T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় ত্বমেকা ঘোষ

মাতৃরূপেণ

– “এভাবে আর চলতে পারেনা অর্ণব , ইটস টু মাচ “, সকাল সকাল পারমিতার মুখে বর্ষার কালো মেঘ দেখে ভয় পেলো অর্ণব | এমনটা অবশ্য আজকাল প্রায়ই হচ্ছে | প্রেমিকাকে পৃথিবীর সব সুখ দেবার সংকল্প করে মাথায় সিঁদুর তুলে দিয়েছিল সে | কিন্তু এখন পারমিতার অসন্তোষ যেন তার ব্যর্থতাকেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় | সব অসন্তোষের মূলে অবশ্য একজনই | তবুও অর্ণব জিজ্ঞাসা করে —

— ” আবার কি হল ?”

–” কি আবার হবে ? তোমার মা , আবার বিছানা  মেঝে একাকার করে বসে আছেন | ”

— ” কেন ? আয়া বেডপ্যান দেয়নি ?”

— ” আয়ার কি দোষ ? উনি তো কদিন আগে অব্দি গতরটুকু নাড়িয়ে বাথরুম যেতে পারতেন , এখন তো সুখের দশা ধরেছে , সেটুকু কষ্টও আর করছেন না | তা মুখে তো আর প্যারালাইসিস হয়নি , চাইতে পারতেন তো জিনিসটা |”

— “মা বুঝতে পারেনি হয়তো ”

— ” যথেষ্ট হয়েছে , আর নিজের মায়ের দোষ ঢাকার চেষ্টা কোরো না | কুঁড়ে মহিলা একটা , আবার নাকি জয়েন্ট ফ্যামিলির বড় বৌ ছিলেন , সব একা হাতে সামলাতেন , কেমন সামলাতেন জানিনা কিন্তু এখন আমার সংসার একদম বেসামাল করে দিচ্ছেন | একটা স্ট্রোকের ধাক্কা সামলাতে দিনরাত আয়ার সেবা নিচ্ছেন আর ছেলের টাকা ধ্বংস করছেন |” পারোমিতার গলা যেন কারোর কান অব্দি পৌঁছানোর জন্য উচ্চ থেকে উচ্চতর হয় | অর্ণবের লজ্জা করে | যদিও তাঁর প্রতি পারমিতার মনোভাব মায়ের অজানা নয় , তবুও সে মিনতি করে বলে —

— ” ওভাবে বোলোনা মিতা ..”

— ” তো কিভাবে বলব ? আমি বিরক্ত হয়ে গেলাম ,প্রায় দশ বছর প্রেমের পর বিয়ে আমাদের | তোমার চাকরি হচ্ছিলো না  বলে বাবা আমার অন্যত্র বিয়ে প্রায় ঠিক করেই ফেলেছিল , ওহ , কি টেনশনটাই না গেছে সেই সময়ে | তারপর যখন এই আই টির চাকরিটা পাওয়ার পর আমার বাবা মা রাজি হল , বেঁকে বসলেন তোমার বাবা | মেয়ে ব্রাহ্মণ , এমনকি উচ্চ কায়স্থও নয় ! নিচু জাতের মেয়ে তোমাদের  বনেদি মুখার্জি বাড়ির বৌ হবার যোগ্য নয় | হুঁ , যতসব ব্যাকডেটেড আইডিয়া , আনকালচার্ড লোকজন |”

—” সেদিন কিন্তু মা ই বাবাকে রাজি করিয়েছিল মিতা | মা কোনোদিন এসব গোঁড়ামি মানেনি , তাই আমাকেও শেখায়নি | মা সেদিন বারবার বাবাকে বলেছিল আমি কিসে ভালো থাকব তা ভাবতে | মায়ের জোরাজুরিতেই শেষ পর্যন্ত বাবা …..”

— ” উনি অত্যন্ত দূরদর্শী মহিলা , বুঝলে ? আমার ছবি দেখেই বুঝে গিয়েছিলেন বয়সকালে এর ঘাড়ে চেপে বসা যাবে | ভবানীপুরে তোমাদের ওই রাবনের গুষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে বাপি এতো ভালো একটা জায়গায় শখ করে কিনে দিল ফ্ল্যাটটা , কমাস যেতে না যেতেই তোমার বাবা পটলডাঙার টিকিট কাটলেন আর উনি স্ট্রোকে প্যারালাইসড হয়ে আমার ঘাড়ে এসে চাপলেন | আমার এতো সাধের ফ্ল্যাট , সেটা নোংরা হচ্ছে , ছুটিতে যে কোথাও ট্যুরে যাব , তা ওনাকে ফেলে যাওয়ার উপায় নেই , আমাদের তো একটা লাইফ আছে নাকি , এই তো মাত্র দুবছর হল বিয়ে হয়েছে , এরই মধ্যে ওনার কারণে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে |বাপি মা ইউ এস এ তে দাদার কাছ থেকে ফিরে এসে যখন শুনবে আমি নিজের শখ আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়ে শাশুড়ির ঝি হয়েছি , ওঁরা তোমার সম্পর্কে কি ভাববে বুঝতে পারছো ?”

— ” কি করব বল ” , অসহায়ভাবে বলে অর্ণব |

— ” বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে , হ্যা ,যত তাড়াতাড়ি সম্ভব  ওনাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে | আমি এখুনি নেট ঘেঁটে আমাদের বাজেটের মধ্যে কতগুলো বৃদ্ধাশ্রম খুঁজে বার করছি , তুমি কথা বলে ব্যবস্থা কর | পুজোর আর মাত্র দু সপ্তাহ বাকি , এর মধ্যেই ওনাকে পাঠাও , আমি লোক লাগিয়ে বাড়িটা পরিষ্কার করাবো | আমার বন্ধু ললিতা , ইউ এস এ তেই থাকে , অনেক বছর পর এবার কলকাতার পুজো দেখতে আসছে | আমার কাছে এসে একদিন থাকবে বলেছে , ওর জন্য মায়ের ঘরটাই লাগবে আমার , ব্যবস্থা কর |”

–” কিন্তু অসুস্থ মানুষটাকে কিভাবে …আমি একমাত্র ছেলে আমার তো একটা দায়িত্ব আছে নাকি ”

— ” ও আচ্ছা , নিজের মায়ের প্রতিই তোমার যত দায়িত্ব , বৌকে ভালো রাখার কোন দায়িত্ব নেই | আর আমি তো তোমাকে দায়িত্ব পালন করতে বারণ করিনি ! টাকা দিয়ে দায়িত্ব পালন করবে | ওরা যা চাইবে তার থেকে একটু বেশি দিয়ে দেবে , ওরা তোমার মাকে মাথায় করে নাচবে |”

— ” ঠিক আছে , অফিস থেকে ফিরে দেখছি | এখন বেরোচ্ছি | …..ফ্ল্যাটের দরজার মুখেই থমকে যায় অর্ণব |

— ” আরে রাজদীপ , তুমি আবার উঠে এলে কেন ? আমি তো যাচ্ছিলাম …”

— ” আসলে স্যার , আমি বলতে এসেছি , আজ আর কাল আপনাকে মদন বলে অন্য একটি ছেলে অফিস নিয়ে যাবে | ও নিচে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে | আমি অফিস থেকে ছুটি নিচ্ছি | ”

–” ও আচ্ছা , কোথাও যাচ্ছ ? ”

— ” না স্যার , আমার মায়ের , ক্ষেতে কাজ করতে করতে একটা পায়ে কেমন ঘা হয়ে গিয়েছিল | কদিন আগে অপারেশন করিয়েছি মেডিকেলে , পা টা বাদ গেছে | ওরা এখনো হাসপাতালেই থাকতে বলছে কদিন , কিন্তু মা বাড়ি আসবে বলে কান্নাকাটি করছে | তাই আজ ডাক্তারের সাথে কথা বলে রাখবো , কাল আমি আর আমার বৌ গিয়ে মা কে বাড়ি নিয়ে আসবো  | পুজো এসে গেছে , প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে মা দুগ্গা আসছেন , আর আমার বাড়িতে মা না থাকলে মানায় বলুন ?”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।