ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ১০)

তীর্থভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম
মহারাজা বিজয় সেন স্বয়ং সদাশিবের অনুরাগী হলেও দেওপাড়া লিপিতে প্রদ্যুম্নেশ্বর শিব ও বিষ্ণুর অধিষ্ঠিরের কথা বর্ণিত আছে। নয় পালের রাজত্বকালে মূর্তি শিবের বাণগড় প্রশস্তিতে ( খ্রিস্টীয় ১১শ শতক) লিপিবদ্ধ হয়েছে, ভক্তিপূর্ণ শিবপূজক মহীপাল মত্ত ময়ূর উপাসক মন্ডলীর জনৈক ইন্দ্রশিবকে অষ্ট কুলাচল সাদৃশ্য যুক্ত মন্দির সহ এক মঠ দান করেছিলেন। প্রখ্যাত মন্দির গবেষক তারাপদ সাঁতরা মহাশয় বলভীশৈলীর ( চিলেঘরের অনুরূপ আকৃতি বিশিষ্ট) উল্লেখ করেছেন। বলভি রীতির মন্দিরগুলি শাক্তদেবী বা মাতৃকা দেবীর আরাধনার জন্য নির্দিষ্ট হয়েছিল।
বলভি মন্দিরের ভূমি নকশা আয়তকার এবং অর্ধ গোলাকৃতির ছাদ দ্বারা আচ্ছাদিত হতো।
প্রাচীনকালে মন্দির নির্মাণ এর আগে অনেক সময় প্রস্তাবিত মন্দিরের একটি অনুকৃতি গঠন করার রীতি ছিল। মূল মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও তার সন্নিকটবর্তী স্থানে প্রাপ্ত নিবেদন মন্দির মূল মন্দিরের গঠন রীতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
রাঢ়ের হিন্দু স্থাপত্য কীর্তির আলোচনা প্রসঙ্গে
বৌদ্ধ স্থাপত্য কীর্তি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যেতে পারে। মন্দির বা বস্তিতে মূর্তি প্রতিষ্ঠা ব্যতীত জৈন স্থাপত্যের সঙ্গে হিন্দু স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ করে মৌলিক পার্থক্য নেই।
তবে বৌদ্ধ শিল্পকলার বিশেষ কোনো নিদর্শন না পাওয়া গেলেও বিদেশীদের বিবরণ, বৌদ্ধ ধর্ম শাস্ত্র, সাহিত্য ও আবিষ্কৃত মূর্তি থেকে বৌদ্ধ স্থাপত্য শিল্পকলা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়। তবে বিংশ শতকের শেষ ভাগে ভরতপুর ও প্রাচীন কর্ণসুবর্ণ মহানগরী উৎখরণের ফলে দুটি বৌদ্ধস্তূপের আবরণ উদ্বোধিত হওয়ায় বহু কৌতুহল ও সন্দেহের নিরসন হয়েছে।
হিউয়েন সাং তাম্রলিপ্ত নগর বন্দরে দশটি বৌদ্ধ সংঘারাম ও সম্রাট অশোকের নির্মিত একটি স্তূপের কথা উল্লেখ করেছেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পান্ডুলিপিতে রাঢ়ে ধর্মরাজিকা চৈত্যের চিত্র অঙ্কিত আছে এবং সম্ভবত ওই চৈত্য উত্তর রাঢ়ে অবস্থিত ছিল।
স্থান নামের সঙ্গে সঙ্গে ‘ধর্মরাজিকা’ শব্দ যুক্ত থাকায় অনেকেই অনুমান করেন যে,ওটি ধর্মরাজ অশোকের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। আবার অনেকের মতে ওটা আদি মধ্যযুগে নির্মিত হয়েছিল; কিন্তু প্রজ্ঞা পারমিতা রচনার পূর্বে—–
‘The Dharmarajika Chaitya in Radha corresponds approximayely to the Tulakshetra stupa and consists of a basement of these traced stages ,a cylindrical drum of two stages ,a hemispherical dome,a square harmika and a conical range of chhatravali as the crowning mmber.’
রাঢ় জনপদে নির্মিত মন্দিরগুলি স্থাপত্য শৈলীর বিচারে নাগররীতির অন্তর্ভুক্ত বলে শ্রেণী বিভাজন করা হলেও এগুলোকে বিশুদ্ধ নাগর রীতির মন্দির বলা যায় না।
নগেন্দ্রনাথ বসুর মতে অতীতে ময়ূরভঞ্জ রাজ্য
রাঢ়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং অধিবাসীগণ নিজেদের রাঢ়ী বলে পরিচয় দিত। ভঞ্জ রাজবংশের পূর্বে এই অঞ্চলে মান বংশের একটি শাখা রাজত্ব করতো এবং তাঁরা মানভূম- পুরুলিয়ার রাজা উদয়মানের বংশধর ছিলেন।
এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে উদয়মানের পরিচয় বর্ণিত আছে। আবার ভঞ্জ রাজবংশের বিবাহাদি ও সামাজিক আচার ব্যবহারে বাঙ্গালীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।চকদীঘির সিংহ রায় পরিবার ও কাশিপুরের রাজবংশের সঙ্গে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের কথা জানা যায়। সম্ভবত ময়ূরভঞ্জ হতে মিশ্র স্থাপত্যশৈলী রাঢ় অঞ্চলে বিকাশ লাভ করেছিল।
আবার রাঢ় অঞ্চলে এমন কয়েকটি মন্দির আছে যেগুলির গঠন রীতিতে উত্তর ভারতীয় নাগর শৈলীর সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে। বীরভূমের
ভাণ্ডীরবন, রাজনগর থানার কবিলাসপুরে মন্দির স্থাপত্য শৈলীতে কলিঙ্গ অপেক্ষা উত্তর ভারতীয় নাগর শৈলীর বৈশিষ্ট্য অধিক।
প্রাচীনকালে পশ্চিমবঙ্গ তথা বীরভূমে নির্মিত মন্দির গুলির স্থাপত্য একটি রীতি ছিল না। বিভিন্ন শিলালেখর বিবরণ অনুযায়ী যে তিন রীতিশিষ্ট মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল সেগুলি হল রেখ বা শিখর,বলভি এবং গোলাকার দেওয়াল যুক্ত ছাদবিহীন স্থাপত্য সৌধ। বীরভূমের নানাস্থানে এই রেখ বা শিখর রীতির অনেক প্রাচীন মন্দির ধ্বংসের হাত এড়িয়ে এখনো বর্তমান থাকলেও অপর দুটি রীতির মন্দির আবিষ্কৃত হয়নি।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বেড়াচাঁপায় খনা- মিহিরের ঢিবিতে খননকার্য চালিয়ে একটি ইঁটের তৈরি মন্দিরের ভিত্তিভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি শিখর রীতির মন্দিরের সঙ্গে তুলনীয়। অনুমান করা যায়, বাংলায় শিখর মন্দির নির্মাণের প্রচেষ্টা হয়তো ওই সময় থেকে হয়েছে।
বাংলায় এই রীতিতে পরবর্তী মন্দির নির্মাণের প্রয়াস দেখা যায় খ্রিস্টীয় আট শতক থেকে। এই শিখর রীতির মন্দিরের গঠন স্থাপত্যের আলোচনায় দেখা যায়, এই রীতির মন্দিরগুলির
আচ্ছাদন চার দেওয়ালের উপর ভর করে ক্রমহ্রাসায়মান আকৃতিতে সোজা উপরের দিকে উঠে একটা নির্দিষ্ট স্থানে শেষ হয়। অন্যদিকে মন্দিরটির গর্ভ গৃহের দেওয়াল স্থাপিত হয় ইংরেজি ক্রস চিহ্নের আকার বিশিষ্ট ভূমি নকশার উপর এবং সর্বোপরি মন্দিরের মস্তকে থাকে আমলক ও কলস।
পাথর ছাড়া বাংলায় ইঁট দিয়ে মন্দির নির্মাণের ধারাবাহিকতা বেশ প্রাচীনকাল থেকেই দেখা যায়। দুর্ভাগ্য বশত বহু মন্দির ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কালের প্রভাবে কিছু মন্দির ভীষণ হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
খ্রিস্টীয় তেরো শতক বা তারও কিছু পরে পশ্চিমবাংলার পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি পাথরের শিখর মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়।
ওই শিখর মন্দিরগুলি ছাড়াও আনুমানিক খ্রিস্টীয় তের শতকে নির্মিত দু একটি পাথরের একক পীঢ়া দেউলের সন্ধান পাওয়া যায় ওড়িশার পার্শ্ববর্তী মেদিনীপুর জেলায়।
শিখর রীতির মন্দিরের আলোচনা প্রসঙ্গে, সেই রীতির মন্দিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরেকটি বৈশিষ্ট্যমূলক স্থাপত্য সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে। এটি হলো মধ্যস্থলে মূল মন্দিরের অবস্থানকে কেন্দ্র করে চতুষ্পার্শে সংযোজিত হয়েছে অলিন্দ যুক্ত বেষ্টনী।
খ্রিস্টীয় ১৩ শতকে বাংলায় যখন তুর্কি আধিপত্য শুরু হয়, তখন থেকে এই মন্দির নির্মাণ কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে।
যদিও অনুসন্ধানে দেখা যায়,রাঢ় বাংলার পশ্চিম সীমান্তের প্রান্তবর্তী এলাকায় এলাকায় এই মন্দির নির্মাণের কাজ অব্যাহত থেকেছে।
খ্রিস্টীয় ১৩ শতকের পর তুর্কি বিজেতাদের প্রায় দেড়শ বছর ধরে বাংলায় রাজ্য বিস্তারের ফলে ক্রমে ক্রমে সকালের অবিভক্ত বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সুলতানি রাষ্ট্র। এই সময়ে বাংলায় রাজত্বকালীন এই সুলতানি আমলে মুসলমানদের আঞ্চলিক সংস্কৃতির রূপরেখাটি বোঝা যায় তাদের তৈরি মসজিদ মাজার প্রকৃতি ধর্মীয় স্থাপত্যে। এই আমলে ইটের তৈরি মুসলিম সৌধ গুলির এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলায় আবহমান কালের প্রচলিত কুঁড়েঘর এর বাঁকানো চালের আদলে। অন্যদিকে সেগুলির অলংকরণ সজ্জায় অনুকরণ করা হয়েছিল পূর্ববর্তী হিন্দু মন্দিরে নিবদ্ধ পোড়ামাটির ফলকে উত্তীর্ণ ভাস্কর্যের ছাঁদে নানাবিধ নকশা।
পরবর্তীকালে মূলত খ্রিস্টীয় ১৫ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলায় নবপর্যায়ে মন্দির নির্মাণের পুনঃপ্রবর্তন শুরু হয় এবং সেই ধারাবাহিকতা বিশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত বজায় থাকে। মূলত চৈতন্য প্রভাবিত বৈষ্ণব ধর্ম আন্দোলনের জন্যই যে পুনরুজ্জীবন, অনেক মন্দির গবেষক সেই কথা স্বীকার করেন।
নবপর্যায়ে নির্মিত মন্দিরের গঠন রীতির রূপরেখা অনেকটা নির্ভর করে মন্দিরের উপরের অংশের আচ্ছাদন সংক্রান্ত নির্মাণ কৌশল এর উপর। নবপর্যায়ে নির্মিত এই মন্দির গুলোকে পাঁচটি স্থাপত্য রীতিতে ভাগ করা যায়।
সেগুলি হল,রেখ বা শিখর, ভদ্র বা পীঢ়া, চালা, রত্ন ও দালান।
তবে এগুলির মধ্যে শিখর ও পীঢ়া রীতি বহু প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় সুপ্রতিষ্ঠিত।
প্রথাগত নির্মাণ রীতি অনুসারে শিখর রীতির মন্দিরকে নিচের ভিত্তি ভূমি থেকে শীর্ষ দেশ পর্যন্ত তিনটি মূল অংশে ভাগ করা যায়,যথা বাঢ়,গণ্ডী ও মস্তক। এছাড়া এই জাতীয় মন্দিরের একটা অংশ মাটির তলায় থাকে যাকে বলে পিষ্ট বা তলপত্তন।
বাঢ় পঞ্চাঙ্গের সমষ্টি; অর্থাৎ পাভাগ,তলজাঙ্ঘ, বন্ধনা, উপর জাঙ্ঘ ও বরণ্ড।
এই শিখর মন্দিরের দ্বিতীয় ভাগ ‘গণ্ডী’ অংশটি হল সৌন্দর্যের দোতক। এই অংশটিতে স্থাপত্য অলংকরণ হিসেবে সংযোজিত হয়, অঙ্গ শিখর, চৈত্য অলিন্দ ও পুষ্প পত্রের অনুকৃতি প্রূভৃতি।
মস্তক অংশের প্রত্যঙ্গ গুলির নাম বেকি,আমলক,খপুরি,কলস ও মন্দিরে অধিষ্ঠিত দেব-দেবীর আয়ুধ চিহ্ন সহ পতাকা দণ্ড।’বেকি’
অংশটি গণ্ডির উপরিভাগের অংশে গোলাকারভাবে স্থাপিত হয় এবং এর ঠিক উপরেই আমলকি ফলের সাদৃশ্য যুক্ত গোলাকার আমলক শিলা স্থাপিত হয়। এই আমলকের উপরে বসে চ্যাপ্টা ধরনের ঘণ্টাকৃতির ‘খপুরি’ আর তার উপরে কলস এবং সর্বশেষ বসে দেব দেবীর আয়ুধ চিহ্ন সহ পতাকা দণ্ড। পশ্চিমবাংলায় বিশেষ করে বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলায় বহু জায়গাতে শিখর মন্দিরের সঙ্গে যুক্তভাবে জগমোহন হিসাবে
পীঢ়া দেউল নির্মিত হতে দেখা যায়।
খ্রিস্টীয় ১৭ শতকে প্রতিষ্ঠিত একক শিখর মন্দিরের স্থাপত্য শৈলীর মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।
এই শতকের শিখর মন্দিরের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল বীরভূম জেলার ভাণ্ডীরবনের (সিউড়ি থানা) ভাণ্ডীশ্বর শিব মন্দির(১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ), কবিলাসপুর( রাজনগর থানা) ধর্মমন্দির(১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ),মহুলা গ্রামে( থানা সিউড়ি)মউলেশ্বর শিব মন্দির,রসা গ্রামের( থানা খয়রাশোল) আদিনাথ শিব(১৬৫৪ খ্রিষ্টাব্দ) মন্দির। এর মধ্যে প্রথম মন্দিরটি ইঁটের তৈরি, বাকিগুলো পাথরের তৈরি।
বাঁকুড়া , পুরুলিয়া ও মেদিনীপুর জেলায় শিখর রীতির তৈরি অনেক মন্দির দেখা যায়।
চলবে