এর মধ্যে সুজয়ের অফিস থেকে বদলির নির্দেশ আসে । যেতে হবে দিল্লীতে । এদিকে সুজাতারও প্রায় চার বছর হলো বিয়ে হয়েছে তবে এখনো তাদের জীবনে সন্তান আসে নি কোনো; ওর সব স্নেহের ভাগীদার তাই ঐ একমাত্র দেওর সুমনই । তার জীবনের এরকম একটা গুরুতর সমস্যায় সুজাতার মনও ক’দিন ধরে খুবই খারাপ । বাড়ির পরিবেশও বেশ থমথমে । তাই সুজাতাও স্বামীর সাথে যাবে বলেই স্থির করলো । সুমনেরও তো মন মেজাজ একটুও ভালো নেই, সেও ক’দিনের ছুটি নিয়ে দাদা-বৌদির সাথে যাবে বলে স্থির করলো ।নির্দিষ্ট দিনে ওরা চলেও গেলো । যাবার আগে রুমিকেই বাবা-মায়ের খেয়াল রাখতে বলে গেলো ।
রুমির কথা সুজয় বাড়িতে বলার পর থেকেই রুমির সাথে রমলা দেবী ও সুকুমার বাবু কথা বলেন না । ও দেখেছে, ওদের বাড়িতে গেলে শুধু বৌদিই কথা বলতো ওর সাথে । ও তাই যাওয়া বন্ধ করেছিলো ও বাড়িতে । তাও সুমন দায়িত্ব দিয়ে যাওয়ায় দোনামনায় ছিলো ও কিছুটা ।
সেদিন সকালে হঠাৎই জানলা দিয়ে সুকুমার বাবুর চিৎকার শুনে রুমি ছুটে গেলো জানলার কাছে । গিয়ে দ্যাখে যে উনি অসহায় ভাবে রুমিকেই ডাকছেন । রুমি ছুটে গেলো ওদের বাড়িতে । গিয়ে যা দেখলো তাতে ওর চক্ষু চড়ক গাছ । রমলা দেবী বাথরুমে পড়ে গিয়ে কাতরাচ্ছেন । উনি যথেষ্ট ভারী চেহারার, তাই রোগা-পাতলা চেহারার সুকুমার বাবু খুব বেকায়দায় পড়েছেন,ওনাকে একা একা তুলতে পারছেন না কোনো মতেই আর উনি ভিজে কাপড়ে ওখানেই পড়ে আছেন । রুমি তখনই ওর বাবা-মা কে ডাকলো । সকলে মিলে ধরাধরি করে ওনাকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো । ডাক্তার ডাকা হলো, দেখা গেলো ওনার বাঁ-পা টা মচকে গেছে,বেশ কিছু দিনের জন্য বেড রেস্ট এর কথা বলে গেলেন ডাক্তার বাবু , প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও লিখে গেলেন উনি ।
এই অবস্থায় ওনার সব ভার পরম মমতায় নিজের কাঁধে তুলে নিলো রুমি । সুজাতাদের কোনো খবর দিলো না যাতে নতুন জায়গায় গিয়ে কোনোভাবেই ওরা বিব্রত না হয়ে পড়ে । রমলা দবী ও সুকুমার বাবুকেও বললো একই কথা আর ওর ওপর ভরসা রাখতে বললো । নিজের স্কুলে কিছুদিন ছুটি নিয়ে রমলা দেবীকে নিজের মায়ের মতোই অক্লান্তভাবে সেবা শুশ্রূষা করে বেশ কিছুটা সুস্থ করে তুললো ও । ওনাকে স্নান করানো,খাওয়ানো, সময় মতো ওষুধ দেওয়া ইত্যাদি যাবতীয় কাজ এমনকী সুগারের রুগী সুকুমার বাবুর খেয়াল রাখা,তাঁকে ওষুধ খাওয়ানো,যেটা এতদিন রমলা দেবীই করতেন, সেই সব দায়িত্ব ও একাই সামলালো হাসি মুখে ।
এরমধ্যে মাত্র একদিন রমলা দেবীর সেই তথাকথিত বান্ধবী এবং তাঁর ডানা-কাটা পরী মেয়ে দ্যাখা করে কর্তব্য করে গেছেন,আর একদিনের জন্যও খোঁজ নেয় নি তারপর । এদিকে এত কাছ থেকে রুমিকে এই ক’দিন দেখে, রমলা দেবী নিজের মত মনে মনে বদলালেন,নিজের স্বামীর সাথেও আলোচনা করলেন । সুকুমার বাবুও এই ক’দিনে সব দেখেশুনে নিজের মত বদলাতে বাধ্য হলেন ।
এরমধ্যে সুমন ফিরে এসেছে । সবকিছু দেখেশুনে রুমির ওপর ও খুব রাগারাগি করলো ওদের খবর না দেওয়ার জন্য । রুমি তাকে সব বুঝিয়ে বলার পর ওর রাগ কমলো একটু । এখন রমলা দেবী লাঠির সাহায্যে ধীরে ধীরে হাঁটতে পারেন । একদিন রুমি ও সুমনকে কাছে ডেকে ওনারা নিজেদের ভুল স্বীকার করলেন এবং ওদের বিয়েতে নিজেদের সম্মতি জানালেন ।
যথাসময়ে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের সানাই বাজলো । এই বিয়েতে সবচেয়ে খুশি সুজাতা কারণ ওর চোখেই তো প্রথম ধরা পড়েছিলো ওদের প্রেমটা । আরো সুখবর হল, ওরও কোল আলো করে নতুন প্রাণ আসার খবরটাও সকলে জেনে খুব খুশি হলো । পাড়াতেও সবাই এই বিয়ের আনন্দে সামিল,এই প্রথম ওদের পাড়ায় পাশাপাশি বাড়িতে এরকম একটা বিয়ে হলো । সব মিলে আজ সেন পরিবারে খুশির হাওয়া বইতে লাগলো । রমলা দেবী দুই বৌমা কে পাশে নিয়ে হাসিমুখে ছবি তুলতে লাগলেন । খুশি রুমির মা বাবাও । আর সুমন আর রুমির মুখে তো হাসি আর ধরে না ; এত প্রতিকূলতা সামলেও আজ ওরা এক হতে পেরে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে শুরু করলো ওদের নতুন জীবন । কথায় বলে , শেষ ভালো যার,সব ভালো তার — কথাটা আজ আরো একবার প্রমাণিত হলো ।