ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৪৪)

আলাপ

ভারতনাট্যম ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীর প্রধাণ আটটি নৃত্যের মধ্যে একটি। যেমন ওড়িশী নাচ সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ভারতীয় নৃত্য বলে দাবী করা হয়, তেমনই ভারতনাট্যমও সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বলে দাবী করা হয়। বস্তুত দুই ধরণের নৃত্যেরই উৎস এবং প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় অতি প্রাচীনকালে প্রায় একই সময়ে। ভারতনাট্যমের মূল উৎসও দুটি অর্থাৎ ভরত মুনীর ‘নাট্যশাস্ত্র’ এবং নান্দীকেশভারা রচিত ‘অভিনয় দর্পণ’। দাক্ষিণাত্যের প্রাচীন ভারতীয় মন্দির ও রাজসভাগুলিতেই বিস্তার লাভ করে এই নাচ। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় এবং ভক্তিভাব বর্ণিত হয় এই নৃত্যের মাধ্যমে। এতে বৈষ্ণব তথা শৈব এবং শাক্ত ধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে ভারতনাট্যম তামিলনাড়ুর জাতীয় নৃত্য।
খ্রীষ্টিয় দ্বিতীয় শতকে প্রথম, তামিল মহাকাব্য ‘শিলাপ্পাটিকরম’-এ ভারতনাট্যমের উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রীষ্টিয় ষষ্ঠ থেকে নভম শতকের বিভিন্ন মন্দির ভাস্কর্যে ভারতনাট্যমের যে দেহ ভঙ্গিমা ও মুদ্রাগুলি দেখা যায়, তাতে বোঝা যায় যে প্রথম খ্রীষ্টাব্দের শেষেই এই নাচ এক অত্যন্ত পরিশীলিত উচ্চশ্রেণীর নৃত্যশৈলীতে পরিণত হয়। ভারতনাট্যমে নানাধরণের ‘বানী’ ব্যবহার হয়। প্রতিটি ‘বানী’ হল
এক একটি স্টাইল বা নাচের ধরণ যা এক একটি বিশেষ ঘরানা বা গুরুকূলের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে।
ভারতনাট্যমে, দেহের বা ধড়ের ঊর্ধাংশ সোজা এবং স্থির থাকে। দুই পা এবং হাঁটু বাইরের দিকে বেঁকে বা বেরিয়ে থাকে। একে আরামান্ডি বলে। এই নাচে অত্যাশ্চর্য পায়ের কাজ দেখা যায় এবং হস্তমুদ্রা চোখের কাজ ও মুখভঙ্গিমাগুলী অত্যন্ত শক্তিশালী যা দিয়ে সহজেই অনেক কিছু বোঝানো যায়। নাচের সঙ্গে গান এবং বাজনা ব্যবহার হয়। সাধারণতঃ নর্তক বা নর্তকীর গুরুজী সম্পূর্ণ নৃত্যানুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। ওড়িশীর মতো এই নাচেও মূল তিনটি ভাগ থাকে নৃত্ত, নৃত্য এবং নাট্য।
ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলিতে এই নাচ সর্বত্র প্রদর্শিত হতো। অন্যান্য শাস্ত্রীয় নৃত্যের মতো ব্রিটিশ আমলে মন্দিরে ভারতনাট্যম নিষিদ্ধ হয়। এর প্রতিবাদ করেন দাক্ষিণাত্যের জনগণ এবং স্বাধীনতার পর আবার এই নাচ মন্দিরে এবং বিভিন্ন সভাগৃহে প্রদর্শিত হতে থাকে।
ভারতনাট্যমের বিভিন্ন ধরণকে সাদিরাট্যম, পারাথিয়াম আট্যম বা থেভরাট্যম বলা হতো। ১৯৩২ সালে এই নাচকে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য ম্যাড্রাস অ্যাকাডেমীতে রুক্মিনী দেবী আরুন্ডেল এবং ই কৃষ্ণ আইয়ারের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে সাদিরাট্যমকেই ভারতনাট্যম বলে পরিচিতি দেওয়া হবে। “ভা-র-ত” কথাটির মধ্যে ভা অর্থাৎ ভাব, র অর্থাৎ রাগ এবং ত অর্থাৎ তাল। এই তিনের সমাহারেই ভারতনাট্যম। নাট্যম বলতে সংস্কৃতে নৃত্য বোঝায়।
খ্রীষ্টিয় বারোশো শতাব্দীতে পাথরের তৈরী দক্ষিণ ভারতের চিদাম্বরম শিবমন্দিরে ভারতনাট্যমের ১০৮ টি ভঙ্গী খোদিত আছে। এই ভঙ্গীগুলিকে নাট্যশাস্ত্রে করণ বলা হয়েছে। এছাড়া সপ্তম শতাব্দীর বাদামী গুহা মন্দিরের এক নম্বর গুহায়, তান্ডব নাচের ভঙ্গিতে শিবের নটরাজ মূর্তির দাঁড়াবার ভঙ্গী একেবারেই ভারতনাট্যমের আঙ্গিকে। শিবমূর্তিটি পাঁচ ফুট লম্বা, শিবের আঠেরোটি হাত বিভিন্ন জ্যামিতিক নৃত্যভঙ্গীতে হাতের অবস্থান দেখায়। শিবের আঙ্গুলগুলিতে ভারতনাট্যমের নানা হস্তমুদ্রা দেখা যায়।
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন খ্রীষ্টপূর্ব তিনশো শতক থেকে খ্রীষ্টিয় তৃতীয় শতক পর্যন্ত প্রচলিত দেবদাসী নৃত্য আসলে ভারতনাট্যমেরই প্রাচীন রূপ। এই দেবদাসীরা বিভিন্ন দাক্ষিণাত্যের মন্দিরে দেবতার সামনে নৃত্যপ্রদর্শন করতেন। তাঁদের বিবাহ হতো না, কারণ তাঁরা দেবতার বিবাহিত বলা হতো। কিন্তু তাঁদের দিয়ে জোর করে বেশ্যাবৃত্তি করানো হতো বলে ব্রিটিশ আমলে দেবদাসী প্রথা বিলুপ্ত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত শুধু মন্দিরেই ভারতনাট্যম প্রচলিত ছিল। একমাত্র তাঞ্জোরের মারাঠা শাসকগণ ভারতনাট্যম নাচের উন্নতিকল্পে নানা পরিকল্পনা নেন এবং মন্দিরের বাইরে নানা সভাগৃহে এই নৃত্যপ্রদর্শন শুরু হয়। কিন্তু এরপর ব্রিটিশ আমলে ভারতনাট্যম নৃত্যকে বেশ্যা নৃত্য আখ্যা দেন ইংরেজরা এবং এই নাচ প্রায় বন্ধ ও বিলুপ্ত হতে বসে।
বিংশ শতাব্দীর সূচনায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন জোরদার হয়ে ওঠে, তখন তামিলনাড়ুতে রুক্মিনী দেবী অরুন্ডেল, বালাসরস্বতী এবং যামিনী কৃষ্ণমূর্তির নেতৃত্বে এর জোরালো প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে ওঠে। প্রথম দুজন পান্ডানালুর বা কলাক্ষেত্র স্টাইলে এবং যামিনী কৃষ্ণমূর্তি থাঞ্জাভোর স্টাইলে বিভিন্ন সভায় নেচে এই নৃত্যকে জনপ্রিয় করতে লাগলেন। এইভাবে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আবার এই নাচ বিভিন্ন মন্দিরে এবং মন্দিরের বাইরেও প্রচলিত হয়।
ভারতনাট্যম মূলতঃ মহিলারাই প্রদর্শন করেন। একজনই নাচেন এবং তাঁর সঙ্গে গীতবাদ্যে অনেকে সঙ্গত করেন। নর্তকী বিচিত্র বর্ণের শাড়ি পরেন। শাড়ির সামনে অংশে বড় কুঁচি নাচের সময় ময়ূরের পাখার মতো ছড়িয়ে যায়। নর্তকীগণ ভারী গহনা, যেগুলি সাধারণতঃ মন্দিরের ভাস্কর্যে দেখা যায়, তা ব্যবহার করেন। মাথায় সিঁথিপাটি ও তার দুপাশে পাশার মতো দেখতে চিরুণী ব্যবহার করা হয়। গলায় সীতাহার জাতীয় ভারী হার ও নেকলেস, নাকে নথ, কানে ভারী ঝুমকো দুল, কোমরে কোমরবন্ধ ব্যবহার হয়। হাতের আঙ্গুল ও পায়ে আলতা ব্যবহার হয়। বড় করে কাজল দিয়ে চোখ আঁকা হয়।
ভারতনাট্যমে যে কাহিনীগুলী নাট্যাংশে নাচের মাধ্যমে বর্ণিত হয়, সেগুলি রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের গল্প, বিভিন্ন ধর্মীয় শ্লোক ইত্যাদি থেকে নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন ঘটনা হস্তমুদ্রা, চোখের ভঙ্গী ও মুখের ভঙ্গী দিয়ে তা প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া দশাবতার, নবরসও তুলে ধরা হয়। পায়ের কাজ, দেহের নানা ভঙ্গী, হস্তমুদ্রা, চোখ মুখের ভঙ্গী এবং সাজ ও গান সবকিছু একত্রিত হয়ে কোন অবতারের রূপ অথবা ঘটনা বা গল্পটি প্রকাশ করে। নাচতে নাচতে শিল্পী হঠাত থেমে বা ঘুরে গিয়ে একটি বিরতি আনেন এবং তারপর হয়তো গল্পের নতুন কোন চরিত্র হিসাবে নিজেকে আবার তুলে ধরেন।
ওড়িশীর মতোই নৃত্ত অংশে শিল্পী বিশুদ্ধ নাচই প্রদর্শন করেন। এখানে কোন ভাব বা নাট্যাংশ থাকে না। তালের সঙ্গে বিভিন্ন হস্ত ও পদমুদ্রা, পদক্ষেপ, ঘাড়ের কাজ ও পায়ের কাজ ব্যবহার করে নাচেন শিল্পী।
নৃত্য অংশে তাল হয় ধীর এবং সেখানে ভাবই হয় প্রধাণ। নাট্যম অংশে একটি গল্প বা নাটক অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
ভারতনাট্যম শিক্ষার শেষে শিল্পীর প্রথম মঞ্চারোহণকে বলা হয় আরঙ্গেত্রম। সাধারণতঃ দশ বা বারো বছর নাচ শেখার পর যখন গুরু মনে করেন যে ছাত্রী একা নাচার উপযুক্ত হয়েছেন, তখনই তাঁর আরঙ্গেত্রম

সাধারণতঃ দশ বা বারো বছর নাচ শেখার পর যখন গুরু মনে করেন যে ছাত্রী একা নাচার উপযুক্ত হয়েছেন, তখনই তাঁর আরঙ্গেত্রম করা হয়।
সাধারণতঃ আটটি ভাগে আরঙ্গেত্রম হয়। একে মার্গম বলা হয়।
পুষ্পাঞ্জলিঃ প্রথমে শিল্পী নাচের মাধ্যমে ‘পুষ্পাঞ্জলি’ দেন বিভিন্ন দেবতা, গুরু এবং দর্শকদের উদ্দেশ্যে।
আলারিপুঃ অনেক সময় শুধু তালবাদ্যের সঙ্গে ‘আলারিপু’ করে বিভিন্ন দেবতাগণকে ও গুরুকে ধন্যবাদ জানিয়েও নাচ শুরু করা যায়। এই অংশে কোন গান থাকে না। নর্তকী এই অংশে নিজের দেহকে নাচের জন্য প্রস্তুত করে নেন।
জাতিস্বরমঃ এই অংশে অন্যান্য যন্ত্রের সুরের সঙ্গে আলারিপু নৃত্য করা হয়। কোন কথা বা গান থাকে না।
শব্দমঃ এই অংশে প্রথম কোন কথা বা গান শুরু হয়। সেই গানের সঙ্গে সুন্দর দেহভঙ্গীমায় শিল্পী নাচেন।
ভর্ণমঃ এটি নাচের প্রধাণ অংশ এবং সবচেয়ে দীর্ঘ অংশ। এটিই ‘নৃত্য’। এতে শিল্পী গানের সঙ্গে নানা ভাবের দ্বারা একটি ঘটনা বা বক্তব্য তুলে ধরেন। বিভিন্ন মুখভঙ্গী, মুদ্রা, পদসঞ্চালনার মাধ্যমে এই প্রকাশ ঘটানো হয়।
পদমঃ এটি নাট্যম অংশটি। এখানে অভিনয়ের মাধ্যমে কোন একটি গল্প বলা হয়। এই অংশে তালের ব্যবহার নাও থাকতে পারে।
তিলান্নাঃ এর সঙ্গে সাধারণতঃ গায়ক তিলান্না বা তারাণা গান করেন। এটিই নাচের চরম অংশ, যেখানে নাচ তুঙ্গে ওঠে। দ্রুত বাদ্য ও সঙ্গীতের সঙ্গে শিল্পী হস্ত পদমুদ্রা ব্যবহার করে নানা দেহভঙ্গীতে বিশুদ্ধ নৃত্য করেন। এখানে কোন অভিনয় থাকে না।
শ্লোকমঃ সবশেষে এই অংশে নৃত্য শিল্পী সবাইকে প্রণাম জানান এবং সবার কাছ থেকে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।
ভারতনাট্যমে অন্তত কুড়িটি আসন ব্যবহার করা হয়, যেমন ধনুরাসন, বৃক্ষাসন, চক্রাসন ইত্যাদি। এ ছাড়া ১০৮ করণ, যেগুলির কথা আগে বলা হয়েছে, সেগুলি ব্যবহার হয়। ভারতে অন্তত দশ হাজার শিল্পী বর্তমানে ভারতনাট্যম প্রদর্শন করেন।

এবার কয়েকজন বিখ্যাত ভারতনাট্যম শিল্পীর কথা বলবো। শুরু করবো শ্রীমতি রুক্মিনী দেবী আরুন্ডেলকে দিয়ে, যিনি বিংশ শতাব্দীর সূচনায়, ব্রিটিশ আমলে যে ভারতনাট্যম নাচ নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো তাকে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া থেকে উদ্ধার করে আবার নিজ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
তামিলনাড়ুর মাদুরাইতে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৯০৪ সালে রুক্মিনীদেবীর জন্ম হয়। তখন তাঁর নাম ছিল রুক্মিনী নীলকান্তা শাস্ত্রী। তাঁর পিতা পাব্লিক ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন এবং মা শেষাম্মাল ছিলেন সঙ্গীতের বিশেষ অনুরাগী। পিতার বদলীর চাকরীর সূত্রে তিনি ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। এই সময় তাঁর ভাই নীলকান্তা শ্রীরাম, অ্যানি ব্যাসান্তের থিওসোফিকাল আন্দোলনে গভীর ভাবে প্রভাবিত হন এবং অ্যানি বেসান্তের শিষ্য হন। পরে পিতা নীলকান্তা শাস্ত্রী রিটায়ার করে ম্যাড্রাসের আদিয়ারে থিয়োসোফিক্যাল সোসাইটির হেড কোয়ার্টারের কাছেই বসবাস করতে শুরু করেন। এখানেই রুক্মিনী দেবীও থিয়োসোফিকাল মতবাদ, যেটি আমেরিকার একটি বিশেষ ধর্মীয় মতবাদ, তাতে বিশ্বাসী হয়ে পড়েন। এই মতে এক একক মহাশক্তিতে বিশ্বাস করা হয় এবং জগতকে তাঁরই প্রসার বলে ধরা হয়। সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক ইত্যাদি সংস্কৃতির নানা নবরূপের সঙ্গেও তাঁর পরিচিতি ঘটে। এখানেই ব্রিটিশ থিয়োসফিস্ট ডক্টর জর্জ আরুন্ডেলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। মাত্র ষোল বছর বয়সে, বেয়াল্লিশ বছর বয়স্ক ডক্টর আরুন্ডেলকে বিবাহ করেন তিনি। বিয়ের পর তিনি স্বামীর সঙ্গে গোটা পৃথিবী ভ্রমণ করেন। সেই সময় শিক্ষাবিদ মারিয়া মন্টেসরি এবং জেমস কাজিন্সের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯২৩ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া ফেডারেশন অফ ইয়ং থিয়োসফিস্ট সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হন। ১৯২৮ সালে অস্ট্রালিয়া যাওয়ার সময় জাহাজে তাঁর সঙ্গে বিখাত রাশিয়ান ব্যালে নৃত্যশিল্পী আনা পাভলোভার সাক্ষাত হয় এবং তাঁরই গ্রুপের একজন নর্তকের কাছে রুক্মিনী দেবী ব্যালে নাচ শেখা শুরু করেন। এর বেশ কিছুদিন পর, আনা পাভলোভা তাকে দেশে ফিরে প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যকলাগুলী পুনরূদ্ধারের চেষ্টা করতে বলেন। ১৯৩৩ সালে ম্যাড্রাস মিউসিক অ্যাকাডেমীর এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম “সাধির” বলে একটি প্রাচীন নৃত্য দেখেন যা দাক্ষিণাত্যের মন্দিরে দেবতার সামনে নাচা হতো। এই নাচ তাঁর এতো ভালো লাগে যে তিনি মাইলাপুর গৌরি আম্মার কাছে এই নাচ শিখতে শুরু করেন। এরপর তিনি ই কৃষ্ণ আইয়ারের সাহায্যে পান্ডালুর মীনাক্ষিসুন্দরম পিল্লাই এর কাছে পৌঁছন ও শিক্ষালাভ করেন। থিয়োসফিকাল সোসাইটির বাৎসরিক অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম নৃত্যপ্রদর্শন করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি স্বামীর সঙ্গে মিলে আদিয়ারে কলাক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে গুরুশিষ্য পরম্পরায় নৃত্যশিক্ষা দেওয়া হত। কলাক্ষেত্র বর্তমানে একটি ইউনিভার্সিটিতে পরিণত হয়েছে এবং থিরুভানিমিউরে ১০০ একর জমিতে কলাক্ষেত্রের বর্তমান ক্যাম্পাস।
তিনিই প্রথম ই কৃষ্ণআইয়ারের সহযোগিতায় “সাধির” নৃত্যের নতুন নামকরণ করেন “ভারতনাট্যম”। মূলত ভারতনাট্যম তৈরী হয় এই নৃত্যের পান্ডানালুর ঘরানার বৈশিষ্টের ওপর ভিত্তি করে। এই সময় ম্যাড্রাসে, এই প্রাচীন নৃত্যকে নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে আন্দোলন শুরু হয় এবং তিনি এর পুরোভাগে ছিলেন। ইংরেজদের মূল আপত্তি ছিল এই নাচে কামোত্তেজক ভঙ্গী বা মুদ্রাগুলি নিয়ে যেগুলি দেবদাসী নৃত্যের ঐতিহ্য থেকে এসেছিল। তিনি এই নৃত্যের সংস্কার করে এই শৃঙ্গার রসাত্মক ও কামোত্তেজক ভঙ্গী ও মুদ্রা বাদ দেন বা পরিবর্তন করেন এবং অন্যান্য বিশুদ্ধ নৃত্যের ভাগ বৃদ্ধি করেন। নৃত্যের নাট্য অংশ ও অভিনয়ের মধ্যে প্রাচীন পৌরাণিক ও ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত বিভিন্ন গল্পগুলি নিয়ে আসেন। ক্রমে তিনি বাদ্যের মধ্যে দক্ষিণ ভারতীয় বেহালার ব্যবহার, আলোর ব্যবহার, মন্দিরের মূর্তির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আকর্ষণীয় রঙিন পোশাক ও গহনার ব্যবহার নিয়ে আসেন এই নাচে। তিনি নাচের কোরিওগ্রাফিতে কয়েকটি বিখ্যাত মহাকাব্য যেমন বাল্মিকীর রামায়ণ, জয়দেবের গীতগোবিন্দ, কালিদাসের রচনাসমূহ নিয়ে আসেন, যেমন সীতা স্বয়ম্ভরম, রাম বনগমনম, পাদুকা পট্টাভিষেকম, শবরী মোক্ষম, ঊষা পরিণয়ম, কুমারসম্ভবম।
পরবর্তীকালে রুক্মিনীদেবী প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসাবে রাজ্যসভার মেম্বার হন। ‘ইন্ডিয়া টুডে’ পত্রিকার প্রথম ‘১০০ জন মহিলা যাঁরা স্বাধীন ভারত গড়েছিলেন’ সেই সূচীতে রুক্মিনী দেবী অরুন্ডেল ছিলেন অন্যতমা।
এবার বলব ভারতনাট্যম এবং কুচিপুরী নৃত্যের বিখ্যাততম নাম যামিনী কৃষ্ণমূর্তির কথা। অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তোর জেলায় ১৯৪০ সালে এক পূর্ণিমার রাত্রে তাঁর জন্ম হয়। তাই প্রথমে তাঁর নামকরণ হয় যামিনী পূর্ণতিলকা অর্থাৎ চাঁদের আলোর ভ্রুতে এক পূর্নাঙ্গ তিলক। তাঁর পিতা ছিলেন সংস্কৃত পন্ডিত এবং ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁর পিতামহ উর্দু কবিতা লিখতেন। যামিনী স্কুলে যেতেন কিন্তু প্রথাগত পড়াশুনো তাঁর খুবই একঘেয়ে লাগত। এই সময় তাঁর পিতা তামিলনাড়ুতে চিদাম্বরমে বদলী হয়ে আসেন। ছয় বছরের বালিকা যামিনী নিজের মনে ঘুরে বেড়াতেন চিদাম্বরমের প্রাচীন থিল্লাই নটরাজ মন্দিরের ভিতরে। মুগ্ধ হয়ে দেখতেন দশম শতাব্দীর অপূর্ব সব গ্রানাইটের ভাস্কর্য, মন্দিরের প্রধাণ দেবতা শিবের নটরাজ মূর্তি, প্রায় দুহাজার বছরের পুরোনো মন্দিরের পিতলের বিভিন্ন দেবতার মূর্তি এবং পাথর-কেটে করা ভাস্কর্যগুলি, শুনতেন নটরাজের তান্ডব নাচের ইতিহাস, দেখতেন অপূর্ব সোনার জল করা গোপুরমগুলি, হাজার পিলারের মন্ডপম ইত্যাদি! তিনি একাগ্রভাবে লক্ষ্য করতেন মূর্তিগুলির বিচিত্র দাঁড়ানোর ভঙ্গী ও তাঁদের হাত পায়ের মুদ্রা। তিনি যেন হারিয়ে যেতেন মন্দিরের অপূর্ব ইতিহাসের গল্পে এবং সৌন্দর্যে। যামিনীর ওপরে এই মন্দিরের প্রভাব এমনভাবে পড়েছিল যে তিনি স্থির করেন সারা জীবনে নৃত্য ছাড়া আর কিছু করবেন না। তাঁর বাড়ির লোকেরা, বিশেষতঃ তাঁর মা এতে বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁরা যে নাচ পছন্দ করতেন না, এমন নয়। কিন্তু সেই সময় একটি মেয়ে শুধু নাচকে অবলম্বন করে একা বেঁচে থাকলে সমাজে সম্মান রক্ষা করা মুশকিল হত।
এই সময়ে তাঁর জীবনে দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমটি হল তাঁর পিতা শেষ পর্যন্ত তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন এবং তিনি যাতে নৃত্যের শিক্ষা পান এবং নিজেকে এই শিল্পে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, তার জন্য যা করা প্রয়োজন তা করবেন স্থির করেন। প্রথমে তিনি রুক্মিনী দেবী আরুন্ডেলের কলাক্ষেত্রে যামিনীকে নিয়ে যান। রুক্মিনী দেবী তাকে দেখেই বুঝতে পারেন যে তিনি ভবিষ্যতের এক নৃত্যাঙ্গনাকে দেখছেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাকে সেখানে স্থান দেন। কিছুদিন শেখার পর আরো উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁর তাঞ্জাভোর বালসরস্বতীর কাছে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তাঁর অতিরিক্ত ব্যস্ততার জন্য যামিনী কাঞ্চিপুরম এল্লাপ্পা পিল্লাই এবং তাঞ্জাভোর কিট্টাপ্পা পিল্লাই-এর কাছে শিখতে শুরু করেন। এল্লাপ্পা পিল্লাই তাকে নবসন্ধি নাচ যেটি দেবদাসীরা দেবতার সামনে করতেন, তাও শেখান। তাঁর পরিবার তাঁর শিক্ষার জন্য অনেক আত্মত্যাগ করেন। তাঁর বোনের শিক্ষা বন্ধ করে একসময় তার নৃত্য শিক্ষা চালিয়ে যান তাঁর পিতা। তিনি পারিবারিক সব জমিও বিক্রয় করে দেন নৃত্যশিক্ষার খরচ চালানোর জন্য। কৈশোরের শেষে এসে সতেরো বছর বয়সে যামিনী কৃষ্ণমূর্তির আরঙ্গেত্রম হয় এবং তিনি প্রথম স্টেজে নাচেন। পরবর্তীকালে তাঁর বোনের গানের গলা খুব সুন্দর হওয়ায় যামিনীর সঙ্গে স্টেজে গান গাইতেন তাঁর বোন।
তাঁর জীবনের দ্বিতীয় আশ্চর্য ঘটনা হল, নৃত্য শিক্ষা সম্পূর্ণ করে তিনি তখন বাড়ি ফিরে এসেছেন ও নানা স্থানে নৃত্য প্রদর্শন শুরু করেছেন। এমন সময় একদিন সকালে তাঁর বাড়ির সামনে রিকশ থেকে নামলেন ধুতি পরিহিত এক ভদ্রলোক। তিনি ছিলেন নৃত্য শিক্ষক ভেদান্তম লক্ষ্মীনারায়ণা শাস্ত্রী। তিনি বললেন যে একটি তেলেগুভাষী মেয়ে কেন শুধু ভারতনাট্যম নাচবে? তার অবশ্যই কুচিপুরী শেখা উচিত। যামিনী বললেন যে ভারতনাট্যম তাঁর ভালোলাগে, কিন্তু তিনি কুচিপুরীও শিখতে চান। সেই সময় কুচিপুরী নাচকে বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় নৃত্যের পর্যায়ে না ফেলে তাকে লোকনৃত্য বলা হতো, কারণ তার মধ্যে গাম্ভীর্য কম এবং তা দ্রুতগতি। অনেক তেলেগু সিনেমায় কুচিপুরী নাচ ব্যবহার হত। কিন্তু যামিনী কৃষ্ণমূর্তির মনে হয় যে তাঁর মানসিকতার সঙ্গে এই নাচ মিলে যাচ্ছে। কুচিপুরী খুবই ছন্দোময়, যেন একটি গতিময় কবিতা! তিনি কুচিপুরী শিক্ষাও শুরু করেন এবং ক্রমে তাতেও পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনি শুধু যে কৃষ্ণা জেলার কুচিপুরী গ্রাম, যেখানে এই মধ্যযুগে নৃত্যগুরু সিদ্ধেন্দ্র যোগীর হাতে এই নাচের জন্ম, সেখানে যান তাই নয়, তিনি ভেদান্ত লক্ষ্মীনারায়ণ শাস্ত্রীর কাছে দীর্ঘ শিক্ষা করেন। তিনি তাকে কুচিপুরীর প্রধাণ ভামা-কল্পম নাট্যাংশেও শিক্ষা দেন যেটি কৃষ্ণের ঈর্ষাকাতর স্ত্রী ভামার ওপর নির্মিত। এছাড়া তিনি চিন্তা কৃষ্ণমূর্তি ও পাসুমার্থি ভেনুগোপাল কৃষ্ণশর্মার কাছেও শিক্ষা করেন।  পরবর্তীকালে সত্তরের দশকে একবার রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর কুচিপুরী নৃত্য দেখে কানাডার প্রধাণমন্ত্রী পিয়ারে ট্রডাউ এতো মুগ্ধ হয়ে যান, যে প্রধাণমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বিস্মিত করে তিনি সোজা স্টেজে উঠে যান এবং যামিনীজির হাত ধরে বলেন “আপনি শুরু নেচে যান, থামবেন না দয়া করে!” এত ছিল সেই নাচের টান!
পরবর্তীকালে তিনি গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছে ওড়িশি নাচও শেখেন।
ক্রমে যামিনী কৃষ্ণমূর্তির নাম ভারতে ভারতে এবং ভারতের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি দেশে বিদেশে ঘুরে নৃত্যপ্রদর্শন শুরু করেন। পরবর্তীকালে দূরদর্শনের ন্যাশনাল প্রোগ্রামেও তিনি বহুবার নৃত্যপ্রদর্শন করেন। এ ছাড়াও নানা মন্দির উৎসব ও সমারোহে তিনি নিয়মিৎ নৃত্য প্রদর্শন করেছেন। তিনি বিভন্ন স্থানে কুচিপুরী প্রদর্শন করায় এই নাচ পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে ওঠে এবং একটি প্রধাণ শাস্ত্রীয় নৃত্যের মর্যাদা পায়। তিরুপতি তিরুমালা দেবস্থানম যামিনী কৃষ্ণমূর্তিকে আস্থানা নর্তকীর সম্মান দেন। এ ছাড়াও তিনি পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন এবং সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমী পুরস্কার পান। তিনি বলেছেন যে তিনি এমন একসময় এই নাচে আসেন যখন এই নাচকে আর কোনভাবেই ছোট করে দেখা হতো না এবং স্বাধীনতার পর রুক্মিনী দেবী আরুন্ডেলের প্রচেষ্টায় তখন এই নাচ ইতমধ্যেই সুউচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। ফলে সেই সম্মানকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে কোন বাধা ছিল না।
ভারতনাট্যমে “লিপ” অর্থাৎ “লম্ফন” অঙ্গটি তিনি বিখ্যাত করেন। বিখ্যাত নৃত্যসমালোচক পি ভি সুব্রহ্মনিয়াম বলেছেন তিনি একটি স্টেজ শোতে বাইশটি লাফ পর্যন্ত দিয়েছেন এবং প্রতিটি লাফই সুন্দর ও নির্ভুল, যা তাঁর নাচের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলত। তিনি দূরদর্শনের জন্য তেরো পার্টে নৃত্যের ওপর একটি সিরিজ করেন এবং ‘এ প্যাশন ফর ডান্স’ নামে একটি ফিচার লেখেন সমালোচকেরা যেটির উচ্চ প্রশংসা করেন।
যামিনী কৃষ্ণমূর্তি বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তিনি বলেন যা নৃত্যই তাকে পরিপূর্ণ করেছে। তাঁর আর কিছুর প্রয়োজন নেই। পরবর্তীকালে তিনি দিল্লীর হজ-খাস এ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানেই তিনি যামিনী কৃষ্ণমূর্তি স্কুল অফ মিউসিক প্রতিষ্ঠা করেন।
এরপর বলবো আরো কয়েকজন বিখ্যাত ভারতনাট্যম শিল্পীর কথা যারা নিজগুণে এই নাচকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এবং অন্যতম জনপ্রিয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে পরিণত করেছেন।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!