খেয়াল ও ধ্রুপদ পর্ব শেষ করে, হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এবার সংক্ষেপে ঠুংরী এবং ঠুংরী ঘরানার কথা। থাকছে দু একজন বিখ্যাত ঠুংরী শিল্পীর কথাও। ঠুংরী কথাটি এসেছে ভারী সুন্দর একটি কথা “ঠুমকাও” বা “ঠুমকনা” থেকে, অর্থাৎ নূপুর পায়ে হেঁটে যাওয়ার ঠুম ঠুম শব্দের মতো হলো এই ঠুমরী বা ঠুংরী সঙ্গীত! যেখানে নূপুর বা ঘুঙ্গুর সেখানেই নাচের কথা মনে হয়। অবশ্যই পরবর্তীকালে ঠুংরীর সঙ্গে নাচ যুক্ত হয়েছিলো, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ঠুংরীর জন্ম হয় কীর্তনকারদের দ্বারা। কীর্তন গান থেকেই ঠুংরীর জন্ম। কীর্তন হলো এক আদি সঙ্গীত যা ভগবানের গুণগান করে, বা তাঁকে বর্ণনা করে গাওয়া হতো। ভাবসমৃদ্ধ এই গান, খেয়াল বা ধ্রুপদের দৃঢ় সংবদ্ধ তাল ও রাগের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে এসেছিলো। সেই কীর্তন থেকেই তেরোশ শতাব্দীতে ঠুংরীর জন্ম।
এরপর অষ্টাদশ শতাব্দীতে বেনারস ও লক্ষ্ণৌতে আবার ঠুংরীর ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। ঠুংরী যেন এক স্বচ্ছ বহতা নদীর মতো। গানের পদগুলিকে সঙ্গীতের নানা ভাব ও সুর দিয়ে সাজিয়ে যেন এগিয়ে চলে ঠুংরী। তাল সেখানে গৌন। গানের পদগুলি বেশীরভাগই মানব ও ঈশ্বর প্রেম, বিরহ, কামনা ইত্যাদি নিয়ে তৈরী হতো।
ঠুংরী ঘরানার কথা বলতে গেলে মূলত তিনটি ঠুংরীর রূপ এবং তিনটি ঘরানার কথা বলতে হয়। বেনারস ঘরানা, লক্ষ্ণৌ ঘরানা ও পাঞ্জাব ঘরানা। প্রথমে আসি বেনারস ঘরানার কথায়। আগেই বেনারস ঘরানার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলাম বেনারস যেন সর্ব সঙ্গীতের এক তীর্থক্ষেত্র হিসাবে গড়ে ওঠে আনুমানিক ছয় সাতশো বছর আগে, কাশীর মহারাজ চেত সিং এর পৃষ্ঠপোষকতায়, প্রচুর সঙ্গীতজ্ঞ, অর্থাৎ গায়ক, বাদক, নৃত্যশিল্পী গিয়ে বাসা বাঁধেন বেনারসে এবং কাছাকাছি অঞ্চলগুলিতে। সেখানে হাভেলী সঙ্গীত ও কীর্তন, ধ্রুপদ, খেয়াল ইত্যাদি নানা ধরণের গানবাজনার প্রচলন হয়। ঠুংরী কিন্তু এই মূল সঙ্গীতগুলির একটি অপভ্রংশ শাখা বা লঘু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত হিসাবে গীত হতো। বেনারস ঘরানার ঠুংরী অনেক ঢিমে লয়ে গাওয়া হয়। তার পদ বা কথাগুলিতে নানা হিন্দু দেবদেবীর লীলা বর্ণনা এবং তাদের প্রেমের কথা, লোকায়ত জীবনে, বিশেষতঃ উত্তরপ্রদেশের দেহাতী মানুষের প্রেম বিরহ সুখ দুঃখের কথা থাকে। অনেক সময় অবধী বা ব্রজভাষা ব্যবহার হয়। ঠুংরী গানে দুটি অংশ – স্থায়ী ও অন্তরা। গানটির কথাগুলিকে নানা ভাব ও সুরের বৈচিত্রে বারবার গাওয়ার পর ঠিক উত্তরপ্রদেশের নানা লোকসঙ্গীতের মতো দ্রুত লয়ে গেয়ে শেষ করা হয়, যাকে বলে লগগি, লড়ি করা। ঠুংরীতে সাধারণতঃ কাফী, খমাজ, পিলু, গারা, পাহাড়ী ইত্যাদি মিশ্ররাগ ব্যবহৃত হয়, যাতে সুরের মিশ্রণ করার অনেক সুবিধা, বিধিবদ্ধ বড় রাগগুলিতে যা সম্ভব নয়। ঠুংরী সাধারণতঃ রূপক, দীপচন্দী, আদ্ধা ইত্যাদি তাল ব্যবহার হয়। এই সব তালের মধ্যে একটা সহজ ছন্দের দোলা আছে। বেনারসের ঠুংরীকে পূরব অঙ্গের ঠুংরী বা বোল-বনাও ঠুংরী বলে। এই ঘরানার বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে আছেন সিতারা দেবী, রসুলন বাঈ, সিদ্ধেশ্বরী দেবী, গিরিজা দেবী, ছান্নুলাল মিশ্র ইত্যাদি।
এবার আসি ঠুংরীর অপর নামকরা ঘরানা অর্থাৎ লক্ষ্ণৌ ঘরানার কথায়। এই ঘরানায় ঠুংরী গায়ন শুরু হয় লক্ষ্ণৌয়ের সুলতান ওয়াজিদ আলির শার সভায়। এই ঘরানার ঠুংরী গায়নে কামনা বা যৌনতার প্রকাশ বেশী। হাত পায়ের মুদ্রায়, বা মুখভঙ্গীতে কামনা, বাসনা বা অনুরাগের প্রকাশ ঘটানো হয়। কত্থক নৃত্যের সঙ্গে অনেকাংশে মিল পাওয়া যায় এই ঠুংরী গায়নের ধরণের। ঠুংরীর লয় অপেক্ষাকৃত দ্রুত। অনেক সময় এই ঠুংরীতে পদগুলি দ্রুত খেয়ালের মতো বানানো হতো ও দ্রুত খেয়ালের মতো তিনতালে গাওয়া হতো। লক্ষ্ণৌ ঘরানার ঠুংরী অনেক বেশী কারুকার্য দিয়ে সাজানো। অযোধ্যায় ওয়াজেদ আলি শাহের দরবারে ইসলামী গজল গায়নের পরম্পরা থেকেও অনেক স্টাইল গ্রহণ করে এই ঠুংরী। অনেক সময়েই তবায়েফ বা বাঈজীরা এই গান গাইতেন। একে বলা হতো বন্দিশ-কি-ঠুংরী। এই ঘরানার বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে আছেন বেগম আখতার বা আখতারি বাঈ, মালকা জান, গওহর জান, নুরজাহান, নয়না দেবী প্রভৃতি।
এই দুটি স্টাইল ছাড়াও পাঞ্জাবের পাতিয়ালা ঘরানায় ঠুংরী গীত হতো একেবারে অন্যরকম ভাবে। এই ঠুংরীতে মুড়কি ও নানা হরকতের ব্যবহার খুব বেশী। অনেকটা পাঞ্জাবী টপ্পার মতো করে গাওয়া হতো এই ঠুংরী। পদগুলিতে প্রেম ও বিরহের কথা উঠে আসতো। বড়ে গুলাম আলী খানের ঠুংরীগুলি এই ঘরানার।
অনেক সময় অনেক বড়ো বড়ো খেয়াল শিল্পী তাঁদের মতো করে খেয়ালের পর ঠুংরী গাইতেন, যেমন উস্তাদ আবদুল করিম খান, উস্তাদ ফৈয়াজ খান। এই খেয়াল অঙ্গেই ঠুংরী গান প্রভা আত্রে, শোভা গুর্তু প্রভৃতি।
এরপর বলবো দু একজন বিখ্যাত ঠুংরী শিল্পীর জীবনের গল্প।