ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ২৮)

আলাপ
গায়ন, বাদন এবং নৃত্য এই তিনের সমাহারেই সঙ্গীত। তাই গায়নের ঘরানাগুলির শেষে এবার অল্প করে বলবো বাদনের (ইন্সট্রুমেন্ট) ঘরানাগুলির কথা এবং সঙ্গে কয়েকজন বিখ্যাত বাদনশিল্পীর কথা, যাঁদের কথা না বললে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অসম্পূর্ণ থাকে। সবশেষে নৃত্য ঘরানাগুলিকে ছুঁয়ে শেষ হবে আলাপ।
বাদনশৈলীর নিরিখে মূল দুটি ভাগ। তবলা বা পারকাশন এবং অন্যান্য সব যন্ত্র। তবলা হলো মূল হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সহায়ক যন্ত্র, তবে এটি আলাদা ভাবেও অসাধারণ একটি যন্ত্র হিসাবে বাজানো হয়। মূল দুটি বিভাগ করার কারণ তবলার সম্পর্ক তালের সঙ্গে এবং অন্যান্য সব যন্ত্রের সম্পর্ক রাগরাগিনীর সঙ্গে।
অন্যান্য যন্ত্রসমূহের মধ্যে আছে সেতার, সরোদ, বেহালা, সন্তুর, বীণা, সারেঙ্গী ইত্যাদি বিভিন্ন তারযন্ত্র, সানাই, বাঁশী ইত্যাদি ফুঁ দিয়ে হাওয়ার সাহায্যে বাজানো যন্ত্র এবং গীটার যাতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সেভাবে বাজানো হতো না, কিন্তু পরে কিছু ইম্প্রোভাইজেশনের পর বাজানো সম্ভব হয়েছে।
এই যন্ত্র ঘরানার মধ্যে আছে এটাওয়া, মাইহার, সেনিয়া, ইন্দোর(বীণকার), জয়পুর-আত্রাউলি, মেওয়াটি, লক্ষ্ণৌ-শাজাহানপুর এবং বেনারস ও বাংলার বিষ্ণুপুর। সেনিয়ার আবার তিনটি ভাগ। সেনিয়া-মাইহার, সেনিয়া-শাজাহানপুর, সেনিয়া-বাঙ্গাশ ঘরানা।
এর মধ্যে মাইহার, সেনিয়া, বীণকার, বেনারস ও লক্ষ্ণৌ ঘরানা ছুঁয়ে যেতেই হবে তাদের বিখ্যাততম শিল্পীদের জন্য। এ ছাড়া দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঘরানার বেহালা ও বীণাবাদন তো আছেই।
তবলা বা পারকাশনে মূলতঃ ছটি ঘরানা। দিল্লি, আজরারা, লক্ষ্ণৌ, বেনারস, ফারুকাবাদ ও পাঞ্জাব। এর মধ্যে চারটি ঘরানা (লক্ষ্ণৌ, বেনারস, ফারুকাবাদ ও পাঞ্জাব) কথা সংক্ষেপে বলে তাদের বিখ্যাততম দু একজন শিল্পীর কথা বলবো। অন্যান্য পারকাশন যন্ত্র যেমন পাখোয়াজ, মৃদঙ্গম, ঘটম ইত্যাদি সবই তবলার অনুসারী তাই সেগুলি আর আলাদাভাবে বলা সম্ভব হবে না।
প্রথমে শুরু করছি বিখ্যাততম যন্ত্রঘরানা মাইহারকে দিয়ে। এই ঘরানার শিল্পীদের কথা বললেই বোঝা যাবে কেন এই ঘরানার উল্লেখ প্রথমেই করতেই হবে। এই ঘরানার পিতা হলেন উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব। ঘরানার শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন পন্ডিত রবিশংকর, নিখিল ব্যানার্জী, বিদুষী অন্নপূর্ণাজী সেতারে, সরোদে উস্তাদ আলি আকবর খান। এই কটি নামই ঘরানাকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। আছেন এমনি আরো অনেক শিল্পী যারা এই ঘরানার আশীর্বাদে ধন্য।
মধ্যপ্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রিকূট পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট মাইহার। একে শহর না বলে গঞ্জ বলা যেতে পারে। ত্রিকূট পাহাড়ের চূড়ায় আছে ৫২ শক্তিপীঠের একটি এবং সারদা মায়ের মন্দির। ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব নিজেই ছিলেন এক প্রতিষ্ঠান। তাঁর কথা অল্প করে না বললে মাইহারের কথা শুরুই করা যাবে না। অধুনা বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবেড়িয়ায় ১৮৬২ সালে আলাউদ্দীন খাঁর জন্ম। তাঁকে রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক বলা যায়। তাঁর দাদা ফকির আফতাবউদ্দীনের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন আলাউদ্দীন। কিন্তু মাত্র দশ বছর বয়সে অজানার সন্ধানে ঘর ছেড়ে তৎকালীন ব্রিটিশ রাজধানী শহর কলকাতায় পালিয়ে আসেন। সেখানে ডক্টর কেদারনাথ বলে এক ডাক্তারবাবুর বাড়ি আশ্রয় পান তিনি। সঙ্গীতে তাঁর অসম্ভব আগ্রহ দেখে তাঁকে গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য বা নুলো গোপালের কাছে তাঁকে পাঠান ডাক্তারবাবু। তাঁর কাছে দীর্ঘ বারো বছর কন্ঠসঙ্গীত চর্চা করেন আলাউদ্দীন। কিন্তু তাঁর প্রবল আগ্রহ নানা ধরণের যন্ত্রের প্রতি। তাই নুলো গোপালের মৃত্যুর পর তিনি স্বল্প সময়ের জন্য যাত্রাদলে যোগ দেন এবং সেখানে পালার শুরুতে যে সব যন্ত্র বাজানো হতো যেমন সেতার, বাঁশী, পিকোলো, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জো ইত্যাদি শিখে নেন। এরপর তিনি স্টার থিয়েটারে অমৃতলাল দত্তের সান্নিধ্যে আসেন এবং সেখানে হাজারী ওস্তাদের কাছে সানাই, টিকারা জগঝম্প ইত্যাদিও শেখেন। পাখোয়াজ, মৃদঙ্গ, তবলা শেখেন নন্দবাবুর কাছে এবং কন্ডাক্টর রবার্ট লোবোর কাছে শেখেন পাশ্চাত্য সঙ্গীত। তাঁর অনন্য প্রতিভা আসলে এতোগুলি যন্ত্রের বাজগুলি অতি অল্প সময়ে আত্মীকরণ করতে সমর্থ হয়েছিলো। সেখান থেকে তিনি নিজস্ব বাদনশৈলী তৈরী করেছিলেন। সবশেষে তিনি আবার শাস্ত্রীয় যন্ত্রসঙ্গীত, যেমন সরোদ ও সেতার শিখতে শুরু করেন রামপুর সেনী বীণকার ঘরানার ওয়াজির খান সাহেবের কাছে। এই রামপুর ঘরানার বাজনার ওপর ভিত্তি করেই তিনি নিজস্ব বাজ তৈরী করেন।
ক্রমে তিনি মাইহারের রাজার সভায় বাদনের জন্য নিযুক্ত হন এবং মাইহারে চলে আসেন। কালক্রমে এখানেই নিজের বাড়ি তৈরী করেন। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে তাঁর আগ্রহ এবং পারদর্শিতা থেকেই তিনি এখানে মাইহার ব্যান্ড গঠন করেন। এই সময় ১৯২০ সালের দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রচুর বালক অনাথ হয়। তাদের জন্য এবং তাদের নিয়েই বিভিন্ন যন্ত্রের সমন্বয়ে অনাথ বালকদের সঙ্গীতশিক্ষার জন্য একটি অর্কেস্ট্রা তৈরী করেন আলাউদ্দীন। ১৯৩৫ সালে এই ব্যান্ড নিয়ে তিনি বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শংকরের দলের সঙ্গে ইউরোপ সফরে যান। উদয়শংকর ভারতে ফিরে আসার পর আলমোরায় কিছুদিনের জন্য তাঁর ইন্সটিটিউটে যোগদান করেন আলাউদ্দীন। এরপর মাইহারে ফিরে এসে তিনি সঙ্গীত শিক্ষাদানে উৎসর্গীকৃত করেন নিজেকে।
মাইহার ঘরানা সম্বন্ধে আর কিছু বলার আগে সেতার এবং সরোদের বাজ সম্বন্ধে মূল দু চার কথা না বললেই নয়। কারণ এই দুটি যন্ত্রই মূলতঃ শিক্ষা দিতেন আলাউদ্দীন এবং তার টানেই মাইহারের মতো প্রত্যন্ত স্থানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো ভারত জুড়ে এবং বিখ্যাতএবং বিখ্যাত ছাত্ররা জড়ো হয়েছিলেন সেখানে।
সেতার যন্ত্রটি তৈরী করেন আমীর খসরু। তখন সেতার ছিলো একটি ত্রিতন্ত্রী যন্ত্র, যাতে মূল তিনটি তার ছিলো। এরপর তানসেনের বংশধর মসীদ খান সেতারে আরো দুটি তার জুড়ে পাঁচতারের যন্ত্র বানান ও সেতারে বাজানোর জন্য এক বিশেষ ধরণের গৎ তৈরী করেন। সেই অনুসারেই এই ধরণের বাজের নাম হয় মসীদখানি বাজ।
সেতার যন্ত্রটিতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রাগরাগিনীগুলি বাজানো শুরু হয় অতি ঢিমে লয়ে আলাপ দিয়ে, তারপর আলাপ ও ঝালার মধ্যবর্তী জোড় বাজানো হয় ও এরপর ঝালা বাজিয়ে প্রথম অংশ শেষ হয়। এতে রাগের বিকাশ এবং বাঢ়হত দেখানো হয়। এরপর শুরু হয় বিভিন্ন গৎ, তবলার তাল ও লয়ের খেলা খেলতে খেলতে। গৎ একটি দ্রুত খেয়াল বন্দিশের মতো। মুখড়াটি বাজিয়ে নানা ছন্দে লয়কারী, তানকারী করে আবার মুখড়ায় ফেরা হয়। ক্রমে বাড়তে থাকে লয় ও শেষে অতি দ্রুত গৎ ঝালা দিয়ে শেষ হয় বাদন।
মসীদখানি গৎ ও বাজ ছাড়াও সেতারে মসীদ খানের বংশধর গোলামরেজা খান নিয়ে আসেন রেজাখানি গৎ ও বাজ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ওস্তাদ ইমদাদ খান নিয়ে আসেন ইমদাদখানী গৎ ও বাজ। ক্রমে সেতারে মূল পাঁচটি তার ছাড়াও চিকারীর তার ব্যবহার শুরু হয়। ব্যবহার হতে থাকে তরফদার সেতার, যেখানে একটি লাউ ছাড়াও ওপরের দিকে একটি তম্বুরা বা লাউ ব্যবহারে যন্ত্রে অন্য ধরণের আওয়াজ আনা হয়।
এবার আসি মাইহার ঘরানার কথায়। যেহেতু আলাউদ্দীন খাঁর শিক্ষা রামপুর সেনী বীণকার ঘরানার ওয়াজির খান সাহেবের কাছে, তাই মূলত রামপুর ঘরানার বাদনশৈলী অবলম্বনেই মাইহার ঘরানার সৃষ্টি হয়েছে। রামপুর ঘরানার বিলম্বিত লয়ের গৎ, মসিদখানী গৎ এবং দ্রুৎ লয়ের গৎ রাজাখানী গৎ হতেই এই মাইহার ঘরানার সাঙ্গীতিক রূপ বা ধরন গ্রহণ করা হয়েছে। মাইহার ঘরানার সাঙ্গীতিক সৃজনশীলতা এবং এর সৌন্দর্য কৌশল চূড়ান্ত বিকশিত হয়েছিল বাবা আচার্য আলাউদ্দীন খান সাহেবের হাতে। রামপুর ঘরানার সঙ্গীতই শিখিয়েছেন আচার্য আলাউদ্দিন খান সাহেব, তবে তাতে তাঁর যন্ত্র সঙ্গীতের নিজস্ব খেয়াল অঙ্গের প্রাধান্য বজায় থাকতো। তাই মাইহার ঘরানার বাজকে খেয়াল অঙ্গের বাজ বলা হয় আর সেখানেই তার আকর্ষণ। সাধারণ মানুষ অনেক সহজে বুঝতে পারে এই বাজ। মাথায় গুণগুণ করে ওঠে চেনা জানা বিভিন্ন গানের সুর। এই খেয়াল অঙ্গের বাজ নিয়েই আলাউদ্দীন খান শেখাতে শুরু করেন তার পুত্র, কন্যা ও শিষ্যদের। পুত্র আলাউদ্দীনকে হাতে দিলেন সরোদ, মেয়ে অন্নপূর্ণা দেবী শিখলেন সেতার। একে একে জড়ো হলেন রবিশংকর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল ঘোষের মতো বহু ছাত্র।
আলাউদ্দীন খান ছিলেন যাকে বলে অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ কঠোর সঙ্গীত গুরু। অনেক গল্প প্রচলিত আছে তার কঠিন শিক্ষাপদ্ধতি এবং মেজাজ নিয়ে। সামনের পর্বে মাইহার ঘরানায় তাঁর অনন্য শিক্ষাদান ও তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কথা।