গল্পকথায় অনিন্দিতা সেন

পাণ্ডুলিপি

সুখ-স্মৃতি হাসপাতাল। চারতলার স্পেশাল কেয়ার ইউনিটে আজ দশদিন হল কোমায় পড়ে আছেন পূর্ব মেদিনীপুরের সিদ্ধেশ্বর ওরফে সিধু মাইতি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! একদিন যাঁর চেম্বারের সামনে থিকথিকে ভীড় জমে থাকত, সে হেন সিধু ডাক্তারই বাইক দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে চোট পেয়ে আজ কোমায়।
কন্দর্প কান্তি সিধু মাইতির প্রেম প্রীতি ভালবাসার প্রতি বিশেষ আকর্ষন বরাবরের। তাঁর কামিনী কাঞ্চন দুর্বলতা সর্বজন বিদিত। কেবলমাত্র লক্ষীমন্ত স্ত্রীর কানেই কেন যে কথাগুলি কোন অলীক কারনে পৌঁছয় না, কে জানে! স্বামীটি তাঁর তুখোড় খেলোয়াড়, আবার সোশ্যাল নেট ওয়ার্ক এর একজন কলম ধারীও বটেন!
বউয়ের চোখে ধুলো দিয়ে অতএব সুন্দরি মাথা সর্বস্ব কবিনী পটাতেও ওস্তাদ বাওয়া! বউকে সাজিয়ে গুজিয়ে জয়দেবের মেলায় নিয়ে যাবেন কথা দিয়ে, হাফ চেম্বার শেষ করেই পাখি ফুড়ুৎ। চললেন কবিনীকে নিয়ে দেউলের জংগলে হাওয়া খেতে!
বেচারি সিধু…ডাক্তার হিসেবে পশার হলেও একটা কাব্যগ্রন্থ না হলে নেটিজেন দের কাছে মান থাকে না যে! অতএব নিকালো পাণ্ডুলিপি! আহা, সে একখানা প্রেমের সাতকাহন। ভাষার ব্যঞ্জনায় মাখামাখি কবিতার পাণ্ডুলিপি চলে এল প্রকাশকের ঘরে। যথা সময়ে ডিম ও পাড়ল। তা’ দিয়ে দিয়ে এক এক করে বেরিয়ে এল সূর্যের শিখা, ইতি অনামিকা, পাহাড়ি পলাশ নামের কাচ্চাবাচ্চারা। ভীড় জমালো বইমেলা আর লিটল ম্যাগাজিন এর টেবিলে টেবিলে। হুঁ হুঁ বাওয়া…এমনি এমনি! উত্তরীয় আর সম্মাননায় কবিনীর দন্তরুচি কৌমুদী দ্যাখে কে!
নাহ্, সে কাহন নাহয় পরে হবে, এদিকে তো ম্যাও সামলাও! অতি কষ্টে পুলিশ কেস ঠ্যাকানো গেছে বাওয়া! ডাক্তারবাবুর তড়িঘড়ি চেম্বার বন্ধ করে ফেরার পথে ঘটনাটা ঘটে। শীতের রাতে মফস্বল শহরে সে সময় নেড়ি কুকুর ছাড়া অবশ্য কারোর থাকার কথা নয়। তবুও দু চারটি ছুটকো ছাটকা ঘরমুখো পথচারী জুটে যায়, আর কি!
তাদের ই কথায় “বাবু তো, মোবাইলে কথা বইলছিলেন বট্যা গো, তা ছাতিম গাইছটো যে ইক্কেবারে সুমুখ টো তেই পইরবেক…. ইট্যো বোধ হয়…! ইখনো বিশ্বাস যেতে লাইরছি!” তা এসব কথা বললেই যে বিশ্বাস করতে হবেই, এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? মাতালের কি বা কান, কি বা দৃষ্টি! তবে মোবাইলের কল লিস্ট চেক করতে গিয়ে লাস্ট কলের ইংগিত টা…খুব ই দুঃখজনক!
আহা! বড্ড নিন্দুক তো মশাই! কি তখন থেকে কবিনী কবিনী করে যাচ্ছেন? আর এই যে এত অনুপ্রেরণা দিয়ে সাড়ে চারশ কবিতা লেখাল…! এ ও কি কম? তার বদলে গাড়ি নয়, বাড়ি নয়, ধুলোমাখা ক’খানা পাণ্ডুলিপিই যদি কপালে জোটে! কাব্য প্রবাহ রোখে কে?
নাহ্ বড্ড বিচ্ছিরি একখানা কপাল করে এসেছিলেন বটে সিধু মাইতি! বেছে বেছে কিনা ওই সময় ই ফোনটা এল! তা, তোমার ই বা হুড়োতাড়া করার মাথার দিব্যিটা কে দিয়েছিল বাপু? বাইকটা থামিয়েও গল্পটা করা যেত নাকি! তা’ প্রেমে পড়লে…হুঁশ থাকে, না জ্ঞান থাকে? আর বিশেষত যাঁর ঘন ঘন চিত্ত বৈকল্য ঘটে! আর গাছ খানাও তেমনি বেয়াদপ! পড়বি তো পড় এক্কেবারে মুখের সামনে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল! গাছের কি হাত-পা আছে? থুড়ি চোখের মাথা খেয়েছেন নাকি মশাই? চেম্বার শেষে দু পাত্তর না চড়ালে কি আর মৌতাত জমে!
যাক্ গে….দুগ্গা দুগ্গা বলে স্বর্গে গেলেন ডাক্তার, রয়ে গেল তাঁর অগনিত ভক্ত বৃন্দ, গরীব গুর্বো রুগীর দল, আর নেটিজেন পাঠক কুল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।