আনন্দে দিশেহারা চাঁদনী। এসএসসি পরীক্ষা শেষ। এবার ঘুরে ফেরার দিন। পরীক্ষার জন্য যেতে পারেনি আপনজনদের বাড়িতে। এমনকী স্বজনদের বিবাহের অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে পারেনি। তাছাড়া সৈয়দপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশের হার বেশি। আগামীতে আরও ভালো করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও পড়ালেখার চাপ ছিল। এবার আর কোনো বাধা থাকল না।
সকালবেলা। ঘুম থেকে উঠতে দেরি করে চাঁদনী। খাবার টেবিলে ভাত নিয়ে বসে আছে মা বাবা ও ছোট বোন। কয়েকবার ডাক দেওয়ার পর ঘুম থেকে জাগে চাঁদনী। ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসে। ছোট পরিবারে চাঁদনীরা দু’বোন। বেশ আদর যতে বেড়ে ওঠে ওরা। চাঁদনীর বাবা আফজাল হোসেন একজন ব্যবসায়ী। তার দু’মেয়েকে নিয়ে যত স্বপ্ন। তাই শহরের নামকরা স্কুলে পড়ালেখা করায়।
চাঁদনী ভর্তা তুলে নিয়ে বলে মাছ খাব না। আমি মাংস দিয়ে খাব। সকালবেলায় মাছ খেতে ভালো লাগছে না।
নে মা তোর যা মন চায় সেটাই নে। সব তো তোর সামনে রাখা আছে। তোর বাপ মাছ মাংস সবই এনেছে। মুচকি হাসি দেয় পাশের চেয়ারে বসে থাকা ছোট বোনটি।
চাঁদনী শোন,
হ্যাঁ বাবা বলো।
তোর দাদি ফোন করেছিল। তোর পরীক্ষা শেষ হয়েছে জেনে খুশি হয়েছে। বলছে…
কী বলছে বাবা?
গ্রামের বাড়িতে তোকে পাঠাতে। তুই তো জানিস আমাদের গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুরে। ওই বাড়িতে আমার বাবা-মা, ভাই-বোনরা থাকেন। আমাদের গ্রামে সবাই আছে। শুধু ব্যবসার কারণে সৈয়দপুরে চলে এসেছি। টানা কয়েক বছর কেটে গেছে। এ শহরের মায়ায় পড়েছি। তাই সহজে এ শহর ছাড়তে পারি নাই।
তোর দাদা-দাদির বয়স হয়েছে। তাই তোকে ডেকেছে। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। পারিবারিক বন্ধন তো আর ছেঁড়া যাবে না। সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ভালো।
ঠিক আছে বাবা আমি যাব। দাদু বাড়িতে যাওয়ার জন্য আমার মনটাও ব্যাকুল হয়ে আছে। তুমি যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা কর। তাহলে আগামী সপ্তাহে যাবে। এ ক’দিন তোমার বান্ধবীদের বাসায় ঘুরে বেড়াও। তোমার দাদি বাড়ি থেকে এলে আবার কলেজে ভর্তি হতে হবে।
চাদঁনী খাওয়া শেষ হলে সাজুগোজু করে তার বান্ধবী তৃপ্তি বাসায় যায়। খুবই কাছের বান্ধবী তৃপ্তি। স্কুলজীবনে সবকিছু যার সঙ্গে শেয়ার করত সে। দুই বান্ধবী মিলে কয়েকদিন ধরে শহরের এ জায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখে। সৈয়দপুর উপজেলা অনেক পুরাতন। ১৯১৫ সালে এ উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতবর্ষেও কোচবিহার থেকে আগত মুসলিম সাইয়্যেদ পরিবারের নামানুসারে প্রথমে সাইয়্যেদপুর পরে সৈয়দপুর নামকরণ করা হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে সৈয়দপুর সিটি টাউন ছিল। সময়ের ভাঁজে তা বিলুপ্ত হয়েছে। পূর্ব ভারতবর্ষের বিহার, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, আসাম, পশ্চিম বাংলা, রাজস্থান, কাশ্মীরের লোকজন স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। বিভিন্ন ভাষাভাষি লোকের একত্রে বসবাস। ১৮৭০ খ্রি. এ শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় রেলওয়ে কারখানা। এ কারখানাকে ঘিরে অধিবাসীদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন ব্যবসা ও শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। এ শহরে একটি সেনানিবাস এবং বাংলাদেশের একমাত্র ইএমই সেন্টার ও স্কুল আছে। বিশাল এলাকাজুড়ে বিমানবন্দরও আছে। একটি বিসিক শিল্প এস্টেট চালু রয়েছে।
সেদিন শনিবার। সকাল থেকে প্রস্তুতি নেয় চাঁদনী। বিকেলে বাসে করে বিক্রমপুর দাদা বাড়ি যাবে। ব্যাগ গোছাতে সহযোগীতা করছে ছোট বোন পাপড়ী। প্রথমে পাপড়ীও যাওয়ার জন্য আগ্রহ দেখায়। কিন্তু মা কে ছেড়ে সে যাবে না। কারণ যেখানেই যাক সেখানে তার মাকে থাকতেই হবে। বিকেল বেলা যথা সময়ে বাস ছাড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে। ঢাকা যাত্রাবাড়ীতে নেমে বিক্রমপুর যাবে। বাবা সঙ্গেই আছেন। দূরপাল্লার বাস ছুটছে তো ছুটছে।
শতশত মাইল পাড়ি দিয়ে দাদু বাড়িতে পৌঁছে চাঁদনী। প্রথমবারের মতো এসেছে দাদু বাড়িতে। আশপাশের লোকজন এসে ভিড় জমিয়েছে ওদেরকে দেখার জন্য। চাঁদনীকে বুকে জড়িয়ে নেয় ও দাদি। আবেগে আপ্লুত হয়ে যায়। চোখের পানিতে আপনজনের ছোঁয়া অনুভব করে চাঁদনী। চাচা চাচি ভাই-বোনেরা দৌড়ে এসে চাঁদনীর কাছে। সবার মুখে একই কথা চাঁদনীতো দেখতে অনেক সুন্দরী হয়েছে। বেশ লম্বা। হালকা পাতলা গড়নের চেহারা। সরিষা ফুলের মতো হলদে ফর্সা। চোখ দুটো টানা টানা। সবার মুখে রূপের প্রশংসা শুনে রীতিমতো লজ্জা পায় চাঁদনী।
পরদিন সকালে বাড়ির উঠোনে বসে আছে দাদু। সুপারি গাছের নিচে দাদুর পাশে গিয়ে বসে চাঁদনী। নাতনিকে পাশে পেয়ে বেশ খুনশুটি দেয়। পরিবারের কে কে কী করে সেটাও জানায় চাঁদনীকে।
শোন চাঁদনী।
বলো দাদু। এই বিক্রমপুরের ইতিহাস তোকে জানতে হবে। কেননা তুই এই এলাকার মেয়ে।
হ্যাঁ দাদু। আমি কিছুই জানি না। শুধু বাবা মায়ের মুখে শুনেছি বিক্রমপুরের নাম।
শোন, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বহু কীর্তিমান মনীষির স্মৃতিধন্য মুন্সীগঞ্জ জেলা। হাজারো গৌরব গাঁথা, সুখ-দুঃখের নানা উপাখ্যান। আর সংগীত, নাটক, নৃত্য, সাহিত্য, আবৃত্তি, সংস্কৃতির সব শাখায় সমৃদ্ধ। সুপ্রাচীন চন্দ্ররাজাদের তাম্র্রশাসনের অঞ্জলি থেকে শুরু করে পাল, সেন, মোঘল, বার ভূঁইয়াদের কীর্তিতে সমুজ্জ্বল হয়ে একটি স্বাধীন বঙ্গরাজ্যে বিক্রমপুরের কীর্তিময় অংশ।
ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, বিশেষ করে আলু চাষভিত্তিক কৃষিতে বিক্রমপুর বাংলার একটি ঐতিহাসিক এলাকা। সুপ্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চল তার বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার জন্য এবং পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্য সুপরিচিত। বিক্রমপুর নামের বিক্রম অর্থ সাহস বা বীরত্ব এবং পুর অর্থ নগর বা এলাকা। বঙ্গভঙ্গের সময় বিক্রমপুরবাসীর কর্মদক্ষতা সম্পর্কে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন বলেছিলেন, আমি বিক্রমপুরবাসীদের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে বেশ অবগত আছি। এ রকম সুনিপুণ রাজকর্মচারী পৃথিবীর আর কোথাও নেই।
মুন্সীগঞ্জের প্রাচীন নাম ছিল বিক্রমপুর। এখানের কৃতী ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন, বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারক অতীশ দীপঙ্কর, লেখক ইমদাদুল হক মিলন, চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, ইংলিশ চ্যানেল জয়ী সাঁতারু ব্রজেন দাস, ভাষাবিদ ও লেখক হুমায়ুন আজাদ, লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজনীতিবিদ চিত্তরঞ্জন দাস, কবি বুদ্ধদেব বসু ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
দাদুর মুখে ইতিহাস শুনে রীতিমতো অবাক চাঁদনী।
এবার দাদুর কাছে বায়না ধরে এ এলাকার দর্শনী জায়গাগুলো ঘুরে দেখাতে হবে। এরপর কয়েকদিন ধরে অতীশ দীপঙ্করের জন্মস্থান, রাজা শ্রীনাথের বাড়ি, রামপালে বাবা আদমের মসজিদ, হাসারার দরগা, সোনারং জোড়া মন্দির, পদ্মার চর ঘুরে দেখান। এভাবে কাটতে থাকে চাঁদনীর দিনগুলো। আনন্দ ফুর্তি আর নতুন নতুন অভিজ্ঞতা নিচ্ছে প্রতিদিন।
সেদিন দুপুরবেলা।
পাশের বাড়ির একজন মহিলা ও একজন পুরুষ মানুষ। গোছল শেষ করে তোয়ালা দিয়ে চুল মুচঁছে চাঁদনী। পুরুষ মানুষটি চাঁদনীর বাবাকে ভাইয়া বলে ডাকেন। বারান্দার চেয়ারে বসা লোকটির পাশে এসে বসে চাঁদনীর বাবা আফজাল হোসেন। দাদা দাদিসহ বেশ আলোচনা করছে। ঘরের কোনে বসে দেখছে চাঁদনী। আলোচনার এক পর্যায়ে মহিলা বলল ভাইজান কবে আসছেন।
সপ্তাহ খানেক হলো এসেছি। মেয়ের পরীক্ষা শেষ হয়েছে, তাই ঘুরতে এসেছি।
আমাদের বাড়িতে তো গেলেন না।
দেখি যাবার আগে একদিন ঘুরে আসব।
পুরুষ লোকটি বলল আফজাল শোন, তোমার কাছে এলাম একটা প্রস্তাব নিয়ে। গতকাল তোমার মা বাবাকে জানিয়েছি। আজ তোমাকে বলি।
জি ভাই বলেন।
তুমি তো জানো আমার তিন ছেলে। বড় ছেলে কানাডায় থাকে। আর ছোট দুই ছেলে ঢাকায় প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়া লেখা করে। পুরো পরিবার নিয়ে আমি এখন ঢাকায় থাকি। গত তিন দিন আগে তোমার মেয়ে চাঁদনীকে দেখেছি। আমাদের সবার ভালো লেগেছে। আমার বড় ছেলে বিপ্লবের জন্য পছন্দ করেছি। তোমার কোনো আপত্তি না থাকলে বিবাহ দিতে চাই। তুমি বিষয়টা ভেবে-চিন্তে জানাইও।
চাঁদনীর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। চাঁদনীর ছবি মেইল করে বিপ্লবের কাছে পাঠানো হয়। ছবি দেখে বিপ্লবও পছন্দ করে। বিপ্লবের ছবি দেখে চাঁদনীও পছন্দ করে। অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিতে আগ্রহ না থাকলেও চাঁদনীর দাদা-দাদির প্রবল আগ্রহ। পরিবারের মুরব্বির কথা অমান্য করতে না পেরে বিয়েতে রাজি হয় চাঁদনী ও তার বাবা মা। বিপ্লব বিয়ে করার জন্য দেশে চলে আসে। প্রায় এক মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়ে মহা ধুমধামে বিবাহের অনুষ্ঠান সমপন্ন হয়।
বিয়ের পর বিপ্লবের পুরো পরিবার ঢাকায় চলে আসে। চাঁদনীকে নিয়ে হানিমুনে সময় কাটায়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, ইনানী, হিমছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন, সিলেটে জাফলং তামাবিল ও শাহপরানের মাজার ঘুরে ঘুরে দেখা আর ছবি তুলে অ্যালবামে ধরে রাখা। অতিমাত্রায় সুন্দরী হওয়া চাঁদনী নিয়ে বেশ খুশি বিপ্লব। আর জীবনের পালে সুখের হাওয়া বওয়ায় চাঁদনীও আনন্দিত। মাঝে মাঝে মনে হতো অল্প বষয়ে বিয়ে করে ভুল হয়নি। মাঝে মধ্যে সৈয়দপুরের বাড়িতে গেলে তার প্রিয় বান্ধবী তৃপ্তি ডেকে আনতো। বিপ্লবকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছবির অ্যালবামগুলো দেখাতো। আর বলতো বিবাহিত জীবনের সুখের কথাগুলো। বেশ জমিয়ে কাটে দিনগুলো।
বিপ্লব চলে যায় কানাডা। তিন মাস থাকার পর সবকিছু গুটিয়ে চলে আসে দেশে। এত সুন্দরী বউ রেখে বিদেশে থাকতে নারাজ বিপ্লব। ঢাকার নিজস্ব ফ্ল্যাটে চলতে থাকে চাঁদনীর সংসার। একই ফ্ল্যাটে শ্বশুর-শাশুড়ি আর দুটি দেবর। কোনো কিছুর অভাব নেই সংসারে। প্রায় ছয় মাস ভালোই কাটে।
এরপর আস্তে আস্তে সুখের সংসারে ঘুন ধরা শুরু হয়। কয়েকমাস থেকে দেবর চাঁদনীর চেহারা নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য করে। চেহারার স্পর্সকাতর জায়গা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে। প্রথমে আমলে নেয় না চাঁদনী। কিন্তু ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকে। রান্না ঘরে থাকলে পাশের রুম থেকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে একদিন শাশুড়িকে খুলে বলে চাঁদনী।
শুরু হয় সংসারে অশান্তি। শাশুড়ি আর দেবরের অমানসিক নির্যাতন শুরু হয় চাঁদনীর ওপর। তবুও স্বামী সংসারের কথা চিন্তা করেই সব নির্যাতন মেনে নেয়। এদিকে বিপ্লব দেশে ফেরার পর অনেকটা পাল্টে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বেড়ে যায়। নিয়মিত মদ খেয়ে রাতে বাসায় আসতে শুরু করে।
মুখ বুজে সহ্য করতে হয় চাঁদনীকে। কিন্তু তার রূপ যৌবন এতটা কাল হয়ে দাঁড়ায় যে একসময় শ্বশুরের দৃষ্টিও পড়ে তার ওপর।
একই ছাদে নিয়ে দেবর শ্বশুরের কুনজর থেকে নিজেকে কত রক্ষা করা যায় সেই চেষ্টা করে প্রতিনিয়ত। বাসার সবাই কাজের জন্য বেরিয়ে পড়ে। অথচ শ্বশুর ঘর থেকে বের হয় না। ঠুনকো অজুহাতে বাসায় থাকার ফন্দি করে। বাসা ফাঁকা হলেই চাঁদনীকে কিছু বলতে পারবে। এরকম অনেক সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। আর এই পাতানো ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে প্রাণপণ যুদ্ধ করে চাঁদনী।
এভাবে আর কতদিন। ধৈর্য বাঁধ ভেঙে গেছে। গভীর রাতে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঘরে ফেরে বিপ্লব।
স্বামীকে কাছে নিয়ে বাবা আর ভাইয়ের কুচরিত্রের কথা জানিয়ে দেয়। চাঁদনী মুখে এ কথা শোনার পর আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো অবস্থা। তেলে আগুনে জ্বলে শুরু করে চাঁদনীর ওপর নির্যাতন। মারতে মারতে অচেতন করে ফেলে রাখে চাঁদনীকে। বাবা আর ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিশ্বাস করে না বিপ্লব।
মদ খাওয়া আরও বেড়ে যায় বিপ্লবের। সংসারে অশুভ ঝড়ের মুখে চাঁদনী। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি করেই রাতদিন পার করতে থাকে। কিন্তু সংসারের কাজ না করার অপরাধে শাশুড়িও মারধর করতে থাকে। রাতে মারে মাতাল স্বামী আর দিনে মারে শাশুড়ি। শ্বশুর আর দেবরের বকুনি সংসার হয়ে ওঠে নরকের মতো। এ নরক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে কোনো কূলকিনারা খুঁজে পায় না চাঁদনী। বিছানার বালিশ চোখের পানিতে ভিজে যায়। রাত জেগে পার করতে করতে চোখের নিচে কালো দাগ বসে যায়। চেহারার মধ্যে পড়ে যায় কষ্টের ছাপ।
গভীর রাত মাতাল স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে। জানালার গ্রিল ধরে বাহিরের আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে করে স্কুলজীবনের কথা। কী ছিল এই দুরন্তপনা জীবনে। বাবা-মায়ের কত আদর স্নেহ ভালোবাসা। যে বাবা তার মেয়ের একটু সুখের জন্য সারাজীবন পরিশ্রম করল। সে বাবা কী জানে তার মেয়ে চাঁদনী আজ নরক যন্ত্রনায় ছটপট করছে। চোখে পানি দেখলে যে মা বুকে টেনে নিয়ে আদর করতে করতে ঘুমিয়ে দিত। সেই মা কী জানে তার মেয়ে চাঁদনী কত রাত ঘুমায় না। কতদিন ঠিকমতো খাবার খায় না। নিয়মিত খায় শুধু স্বামী আর শাশুড়ির হাতে মার। দেবর শ্বশুরের বকুনি।
ও মা…
ও বাবা…
আমি তোমাদের এতটাই বেশি হয়েছিলাম যে এই নরক আগুনে নিক্ষেপ করেছ। আমি আর পাচ্ছি না মা। আমি আর পাচ্ছি না। তোমরা আমাকে বাঁচাও। এ নরক যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দেও। এই বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
চাঁদনীর কান্নায় ঘুম ভেঙে যায় বিপ্লবের।
বিছানা থেকে উঠে চাঁদনীর চুলের মুটি ধরে সমানে মারতে থাকে। আর অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে। মাইরের তোপে অচেতন হয়ে পড়ে। বিচানার নিচে পড়ে থাকে চাঁদনী। ক্লান্ত বিপ্লব বালিশ টেনে নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
ফজরের আজান হয়। আজানের সুওে চৈতন্য ফিরে পায় চাঁদনী। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নেয়। এরপর স্বামী সংসার বাদ দিয়ে নিজেকে বাঁচার কথা চিন্তা করে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। চরম অনিশ্চয়তা ও অস্বাভাবিক ষড়যন্ত্রমূলক বাধা বিপত্তির মতো কুয়াশাঘন পথে ভোরে চলে যায় এক নিকট আত্মীয়ের বাসায়। ওই আত্মীয়ের সহযোগীতায় চাঁদনী চলে যায় বাবার বাড়ি সৈয়দপুরে।
বাবা-মাকে খুলে বলে সংসারজীবনের সব কথা। মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঁদতে থাকেন বাবা-মাও। সর্বোচ্চ আদর যত্ন দিয়ে যাকে বড় করেছে, তার ওপর নির্যাতন ক’জন বাবা মা সহ্য করতে পারে।
কেটে যায় বেশ কিছুদিন। এরপর বিপ্লবের বাবা-মা ধরনা দেয় চাঁদনীদের বাসায়। কিন্তু চাঁদনী আসতে চায় না। ওর বাবা-মাও দিতে চায় না। এরপর এলাকার চেয়ারম্যান ও মাতব্বরদের নিয়ে গ্রাম্য সালিশ করে। বিপ্লবও বিভিন্নভাবে চাঁদনীর কাছে মিনতি জানায়। চিন্তায় পড়ে চাঁদনী। বিয়ের সময় অনেক টাকা খরচ করে গহনা খাট সোফাসহ জিনিসপত্র দিয়েছে। আর মানুষ মাত্রই ভুল হয়। বিপ্লব যদি ভুল পথ থেকে ফিরে আসে। এসব চিন্তা ভাবনার পর চাঁদনী আর ফিরে আসে স্বামীর বাসায়।
মাস খানেক ঠিকভাবে চলতে থাকে। বিদেশ ফেরত বিপ্লব কোনো আয় রোজগার করে না। ব্যবসা করার কথা থাকলেও সেদিকে তার কোনো মতো নেই। শুধু মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় পড়ে থাকে। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে গোছল করতে যায়। এমন সময় চাঁদনী আন্তরিকভাবে বলে এভাবে আর কতদিন চলবে। ব্যবসা-বাণিজ্য কর। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদনীর চুল ধরে মারতে থাকে। আর চিৎকার করে বলে তোর বাপকে বলবি টাকা দিতে। আমি ব্যবসা করব। সঙ্গে সঙ্গে শাশুড়ি এসে বলে বাপের কাছ থেকে টাকা না আনলে এ বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। এই টাকা নিয়ে শুরু হয় নতুন করে নির্যাতনের মাত্রা। রান্না করার সময় শাশুড়ি গরম খুন্তি দিয়ে হাতে ছ্যাঁকা দেয়। প্রায় প্রতিদিন কমবেশি নির্যাতন সহ্য করতে হয়।
একদিন সকালবেলা টাকার জন্য চাপ দেয় বিপ্লব। চাঁদনী কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসে আসে। পাশের ঘর থেকে গালমন্দ করতে করতে আসে শাশুড়ি। চাঁদনী বলল কিসের টাকা দেবে আমার বাবা। কেন তাকে গালি গালাজ করেন আপনারা। এ কথা বলতে না বলতে চাঁদনীকে মারতে শুরু করে। সঙ্গে তেড়ে আসেন শাশুড়ি দুজন মিলেই মারেন চাঁদনীকে। ভাগ্যের কী নিমর্ম পরিহাস, নির্যাতনের হাত মুক্ত করার মতো কেউ নেই। নিজেকে সান্ত¦Íনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে না পেয়ে আবার চলে যায় ওই আত্মীয়ের বাসায়। তাদের হেফাজতে চাঁদনী চলে যায় সৈয়দপুরের আপন ঘরে।
কেটে যায় কিছুদিন। দু’পরিবারের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নাই। কিন্তু স্বামীর বাড়ির কাজের লোকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতো চাঁদনী। খোঁজখবর নিতে স্বামী কেমন আছেন। হঠাৎ একদিন জানতে পারে তার স্বামী সড়ক দুর্ঘনায় আহত হয়ে হাসপাতালে। মনকে আর বুঝাতে পারছে না চাঁদনী। অসুস্থ স্বামীকে দেখার জন্য বাবাকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসে ঢাকায়। কিন্তু দরজার চৌকাট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি শ্বশুর-শাশুড়ি আর দেবর। কোন হাসপাতলে নেওয়া হয়েছে বিপ্লবকে সে তথ্য দেওয়া হয় না। কুকুরের মতো তাড়িয়ে দেওয়া হয় বাবা ও মেয়েকে। পরে কাজের বুয়ার কাছে ঠিকানা নিয়ে চলে যায় হাসপাতালে। চাঁদনী আর তার বাবাকে হাসপাতালের বারান্দায় উঠতে দেয়নি বিপ্লবের মা ও ভাই। শত শত মানুষের সামনে অপমান অপদস্ত করা হয়। অবশেষে স্বামীর মুখ না দেখতে না পেয়ে, চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে হাসপাতাল চত্বর থেকে বেরিয়ে যায় চাঁদনী।