“অর্ধেক মানবী সে অর্ধেক দানবী” গল্পে পল্লবী পাল

শিক্ষাগত দিক দিয়ে MBA, পদার্থবিদ্যায় স্নাতক। তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিতে HR ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে পারসোনালিটি ডেভেলপমেন্ট ও সফটস্কিল ট্রেনার হিসাবে কর্মরতা। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে অনেকদিন যুক্ত থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন সাহিত্য গ্রূপে, পেজে ও নিজস্ব ব্লগে সক্রিয়ভাবে লেখার শুরু করেন বিগত একবছর আগের থেকেই।

অর্ধেক মানবী সে অর্ধেক দানবী

“She was a gordian shape of dazzling hue,
Vermilion-spotted, golden, green, and blue;
Striped like a zebra, freckled like a pard,
Eyed like a peacock, and all crimson barr’d;
And full of silver moons, that, as she breathed,
Dissolv’d, or brighter shone, or interwreathed
Their lustres with the gloomier tapestries—
So rainbow-sided, touch’d with miseries “
জন কিট্স্ সাহেবের এর এত কাব্যিক প্রশংসা কার জন্য তাই ভাবছেন তো ? এ এক অর্ধেক মানবী ও অর্ধেক দানবীর গল্প, এক মানবীর জীবনের ভয়ঙ্কর পরিণতির মর্মস্পর্শী কাহিনী।
——
প্রজ্বলিত মশালের দ্যুতি তরল সোনার আভা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্রামকক্ষের প্রস্তরগাত্রে। দুশ্চিন্তা ভরা দুটি চোখ সেই আগুনের লেলিহান শিখার দিকে নিস্পলকভাবে তাকিয়ে । সে দৃষ্টি অপেক্ষারত এক সংবাদের। রাজকীয় সাজ পোশাকের ভারে দেহ মন কিঞ্চিৎ ক্লান্ত। কিছুসময়ের মধ্যেই কক্ষের নিস্তব্ধতায় তরঙ্গ ওঠে, ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে কারোর পদধ্বনি
—সম্রাট বেলোসের জয় হোক!
লিবিয়ার ক্ষমতাবান সম্রাটের চোখে তখন পিতৃসুলভ ঔৎসুক্য
—কী সংবাদ?
মহারানীর প্রধান সহচরী সহাস্য বদনে সুসংবাদ দিলেন
—মহারানী এক অপরূপা কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, ঈশ্বরের কৃপায় মাতা ও সন্তান উভয়েই সুস্থ আছেন।
অসীম আনন্দে রাজা বেলোস এগিয়ে চললেন মহারানীর কক্ষের দিকে। কক্ষে প্রবেশ করা মাত্রই কর্ণসুধার মতো ভেসে এল নবজাতিকার ক্রন্দনধ্বনি। রাজা এসে বসলেন বিশ্রামরত স্ত্রীর পাশে, প্রসবের দীর্ঘ যুদ্ধে রানী জয়ী কিন্তু ক্লান্তি আর অবসন্নতার ছাপ সুস্পষ্ট। রাজাকে স্বাগত জানালেন তার প্রশান্তির হাসি দিয়ে। মহারানীর সহচরী নিয়ে এলেন শুভ্র বসনাবৃত শিশুটিকে, তুলে দিলেন রাজার হাতে। রাজার দৃষ্টি বাৎসল্য রসে পরিপূর্ণ। সত্যি অপরূপ সে শিশু, এ যেন দেব শিশু ! মহারাজ শিশুটিকে সগর্বে সামনে তুলে ধরলেন
—অপরূপা তুমি, দেবতা ল্যামির দৈব তেজদীপ্তি তোমার শরীরে, আজ থেকে তুমি জগতে পরিচিত হবে লামিয়া নামে।
সকল সহচরীরা রাজকুমারীর সমম্মানার্থে মাথা নত করলেন।
লিবিয়ার রাজ্ প্রাসাদে সৌন্দর্য্যে অতিপৃক্ত হয়ে ধীরে ধীরে যৌবনে পা দিল লামিয়া। শুভ্রকান্তি, কোমল ও পেলব সুদীর্ঘ তনু, সুডৌল উন্নত স্তনযুগল, কটি দেশের আকর্ষণীয় খাঁজ, একঢাল কেশরাশির রাঙা আভা, মায়াবী চোখ আর রহস্যময় হাসি নিয়ে সে হয়ে উঠল অনিন্দিতা। তার মনমোহিনী রূপ সহস্র যুবকের হৃদস্পন্দনকে স্তব্ধ করে দেয়। লামিয়া শুধু তার রূপসী শিরোপায় সীমাবদ্ধ থাকল না, রাজ্কার্য ও বুদ্ধিমত্তাতেও সে পিতার ন্যায় পারদর্শী হয়ে উঠল। পিতার মৃত্যুর পর রাজ্ সিংহাসনে অভিষিক্ত হলেন লিবিয়ার নতুন রানী লামিয়া। তার রূপ ও গুনের মুগ্ধতায় স্তম্ভিত হয়ে থাকল রাজ্ সভা। ধীরে ধীরে সে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়লো তিনলোকে।
লামিয়ার অপরূপ সৌন্দর্যের কথা শুনে দেবতা জিউসের মনে খেলা করছে ভীষণ কৌতূহল। একবার সে মানবীকে চাক্ষুস করতেই হবে, সে নাকি অতিরিক্ত সুন্দরী ! সে কী জিউসের স্ত্রী নারীশক্তির দেবী হিরার চেয়েও অধিক সুন্দর ? কৌতূহলবশত জিউস একদিন সাক্ষাৎ করতে এলেন সুন্দরী লামিয়ার সঙ্গে।
রাজপ্রাসাদের উদ্যানের আমরান্ডাদের সুগন্ধ মেখে একান্তে সময় বিলাস করছিল রানী লামিয়া। দামাল হাওয়ায় লামিয়ার রাঙা কেশরাশি কিছুটা অবিন্যস্ত হয়ে আংশিক ঢেকে রেখেছে তার অনিন্দ্য সুন্দর মুখমন্ডলকে। সুপুরুষ ও দীর্ঘদেহী জিউস সামনে এসে দাঁড়ালেন লামিয়ার। লামিয়া তার কেশরাশি সরিয়ে মুখ তুলে তাকাল জিউসের দিকে। লামিয়ার সৌন্দর্য এক মুহূর্তেই বশ করে ফেলল দেবতা জিউসের অদম্যপৌরুষকে
—অপূর্ব ! তুমি সত্যি অতিরিক্ত সুন্দরী !
দেবতা জিউসকে হঠাৎ সামনে দেখে বিস্ময়ে উঠে দাঁড়ালো লামিয়া
—দেব আপনি ! হে সর্বশক্তি সম্পন্ন দেবরাজ জিউস, লিবিয়ার রানী লামিয়ার প্রণাম গ্রহণ করুন।
—তোমার রূপ ও গুনের প্রশংসা শুনে আমি অসীম কৌতূহলী হয়ে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি, আমি মুগ্ধ !
—হে দেব ! কি সৌভাগ্য আমার ! আমার সঙ্গে প্রাসাদে আসুন, আপনাকে সেবার সুযোগ দিন দেব।
লামিয়ার সেবা ও যত্নে জিউস ভীষণ প্রসন্ন হলেন, তার মোহিত দৃষ্টি তখনও আটকে আছে সুন্দরী লামিয়ার দিকে।
—হে দেব, আপনার সেবায় কোনো ত্রুটি হয়নি তো, অজ্ঞানতার বশে যদি কিছু ত্রুটি হয়ে থাকে আমাকে মার্জনা করবেন।
—তোমার সেবায় কোনো ত্রুটি হয়নি, কিন্তু আমি যে এখনো অভুক্ত লামিয়া !
—মার্জনা করবেন দেব, আদেশ করুন, আমি এক্ষুনি সমস্ত আয়োজন করব।
লামিয়া ব্যস্ততায় উঠে যেতে উদ্যত হলে জিউস লামিয়ার হাত ধরলেন
— হে অপরূপা ! জোৎস্নার স্নিগ্ধতায় ভরা তোমার মুখমন্ডলের ওই গোলাপি ওষ্ঠ, তার স্পর্শ না জানি কত সুমিষ্ট, আমি সে সুধারস পিয়াসী, আমাকে তোমার যৌবন রসে তৃপ্ত কর।
লামিয়া তাকালেন জিউসের দিকে, তার দুচোখে প্রণয়ীর কামাতুর দৃষ্টি। লামিয়া বুদ্ধিমতী, অলিম্পাসের প্রধান দেব স্বয়ং তার প্রণয়প্রার্থী, তাকে প্রত্যাখ্যান করার পরিনাম সে ভালোই জানে। তাছাড়া জিউসের প্রণয়ী হবার সৌভাগ্য কী সকলের হয়?
কিঞ্চিৎসময় নিয়ে লামিয়া উত্তর দিল
—আদেশ করুন দেব, আমি আপনাতে নিবেদিত।
জিউস সঙ্গমের ইচ্ছায় আলিঙ্গন করলেন লামিয়াকে, জিউসের অদম্য পৌরুষত্বের শরীরী কামনা বাসনার সব তৃষ্ণা সুচারু ভাবে শান্ত করলো লামিয়া। তৃপ্ত হলেন দেব, কথা দিলেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আবার আসবেন।
সময়ের সঙ্গে লামিয়ার প্রতি অমোঘ আকর্ষণ সৃষ্টি হলো জিউসের, প্রায়ই প্রেমিকা লামিয়ার সাহচর্য পেতে চাইতেন তিনি। জিউসের ঔরসে অনেক পুত্রের জন্ম দিল লামিয়া। তার সান্নিধ্যে অনেক মন্ত্র ও তন্ত্রের বিদ্যাও লাভ করল সে। জিউসের থেকে কায়াবদলের (মেটামরফোসিস) বরদান ও পেল সে। কিন্তু হায় ! পরকীয়ার সুখ কী কখনো চিরস্থায়ী হয়?

লামিয়ার চিন্তায় জিউস নিজের স্ত্রী দেবী হিরার প্রতি উদাসীন ও নির্লিপ্ত হয়ে পড়লেন, স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গমেও অনীহা, সমগ্র চিন্তা জুড়ে আছে প্রেমিকা লামিয়া। জিউসের এই প্রকার আচরণে সন্দেহ হল দেবী হিরার, চর পাঠিয়ে জানতে পারলেন স্বামীর পরকীয়ার খবর, অপরূপ সুন্দরী প্রেমিকা লামিয়া ও তার সন্তানদের খবর। প্রচন্ড ঈর্ষান্বিত ও ক্রুদ্ধ হলেন দেবী হিরা, প্রকট হলেন লামিয়ার সামনে।

—ছলনাময়ী মানবী, তোমার এতো দুঃসাহস তুমি সামান্য মানবী হয়ে আমার স্বামীকে বশীভূত করার চেষ্টা কর।

ভীত লামিয়ার জোড় হাতে বলল

—হে দেবী ! দেবতা জিউস আমাকে স্বইচ্ছায় গ্রহণ করেছেন, আমি অপরাধী নই। তিনি স্বয়ং আমাকে তার প্রণয় নিবেদন করেন। তিনি দেবতাদের প্রধান, অসীম শক্তিশালী, আমি সামান্য মানবী, তার অসীম শক্তির বিরুদ্ধাচারণ করা আমার কল্পনার অতীত। আমি তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারিনি দেবী, আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। তবে এ কথা সত্য যে তার ভালোবাসা আমাকে সম্পৃক্ত করেছে, আমার গর্ভে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে, আমি ভাগ্যবতী।

লামিয়ার অকপট স্বীকারোক্তিতে অপমানে ও ক্ষোভে ফেটে পড়লেন হিরা। স্বামীর পরনারীতে আসক্তি এ যে যেকোনো স্ত্রীর মর্যাদায় আঘাত হানে,দেবীও ব্যতিক্রম হলেন না। জিউসের বিস্বাসঘাতকতার সমস্ত রাগ এসে পড়ল লামিয়ার ওপর, দেবী তার শক্তি দিয়ে লামিয়ার চোখের সামনেই এক এক করে হত্যা করলেন লামিয়ার সমস্ত সন্তানদের ও লামিয়া কে অভিশাপ দিলেন
—তোমার জীবন এই মুহূর্ত থেকে দুর্বিসহ হোক। আমি তোমার চক্ষু থেকে চিরতরের জন্য নিদ্রাহরণ করে নিলাম, তুমি কোনোদিন দুইচোখের পাতা এক করতে পারবে না, সন্তান হত্যার দৃশ্য তোমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে প্রতিনিয়ত। তোমার গর্ভ থেকে কোনো জীবিত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করতে পারবে না, ভূমিষ্ঠ হবার আগেই তার মৃত্যু হবে। তুমি পরিণত হবে এক সন্তানভূক অর্ধসর্প দানবীতে।
নির্মম ক্রূর হাসি নিয়ে মিলিয়ে গেলেন দেবী হিরা। পরমা সুন্দরী লামিয়া পরিণত হল অর্ধ নারী আর অৰ্ধ সর্পিল কায়ার অভিশপ্ত দানবীতে। সন্তানশোকে পাগল হয়ে লামিয়া হয়ে উঠল ভয়ানক দানবী, সে প্রতিজ্ঞা করল সবার সন্তানকে সে হত্যা করবে, মাতৃক্রোড় থেকে সদ্যজাত শিশুকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে ভক্ষণ করতে লাগল সে। দেবতা জিউস তার প্রেমিকার এই করুন পরিণতি দেখেও চুপ থাকলেন, শুধু লামিয়া কে এক আশ্চর্য ক্ষমতা দিলেন যে সে নিজের চোখ উৎপাটিত করে পুনরায় তা প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হবে, এবং চক্ষু উৎপাটন করে সে ঘুমিয়ে থাকতে পারবে।
কথিত আছে পরবর্তীকালে সন্তান ভক্ষক লামিয়া নাকি ইমপোজা ও মর্মো দানবীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যৌন আকর্ষণের মাধ্যমে আক্রমণ করত নির্জন অরণ্যের পুরুষ পথচারীদের। যৌন সঙ্গমের পর তাদের হত্যা করে তাদের রক্তপান ও মাংস ভক্ষণ করত। ইমপোজা দানবীদের ক্ষমতা হল যে তারা ঘুমন্ত মানুষের সঙ্গে সহবাস করতে পারে, তবে তারা কুৎসিত। তাদের সাহায্যে নির্জনস্থানে ঘুমন্ত পুরুষের বীর্য সংগ্রহ করে লামিয়া জন্ম দিত কন্যা সন্তানদের, তারাও ছিল আবক্ষ রূপবতী নারী ও অর্ধসর্প এবং লামিয়ার ন্যায় রক্তপিপাসু শিশুভক্ষক।
এভাবে গ্রিক ডেমনোলোজি বা পিশাচবিদ্যার এক অন্যতম সুন্দরী দানবী হিসাবে স্থান করে নিল লামিয়া। গ্রিক পুরানের অধ্যায়ে আরেকবার লেখা থাকল ক্ষমতার অপব্যবহার ও এক নিরীহ মানবীর জীবনের মর্মান্তিক পরিণতির কথা। যে মানবীর জীবনে অভিশাপ হিসাবে নেমে এসেছিল এক ক্ষমতাবান দেবতার পরকীয়া প্রেম।
মিথের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করাই অবান্তর, কিন্তু বাস্তবে এমন নিরীহের ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যায়ভাবে তার জীবন তছনছ করে দেওয়ার ঘটনা খুব কী বিরল?
সমাপ্ত
তথ্যসূত্র : ব্রিটানিকা, উইকিপিডিয়া, গ্রিক মিথোলোজি
পংক্তি ঋণ : লামিয়া কবিতার অংশ, জন কিটস
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।