ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ২৬)

আলাপ
যেমন হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয়সঙ্গীত, তেমনই কর্ণাটকী শাস্ত্রীয়সঙ্গীত একটি সমুদ্র। অসংখ্য নামী শিল্পী এই সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। সে এক অন্যই জগত, যার সম্পর্কে আমরা উত্তরভারতীয় মানুষরা অতোটা অবহিত নই। কিন্তু কয়েকজন শিল্পী দেশকালের গন্ডী ছাড়িয়ে শুধু ভারতবিখ্যাত হয়েছেন এমন নয়, পৃথিবীবিখ্যাত হয়েছেন। আলাপের পাতায় উঠে আসবেন এমনি দু একজন শিল্পী যাদের গান আমাদের কানেও তেমনই মধুবর্ষণ করে, যেমন দক্ষিণভারতীয় মানুষের কানে করে। ভাষা বা গায়কী তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আমার বাবার বিশাল রেকর্ড ক্যাসেটের ভান্ডারে, বেশ ছোটবেলাতেই শুনেছিলাম একটি ভজনের ক্যাসেট, যার প্রতিটি গান শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তার গুঞ্জরণ থামার নয়। সুরের কায়দা ও গায়ন দক্ষিণভারতীয় কিন্তু তাতেও মীরার ভজন হয়ে উঠেছে অপরূপ, শুধু কন্ঠের গুণে – “মেরে তো গিরিধার গোপাল দুসরো না কোঈ”। বারবার ঘুরে আসছে এই লাইনটি নানা সুরের পরিবর্তনে, ঠিক যেন নিরাভল গাওয়া হচ্ছে আর মাথার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে লাইনদুটি। সুতীব্র মিষ্টি গলা যা মূহূর্তে তারসপ্তক চিরে চলে যাচ্ছে প্রাণের গভীরে। সেই প্রথম এম এস সুব্বুলক্ষ্মীকে শোনা। আজ তাঁরই জীবন ও গানের কথা।
এম এস সুব্বুলক্ষ্মী, যিনি এম এস হিসেবেই বিখ্যাত ছিলেন সঙ্গীত জগতে, তিনি এমন একটা সময়ে জলন্ত নারীবাদের উদাহরণ হয়ে থেকেছেন এবং নিজের শর্তে বেঁচেছেন ও বিখ্যাত হয়েছেন, যার উদাহরণ সেই বিংশ শতকের শুরুতে ছিলই না। প্রথম মহিলা শাস্ত্রীয়সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে নিজেকে তিনি এমন এক উচ্চ আসনে নিয়ে গেছেন যে তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন পন্ডিত নেহেরু থেকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন সবাই। যখন মহিলা শিল্পীরা কোন বড়ো সঙ্গীতের আসরে প্রকাশ্যে গান গাওয়ার অনুমতি পেতেন না, তখন তিনি বিদেশের বিখ্যাত সব হলে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন! প্রথম মহিলা সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে ভারতরত্ন এবং র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার, যা এশিয়ার নোবেল পাওয়ার সমতুল্য তা তিনি লাভ করেন, প্রধাণতঃ কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে! সুতরাং অবশ্যই জানবার ইচ্ছা হয়, কী করে তিনি এই উচ্চস্থান লাভ করলেন এবং তাঁর জীবন ও সঙ্গীতসাধনা বিষয়ে। সত্যি কথা বলতে গেলে, তাঁর সম্বন্ধে তামিল তেলেগু কন্নড় ভাষায় অজস্র এবং এ ছাড়াও ইংরাজীতে অন্ততঃ সাত আটটি বেস্টসেলার বই রচিত হয়েছে। সুতরাং তাঁর জীবন ও সঙ্গীতসাধনার কথা ভালোভাবেই লিপিবদ্ধ আছে। সেই বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে অল্প কিছু কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১৯১৬ সালে মাদ্রাস প্রেসিডেন্সির মাদুরাইতে, মাদুরাই সম্মুখভাদিভু সুব্বুলক্ষ্মীর জন্ম হয়। পিতার নাম সুব্রহ্মনিয়াম আইয়ার এবং মা বীণাবাদিকা সম্মুখভাদিভের আম্মাল। ঠাকুমা আক্কাম্মালও ছিলেন বেহালা শিল্পী। তাঁর মা ছিলেন দেবদাসী সম্প্রদায়ের। এই সম্প্রদায়ের মহিলারা সেই যুগে দক্ষিণভারতীয় বিভিন্ন মন্দিরে নৃত্য গীত পরিবেশনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বলা হতো তাঁরা দেবতার সঙ্গেই বিবাহিত। তাই তাদের সামাজিক বিবাহ হতো না। অনেকেই উচ্চবর্ণের মানুষের, বিশেষতঃ ব্রাহ্মণদের আশ্রয়ে বাস করতেন। সুব্বুলক্ষ্মীর মাও তেমনই ব্রাহ্মণ সুব্রহ্মণিয়াম আইয়ারের আশ্রয়ে থাকতেন। বাড়িতে সঙ্গীতের পরিবেশ ছিলো এবং তাঁর মা খুব ছোটবেলা থেকেই তাঁকে সঙ্গীতশিক্ষা দিতে শুরু করেন। পরে সেম্মানগুড্ডি শ্রীনিবাস আইয়ারের কাছে কর্ণাটকী এবং শ্রী নারায়ণ রাও ভ্যাসের কাছে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয়সঙ্গীত শিক্ষা করেন।
মাত্র এগারো বছর বয়সে তিরুচিরাপল্লীতে বিখ্যাত একশো পিলারযুক্ত রকফোর্ড মন্দিরে গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয় সুব্বুলক্ষ্মীর। সাধারণতঃ এই সঙ্গীতসভায় কোন মহিলা প্রধাণ আসন পেতেন না। কিন্তু এই ছোট্ট মেয়েটিকে উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্যোগে আমন্ত্রণ করেন প্রধাণ শিল্পী হিসাবে, এমনি সম্মোহক ছিলো তাঁর সঙ্গীত। এরপর মাত্র তেরো বছর বয়সে মাদ্রাজ সঙ্গীত আকাদেমীতে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাঁর অপূর্ব ভজন শুনে সেদিন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছিলেন শ্রোতৃবর্গ। তাঁর গান শুনে বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে আকাদেমী এরপর প্রত্যেক বছর তাঁর গানের আয়োজন করেন এবং সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মনে রাখার মতো সঙ্গীত পরিবেশন করেন সেখানে।
এই সময় তাঁর মা সম্মুখভাদিভেল আম্মাল তাঁর বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁর ধারণা ছিলো তাঁর সুন্দরী মেয়ের জন্য অত্যন্ত ধনী উচ্চবর্ণের পরিবারের ছেলের সম্বন্ধ করতে হবে। তিনি রাজা জমিদার ঘরে পাত্রের সন্ধান করতে শুরু করেন। অবশেষে অত্যন্ত ধনী উচ্চবর্ণের চেট্টিনাড পরিবারের একটি ছেলের আশ্রয়ে মেয়ে থাকবে এমনি ব্যবস্থা পাকা করেন। এই ব্যবস্থা সুব্বুলক্ষ্মীর একেবারেই মনপুঃত হয়নি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আত্মসম্মানী ও স্বাধীনচেতা। যে তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গীতকে ভালোবাসবে, সে যদি অতি সাধারণ হয়, তবুও তাকেই তিনি বিবাহ করবেন, এই ছিলো তাঁর মনোকামনা। তিনি তাঁর মায়ের দেওয়া সব গয়নাগাঁটি খুলে রেখে এক রাত্রে একা ঘর ছাড়লেন এবং রাত্রের ট্রেন ধরে সোজা মাদ্রাজে এলেন।
সেখানে সুব্বুলক্ষ্মী মাত্র দুজন মানুষকে চিনতেন। তাঁরা হলেন খদ্দর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক কংগ্রেস নেতা এবং সদাশিভম বলে এক ভদ্রলোক, যিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুব্বুলক্ষ্মী স্টেশন থেকে একটি ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা করে প্রথম ভদ্রলোকের বাড়ি গিয়ে নামলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র কুড়ি বছর। ভদ্রলোক বিবাহিত। তাঁর ছেলেমেয়ে আছে। হঠাত একটি কুড়ি বছরের উভিন্নযৌবনা সুন্দরী সাত সকালে তাঁর কাছে এসে আশ্রয় চাইলে তাই নিয়ে কতখানি চর্চা শুরু হবে সেই যুগে এবং তাঁর স্ত্রী কী বলবেন ভেবে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে সেই ভদ্রলোক সুব্বুলক্ষ্মীকে বাড়িতে না ঢুকিয়ে, সেই টাঙ্গা করেই তাঁকে সদাশিভমের বাড়ি নিয়ে গেলেন। সদাশিভম বাড়িতে একা ছিলেন। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি সর্বদা পরোপকার করার জন্য প্রস্তুত থাকতেন। তাঁর পুরো নাম ত্যাগরাজা সদাশিবম। তিনি ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী, সাংবাদিক, গায়ক এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক। কল্কি কৃষ্ণমুর্তির সঙ্গে মিলে তিনি কল্কি বলে একটি কাগজ প্রকাশ করতেন। তিনি কোন কিছু না ভেবে সুব্বুলক্ষ্মীকে আশ্রয় দেন। তাঁর বাড়িতেই সুব্বুলক্ষ্মী থাকতে শুরু করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গীত সাধনায় কোন বাধা আসেনি। বরং সদাশিবম তাঁকে সর্বতোভাবে সাহায্য করতেন। এরপর তাঁর
প্রযোজনায় যখন একটি চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা হয়, যার নাম সেবাসদনম, তখন তিনি পরিচালককে বলেন এর প্রধাণ চরিত্রে সুব্বুলক্ষ্মীকে নিতে। সেটিই ছিলো ছায়াছবিতে তাঁর প্রথম কাজ। সিনেমাতে তাঁর গান সবার পছন্দ হয়।
এদিকে সম্মুখভাদিভেল আম্মাল বুঝতে পারেন যে তাঁর মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে মাদ্রাজে কোথাও আশ্রয় নিয়েছে। তিনি তাঁর ছেলেকে মাদ্রাজ পাঠান বোনের খোঁজ নিতে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করে সদাশিবমের বাড়িতে তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়। তাঁর ভাই তাঁকে ফেরত নিয়ে যাওয়ার জন্য খুব জোরাজুরি করতে শুরু করেন। কিন্তু সদাশিবমও তাঁকে ছাড়তে রাজী নন। এদিকে সদাশিবম বিবাহিত ছিলেন। তাঁর দুটি সন্তান। ছোটটির জন্মের পর তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে বাপের বাড়িতে ছিলেন। তিনি এই সংবাদ পেয়ে ফিরে আসার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। বেশ সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু সুব্বুলক্ষ্মী তাঁর নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়লেন না এবং মাদুরাই ফেরত এলেন না। কোনভাবেই সেই চেট্টিনাড় ছেলেটির সঙ্গে থাকতে রাজী হলেন না। সদাশিবের মতো মানুষের সাহায্য পেয়ে এবং বন্ধুত্ব পেয়ে তিনি তখন পরিপূর্ণ। এর চার বছর পর সদাশিবম এর স্ত্রীর মৃত্যু হলে তাঁরা বিবাহ করেন।
সঙ্গীতজগতে তখন তিনি এক নক্ষত্র। তিনি লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, কানাডা, চীন, জাপানে ভারতীয় সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের প্রতিনিধি হিসাবে ঘুরে ঘুরে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। কার্নেগী হল, ইউ এন জেনারেল আসেম্বলি, রয়াল আলবার্ট হল ইত্যাদি অত্যন্ত সম্মানীয় উঁচু দরের হলগুলিতে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়ায় ১৯৮৭ সালে মস্কোতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
১৯৬৯ সালে তিনি রামেশ্বরমের সব মন্দিরগুলিতে ভারতীয় রেলের সঙ্গে পরিভ্রমণ করে ৩৬ টি স্থানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাঁর পরিবেশিত অসাধারণ ভজন গান্ধিজি থেকে পন্ডিত নেহেরু সবাইকে মুগ্ধ করে এবং ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর দিল্লীতে রাষ্ট্রপতি ভবন এবং বড় বড় বেশ কটি হলে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তিনি তখন শুধু আর কর্নাটকী সঙ্গীতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও ভজনও সমান দক্ষতার সঙ্গে পরিবেশন করেন।
তিনি শকুন্তলা, মীরাবাঈ বলে আরো কটি সিনেমা করেন, যেগুলিতে তিনি নামভূমিকায় অভিনয় করেন। মীরাবাঈ সিনেমার ভজনগুলি খুব বিখ্যাত হয়। কিন্তু সঙ্গীতসাধনায় বাধা পড়ছিলো বলে তিনি এরপর আর সিনেমা করেননি।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রে যতগুলি সম্মান হতে পারে সবই পান সুব্বুলক্ষ্মী । পদ্মভূষণ, সঙ্গীত নাটক আকাদেমী পুরস্কার, কালিদাস সম্মান, পদ্মবিভূষণ, র্যামন ম্যাগসেসে এবং ভারতরত্নে ভূষিত এম এস সুব্বুলক্ষ্মীকে কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রানী বলা হয়। তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি লোকসমক্ষে সঙ্গীত পরিবেশন বন্ধ করে দেন। ২০০৪ সালে এই প্রণম্য শিল্পীর মৃত্যু হয়।