এক ডজন কবিতায় প্রভাত মণ্ডল
১. ফাগুন এলো
আয় সখী আয় যতনে সাজায়
মনের মতোন করে ।
ওগো ফাগুন এলো ফিরে ।।
বাতাসে একি মধুর তান
ফুলেতে সুভাস ভরা ,
নয়ণে একি মাতাল নেশা
হৃদয় হরণ করা ।
ওগো ফাগুন এলো ফিরে ।।
মন ছুটে যায় সুদূর পানে
কোন অজানা নীল গগনে ,
তারার সাথে খেলে খেলে
সাঙ্গ হল রাতি ,
আমি নিভিয়ে দিলেম বাতি ।
ওগো ফাগুন এলো দ্বারে ।।
আজি এ ফাগুন প্রাতে
ফুলের মালায় , তোর
সাজিয়ে দিলেম খোঁপা ,
চল সখি চল থাকতে নারি
এ বদ্ধ ঘরে একা ।
ওরে ফাগুন এলো দ্বারে ।।
বন্ধ মনের দুয়ার খুলে
সেই চেনা সব দ্বন্দ্ব ভুলে ,
আয় না সখি সুর ধরি আজ
আমরা করি খেলা ,
যাক বয়ে যাক বেলা ।
ওরে ফাগুন এলো দ্বারে ।
২. হে প্রভু
হে প্রভু !
এ জগৎ সৃষ্টি তোমা হতে
তোমা হতে সবই লয় ,
করজোরে তাই বন্দনা করি
তোমার পদযুগল ধরি ,
রচি মম মনে সকাল সন্ধ্যা
তবু এ পৃথিবী আজও বন্ধ্যা ,
কোথা গেলে হে দয়াময় !
বসুধা জুরে এ হিংসা দ্বেষ
আজ রুক্ষ করুণ তোমার বেশ ,
তুমি কি পারোনা ঘুচাতে কালিমা
পারোনা আঁধার সরায়ে ,
নবোদিত এক সূর্য কিরণে
এ ভুবন টুকুরে ভরায়ে ।
হে প্রভু ! জাগো , ওঠো ।
মুক্ত করো এ ধরিত্রীরে ।
শত কালিমা জাতি বিদ্বেষ
বহু অস্ত্রের মেলা ,
ঘুচায়ে দাও মুছায়ে দাও
এ রক্তের হোলি খেলা ।
জানি তোমা হতে সৃষ্ট জগৎ
সবই লালন করিছ তুমি ,
জানি তুমি ওগো আনিবে বহিয়া
শান্তির শুভ বাণী ।
৩. ওগো শুনছো
ওগো শুনছো !
শুনে যাও
আমি প্রকৃতি ,
তোমার প্রেমিকা নই গো !
যে ঠকাবো তোমায় ।
হাতে হাত রেখে দেওয়া কথা
অনায়াসে যাব ভুলে ।
তোমার স্ত্রীও নই গো
যে বারে বারে বলবো
তুমি অকর্মণ্য
একটা আস্ত বোকা ,
সকাল হলে বাজারের প্যাকেট টাও
তোমার হাতে ধরাবো না
আর ফর্দটাও দেবোনা তুলে ।
শুধু বলি আমাকে ভালোবাসো
এ মানব সংসারে ।
সবাইকে তো ভালোবাসলে !
পেলেও বহু কিছু !
ওদের সবাইকে যতটা বেসেছো ভালো
তার এক তিল ভালোবাসা আমাকে দাও ,
তার ঢের বেশি সম্পদ তোমায় দেবো
যা দেবো সে তো শান্তি !
মননের স্নিগ্ধতা , পবিত্রতা ।
ওগো শুনছো !
আমাকে ভালোবাসো ।
৪. অপেক্ষা করো
ওগো বন্ধু !
তুমি কি খুঁজছো চাকরী !
পাবে , শুধু অপেক্ষা করো ।
আজ নয় কাল নয় পরশু
সময়ের অবকাশ বেড়ে যায় ,
পায়ের তলার সব জমিগুলো
শুখা মরুভূমি সম মনে হয় ।
টাকার কাছেই আজ যোগ্যতা
বিশ্বাস হয় কি গো বন্ধু !
সরকার যেই হোক জেনে নাও
চাকরীটা পাচ্ছোনা বন্ধু ।
চাকরীটা পেতে গেলে
পকেট গরম চাই ,
দিতে হবে আরো তেল
নেতার পেছনে ভাই , জেনে রাখো ।
বিশ্বাস হলো না তো বন্ধু !
তবে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখো
আর অপেক্ষা করো
চাকরীর ।
৫. ওরা
ওরা একরাশ যন্ত্রনা বুকে নিয়ে
সময়ের নিষ্ঠুর পরিহাসে ,
দিন রাত স্বপ্নের খেয়া বায়
বেদন বয়ে চলে হৃদমাঝে ।
ওরা তবুও স্বপ্ন দেখে প্রতি সাঁঝে ।।
ওরা আর কেউ নয় ওরা বেকার ,
ওদের নেই কোনো ধর্ম জাতি
নেই কোনো আকৃতি আকার
ওরা বুক পোড়া সলতে বাতি ।
ওরা জেগে রয় সারা দিবা রাতি ।।
হঠাৎ নিভে যাওয়া সন্ধ্যা প্রদীপ
আঁধার ঘনিয়ে তোলে ভুবনে ,
তবু ভাবি আলো দেবে একদিন
গভীর রাত্রি জাগা এদুনয়ণে ।
ওরা প্রভাত আনিবে নব ভুবনে ।।
৬. দীর্ঘ পথ
এখনো দীর্ঘ পথ হাঁটা বাকি।
অসুস্থ পৃথিবীটার সর্বাঙ্গে গভীর ক্ষত,
ঔষধের প্রলেপ মাখাতে আজ আর ধর্মের দেখা নেই।
এখন রাত্রি গভীর,অনন্ত অঙ্গগ্লানি;
মহামারির কশাঘাতে পৃথিবীর শরীর জুড়ে জ্বর।
এ রাত্রিতে কে জেগে আছে?
ঈশ্বর নাকি আল্লা?
স্বর্গ আর বেহেস্ত হয়েছে ধরাশায়ি,
জেহাদ জেহাদ করে মরে যারা আজ স্তব্ধ ওদের কণ্ঠস্বর,
আজ শুধু জেগে আছে জীবন্ত ঈশ্বর।
নিজের জীবনকে বাজি রেখে দিবা-রাত্রির প্রভেদ দিয়েছে মুছে।
প্রতিধ্বনি নেই আর ধর্মের দালালদের স্বরে,
ওরা গভীর শীতঘুমে আচ্ছন্ন ; আবার জাগবে বলে
চুপিচুপি অপেক্ষা করে আছে ইদুরের গর্তে,
কিংবা গুটিপোকা হয়ে সুতো পাকাতে ব্যস্ত,
সে সুতো দিয়ে আবারও ধর্মের ঘুড়ি ওড়াবে বলে।
ধর্মের পদাঘাতে বিজ্ঞান গিয়েছে মূর্ছা বহুবার,
হেরে যায়নি,প্রতিশোধ নেয়নি সে কখনো,
স্বর্গ আর বেহেস্ত দেখিয়েছে এ পৃথিবীর বুকে;
ভালোবাসতে শিখিয়েছে জীবনের বিনিময়ে।
এখনও দীর্ঘ পথ হাঁটা বাকি;
মানুষে মানুষে মুছে দিয়ে ধর্মের ভেদ,
ক্লান্তিতে নয় পরাজয়, মাথানত করে দাও বিজ্ঞান দ্বারে,
পায়ে পায়ে হেঁটে চলো হাতে হাত রেখে
ধর্মের দ্বার সব পিছে ঠেলে ফেলে।
৭. নিঝুম রাত্রি
নিঝুম রাত্রি,অবসন্ন চাঁদ
এক পলকে তাকিয়ে আছে পৃথিবীর দিকে,
মেঘের চাদর ক্ষণে ক্ষণে ঢেকে দিচ্ছে মুখ
তবুও তৃষাতুর চোখ কি যেন খোঁজে বারেবার।
গভীর সমুদ্রের প্রবালের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে চায়,
ঊষর মরুবক্ষ থেকে হিমাদ্রির চূড়া,
মন্দিরের প্রাঙ্গন হতে মসজিদের বারান্দা
ছুঁয়ে দেখে সে।কখনো ভাবেনি এত মৃত্যু হবে
পৃথিবীর বুকে,তবুও মৃত্যু আসে।
সোনালি চাঁদের আলো ছুঁয়ে যায় শরীর,
ফুটপাতে মাছি ভনভনে দোকানের বারান্দায়
কৃশকায় কয়েকটি দেহ ছুঁতে গিয়ে
উদাসীন হয়ে ওঠে।ছন্দপতন ঘটে।
অজস্র কলঙ্ক গায়ে নিয়ে স্নিগ্ধ আলোয় এতদিন
ভরিয়েছে পৃথিবীর কোল,আজ চকিতে নয়নে অশ্রুধারা।
চিতার আগুন আর কবরের সারি ছুঁয়ে যেতে চায়,
যদি সেরে ওঠে পৃথিবীর সবগুলো বাড়ি,
মুছে যায় শ্বাসরোধী এই মহামারী।
৮. অভিমানী
নদীতে ঝরণায় দেখা হবে কবে
কথা হবে চুপিচুপি হবে অভিসার,
অভিমানী চাঁদটাও বসে আছে একা
একলা ধরণী কাঁদে শরীরেতে জ্বর।
তোমার হৃদয় হতে আমার অন্তরে
বিরহের সুর বাজে নিখিলের মাঝে,
ঊষার জুথিকা ফুলে গেঁথেছি যে মালা
একা নিয়ে বসে আছি গোধূলি সাঁঝে।
৯. গল্প লিখো
নগ্ন পায়ে হেঁটেছি হাজার পথ, বিঁধেছে কাঁটা
অবিরত পদতলে, ক্লান্তি নেমেছে সমগ্ৰ শরীর জুড়ে,
শুধু শ্রান্তি নামেনি মানস ভূমি তলে।
এ পৃথিবীর যত মায়া নিয়েছি কিনে, মহাকাশে গিয়ে
বিলাব সে ধনরাশি, বলব সেথায় মনে মনে শত কথা,
পৃথিবীর রূপ শ্যামের মোহন বাঁশি।
দেখেছি স্বর্গ নরকও দেখেছি তোমারই পদতলে,
পৃথিবী গল্প লিখো তুমি, আমি মহাকাশ পাড়ি দেবো,
তোমারই গল্পে এক কোনে আমি শুকতারা দেখা পাবো।
১০. মিথ্যা ফানুস
শঙ্কিল পৃথিবী শঙ্কিত রাত ভোর,খুঁটে খাওয়া ওই
মানুষের মনে ব্যথা,উপবাসে কাটে মহামারী দিন গুলো,
দেখি মানুষের রাজা মস্ত সামগ্ৰী চোর।
রাজার কুলায় বাহারি রঙিন বাতি,সাজানো গোলাপ
বিছানো ফুলের রাশি,অভুক্তদের বাইরে দাঁড়ানো সারি,
নজর থাকে ডাস্টবিনে সারা রাতি।
সকাল হলেই উচ্ছিষ্টের পাহাড়,জমে যায় সব ক্লান্ত
পথের ধারে,রাতজাগা যত কৃশকায় মনুর দল,
কাড়াকাড়ি আর মারামারি করে মরে।
সাম্যবাদের মিথ্যা ফানুস ওড়ে,সভ্যের দল উল্লাসে
সারারাত,প্রজার পাঁজরে মুকুটমণির মালা আর উদরে
অন্নাভাব,তবু রাজার প্রাসাদ আকাশ ভেদ করে।
১১. কিনে নেব মৃত্যু
মৃত্যু দেখেছি বহুবার, তবু কিনতে পারিনি তাকে দাম দিয়ে,
উপত্যকার শরীর জুড়ে নেমেছে কান্না, তুমি কি দেখেছ
সেই ফুল হয়ে ফুটে থাকা শিশুদের মননের ভাবনা!
পরিযায়ী ছুটে চলে অশান্ত পৃথিবীতে, ফুলেদের মুখ
সারিসারি, বুঝি খসে পড়ে যায় পৃথিবীর অবেলায়,
গোধূলিতে মেঘেদের মুখ বড় ভারি।
বুঝিবা বৃষ্টি নামে গাছেদের চোখে,ভেঙে পড়ে ডালপালা
সাজানো বাগান, তবুও স্বপ্ন আসে রাজপথ মাঝে, উঁকি
দেয় ভাঙা চাঁদ তারারাও ম্লান।
বাহারি পাতার দল জড়িয়েছে মায়ায়, ফুটবে নতুন ফুল
গাছেদের দেহে, কিনে নেব মৃত্যু আকাশের চাঁদ, উঠবে
নতুন সূর্য আসবে প্রভাত।