ক্যাফে গল্পে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক

শাপমুক্তি

সীমান্ত পেরিয়ে দলে, দলে হিন্দু-বাঙ্গালী পঃ বঙ্গে এসেছে–আসছে —আসা অব্যাহত। জমি-জমা, মান ইজ্জ্বৎ খুইয়ে শুধু প্রাণের ভয়ে এদেশে এসে উদ্বাস্তু পরিচয়ে ক্যাম্পে বাস– এ ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্প—শুরু হয়েছে সেই স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিন থেকে—স্বাধীনতার যূপকাষ্টে প্রদত্ত বলি, হিন্দু-বাঙ্গালী।
সারা ভারত যখন স্বাধীনতা উৎযাপনে ব্যস্ত, তখন বাঙ্গালীর এই মর্মন্তুদ ইতিহাসের কথাটি কারো মনে পড়ে না, মনে পড়ে না হাজার, হাজার মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে অন্যায়ভাবে পাওয়া ঐ দিনটা;আপামর বাঙ্গালীর মতামত নেওয়া হয়েছিল কি? না, দেশ-নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে স্বাধীনতার অগ্রদূতের এমন অবস্থা করেছে;অবশ্য কিছু ঘৃণ্য বাঙ্গালীও এ বিষয়ে উৎসাহী হয়েছিল। স্বাধীনতার ইতিহাসে বাঙ্গালীর কী ভূমিকা রাখা হয়েছে তা বিস্ময়কর, আজও আজাদ-
হিন্দ বাহিনীর অবদান, নৌ-বিদ্রোহ ইতিহাসে অবহেলিত রয়ে গেল। সে যাক্ , ভবিষ্যৎ লিখবে সত্য কথা-যা সত্য, তাকে চাপা দিয়ে বেশি দিন রাখা যায় না, লেখা হবেই নতন ইতিহাস। এখন দেখা যাক, ওপার থেকে আসা সত্যরঞ্জন, বিবেকরঞ্জন ও মানবের কী হাল। ইংরেজ রাজত্বে, ওরা তিনজনেই মানব-কল্যানে নিজেদের সঁপেছিল, ইংরেজদের সংগে স্বাধীনতার লড়াইয়ে তারাই প্রথম সারিতে— ভিক্ষা করে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তারা প্রথম থেকেই–নিজেদের তারা দেশ-মাতৃকার পদতলে প্রদত্ত বলি বলে ভাবতো। আর আজ—-।
ক্যাম্পে, ক্যাম্পে ঘুরছে, পরিচিতি উদ্বাস্তু, হায়, ভাগ্যের কি পরিহাস! উদ্বাস্তু-ক্যাম্পের খাতায় তিনজনেরই নাম লেখা তারপর ছাড়াছাড়ি, কে কোথায়, একে অপরের খোঁজ করেও মেলে না দেখা।
মানব থাকে কোলকাতায়,
মনমরা, আপ্রাণ চেষ্টায় জীবন-যুদ্ধে জয়ী, সে আজ প্রতিষ্ঠিত; তবু কিসের অভাব তাকে প্রতিনিয়তই বিদ্ধ করে চলেছে।
তাই মানব, সহকর্মীদের খোঁজ করে চলে, ক্যাম্প-ফেরৎ মানুষের কাছে;কেউ বলে, সত্য ক্যাম্পেই মারা গেছে, কেউ বলে সত্যকে তারা একটা ক্যাম্প থেকে চলে যেতে দেখেছে, কিন্তু, না, এখন তার অবস্থান কোথায় কেউই বলতে পারে না। এখন পঃ বাংলা থেকে সত্য নিখোঁজ। মানবের দৃঢ় বিশ্বাস, সত্যের মৃত্যু হয় না, হয়তো সে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, কালে সে আবার আবির্ভূত হবেই।
মানবের সংগে ক্যাম্পে, দত্ত-পরিবারও ছিল।তারা সরকারী কলোনিতে পুনর্বাসন পেয়েছে। দত্ত-পরিবারের ছেলেরা প্রথমে মুদিখানা দোকানের মাধ্যমে ক্রেতা ঠকানো শুরু করে, জীবন-যুদ্ধে কেবল জয়ই– কেবল টিকে থাকাই লক্ষ্য;তারপর, শুরু হয়েছে তোলাবাজি, কাটমানি–লোককে চমকানি, আরো কত কী—নীচে নামার পথের আর শেষ থাকে না।
তারাওআজ সমাজের হত্তা, কর্ত্তা–পরিচিতি সমাজ-সেবী। অসৎ পথে যে জয়ী হওয়া যায়, সে উদাহরণ তো তার চোখের সামনেই রয়েছে, কালে কী হবে কে জানে!
মানব চিন্তিত, সত্যই এ অবস্থায় সত্যের স্থান সম্ভব নয়, সে চলে গিয়ে বেঁচেছে;সে এসব মানতে পারতো না । শৈশব থেকে
শেখা উপদেশাবলী আজ ভ্রান্ত বলে বোধ হচ্ছে। তাই কি! অবস্থার সংগে সংগে মানসিক পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু মানসিক শান্তি, স্বস্তি–যা মানুষের মধ্যে মান ও হুঁশ জোগাতে অপরিহার্য, তা কি সত্যকে দূরে ঠেলে পাওয়া সম্ভব? না, তা জানতে বিবেকের খোঁজ পেতেই হবে—একমাত্র বিবেকই মানবের মনের এই দ্বন্দ্ব দূর করতে পারে–মুক্তির পথ দেখাতে পারবে–শান্তির পথে আবার সে হাঁটতে সে সক্ষম হবে।
অনেক খোঁজার পর মানব সন্ধান পেল বিবেকরঞ্জনের ঠিকানা। একটা ক্যানেলের কাছে ঝুপড়িতে বিবেকের আস্তানা। খোঁজ করতে করতে মানব সেই ক্যানেলের কাছে এসে পড়েছে। সেখানে এসেই এক সুন্দর, নিষ্পাপ শিশুর সঙ্গে দেখা; জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটি বলে, “আপনি দাদুকে খুঁজছেন? ”
“হ্যাঁ, বিবেকরঞ্জন এখানে থাকে?”
“আপনি? ”
“কিন্তু, তুমি কে? ”
“আমি ওনার প্রতিভূ, আমিই তো ওনার সব। ”
“একবার দেখা করতে পারি? ”
“দাঁড়ান, দাদুকে জিজ্ঞেস করে আসি;দাদু তো শয্যাশায়ী, স্বাধীন ভারতের পুলিশ ও সমাজ-সেবীরা তাঁকে আধমরা ক’রে রেখেছে। ”
“ভিতরে আসুন, মুখোশ খুলে আসতে হবে, তবেই দাদুর দেখা মিলবে।”
মানবরঞ্জন, বহুদিন পর তার অন্য সত্তার সংগে মিলিত হতে চলেছে,সে এক বিশেষ অনুভূতি তে আচ্ছন্ন। ঘরে ঢুকতেই বিছানার সংগে লেপ্টে থাকা একজনের ক্ষীন কন্ঠস্বরে সে সংবিৎ ফিরে পেল।
“ঐ চেয়ারটায় বস। ”
মানব দেখলো, চেয়ারটা একটা
বিশেষ মেশিনের ওপর বসানো;হ্যাঁ, টাইম-মেশিন বলেই বোধ হচ্ছে। চেয়ারে বসতেই, সে ফিরে গেল অতীতে, দেখছে তার সামনে হাসছে প্রাণবন্ত বিবেক, অনেক সম্ভাবনায় ভরা তার প্রশস্ত হৃদয়, মনে হয়, এখনি কিছু ওলট-পালট
ঘটিয়ে ফেলবে সে একক প্রচেষ্টায়।
মানব বললো, “বিবেক, তুমি কি আবার এই মূর্তিতে আমাদের মধ্যে ফিরে আসতে পারো না? “
“কেন নয়, এ দেশের এ পরিবেশে বিবেকের স্থান হ’তে পারে না;তোলাবাজি, মিথ্যাচারের মধ্যে আমি কী থাকতে পারি, না, তুমিও কী খুব স্বস্তিতে আছো? যেখানে সত্য নেই, সেখানে বিবেকের কী স্থান হ’তে পারে? ”
“তা হলে আমরা কী বিবেকহীন
হ’য়েই থাকবো? ”
“তা কেন; ইংরেজদের কাছে কত কী আমরা শিখেছি, স্বাজাত্যবোধ শিখেছি, দেশকে ভালোবাসতে শিখেছি, একাত্ম হ’তে শিখেছি;
আচ্ছা, বল তো ক’জন ইংরেজ এসেছিল, ওরা তো আমাদের দিয়েই আমাদের পরাধীন করেছিল, আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে:এর মধ্যে ভুলে গেলে বর্গীদের হামলার কথা, ‘বুলবলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে’ গানের কথা! না, ইংরেজই শিখিয়েছে এক দেশ, এক ভাবনা, ওরাই শিখিয়েছে আমাদের স্বাধীনতায় উদ্বুদ্ধ হ’তে, আমরা ওদের তাড়াতে তৎপর হয়েছি, মৃত্যু বরণ করেছি। তবু নাকি স্বাধীনতা এসেছে অহিংসা-পদ্ধতিতে, বলে এমন প্রচার করা হয়েছে যেন আমাদের মৃত্যু-বরণ, আমাদের আত্মত্যাগ সব বৃথা, জাতির জনক এসে আমাদের উদ্ধার করলেন, কিন্তু, বাবা! আমরা যে অযোনী-সম্ভবা। যে দিন দেশোদ্ধারের নেতৃত্ব চলে গেল পশ্চিমের – নেতাদের হাতে, সেদিন থেকেই পঃ বাংলার ভাগ্যাকাশে
জমলো মেঘ, আর কিছু স্বার্থান্বেষী
বাঙ্গালীর জন্যই আজ আমাদের এই দশা। আপামর জনসাধারণ তো উপলব্ধিই করতে পারলো না যে তারা সত্যই স্বাধীন:সেই বৃটিশের অত্যাচার চালানোর আইনগুলো
তো বহাল, বিনা বিচারে আটক, আন্দোলন বা প্রতিবাদে জোটে পুলিশের লাঠি, জল-কামান, বুলেট, তবে কীসের স্বাধীনতা? তাই তো তোমাদের কবি বলেছেন—‘স্বাধীনতার হীনতায় কে বাঁচিতে
চায় রে, কে বাঁচিতে চায়—– ‘।
শুধু মাত্র পতাকা উত্তোলনে প্রকৃত
স্বাধীনতা বোঝায় না, আসে মানসিক পরিবর্তনে, আসে দায়িত্ব পালনে, আর তা সম্ভব কেবল দেশের মানুষের চরিত্র গঠনের মাধ্যমে। সে চরিত্রের মানুষ বড়ই
অভাব এখন। “
“তবে কী অবস্থার পরিবর্তন হবে না, তোমাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না? ”
“সময়ই সে কথা বলবে, শুধু জমি তৈরী করে রাখো, আগাছা-পূর্ণ জায়গায় উন্নত-বীজও প্রস্ফুটিত হ’তে পারে না, ভেবো না যেন আমি কোন বিপ্লবের কথা বলছি, তার জন দরকার আদর্শ-বান চরিত্র-নিষ্ট যুবকবৃন্দের, যেটা ভোগ-নির্ভর অর্থনৈতিক অবস্থায় কল্পনা-সাধ্যও নয়। চরিত্র-হীনদের দেশে বিপ্লব, সে তো সোনার-পাথর বাটি!”
“জমি তৈরী বলতে কী বোঝাতে চাইছো? ”
“আমি, স্বাধীনতার যোগ্য উত্তরাধিকার হওয়ার কথা বলছি, চরিত্র গঠনের মাধ্যমেই তা সম্ভব, ফোকটে কিছু হয় না, তাঁত বুনে বা চরম ভোগের পর ব্রহ্মচর্য পালনে
তা হয় না;আর মুখোশ পরে তো হয়ই না, দেখতে তো পাচ্ছো দেশের কী অবস্থা! আগে মানুষ তৈরী হবে, তাদের মধ্যে থেকেই
সেবক-নেতা বেড়িয়ে আসবে;ততোদিন বাঙ্গালীর সমাজ-জীবনের এ সন্ধিক্ষণ-এ অস্থিরতা চলতেই থাকবে–পাপস্খলন চলবে অব্যাহত– আবার কালে শাপমুক্তি ঘটবে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।