আকাশ স্যার খুব সুন্দর পড়ান। ঝিনুক কখনোই স্যারের ক্লাস মিস করে না। আজও ও প্রায় হাঁ করেই স্যারের পড়ানো শুনছিলো। নীলা ফিসফিস করে বলে,” জানিস তো, স্যার বিয়ে করেন নি?” ঝিনুক মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। কে না জানে স্যার বিয়ে করেন নি! কোন এক প্রেমিকা নাকি স্যারকে ধোঁকা দিয়ে চলে গিয়েছে। ওরা স্যার- ম্যাডামদের নিয়ে মাঝেমাঝেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। ক্লাস শেষ হলে ঝিনুক তাড়াতাড়ি বাইরে গিয়ে স্যারকে ধরে,” স্যার, আমার ট্র্যাজেডি বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে- আপনি আলাদা করে বুঝিয়ে দেবেন?” স্যার বিব্রত মুখে বললেন,” ঠিক আছে, স্টাফরুমে চলে এসো কাল। ” তারপর কি একটা ভেবে বললেন, ” কিন্তু, স্টাফরুমে বোঝানো মুশকিল। ” ” আপনার বাড়ি যাইনা স্যার?” ” তুমি আমার বাড়ি চেনো?” একটু অপ্রতিভ মুখে ঝিনুক বলে,” আমি শুনেছি আমাদের বাড়ি ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে- মানে সুকিয়া স্ট্রিটের কাছে একটা পেল্লায় পুরনো বাড়িতে আপনি থাকেন।” ” পেল্লায় পুরনো বাড়ি!” বলেই স্যার হেসে ফেললেন। ” ঠিক তাই- তুমি কাল কলেজের পরে আমার বাড়িতে এসো।” একটু থেমে বললেন,” তুমি সন্ধের আগেই কিন্তু চলে আসবে। দেরি করবে না। ” ঝিনুকের মনের মধ্যে তখন প্রজাপতি উড়তে শুরু করেছে।
বাড়িতে আজকে বলে এসেছে ঝিনুক ফিরতে ওর দেরি হবে। কলেজের কাউকেই ও বলেনি স্যারের বাড়ি যাচ্ছে। হইচই পড়ে যাবে। কেউকেউ মজা করবে। অনেকেরই হিংসা হবে। অলি একটু বিস্মিতই হলো,” তুই এতো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিস!” নীলা, তুহিন আর সুহাসও বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। ঝিনুক জানে সুহাস ওকে একটু অন্যচোখেই দেখে। যদিও ঝিনুকের ওর জন্য সেরকম কোনো ফিলিংস কখনোই হয় নি। স্যারের বাড়ির সামনে গিয়ে ও থ হয়ে গেলো। সত্যিই বিশাল বাড়ি। তবে জরাজীর্ণ অবস্থা। শেষ বিকেলের বিষণ্ণ আলোয় বাড়িটাকে কেমন যেন পরিত্যক্ত মনে হচ্ছে। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে ঝিনুক বুঝতে পারলো একতলায় কয়েকজন কাজের লোক থাকে। ” ওপরে চলে এসো। ” ঝিনুক তাকিয়ে দেখে দোতলার বারান্দা থেকে স্যার ওকে হাত নেড়ে ডাকছেন। সূর্যাস্তের আলোয় এই পুরনো বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ানো স্যারকে দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা ছবি। ঝিনুকের হঠাৎই মনে হলো ট্র্যাজেডির কোনো নায়ক আসন্ন বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বেশ অসুবিধে হচ্ছে। উঁচু ঘোরানো সিঁড়ি। একটু উঠতেই পাঁচিলের আড়ালে সূর্যের আলো ঢেকে যাওয়ায় অন্ধকার লাগছে। একটা টিমটিমে আলো জ্বলে উঠলো। ঝিনুক বুঝতে পারলো স্যারই জ্বালিয়েছেন। উঠেই বারান্দা। দুটো কাঠের চেয়ার রয়েছে। স্যারের হাতে কফির মাগ৷ ইশারায় ওকে বসতে বলে স্যার ভেতর থেকে আর একটা কাপ নিয়ে এলেন৷ ” নাও, কফি খাও। ” কফির মাগে চুমুক দেয় ঝিনুক। সন্ধ্যা নামবে এখনি। তার আগে আকাশটা টকটকে লাল। কে যেন আকাশের গায়ে রক্ত মাখিয়ে দিয়েছে। ” স্যার, রক্তাক্ত আকাশ। তাই না?” আকাশ স্যারের মুখটা কেমন যেন হয়ে গেলো। তারপরেই হেসে উঠলেন স্যার। ” ঠিক বলেছো- রক্তাক্ত আকাশ। জানো তো শেক্সপিয়রের নাটকে প্রচুর রক্তারক্তি – খুন আছে- তবুও কি অপূর্ব সব ট্র্যাজেডি। ” স্যার টপিক নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিয়েছে বুঝতে পারলো ঝিনুক। ” আকিরা কুরোশোয়ার নাম শুনেছো?” ঝিনুক হেসে বলে, ” ‘সেভেন সামুরাই’ দেখেছি স্যার। ” ” ভেরি গুড। কুরোশোয়া শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডি নিয়ে যে সিনেমাগুলো করেছেন-তার একটার নাম ‘থ্রোন অফ ব্লাড’ – তার মানে রক্তের সঙ্গে ট্র্যাজেডির নিবিড় সম্পর্ক। তাই না?” স্যারের মুখটা আবার কিরকম হয়ে গেলো। এবার ঝিনুকের একটু অস্বস্তি হচ্ছে। সন্ধের অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চারদিক। এইসময় স্যারের মুখে বারবার রক্ত শব্দটা শুনে কেমন যেন গা ছমছম করছে ঝিনুকের। প্রসঙ্গ ঘোরাতে ঝিনুক বললো,” স্যার বাংলায় সেরকম ট্র্যাজেডি লেখা হয় নি – তাই না?” ” বাঙালি বড্ড সেন্টিমেন্টাল – ট্র্যাজেডির কিসুই বোঝে না। শুধু মৃত্যু আর কান্নাকাটি হলেই আর কিছুর দরকার নেই। ” গজগজ করতে করতে স্যার ভিতরে ঢুকলেন৷ স্যারের ঘরে ঢোকার আগে বাঁদিকে আর একটা ঘর আছে৷ সেই ঘরের দরজায় তালা লাগানো হলেও ফাঁক দিয়ে ভিতরটা দেখা যাচ্ছে। কৌতূহলে একটু কাছে গিয়ে ঝিনুক অস্পষ্ট আলোয় দেখে ভিতরে আলাদা আলাদা খাঁচায় খরগোশ, সাদা ইঁদুর, পাখি রয়েছে। বিস্মিত হয়ে গেলো ও। দেখে যে কেউ বলবে, আকাশ স্যার জুলজি পড়ান- সাহিত্য নয়। স্যারের বোঝানো সত্যিই চমৎকার। আজ শেষ হয় নি। আরেকদিন আসতে হবে। স্যারের কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথ ধরে ও।
বাড়ি ফিরে দিদি আর বিল্লুকে দেখে বেশ আনন্দ হলো ঝিনুকের। জামাইবাবু দিয়ে চলে গেছেন। দিদি এখন সপ্তাহখানেক থাকবে। পরপর দুদিন ও গেলো স্যারের কাছে। স্যার যত্ন নিয়ে অনেকক্ষণ ধরেই বোঝান ওকে। বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হচ্ছে না ওর। ঝিনুক অনুভব করে, স্যারের প্রতি ওর টানটা অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যাচ্ছে। স্যার পড়াতে পড়াতে একটু ড্রিংক করেন। ঝিনুকের দাদু যেহেতু নিয়মিত সুরাপান করতেন – তাই ওর খুব একটা অস্বস্তি হয় নি। “আচ্ছা স্যার, একটা কথা বলবো?” স্যার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে। স্যারের আলমারি থেকে বের করে কাম্যুর ‘আউটসাইডার’ বইটা দেখছিলো ঝিনুক। “এই বইটা আপনাকে ঝিম দিয়েছে- ঝিম কি আপনার ছাত্রী?” স্যারের মুখ কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেলো। ” এইসব কথা তোমাকে বলা কি উচিত হবে?” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে স্যার বললেন,” ও আমার এক ছাত্রী। না- ঠিক ছাত্রী নয়- আরো একটু গভীর সম্পর্ক ছিলো ওর সঙ্গে।” স্যার আজ বোধহয় গোটা বোতলটা শেষ করে দেবেন। ” জানো তো – তোমাকে অনেকটা ঝিমের মতো দেখতে। আমি সাধারণত কাউকে বাড়িতে পড়াই না। তোমাকে আর না করতে পারলাম না।” ” আমি আসলে অভিশপ্ত! বুঝলে- সে জন্যই ঝিমকে হারালাম। ” স্যার দুহাতে মাথা চেপে বসে পড়লেন। আজ আর পড়ানোয় মনোযোগ নেই আকাশ স্যারের। রাতে খাওয়ার পরে দিদির সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে ঝিনুক বললো,” দিদি, আমি যখন হস্টেলে থেকে পড়াশুনা করতাম, তখন তুই এখানকার কোনো স্যারের কাছে পড়তিস?” ঝিমলি বলে, ” কেন জানতে চাইছিস?” ” তোর নাকি ঐ স্যারের সঙ্গে প্রেম ছিলো- আর তুই নাকি ঐ স্যারকে ঠকিয়েছিলি? ” ঝিমলির মুখ লাল হয়ে যায়। ঠান্ডা গলায় বলে,” তুই তাহলে সব শুনেছিস? জেনে রাখ- লোকটা অভিশপ্ত ছিলো। ভয়ঙ্কর লোক। ” ঝিনুকের মুখ থেকে কোনো কথা বেরোলো না। স্যারের জন্য ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। দিদির ওপর রাগও হচ্ছে। ওরা ব্যালকানিতে বসে গল্প করছিলো। আকাশ চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঝিনুক দেখে দুটো কালো ডানা মেলে কিছু একটা এদিকেই উড়ে আসছে। শিউরে দিদির হাত ধরে ও চেঁচিয়ে ওঠে,” দিদি- এটা কি?” ” ঘরে ঢুকে আয় ঝিনুক-ও টের পেয়েছে আমি এসেছি। ” দুজনে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। বাইরে কিছু একটা ডানা ঝাপটাচ্ছে জানলায়। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দুই বোন চুপ করে বসে থাকে বিছানায়৷ আসতে আসতে ডানার ঝাপটানি থেমে যায়। সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ঝিনুক তাকিয়ে দেখে ঝিমলির মুখ সাদা হয়ে গেছে৷ ” কালই বাড়ি চলে যাবো।” কোনরকমে এই কথাটা বলে ঝিমলি চাদর দিয়ে গোটা শরীরটা ঢেকে শুয়ে পড়ে।
ঝিমলি সত্যিই পরেরদিন চলে যায়। কলেজে গিয়ে ঝিনুক দেখে আকাশ স্যার আসেন নি। বিকেলে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে স্যারের বাড়ির সামনে চলে এসেছে- তা ও খেয়ালই করেনি৷ খেয়াল হলো বাড়ির দিকে তাকিয়ে। কেমন যেন ওর মনে হচ্ছে যে গোটা বাড়িটা ওকে গিলে খাবে বলে দাঁড়িয়ে আছে। শিউরে উঠে পিছনে ফিরলো ঝিনুক। ” তুমি আজও এসেছো!” ঝিনুক তাকিয়ে দেখে স্যার দরজার বাইরে এসে ওকে দেখতে পেয়ে গেছেন। ” চলো ওপরে। ” সম্মোহিতের মতো ঝিনুক স্যারের পিছন পিছন উঠে গেলো। বারান্দায় এগুলো কি! ভালো করে তাকিয়ে ঝিনুক দেখে পাখির পালক, খরগোশের লোম আর রক্ত পড়ে রয়েছে গোটা বারান্দা জুড়ে। স্যারের ইশারায় চেয়ারে বসে ও। ” তোমার পড়া শেষ। কাল থেকে আর আসতে হবে না ঝিনুক। ” ঝিনুক চুপ করে বসে থাকে। আকাশে এখনো আলো রয়েছে। সেই আলোয় স্যারের বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ঝিনুক। ” তোমায় আমার জীবনের একটা কাহিনি শোনাই। আমার বাবা বনবিভাগের কর্মী ছিলেন। একবার ডুয়ার্সের জঙ্গলে রাতের অন্ধকারে আমাকে একটা বাদুড় কামড়ায়। ডাক্তারের চিকিৎসায় মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এলাম। কিন্তু, এর বেশ কয়েক বছর পরে- তখন চাকরি পেয়ে গেছি- একদিন দেখি রাতে আমার কিরকম যেন অস্বস্তি হচ্ছে। রক্ত খেতে খুব ইচ্ছে করছে। ” স্যার কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। ” এইজন্যই খরগোশ, পাখি- এইসব পুষতে শুরু করলাম। ঝিমকে আমি খুব ভালবেসেছিলাম। ও একরাতে বাড়ি ফিরতে চাইলো না। বাড়িতে ফোন করে বানিয়ে বানিয়ে কি একটা বলে দিলো। রাতে ওকে এতো সুন্দর লাগছিলো যে, নিজেকে সামলাতে পারলাম না। ওকে যখন আদর করছিলাম, তখন হঠাৎই অস্বস্তি শুরু হলো। রক্ত পান করার জন্য ঠোঁট উদগ্রীব হয়ে উঠলো। কোনরকমে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করছি। হঠাৎ ও লাফিয়ে বিছানা থেকে আর্তনাদ করতে করতে নেমে গেলো। আমি বুঝতে পারলাম আমি আবার বাদুড় হয়ে গিয়েছি। ও ছুটে বেরিয়ে গেলো। কি অভিশাপ বলো তো!” কি বলবে ঝিনুক বুঝে পেলো না। ওর মেরুদন্ড বেয়ে যেন একটা বরফের ডেলা নীচে নেমে যাচ্ছে। হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। আর থাকা যাবে না! জোর করে উঠে নীচে নামতে শুরু করলো ঝিনুক।
” ঝিনুক একটা কথা শুনে যাও। ” ঝিনুক মাঝসিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকায়। অন্ধকার হয়ে আসছে। এবার চলে যাওয়া উচিত। ” আমি কলেজ ছেড়ে ডুয়ার্সে চলে যাচ্ছি। আমি প্রথম থেকেই জানতাম তুমি ঝিমের বোন। ঝিম যে এসেছে তা শুনেছিলাম। কাল রাতে ওকে একবার দেখতে খুব ইচ্ছে হলো। ” ঝিনুক প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসে একবার পিছনে ফিরে তাকিয়ে ওর মনে হলো বাড়িটা বোধ হয় ভেঙে পড়বে। হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়িতে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লো ও। খুব কষ্ট হচ্ছে এখন ঝিনুকের। মনে হচ্ছে দুটো চোখ ওর দিকে তাকিয়ে যেন কাঁদছে। স্যার আর কলেজে যান নি। ঝিনুক শুনেছে, স্যার কোথায় চলে গেছেন কেউ জানে না। আর স্যারের বাড়ি ভেঙে এখন ফ্ল্যাট হয়েছে। বহুদিন পরে ঝিনুক ডুয়ার্সে ঘুরতে গিয়ে ভাবছিলো, এখানেই কোথাও স্যার আছেন। একদিন গাছের ডালে একটা বাদুড়কে ঝুলে থাকতে দেখে গা ছমছম করে ওঠে ওর৷ ওকে একদৃষ্টিতে আতঙ্কিত চোখে বাদুড়ের দিকে তাকিয়ে দেখে গাইড বলে ওঠে,” ম্যাডাম ভয় পাবেন না- এটা বাদুড়। আমি আপনাদের হাতি, বাইসন আর গন্ডার দেখিয়ে দেবো। সেগুলো অনেক বিপজ্জনক। এখানে লেপার্ডও আছে।” ঝিনুক ভাবে, না- ও স্যারকে আজও ভুলতে পারে নি। পারবেও না। স্যারের কথা মনে হলে ভয় পেলেও ওর বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে, চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। ও কি স্যারকে ভালবেসে ফেলেছিল? কে জানে!