মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত দুদিনের অবসর পেয়েছেন। ভাবলেন মর্ত্যে একবার মাতৃভূমি দর্শন করে আসবেন। আড়াই হাজার বছর হতে চললো প্রায়। মর্ত্যের খবর পেয়ে যান বিভিন্ন স্বর্গীয় ট্যাবলয়েডে। তাই মোটামুটি একটু ধারণা আছে। কিন্তু গত একশ বছর খুব বিশেষ কিছু খবর দেখতে পাননি। তাই ঠিক করলেন একবার সশরীরে, না না শরীর তো নেই, ওই মূর্তিটাই আছে, সমূর্তিতেই ঘুরে আসবেন। দেশকাল, মানুষজন, সভ্যতা একটু জানা দরকার।যাই হোক ভারতবর্ষকে প্রথম এক রাষ্ট্র হিসাবে যে সম্রাট গঠন করেছিলেন, তাঁর এমন ইচ্ছা খুব স্বাভাবিক।
পাটলিপুত্রের নিকটতম মহানগর কলকাতায় সরাসরি অবতীর্ণ হলেন। অনেক রকম গুপ্ত বিদ্যা শিখেছিলেন চাণক্যর কাছে। দেখলেন এখনো ভোলেননি। বাতাসের সাথে ভাসতে ভাসতে আলোর গতিতে স্বর্গ থেকে একদম কলকাতা ময়দান। বিদ্বান সাহসী চন্দ্রগুপ্ত প্রথমেই উচ্চ শিক্ষার খবর নিতে উৎসাহী হলেন। যে কোনো জাতির মানদণ্ড, মূলভিত্তি তার শিক্ষা। ময়দানে অনেক লোক। ইতস্ততঃ ঘুরছে। এক জন, ” চলছে না, চলবে না ” বলে জোরে জোরে কিছু বলছে। চন্দ্রগুপ্ত কিছূই বুঝলেন না।
এত ভাষার সমস্যা হবে ভাবেননি। তাঁর আশা ছিল এদের ভাষা বুঝতে পারবেন। না সে আশা নেই। মনে মনে ভাষার দেবীর স্তব করে নিতেই সব জল। এক অনুবাদক এসে মিশে গেল অন্তরাত্মায়।তারপর নিমেষে পৌঁছে গেলেন শহরের নামকরা উচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সামনেই কাঁধে ঝোলা নিয়ে এক ছাত্রকে দেখে একটু অবাক হলেন। ছাত্র সুলভ নম্র আচরণ নয়, একটু উদ্ধত যেন। তক্ষশিলার সাথে অনেক পার্থক্য। সেখানে সবাই খুব বিনয়ী ছিল। চাণক্যের কড়া শাসন ছিল। ছাত্ররা তটস্থ থাকতো। তিনি সামনের বিরাট প্রান্তর পেরিয়ে গম্বুজ আকারের এক ঘরে উপস্থিত হলেন। ঘর ভর্তি সব নারী পুরুষ যেন মগধের বাজার। অনুশাসনের বড় অভাব। এরা উন্নতি কিভাবে করবে নাকি এই জন্য উন্নতি করতে পারেনি, বড় চিন্তিত হলেন। সেখানে এক জন ” সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলবে না” এই সহ জোরালো আলোচনা, বক্তব্য। অবাক কাণ্ড! ভারতের প্রথম সাম্রাজ্যবাদী সম্রাটের সামনে এত বড় সাহস। এত বড় ইতিহাসের অসম্মান। জানতে পারলেন ভারতবর্ষ এখন গণতান্ত্রিক দেশ। তবে সাম্রাজ্যবাদ কি? বুঝলেন এরা বিরোধী পক্ষ। আর সাম্রাজ্যবাদী বলতে আমেরিকাকে বোঝানো হয় আর ভারত সরকার এখানে প্রতীকী সাম্রাজ্যবাদ। কেমন যেন গুলিয়ে গেল সব। কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছে না।
অবশেষে এক নিরীহ ধরনের ছাত্রকে ধরলেন। জানতে হবে তো সব। জিজ্ঞাসা করলেন, ” এরা তো খুব আমেরিকাকে ঘৃণা করে। ” ছাত্রটি মাথা নাড়লো। তারপর সেই নেতা গোছের ছাত্রটির সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করলো। যে সম্রাট প্রথম ভারতবর্ষ গঠন করেছিলেন তাঁর কৌতূহল স্বাভাবিক। ডেকে আলাপ করলেন। ” এরপর কি করবে তুমি? ” উত্তর পেলেন ” ভিসা রেডি। আমেরিকা যাচ্ছি। খুব বড় অফার আছে।” হেঁচকি উঠলো চন্দ্রগুপ্তের। ভাবলেন হয় মিথ্যা বলছে নয় ভুল শুনলেন। খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে করতে বুঝতে পারলেন…. এরা মুখে বলে এক। আর কাজে করে সম্পূর্ণ বিপরীত। নামকরা কলেজের মেধাবী ছাত্র, সরকারী টাকায় পড়াশুনা করে মাতৃভূমিতে থাকতে রাজি নয়। মনে পড়লো মাত্র কিছুদিন পাটলিপুত্র ছেড়ে থাকতে হলে তাঁর কি পরিমাণ কষ্ট হতো। ভাবলেন ভাগ্যিস চাণক্য আসেননি।
একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, ” তোমরা সেই আমেরিকা যাবেই যখন তখন তার বিরুদ্ধে কথা বলছো কেনো? ”
” আরে ওটা তো আমাদের চিন্তাধারা, দর্শন, ওটা একটা ‘বাদ’ “। ” ভারতীয় দর্শন নয় কেনো” প্রশ্ন চন্দ্রগুপ্তের। ” ওটা তো ঋষিদের লেখা। ঋষি মানে হিন্দু। তাই ওটা সাম্প্রদায়িক।” চন্দ্রগুপ্ত দেখলেন কেউ ভারতীয় ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য জানে না, শ্রদ্ধা নেই। সবাই বিদেশীদের ভাল ভাবে। উন্নত মনে করে। তাদের আদর্শে, ভাবধারায় দীক্ষিত। হিন্দু ধর্ম যেন এক অসুখ। ছুঁলেই ভারতবর্ষ ধ্বংস হবে।
তিনি সব থেকে বড় গ্রন্থাগারে চলে গেলেন। ইতিহাসটা একটু পড়ে নিতে হবে। দেখলেন তাঁর পড়া স্বর্গের ইতিহাস আর কলকাতার লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত ইতিহাসে বিস্তর পার্থক্য। যত অত্যাচার, শোষণ, যুদ্ধ সব হিন্দু রাজাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতিভেদের সংজ্ঞা বদলে গেছে। খুব কষ্ট হলো। মূর্তিতে একটু চির ধরলো। আড়াই হাজার বছরের পুরানো তো।
এবার তিনি ক্ষমতার পীঠস্থানে যেতে চান। বর্তমান শাসক আর বিরোধী পক্ষ কেমন না জানলে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা জানা যায় না। উন্নতি বা দুর্গতির মূল কারণ তো শাসক আর তাদের নীতি। দেখলেন ঠাণ্ডাঘরে বসে সর্বহারাদের কল্যাণের আলোচনা চলছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না কিছু। অন্য এক নেতা বিদেশী ভাষায় বলছেন যে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা না হলে আপামর জনগনের কাছে পৌঁছাবে না। আসলে তিনি নিজেই সকলের কাছে পৌঁছাতে পারলেন না। বড় গোলমেলে সব। রাস্তা ঘাট, দোকান বাজার, কোথাও কোনো পরিকল্পনা নেই। জঞ্জালের স্তূপ, ভিড়ে ভরা বাস, যত্র তত্র গাড়ি দাঁড়িয়ে। কোনো নিয়মের ধার কেউ ধারে না। প্রকাশ্য রাস্তায় পানের দাগ, প্রকাণ্ড রাজপথে কোনো শৌচাগার নেই, বিশ্রামরের ব্যবস্থা নেই। এবার মাথা ঘুরতে লাগলো। কিছু খেতে হবে।
সামনেই বিশাল হোটেল। তাঁর চেহারা দেখে তো সবাই অবাক। তিনি নিজের পরিচয় দিলেন। খাবারের কথা জানতে চাইতেই ম্যানেজার বললেন, “স্যার, আপনার নামে দিল্লীতে সব থেকে ভাল হোটেল আছে। ওখানে চলে যান। দিল্লী দর্শনও হয়ে যাবে সঙ্গে ভাল খাওয়াও। ” চন্দ্রগুপ্ত ভাবলেন সেটাই ভাল। দেশের রাজধানী না দেখলে দেশভ্রমণ বৃথা। বিকালে যাবেন সেখানে। আগে একবার গ্রাম বাংলা দেখে নিতে চান। বারবার তো আর আসার সুযোগ পাওয়া যাবে না।
কিন্তু যাবার আগে মহানগরের দুরবস্থা দেখে চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। মাত্র দু ফোঁটা জল। পরের দিন খবরের শিরোনাম…. মাত্র আধা ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে কলকাতা আবার জলের তলায়।
শহরের অভিজ্ঞতা একদম ভাল হলো না। ভাবতে ভাবতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ভেসে চলেছেন। হঠাৎ এক জায়গায় বেশ কিছু মানুষের জটলা দেখে নামলেন। কি হয়েছে সেটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন। এক জন পুরুষ রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। তাকে জড়িয়ে ধরে এক মহিলা আকাশ কাঁপিয়ে কাঁদছে। আচ্ছা নিশ্চয় জীবনসঙ্গিনী। খোঁজ নিয়ে বুঝলেন স্থানীয় রাজনীতির শিকার। এত অবাক কখনো হননি। প্রজার মৃত্যুর জন্য রাজার নীতি দায়ি!? সে তো যুদ্ধ হতে পারে রাজার নীতি থেকে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মৃত্যু!!!
অন্য গ্রামে চলে এলেন। অন্য জেলা একটু দক্ষিণে। সেখানে জল খেতে এক গৃহস্থ বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি যা দেখলেন, শুনলেন, প্রাণায়াম করে করে ভিতরের জোর খুব নাহলে অজ্ঞান হয়ে যেতেন। সেই বাড়িতে তিন ভাই। তিন জনে তিন প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থক। বড় ভাই এতদিন লাল ঝাণ্ডার হয়ে কাজ করে এসেছেন। পঞ্চায়েতের সব ঠিকাদারি উনিই পেয়েছেন। এখন মেজো ভাই সবুজের সমর্থক। এখনো পঞ্চায়েতের ঠিকাদারি সব ওদের। ছোট ভাই গেরুয়াতে নাম লিখিয়েছেন সদ্য। আগামী দিনে যদি পালা বদল হয়, ঠিকাদারির ঠিকেটা পাকা করে রেখেছেন। বুঝলেন খুব দূরদর্শী পরিবার।
আবার চলতে মানে ভাসতে শুরু করলেন। এবার একটু উত্তরে গেলেন। জল খাওয়াও হয়নি এখনো। কষ্ট হচ্ছে খুব। দেখলেন বাঁশের পুল মূর্তির তো ওজন কম নয়। কিন্তু ওই পুলটাই যোগাযোগের এক মাত্র উপায়। বেশ খানিক এগোতেই চোখে পড়লো একটি বড় ব্যানার ” দূর্গাপুজা নয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখুন। অন্যের ধর্মে আস্থা রাখুন” ….দুটোর মধ্যে যোগসূত্র জানা খুব দরকার।
সামনের বটতলায় বাঁশের মাঁচায় কয়েক জন আগুন খাচ্ছে মানে মুখে আগুন। হাতে খবরের কাগজ আর সবাই বিশ্বজ্ঞানী। কি নিয়ে যেন মহা তর্কাতর্কি চলছে। বোধহয় এই গ্রাম খুব বর্ধিষ্ণু মানে সবার অঢেল টাকা পয়সা। কাজের সময় বসে আড্ডা তো তারি ইঙ্গিত দিচ্ছে। যাই হোক জিজ্ঞাসা করলেন ওদের বিষয়টা। জানতে পারলেন অভিনব তথ্য। পাশের এক গ্রামে হিন্দু বেশী হওয়া সত্ত্বেও দূর্গাপুজা বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। যুক্তি ছিল অন্য ধর্মের কাছে বিষয়টা সাম্প্রদায়িক। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বললেন ” কেন সব ধর্মনিরপেক্ষতার দায় দায়িত্ব কি একা হিন্দুদের? আর তোমরা কেমন মানুষ? প্রতিবাদ করো না? ” সবাই বললো ” হ্যাঁ, বিষয়টা পুরানো। এই তো মহরমের জন্য বিসর্জন বন্ধ করেছিল সরকার। আদালতে সরকার হেরে গেছে। বিচারপতি ধিক্কার জানিয়ে হিন্দুদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ” তাহলে ওই ব্যানার ” বললেন চন্দ্রগুপ্ত। বললো ” ওটা সরালে মুশকিল আছে। আমরা নিরীহ মানুষ। কোনো রঙে নেই। বেঁচে থাকার লোভ একটু বেশী। থাক না ওটা। ক্ষতি কি।” চন্দ্রগুপ্ত এদের নিস্পৃহতা দেখে খানিকক্ষণ বোবা হয়ে গেলেন। এরা প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে। অবশ্য প্রতিবাদ করার ফল তো আগেই দেখেছেন। প্রতিবাদ করা ভুলতে বাধ্য হয়েছে মানুষ।
এগিয়ে চলে গেলেন বেশ পূর্ব দিকে। সামনেই কাঁটা দিয়ে ঘেরা লম্বা দীর্ঘ প্রাচীর। খাকি রঙের পোশাক পড়া লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। জানতে পারলেন এটা আন্তর্জাতিক সীমানা আর লোকগুলো সীমান্ত প্রহরী। কিন্তু যা দেখলেন তা আরো ভয়াবহ। কাতারে কাতারে মানুষ ওই বেড়া ডিঙিয়ে এপারে আসছে। এদিকে লোক বসে আছে ভুয়ো পরিচয়পত্র তৈরি করার জন্য। আশ্চর্য্য এত লোক আসছে অথচ পুলিশ প্রশাসন সবাই নিরুত্তাপ। তাহলে অন্য দেশ কেন। তিনি তো নিজেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছোট ছোট রাজ্য জয় করে বিশাল অখণ্ড ভারতবর্ষের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ তার অর্ধেক বেঁচে আছে। পরিস্থিতি এক কথায় জটিল।
চন্দ্রগুপ্ত এবার এক শিক্ষকের সাথে কথা বলতে চান। গ্রাম বাংলার মানুষের অনেক অজানা তথ্য জানতে পারবেন। খুঁজে খুঁজে এক বছর চল্লিশের শিক্ষকের দেখা পেলেন। সাইকেল দাঁড় করিয়ে তেলেভাজা খাচ্ছেন। ” এত তেলেভাজার দোকান কেন? ” ” এটাই তো বাংলার নতুন শিল্প। ভাল ভবিষ্যৎ আছে স্যার। ” চন্দ্রগুপ্ত বেজায় রেগে বললেন ” তোমাদের পেটের সমস্যা হয় না। ” শিক্ষক মহাশয় উত্তর দিলেন ” খুব আছে স্যার। গোলাপী ওষুধ ভরসা স্যার। ঘরে ঘরে পাবেন। আর একটু বয়স হলে তো চেন্নাই যেতেই হবে। ” চন্দ্রগুপ্ত আবার অবাক ” চেন্নাই কেন? সেটা কি শ্মশান নাকি? ” ” আরে কি যে বলেন স্যার। চেন্নাই হলো বাঙালির স্বাস্থ্য তীর্থ স্থান। ” ” দাঁড়াও দাঁড়াও। স্বাস্থ্য আমার বিষয় নয়। চরক আছেন। পাঠিয়ে দেবো একদিন। দেখে যাবেন। “
” স্যর…. ” চন্দ্রগুপ্ত এবার বাধা দিলেন। ” স্যার স্যার করছো কেন তখন থেকে? আমাকে চেনো না? ” ” স্যার তো সব চেয়ে ভদ্র, সভ্য, মার্জিত সম্বোধন স্যার”। মাথা চুলকে সরল স্বীকারোক্তি ” না স্যার, চিনতে পারিনি। ” চন্দ্রগুপ্ত জিজ্ঞাসা করলেন ” কোন ধরনের শিক্ষক?” ” আজ্ঞে প্যারা স্যার। ” ” বাহ্” বেশ খুশি হয়ে বললেন। কিন্তু পরক্ষণেই রেগে বললেন ” ইতিহাস জানো না বুঝি? ” “না স্যার, আমি তো ইতিহাসই পড়াই। ” তারপর বলতে শুরু করলেন ” আসলে সাধারণ স্নাতক। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পারদর্শী না।” চন্দ্রগুপ্ত ক্ষুন্ন হয়ে বললেন ” তবুও মহান সম্রাট চন্দ্রগুপ্তকে চেনো না? ” এবার ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বললেন যে শ্রেণীতে পড়ান সেখানে মধ্যযুগ আর আধুনিক যুগ।
চন্দ্রগুপ্ত আবার বললেন ” প্রাচীন ভারত পরীক্ষায় ছিল না। ” ” ছিল স্যার। তবে সাজেশনে ছিল না। অশোক ছিল। অশোক আপনার ছেলে না ” চন্দ্রগুপ্তের চোখে আগুন ” অশোক আমার নাতি। ” ” এই রে, বিন্দুসার বাদ যাচ্ছিল। ” ” তা সাজেশন পড়েছো, পুরো বই পড়োনি। ” ” না স্যার, চারটি মেয়ের সাথে এক সঙ্গে প্রেম করে আর হয়ে ওঠেনি। ” চন্দ্রগুপ্ত জিজ্ঞাসা করলেন ” তোমার চার জন সহধর্মিণী। ” শিক্ষক জিভ কেটে বললেন ” স্বাধীন ভারতে হিন্দুদের এক জন স্ত্রীই বৈধ। ” উত্তর এল ” আচ্ছা বাৎসায়নের বিষয়। তা ভাল ভাল। পরে শিখে নাওনি কেনো। ” ” গিন্নী রাগ করেন। সাত হাজার টাকার শিক্ষক স্যার অন্য কাজ না করলে সংসার চলবে না। ” ” কিন্তু শিক্ষকদের তো ভাল বেতন ।কথা হলো তো প্রশাসকের সাথে।” ” হ্যাঁ স্যার তারা স্থায়ী। তারা পরীক্ষা দিয়েছে। আসলে কোষাগারে টাকা নেই। আগের সরকার ফাঁকা করে গেছে। এখন স্যার সবাই বাংলা ফাঁকা করে চাকরির সন্ধানে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। ” সম্রাট জানতে চাইলেন ” তুমি যাওনি কেনো? ” ” আমি অত দক্ষ না তো। আসলে বাপ দাদার ভিটে ছেড়ে যেতে পারিনি। ” ” বাহ জাতীয়তাবাদী। ” শিক্ষক মাথা নাড়লেন ” না স্যার, এখানে জাতীয়তাবাদী হওয়া মানা। এখানে সবাই বাংলাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ।”
চন্দ্রগুপ্ত বড় উদাস হয়ে যান। আম্বেদকরের সাথে কথা বলতে হবে ফিরে গিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষ সংজ্ঞাটা খুব গোলমেলে। নেহরুর সাথেও দেখা করবেন। তাঁরও দায়িত্ব আছে।
মাঠগুলো সব নিষ্প্রাণ। খালে বিলে পুকুরে জল নেই আর থাকলেও পানীয় নয়। খুব দূষিত। সবুজের সতেজতা নেই, মশায় পিনপিন করছে , রাস্তায় লোকজন নেই সব ঘরে টিভি দেখছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো। সবাই উঃ, আঃ করে বাইরে বেরিয়ে আসছে। চন্দ্রগুপ্ত একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন ” কি দেখছিলে? ” চন্দ্রগুপ্তকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান হয় ধারাবাহিক। ” খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার প্রশ্ন করলেন ” আপনি তাঁর সম্বন্ধে কোনো বই যেমন অর্থশাস্ত্র বা মুদ্রারাক্ষস পড়েছেন? ” ” না না, বই পড়লে চোখ আর মন দুটোই খোলা রাখতে হয়। টিভি দেখলে কষ্ট কম। শুধু চোখের কাজ। মনের ছুটি। অত পরিশ্রম করতে পারি না। বাবা বিগত সরকারে রাজ্য সরকারী কর্মচারী ছিলেন। তার সঙ্গে শ্রমিক নেতা। দুই ঘণ্টার বেশি অফিস করেরনি কখনো। রক্তে মিশে গেছে সেটা। “
চন্দ্রগুপ্ত বুঝে গেলেন আর কিছু জানার নেই। আর কিছুই দেখার নেই। ‘সোনার বাংলা ‘, ‘ রূপসী বাংলা ‘ সব কেতাবি কথা। আসলে ঘুণ ধরে গেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। হাড় গিলগিলে অবস্থা। না কি যেন বলে, হাড় জরজরে অবস্থা। জল এখনো খাওয়া হলো না। খুব জোরে হাওয়ার সাথে পাড়ি জমালেন। দিল্লী দর্শন এবার। পরের দিন খবরের শিরোনাম…… ” বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা অসময়ের কালবৈশাখী ঝড়ে বিপর্যস্ত। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক। তেলেভাজা শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত সব থেকে বেশি। সব নষ্ট হয়ে গেছে। আবহাওয়া দপ্তর এবারেও সময় মত আগাম সতর্ক বার্তা জানাতে অক্ষম। “
একদিন কলকাতা ও গ্রামবাংলায় ঘুরে মহান সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য খুব ক্লান্ত বিধ্বস্ত। ঘোরাঘুরি করে যতটা না ক্লান্ত সব কিছু দেখে শুনে সত্যি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। নিজের তো করণীয় কিছুই নাই। নীরব দর্শক মৌন প্রস্তর মূর্তি। ঘটনাক্রমে সারাদিন খাওয়া হয়নি। মানুষের দুর্গতি দেখে জল খেতেও ভুলে গেছেন। এবার কষ্ট হচ্ছে খুব। এই সব ভাবতে ভাবতে ভেসে চলেছিলেন তিনি হালকা বায়ুর সাথে। দিল্লী বর্তমান ভারতবর্ষের রাজধানী। তাই। এই নির্ণয়। দিল্লী দর্শন করে আজকের শাসনতন্ত্রটা একটু বুঝে নিতে চান। জনগনের জীবনযাত্রার মান না জানলে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা ও অবস্থান জানা সম্ভব নয়। তিনি বেশ ভাল করেই জানেন যে করার কিছুই নেই আজ তাঁর, সব নিছক কৌতূহল। কিংবা………..
হঠাৎ এক ভয়াবহ চিৎকারে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের চিন্তায় ছেদ পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে গতি কমিয়ে নীচে নামলেন। দেখলেন এক অর্ধনগ্ন অল্প বয়সী যুবক পাগলের মত সাহায্য চাইছে। প্রকাশ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সে কিন্তু কেউ ঘুরেও দেখছে না। কোনো আগ্রহও দেখাচ্ছে না কেউ। বড় মর্মান্তিক দৃশ্য।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য যুবকটির কাছে গিয়ে পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলেন বিষয়টি। আর কেন কোনো সাহায্যকারী এগিয়ে আসছে না সেটাও জিজ্ঞাসা করলেন। যুবক যা জানালেন তা রীতিমত ভয়ঙ্কর, হাড় হিম করা ঘটনা, নিতান্তই কুৎসিত অমানবিক। যুবক ও তার মহিলা সঙ্গিনী সিনেমা দেখে ফিরছিলেন তখন রাত আটটা। বাসে সাতজন দুষ্কৃতকারী ছিল। তারা প্রচণ্ড মারধর করে যুবকটিকে নির্বস্ত্র করে নামিয়ে দেয়। মারাত্মক আঘাতে পা ভেঙে গেছে। তাই হেঁটে যেতেও পারছে না কোথাও। মেয়েটির অবস্থার কথা ভেবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। পুরুষ বলে এই প্রথম একটু যেন লজ্জিত বোধ করলেন। তরোয়াল চালাতে আর পারেন না বলেও আফসোস হলো খুব। কিন্তু এক অদ্ভুত নিয়ম শুনলেন। হিন্দুরা প্রকাশ্যে কোনো অস্ত্র নিয়ে বেরোতে পারবে না। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ ছাড় আছে।
” কিন্তু কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না কেন? ” বললেন সম্রাট। যুবকটি কাঁদতে কাঁদতে বললো যে সুরক্ষাকর্মীরা খুব অপদস্থ করে সাধারণ মানুষকে। জনগনের দোষ বিশেষ নেই। সাহায্য করতে এসে ঝামেলায় জড়াতে কেই বা চায়?
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একটু এগিয়ে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুলিসের গাড়িতে ঘটনার বিবরণ দিয়ে সাহায্যের জন্য আবেদন করলেন। হঠাৎ খুব কষ্ট হতে লাগল। দমবন্ধ লাগছে কেমন যেন। সামনের সব দৃশ্য অনেকক্ষণ থেকেই ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছিল। সুরক্ষা কর্মীরা খুব ভাল ব্যবহার করলো। বললো দিল্লীতে নাকি ভয়ানক বায়ু প্রদূষন। তাই এমন কষ্ট হচ্ছে। ধীর পায়ে এগোতে থাকলেন নিজের নামের হোটেলটির দিকে।
বাহ্ বাহ্!!! হোটেল তো নয় এতো একটা সুরম্য রাজপ্রাসাদ। শুধু তেমন প্রাচীন শিল্পকলা বা কারুকার্য নেই। যদিও সম্রাটের পাটলিপুত্রের রাজপ্রাসাদও অত্যন্ত দর্শনীয় ছিল। তবুও তাঁর এই হোটেলের আকার আয়তন বেশ পছন্দ হলো। প্রধান দ্বারের সামনে আসতেই সুরক্ষা কর্মীদের এক বিশাল বাহিনী উপস্থিত হলো। সম্রাট উপলব্ধি করলেন যে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা না থাকলেও অভিজাতদের সুরক্ষার বিষয়ে সরকার খুব যত্নবান। বিশেষ সম্মান দিয়ে তারা মহান সম্রাটকে হোটেলের ভিতর নিয়ে এলেন। হোটেলের বড় সাহেব প্রথমে তো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসেই থাকলেন। তারপর সবার ডাকাডাকি শুনে সম্বিত ফিরে এলো। কেমন আপ্যায়ন হওয়া উচিত সেটা নিয়ে একটু সংশয়ান্বিত হয়ে গেলেন। যাঁর নামে এই হোটেল সেই মহান সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আজ হোটেলের লবিতে সমূর্তিতে। এও তো এক ইতিহাস আর তার সাক্ষী সবাই।
প্রাচীন কালে রাজকীয় আপ্যায়ন অনেক দেখেছেন মৌর্য সম্রাট। গ্রীক রাজা সেলুকাসের অতিথি সৎকারও দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর জামাই হবার সুবাদে। কিন্তু আধুনিক ভারতে বিশেষ করে এক গণতান্ত্রিক দেশে এখনো এত রাজসিক অভ্যর্থনা আছে, না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতেন না।
হাজার হাজার পানীয়, দেশ বিদেশের চিত্র বিচিত্র সব সুগন্ধী ব্যঞ্জন, সোনার বাসন, খাবার কক্ষ পুরোটাই রুপো দিয়ে তৈরি। এক কথায় অভিনব। নৃত্য গীত পরিবেশন করছেন বিখ্যাত সব বলিউড শিল্পীরা। বেশ মধুরম্ মধুরম্ পরিবেশ। ভালই উপভোগ করলেন এমন অনিন্দ্য সুন্দর বিনোদন অনুষ্ঠান। কিন্তু মনের ভিতর একটা শংকাও আসছিল যে কত খরচ হলো কে জানে। বেশি কিছু তো নেই তাঁর কাছে। ওই নামেই সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের মূর্তি। একটার বেশি স্বর্ণমুদ্রাও কেউ রাখেনি। সব চুরি হয়ে গেছে এই কয়েক হাজার বছরে। অবশ্য বিদেশীরাই দায়ী এর জন্য। এখনকার মানুষ নির্দোষ।
হোটেলের ম্যানেজারকে ডেকে পাঠালেন। খরচের হিসাব জানতে হবে। ম্যানেজার এমন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন যে মনে হলো কোনো স্তম্ভ যেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তো বুঝতেই পারলেন না যে সমস্যা কি হলো। কিছুক্ষন পর ম্যানেজারের সম্বিত ফিরলে জানালেন যে সম্রাটের নামে হোটেল তো। ওনারা খুব গৌরবান্বিত বোধ করছেন। পয়সা নেবার প্রশ্নই নেই। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের একটু খানি শ্রদ্ধা নিবেদন মাত্র। কিন্তু সম্রাট বলে সম্রাট, ভারতবর্ষের প্রথম সম্রাট তিনি, তাঁর অহংবোধ, আত্মসম্মানবোধ আলাদা তো হবেই। তিনি স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের মত নির্লজ্জ পণ্য নন। সম্রাট বললেন ” শোনো সম্রাট কোথাও ঋণ রেখে যাবে না। খরচের পরিমাণ বলো। যদিও এই মুহূর্তে একটিই স্বর্ণমুদ্রাই আছে। বাকি থাকলে ফিরে গিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। ” জিভ কেটে ম্যানেজার বললেন ” সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রার বাজার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। আপনি বোধহয় জানেন না। খরচ হয়েছে পঞ্চাশ লাখ টাকা। তার অর্ধেক বিনোদন শিল্পীদের দিতে হবে। পঞ্চাশ লাখ কেটে বাকি টাকা আমি একটা বাক্সে দিয়ে দেবো। পরে কাজে লাগতে পারে। ” কিছুক্ষন পরে এক বাক্স কাগজ এনে দিলেন, 1000 লেখা আছে সব কাগজে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবার সব দেখলেন, শুনলেন কিন্তু আর বোঝার চেষ্টা করলেন না। এসে থেকেই তো অভূতপূর্ব ঘটনাবলী দেখছেন।
রাত্রের আহার সবসময় অল্প করতে বলতেন চাণক্য। কিন্তু আজ একটু বেশিই হয়ে গেছে। তাই একটু নিশিভ্রমণে বেরোলেন। এক জায়গায় দেখলেন প্রচুর লোকজন, আলোর ঝলকানি। জানতে পারলেন দিল্লীর মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করছেন মাফলার গলায়। অভিনব সাজগোজ। তাঁর পাঁচ মিনিট বক্তব্যে ন্যূনতম পঞ্চাশ বার প্রধানমন্ত্রীকে দোষারোপ করলেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একজন সাংবাদিককে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন ” তোমাদের প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীর থেকে ছোট? ” ” আরে না না। প্রধানমন্ত্রী তো ভারতবর্ষের প্রধান শাসক। ” ” তবে দোষারোপ কেন? ” বললেন চন্দ্রগুপ্ত। সাংবাদিক অদ্ভুত এক কথা বললেন ” এটা একটা নতুন অসুখ। এর নাম ‘প্রধানমন্ত্রীকে দোষারোপ দুরারোগ্য ব্যাধি’। এই রোগ সারবার নয়। ” মনে মনে সম্রাট বললেন ” ভাগ্যিস চাণক্য আসেননি। নাহলে মাফলার কুমারের কাশির অসুখ সারিয়ে দিতেন। সঙ্গে এই অসুখও।” আর এক বিস্ময়কর তথ্যও জানতে পারলেন। মাফলার কুমারের জিভ নাকি স্বাভাবিকের থেকে বড়। ” ওহো! তাই এই সমস্যা ” বলে হাসতে থাকলেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।
আগামীকাল দিল্লী দর্শন করতে চান সম্রাট। দিল্লী দেশের রাজধানী। ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু। শাসনতন্ত্র না বুঝলে, শাসন ক্ষেত্র না দেখলে দেশের বিষয়ে সম্যক জ্ঞান হবে না। শহরটাও একটু ঘুরে দেখবেন। ম্যানেজারকে বললেন ” ব্যবস্থা করো আগামীকাল বাইরে যাবো। বেশিক্ষণ অবশ্য থাকবো না। খুব প্রদূষন। আর বাইরে ভ্রমণে যখন যাবোই যমুনায় স্নান সেরে নেবো। “
ম্যানেজার মানুষটি খুব ভাল। তৎক্ষণাৎ ফোন করলেন বেশ কয়েকটা জায়গায়। তারপর সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে জানালেন ” আমাদের রাষ্ট্রপতির একটি অসাধারণ রথ আছে। উন্নত সব অশ্ব দ্বারা চালিত। ওই রথ ভাইসরয়ের ছিল। দেশভাগের সময় আমরা পেয়েছি। ওই রাজকীয় রথে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দুজন মন্ত্রী আসবেন আপনাকে নিতে। ” চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বললেন যে রাষ্ট্রপতি আবার কে? আবার জগা খিচুড়ি তথ্য পেলেন। যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা, তাই রাষ্ট্রপতি প্রতীকী প্রধান, শাসনতন্ত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সেটা নাকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বুঝে গেছেন আসলে ভারতীয় নাগরিক খুব ধাঁধা ভালবাসে। ক্ষণে ক্ষণেই রাষ্ট্রের প্রধান বদলে যায়। আর আজ কিছু ভাবতে পারছেন না। বেশ রাত হয়ে গেছে। ভাল করে ঘুমটা সেরে নিতে চান এবার। নিজের নামের হোটেলে নিজের নামের স্যুইটে শুতে চলে গেলেন শুভ রাত্রি জানিয়ে। ” কাল আবার কি কি অত্যাশ্চর্য ঘটনা অপেক্ষা করছে কে জানে…..। “
খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল সম্রাটের। তিনি ঠিক করলেন একটু হেঁটে আসবেন। ভোরবেলা হাঁটলে মনটা বরাবর শান্ত থাকে। একটু হাঁটতে হাঁটতে এগোচ্ছেন। মনে মনে ভাবছেন, আজকে কি কি নতুন চমকের সম্মুখীন হতে হবে কে জানে। হঠাৎ কানের পাশে বাজখাঁই গলায় পেল্লাই চিৎকার খানিকটা ‘হুয়া হুয়া’ শব্দ বেরোচ্ছে। হাজার শিয়ালের ডাকও তো এত ভয়ানক নয়! এ আবার কিসের চিৎকার! কি সব অজানা ভাষা! সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য! এত বেসুরো, প্রচুর কোষ্ঠকাঠিন্য হলে তবেই মানুষের গলা দিয়ে এমন আওয়াজ বেরোবে। কিন্তু এ ভাষা তো সনাতনী কোন ভাষা নয়, কারণ গতকাল ভারতে পদার্পণ করার পরে বাগদেবীকে স্মরণ করার সঙ্গে সঙ্গে সব রকম ভাষা বোঝার একটা বরদান পেয়ে গেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সিস্টেমে এই ভাষা তো ঢুকছে না। সম্রাট বেজায় চিন্তিত। কেসটা কি হল? এরা এমন চিল চিৎকারই বা করছে কেন উল্লুকের মতো? ভোরের সমস্ত আমেজ নষ্ট করে দিচ্ছে। এমন ভাষা বলছে যে ভাষার অস্তিত্ব কখনোই এই দেশে ছিল না। জোড়হাত করে মানে সবটাই মনে মনে স্মরণ করলেন বাগদেবীকে। শ্বেত শুভ্র বসনা বীনারঞ্জিতা বাগদেবী আবির্ভূত হলেন। মৌর্য সম্রাট জিজ্ঞাসা করলেন ‘হে দেবী, হে বাগদেবী, এই ভয়ংকর আওয়াজ কিসের? এরা কোন প্রাণী যারা ঊষার সমস্ত আমেজ নষ্ট করে? বিজাতীয় ভাষায় এত জোরে জোরে বেসুরো প্রলাপ বকছে?’ দেবী স্মিতহাস্য করলেন, বললেন ‘এটাই তো নতুন ভারতের ইউএসপি। এরা আওয়াজ করে, সেই আওয়াজ আবার জোর করে শুনতেও বাধ্য করে। এরা সব এসেছিল বালির দেশ থেকে। লুটে নিয়েছিল এ দেশের ধন-সম্পদ। এরা আবার সমস্ত স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার বন্দনা বন্ধ করে দিয়েছে, বলে নাকি সেটা সাম্প্রদায়িকতা। তবে আমিও কিন্তু হার স্বীকার করলাম। এ ভাষা আমিও বুঝিনা।’ ‘এর মানে জানা তো ভীষণ দরকার’ বললেন উতলা সম্রাট। ‘সম্রাট, সম্রাট, ধৈর্য ধরুন, পাঠাচ্ছি নারদকে। উনিই জানেন এই ভাষা।’ এই বলে বাগদেবী তিরোহিত হলেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রণাম করলেন মনে মনে। খুব গর্ব হলো, সত্যিই তো সমস্ত জ্ঞান, আলো, বুদ্ধি, বিদ্যা, তাদের দেবতা এক নারী। এই হচ্ছে সনাতনী সভ্যতা যেখানে এক নারী সমস্ত জ্ঞান বিদ্যার দায়িত্বে। ‘নারায়ন নারায়ন, নমস্কার সম্রাট’। ‘আরে মহর্ষি নারদ যে’। ‘হ্যাঁ, বাগদেবী পাঠালেন। কি নাকি আপনাকে বলতে হবে।’ ‘হ্যাঁ, মানে ওই যে চিল চিৎকার করছে কয়েকজন, বেআক্কেলে বেসুরো বাজখাঁই গলায় হুয়া হুয়া করছে, এর মানে কি?’ ‘সর্বনাশ আপনি এর মানে জানবেন? তাও আবার এই অঞ্চলে? উত্তর দিল্লিতে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে, ওরা এখনই আপনার মূর্তি দেখলে জানেন না নাক ভেঙে দিতে পারে!’ ‘সেকি মূর্তির নাক ভাঙ্গবে কেন?’ ‘ওরা মূর্তিপূজার বিরোধী। সমগ্র ভারতে কত লক্ষ সহস্র মূর্তির যে নাক ভাঙ্গা।’ ‘এরা কি বর্বর নাকি?’ ‘হ্যাঁ ,বর্বর বলে বর্বর! দস্যু, দস্যু ছিল এরা সব।’ ‘তবে এরা এখানে কি করছে?’ ‘ওরা সব তাদের বংশধর। আর এই হুয়া হুয়ার মানে ওরা সবাইকে ডাকছে আর বলছে ওদের দেবতাই সর্বশক্তিমান। তার উপর আর কেউ নেই ইত্যাদি।’ ‘কোন জাতি যে নিজের পায়ে কুড়ুল মারে, এখানে না এলে জানতে পারতাম না’ সম্রাট ভীষণ দুঃখিত হলেন। যারা মূর্তিপূজার বিরোধী, যারা তাদের শত্রু মনে করে, যারা তাদের মেরে ফেলাকে সব থেকে বড় পূণ্য মনে করে, তাদেরকে মাথায় তুলে সব রকম সুবিধা দেওয়া আসলে আত্মহত্যার শামিল। এই জাতি যতদিন না বুঝবে ততদিন দুর্ভোগ ভোগ করবে। এত কথা বলতে বলতে কখন যে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে, খেয়াল নেই কারোর। না আজ আর হাঁটবো না। সেই যে একটা রথ আছে বলেছিল, ঘোড়ায় টানা, আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতি যাতে সাংবিধানিকভাবে চাপার অধিকারী, আজ তাতে বসেই দিল্লী দর্শন।
সম্রাট হোটেলের সামনে ফিরতেই দেখলেন সেই অসাধারণ রথ অত্যন্ত সুসজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাঁরই অপেক্ষায়। বিভিন্ন বর্ণময় সাজ-পোশাকে বেশ কিছু ব্যক্তিগত সুরক্ষা বাহিনী। সম্রাটের বেশ নিজেকে অনেক বছর পর, তা প্রায় আড়াই হাজার হতে চলল, চক্রবর্তী রাজা বলে মনে হল রথে চাপার সঙ্গে সঙ্গে। চালককে বললেন ‘আচ্ছা, দিল্লীতে এখন দেখার কি আছে?’ ‘আপনি কি কি জিনিস দেখতে চান সম্রাট? সেই অনুযায়ী আমি আপনাকে দর্শন করাবো।’ ‘বিখ্যাত কি জিনিস আছে?’ ‘লালকেল্লা, রাষ্ট্রপতি ভবন, ইন্ডিয়া গেট, পার্লামেন্ট।’ ‘লালকেল্লাটা কি জিনিস?’ ‘ওটা তো শাহজাহান তৈরি করেছিল?’ ‘শাহজাহান?’ ‘বিদেশি আক্রমণকারীদের বংশধর। বাইরে থেকে এসেছিল, আমাদের ক্রীতদাস করে রেখেছিল। আমাদের মেয়েদের জোর করে…’। ‘থাক থাক’৮, চিৎকার করে উঠলেন সম্রাট। তাঁর আমলে সাধারণ নারীদের উপর জোর তো বাদ, ক্রীতদাসীর উপরেও জোর করলে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হত। ‘ছি ছি, দেখবো না ওদের তৈরি করা কিছু।’ ‘আর রাষ্ট্রপতি ভবন…’। মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললেন সম্রাট, ‘আচ্ছা তোমাদের মন্ত্রীরা সব বসে কোথায়? মানে মন্ত্রীপরিষদ কোথায়?’ ‘ও ওটা তো পার্লামেন্ট’। ‘আহা, ম্লেচ্ছ ভাষা কেন?’ ‘আসলে সম্রাট সংসদ ভবন নাম, কিন্তু আমরা সব পার্লামেন্ট বলে ডাকতেই অভ্যস্ত।’ ‘আগে ওটাই দেখে আসি। তোমাদের গণতন্ত্রের মন্দির।’ রথ ছুটে চলল চওড়া রাজপথ ধরে। রথ এসে থামল সংসদের প্রধান দরজার সামনে।
‘কি এলাহী সুরক্ষা ব্যবস্থা!’ সম্রাট চন্দ্রগুপ্তকে বাধা দেয় এমন শক্তি এদেশে এখনো নেই। ধীরে ধীরে লম্বা লন পেরিয়ে সংসদ কক্ষে পৌঁছে গেলেন চক্রবর্তী সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত। অসম্ভব চেঁচামেচি ঠিক যেমন পাটলিপুত্র নগরীতে হাটের দিনে হত। কেউ কারোর কথা শুনছে না। সবাই সবাইকে ছাপিয়ে কথা বলার থেকে চিৎকার করতে বেশি ব্যস্ত। একদম সামনের সারিতে ভারিক্কি চেহারায় চশমা পড়ে একজন কিছু কথা বলছেন। মাঝখানে সিঁড়ির উপরে বড় চেয়ারে বসে আছেন একজন। অন্যদিকে চেয়ারে তাকাতেই হতভম্ব চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। আরে এ ছোকরা ঘুমায় কেন? সাদা বস্ত্র পরিহিত মাঝেমাঝেই ঢুলে পড়ে যাচ্ছে আর পাশে বসা এক বিদেশিনী মহিলা মাঝেমাঝেই পিছন থেকে ঠেলে ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছেন। বেশ লাগছিল দেখতে। যেন মা ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে খাওয়াতে বসিয়েছে। বেশ খানিকক্ষণ গ্যালারিতে বসে থেকে চন্দ্রগুপ্ত বুঝলেন একটি আইন পাস হচ্ছে মানে এটা আইন সভা। এখানে রাষ্ট্রের জন্য আইন তৈরি করা হয়। যিনি বলছেন তিনি সরকার পক্ষের। আর যিনি ঘুমাচ্ছেন তিনি বিরোধী পক্ষের। মানে এদেশের লোক বিরোধী পক্ষ হিসেবে ঘুমন্ত লোকেদের শিবিরকে পছন্দ করেছে। ভারী অদ্ভুত! শক্তিশালী বিরোধী ছাড়া গণতন্ত্র অচল! ষোড়শ মহাজনপদে গুটি কয়েক গণপ্রজাতন্ত্র ছিল যেসব রাজ্যে অন্তত তারা তো সেটাই মেনে চলত। কিন্তু তাদের তো দুটো পরিষদ ছিল স্বভাবত। এদের আরেকটি কক্ষ কোথায়? কাছে কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করা যেত। নেমে এলেন গ্যালারি থেকে। কাউকে ধরতে হবে। আইন পাঠের সময়ে অনেকেই বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে চিৎকার করতে করতে। কারণটা কি? সম্রাট তাড়াতাড়ি দরজা থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে প্রথম যাকে পেলেন তাকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলেন। একি স্নায়ু রোগের কারণে মুখ আংশিক বিকল। কথাই বলতে পারে না, জনপ্রতিনিধি হবে কি করে? এ কে জিজ্ঞাসা করে কোন লাভ নেই। এ নিতান্তই স্বার্থপর না হলে এখানে আসতো না।
তারপর দেখলেন একজন কালো বিদেশী পোশাক পরিহিত সুপুরুষ এগিয়ে আসছেন, হাতে অনেক কাগজ, দাঁড় করালেন। এগিয়ে গেলেন, বললেন ‘আমি একটু কথা বলতে চাই।’ ‘কিন্তু আমি যে ব্যস্ত।’ ‘আমি এটা না জানতে পারলে বড্ড উসখুস করছে।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে পাঁচ মিনিটের মধ্যে যা জানার আছে বলুন, একটু তাড়াতাড়ি করুন।’ ‘এখানে এখন কি হচ্ছে?’ :বিল পাস হচ্ছে।’ ‘কিসের বিল?’ ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল।’ ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী মানে এই দেশে অন্য দেশের নাগরিক থাকতে পারে নাকি?’ চমকে উঠলেন সম্রাট। ‘হ্যাঁ আছে তো!’ ‘তোমরা কোন নিয়ম করো নি?’ ‘নিয়মের তোয়াক্কা কেউ করে না সম্রাট। দেশটা যখন ভাগ হলো তখন যার যার ভাগে যে যে দেশ, সেভাবে চলে যাবার কথা। কিন্তু সেভাবে তো হয়নি। আর ভারত যেহেতু উদার, অর্থনৈতিক ভাবে বাকি প্রতিবেশীদের থেকে স্বচ্ছল, কাজেই লোক ঢোকে পিলপিল করে। এরমধ্যে পূর্ব দিক থেকে এত বেশি লোক ঢুকেছে যে আমরা দিশাহারা।’ ‘তোমরা কি সবাইকে তাড়াতে চাও?’ ‘না আমরা সবাইকে তাড়াচ্ছি না। আমরা এখানে এই দেশ যাদের জন্য হয়েছিল, তাদের রাখতে চাই। অন্যদের জন্য দুটো দেশ আছে, তাদের এখানে আসার কোন দরকার নেই।’ আমাকে একটু খুলে বল। ‘আচ্ছা বিরোধীপক্ষ ঘুমাচ্ছে কেন?’ ‘সম্রাট ওরা ঘুমিয়ে ছিল বলেই তো তবে আজ বিরোধী পক্ষ। 70 বছর নিজেরাও ঘুমিয়ে ছিল আর দেশকেও শীতঘুম এ পাঠিয়ে দিয়েছিল।’ ‘ওই ছেলেটি কে?’ ‘উনি যুবরাজ।’ ‘সে আবার কি, স্বাধীন ভারতের যুবরাজ আছে নাকি?’ ‘আছে তো।দেশ এদের সম্পত্তি। উনি রানী মা যদিও বিদেশি, এককালে উনি মদিরা সরবরাহ করতেন।’ ‘ও বাবা তার মানে তো অভিজাত গণিকা।’ ‘না না আপনার আমলে গণিকারা অভিজাত ছিল।’ ‘এখন লজ্জায় মুখ দেখান না কেউ এমন একজন কেউ রাণীমা হলেন কি করে?’ ‘সে গল্প 5 মিনিটে বলা সম্ভব নয়। তবে যুবরাজ মানসিকভাবে সুস্থ নন।’ ‘সুস্থ নন মানে? মানে উনি এখনো অপরিণত, অপরিপক্ক। শুধু বয়স বেড়েছে। মনের দিক থেকে উনি এখনো শিশু।’ ‘তার মানে তো শিশু সরলমতি।’ ‘না না এ শিশু সরল নয়। নিতান্তই অজ্ঞ-মূর্খ, অজ্ঞান, কাণ্ডজ্ঞানহীন, বলতে গেলে আসলে অজের প্রকারভেদ মাত্র।’ ‘সে কি অজ?’ ‘হ্যাঁ অজ।’
সম্রাট সব দেখে অসম্ভব অবাক হলেন। বর্তমান ভারতবর্ষের কিছুই তিনি বুঝলেন না। এই দেশ আদৌ নিজের ভাল কতটা বোঝে, ধাঁধা থেকে গেল সেটাও। বারবার কেমন যেন কষ্ট হতে লাগল।একটা প্রকাণ্ড শব্দ করে পাথরের মূর্তি ভেঙ্গে গেল।বেরোতে লাগল কালো ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ায় দিল্লীর আকাশ বাতাস চেয়ে গেল। পরের দিন কাগজে বেরোলো, বায়ুদূষণ এত বেড়ে গেছে রে আবহাওয়া মণ্ডল কালো হয়ে আসছে।এর কারণ খুঁজতে ব্যস্ত তাবত বড় বড় বিজ্ঞানী।