করতে পেরেছ বলিষ্ঠস্বরে। আমি তো তাও পারি নি।

পাঞ্চালী– জানি আমি। অসম্মান আমাদের দূ্জনেরই হয়েছে। যদিও প্রেক্ষাপট আলাদা। হস্তিনাপুরের পাশাখেলার পরাজয়ের পর আমার সে অসম্মান আমি আজও ভুলতে পারিনি। এই অসম্মানের দায়ভার কি আমার স্বামীর ছিল না?
প্রথম পান্ডব নাকি ধর্মরাজ! তিনি নিজে বিজিত হয়ে তার ভাইদের পণ রাখলেন আর তাদের হারিয়ে শেষমেশ নিজের রজঃস্বলা স্ত্রীকে! সেদিন দুঃশাসন যখন আমাকে কুরুসভায় নিয়ে আসে, তখন রথীমহারথীরা নতমস্তকে ছিল। তা কি লজ্জায় নাকি নির্লজ্জতায়! আজও সেদিনের অসম্মানের কথা আমি ভুলতে পারি না। আমি পঞ্চপান্ডব পত্নী দ্রৌপদী! যার পাঁচ স্বামী তার সম্মান রক্ষা করতে ব্যর্থ ছিল! সেদিন
যদি কৃষ্ণ আমার আব্রুতা রক্ষায় সাহায্য না করতো, আমার কী হতো বলতে পারো?

জানকী– কী হত এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক জানা নেই দ্রৌপদী। তবুও তুমি ছিলে এক দীপ্ত সাহসিকতার প্রতিমূর্তি। দ্যুতক্রিয়ার সভায় তোমার অসম্মানের পরেও তখন শুধুমাত্র নিজের স্বামীদের ও সন্তানদের দাসত্ব মুক্তি প্রার্থনা করেছ। কিন্তু ভেঙে পড়নি। নিজের অসম্মানের প্রতিশোধের আগুন নিজের বুকের ভেতর বাঁচিয়ে রেখেছিলে।
পাঞ্চালী– হ্যাঁ, জানকী। সেই প্রতিশোধের আগুন আমি নিজের বুকে জ্বালিয়ে আমি কঠিন সংকল্প করেছিলাম। তাকেই ভক্তরা তপস্যা বলে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধজয়ে সেই তপোলব্দ্ধ ফলের প্রভাব আছেই। কিন্তু সেই জয়লাভের পরে যে আমিও হারিয়েছি অনেক কিছু। পিতা ভাই সন্তানদের হারাতে হারাতে আমি হয়েছি এক শোকসন্তপ্ত নারী। আমি কি পেয়েছি? প্রেমিক অর্জুনকে স্বামীরূপে বরমাল্য পরিয়ে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েও তাকে সম্পূর্ণ আপনার করে পাইনি। শাশুড়ির নির্দেশে এবং ব্যাসদেবের আশ্বাসে নিজের সতীত্ব ও নারীত্ব বিসর্জন দিয়ে পঞ্চস্বামীর স্ত্রী হতে হয়েছে। বৈদেহী তুমি তো ভাগ্যবতী ছিলে, যাকে পতীরূপে পাবার জন্য শিবের তপস্যা করেছো, তার একমাত্র স্ত্রী ছিলে তুমিই।
জানকী– আমি ভাগ্যবতী! হাসালে যাজ্ঞসেনী। আমার স্বামীর কাছে আমি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি, এই লজ্জা আমি রাখি কোথায় বলতে পারো? আমাকে হরণ করেছিল দশানন তার বোনের অপমানের প্রতিশোধ নিতে। সে অপমান তো আমি করিনি। হ্যাঁ আমি রাবনের ছলনা বুঝতে পারিনি। কোনো সন্ন্যাসীকে ফিরিয়ে দিতাম কি করে বলো! তার অভিশাপের ভয়ও ছিল যে! তাইতো লক্ষণরেখা অতিক্রম করেছিলাম। আর সেই সুযোগে রাবন আমাকে হরণ করে নিয়ে গেল লঙ্কায়। সেখানে
শত প্রলোভনেও অটল থেকে অশোকবনে সারাদিনরাত শুধু স্বামীর অপেক্ষা করেছি। পরে সেই স্বামীর কাছেই অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে যাকে নিজের সতীত্ব প্রমাণ করতে হয়, তুমি তাকে সৌভাগ্যবতী বলো!
পাঞ্চালী– কেন প্রতিবাদ করনি? কেন?
জানকী– পারিনি মহাভারতী। তোমার মতো হতে। সবাই পারে না। তুমি আর আমি ধার্মিক আর আদর্শবাদী হলেও তোমার আর আমার স্বভাব সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি প্রাণহীন পুতুলের মতো আমার স্বামীর বিশ্বাস অর্জনের প্রাণপণ চেষ্টা করে এসেছি, তুমি প্রয়োজনে স্বামীকেও ভর্ৎসনা করার মতো সাহস দেখিয়েছ। আমি পূর্ণিমার চাঁদের মতন শান্ত স্নিগ্ধ আর তুমি নিদাঘের তপ্ত সূর্যরশ্মির মতো দীপ্ত। তুমি শ্রীকৃষ্ণকে জানিয়েছ সন্ধিপ্রস্তাবের পরিবর্তে যুদ্ধের অভীপ্সা আর আমি অশোকবনে হনুমানকে বাঁধা দিয়েছি চেড়িদের হত্যা করতে। তাকে বলেছি, চেড়িরা নির্দোষ তারা শুধু মাত্র রাজাদেশ পালন করেছে। প্রাণনাশ আমি চাইনি যে…
পাঞ্চালী– তবুও ভবিতব্যকে এড়ানো যায়নি ভূমিদ্যা। যুদ্ধ যে অবশ্যম্ভাবী ছিল। রাবন বড়ো বীর হলেও পরস্ত্রীকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে হরণ করে নারীকে অপমান করেছিলেন। নারীর অপমানেই ধ্বংসের বীজ পোঁতা হয়। তবে একথা ঠিক যে তোমার আমার মাঝে বৈপরীত্য আছেই। তোমার স্বামী তোমার প্রতি অনাস্থা রেখে তোমাকে অসম্মান করেছেন সেখানে বনবাসকালে কীচক দ্বারা অসম্মানিত হলেও আমার স্বামী আমার প্রতি গভীর আস্থা রেখে আমার পাশে থেকেছেন। তোমার মানসিক যন্ত্রণা আমি অনুভব করছি।
জানকী– তুমি একজন নারী, তাই অনুভব করছো আরেক নারীর যন্ত্রনা। তবে জেনে রাখো আমার স্বামী আমার অসম্মানের জন্য লঙ্কা আক্রমণ করেন নি। স্ত্রী অপহৃত হওয়ায় তার নিজের অসম্মান হয়েছিল। তার পৌরুষ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। তিনি তার বদলা নিতে লঙ্কা আক্রমণ করেছিলেন। আমার অপমানের প্রতিশোধ নিতে তিনি লঙ্কা আক্রমণ করে নিজের বিজয় পতাকা প্রতিস্থাপন করেন। তারপর আমাকে উদ্ধার করার পরে তিনি তার স্ত্রীকে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে নিজের সতীত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য করেছেন। সেকি আমার আরো বড় অসম্মান নয়! ঠিক তেমন ভাবেই দ্যুতক্রীড়াসভায় তোমার চূড়ান্ত অপমানের সময় স্বামীরা নীরব দর্শক ছিলেন। সে কি তোমার অসম্মান ছিলনা? তাই বিপরীত স্বভাবের হলেও আমরা দুজনেই নারী, আর তাই সমব্যথী। শুধু কিছুটা মাত্রার হেরফের মাত্র।
পাঞ্চালী– ঠিক বলেছ। তাই সীতাকে অগ্নি পরীক্ষা দিতে হয়, পাঞ্চালীকে অসম্মানিত হতে হয়। যুগে যুগে নারীকে শুধু অসম্মানিত ও লাঞ্ছিতই হতে হয়। নারী শুধুই নারী হয়ে থেকেছে মানুষের সম্মান পায়নি।আর নারীর অসম্মানে ধ্বংসের বীজ বপন হয়ে চলেছে।
জানকী– আবার দেখো এই নারীই প্রাণের জন্মদাত্রী। সেই জন্যই আমরা আজও স্বপ্ন দেখি একদিন পৃথিবীতে নারীরা মানুষের সম্মান পাবে।
পাঞ্চালী– শুধু দেবী আর মা হিসাবে আরাধনা করার এই ভন্ড সমাজকে ভেঙে সত্যিই দুর্গা ও চন্ডী রূপে সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ করবে নারী।
সমবেত– আবার একদিন এই ভাগীরথীর তীরে এক নতুন সূর্যোদয়ের সূচনা হবে। ঈশ্বর নয় মানুষ হয়েই সেই ভোর আনবে নারী।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।