ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৫)

তীর্থভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম
শ্রদ্ধেয় হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের মতে,” অতি পূর্বকালে ভারতবর্ষের এক অংশ পাঁচটি ভাগে বিভক্ত ছিল– অঙ্গ, বঙ্গ ,কলিঙ্গ ,পুন্ড্র এবং
সুহ্ম।
বর্তমান ভাগলপুর অঞ্চলের পূর্ব নাম অঙ্গ। বঙ্গ– পূর্ববঙ্গ, কলিঙ্গ কটক অঞ্চল। তাহার পরের দেশ ওড্র— উড়িষ্যা।পুন্ড্র মালদহ অঞ্চলের এবং সুহ্ম রাঢ় অঞ্চলের পূর্ব নাম।পুন্ড্রের রাজধানী ছিল গৌড়। অঙ্গ ,পুন্ড্র এবং সুহ্ম পরবর্তীকালে গৌড় মন্ডল নামে অভিহিত হয়। একসময় সমগ্র বাঙ্গালা দেশ গৌড়বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। আসাম পর্যন্ত সীমা ছিল এই গৌড়বঙ্গের। উত্তর কালে কোন সময় গৌড়বঙ্গ চারিটি প্রদেশ বা ভুক্তির অন্তর্ভুক্ত হয়।পৌন্ড্রবর্ধন ভুক্তি, প্রাগ জ্যোতিষভুক্তি, বর্ধমান ভুক্তি ও দণ্ডভুক্তি— মালদহ আসাম রাঢ় অঞ্চল এবং মেদিনীপুর অঞ্চল পরে বর্ধমান ভুক্তির অর্থাৎ রাঢ়ের একাংশের নাম হয কঙ্কগ্রামভুক্তি।
গৌড় বঙ্গ পৃথক হইলেও সভ্যতা ও সংস্কৃতির যোগসূত্র উভয়ের অচ্ছেদ্য ছিল। মহাকবি কালিদাস সম্রাট রঘুকে বঙ্গ বিজেতা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। অনেকের মতে রঘুবংশের রঘুর দিগবিজয় গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয়ের রেখাচিত্র রহিয়াছে। বঙ্গের নৌসাধনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কালিদাস। পরবর্তীকালে দুই পরাক্রান্ত রাজবংশ গৌড়বঙ্গের শাসন কার্য পরিচালনা করিতেন। গৌড় মন্ডলের অধিশ্বর ছিলেন পাল রাজাগন। বর্ম রাজবংশ বহুদিন বঙ্গের শাসনকার্য পরিচালনা করিয়াছিলেন। বর্ম রাজগণের সময়ে রাঢ়ামন্ডলের সঙ্গে বঙ্গের ঘনিষ্ঠ সংযোগ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গেশ্বর হরিবর্মদেব প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল রাজত্ব করিয়াছিলেন।তাঁহার সান্ধি বিগ্রহিক ছিলেন রাঢ়ের সিদ্ধল– গ্রামীণ ভবদেব ভট্ট। শস্ত্র এবং শাস্ত্রে ইঁহার সমান পারদর্শিতা ছিল। অধিকাংশ রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণের জন্ম হইতে মরণোত্তর কর্তব্যবিধান আজিও ভবদেব সংকলিত দশকর্ম পদ্ধতি অনুসারেই” পরিচালিত হয়।”
এই ভবদেব ভট্টের পূর্বপুরুষ বর্তমান বীরভূমে প্রখ্যাত সতীপীঠ লাভপুরের অট্টহাস পীঠ স্থানের( দেবী- ফুল্লরা, ভৈরব বিশ্বেশ) পূর্ব প্রান্তে দেবীদহ নামে এক বিশাল জলাশয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই লাভপুর থেকে কিছুটা উত্তরে ভবদেবের জন্মভূমি সিদ্ধল গ্রাম, বর্তমান নাম শীতল গ্রাম এখনো বর্তমান আছে।
” ভোজ বর্মনের বেলাব তাম্রশাসনে( খ্রিস্টীয় ১১শ শতাব্দী) উত্তর রাঢ় বা রাঢ়ে সিদ্ধলগ্রামের অবস্থিতির উল্লেখ আছে।’ ভুবনেশ্বর প্রশস্তিতে’ এই সিদ্ধল গ্রামকে গ্রাম সমূহের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট, আর্যাবর্তের অলংকার স্বরূপ এবং রাঢ়দেশের সৌভাগ্য লক্ষ্মী রূপে বর্ণিত হয়েছে। লাভপুর থানার শীতল গ্রাম বা সিধলগ্রাম ই উপরোক্ত লেখামালা সমূহে উক্ত ‘ সিদ্ধলগ্রাম’ বলে অনেক পন্ডিতের ধারণা। ভবদেব ভট্টের পূর্বপুরুষ আদি দেব রাঢ়ের সিদ্ধলগ্রামে এসে বসবাস করেন, উপরোক্ত লেখ থেকে জানা যায়।
‘ ভুবনেশ্বর প্রশস্তি’ বর্তমানে ভুবনেশ্বরের অনন্ত বাসুদেব মন্দির চত্বর সংলগ্ন পশ্চিম দিকের দেওয়াল গাত্রে লাগানো আছে। পরমানন্দ আচার্য মহাশয়ের মতে এই শিলালিপি টি আদিতে নারায়ণ বা অনন্ত নারায়ণের মন্দির গাত্রে লাগানো ছিল। থেকে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে এই শিলালিপিটি স্থানান্তরিত হয়, পরবর্তীকালে ভুবনেশ্বর এর পুরোহিতগণের অনুরোধে এইটি বর্তমান স্থানে রক্ষিত হয়।( Proceedings of the Indian History Congress,Third Session,Calcutta,1939,p313) দ্রষ্টব্য।”
এই প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করতে পারি, অনেকের মতে এই অট্টহাস পীঠ বর্ধমান জেলার কেতুগ্রামে, কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত দক্ষিণ ডি অর্থাৎ ‘ দক্ষিণডিহি ‘ নামক গ্রামে। কাটোয়া থেকে আধ কিলোমিটার দূরে অজয় নদীর শাখা নদী ঈশান নদীর তীরে এই গ্রাম।
বছর ১৩ আগে এক ২৫শে ডিসেম্বর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছেছিলাম ওই স্থানে। ওই জায়গাটি বেশ পুরনো এবং এককালে বেশ জঙ্গলাকীর্ণ ছিল তা এখনো বোঝা যায়। সেদিন ওখানে উৎসব চলছিল। কলকাতা থেকে এক ধনী ভক্ত এসে মচ্ছবের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়েছিল প্রসাদ গ্রহণের জন্য।। ভিড়ের জন্য সেভাবে কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলে খোঁজখবর নিতে পারিনি। মন্দিরে দেবী দর্শন করে প্রণাম জানিয়ে চলে এসেছিলাম।
দক্ষিণ ডিহিতে দেবীর মন্দির ছোট ও পুরনো। প্রাচীন বিগ্রহ, চামুণ্ডা- মুন্ডমালিনী–৺মা কালী। স্থানীয় পূজারীরা বলেন ,দেবীর নাম অধরেশ্বরী। যেহেতু দেবীর অধর এখানে পড়েছিল। মূর্তি অস্পষ্ট। যেন রক্ত বস্ত্র আচ্ছাদিত কোন স্তূপ। এই মূর্তি কিরকম পুরোহিতদেরও ধারণা নেই। হয়তো কোন প্রাচীন মূর্তির ক্ষয়প্রাপ্ত অবস্থা। আকৃতি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিদর্শন লুপ্তপ্রায়। কিভাবে কোন কালে সংগৃহীত হয়েছিল কেউ জানে না। ওই এলাকার লোকেদের মতে তীর্থক্ষেত্র তখনই কিছু ক্ষেত্রে হয় যখন তার পাশে কোন উত্তর বাহিনী নদী থাকে। দক্ষিণ ডিহিতে সেই রকম নদী আছে, লাভপুরে নেই।
তবে অনেক পন্ডিত ব্যক্তি মনে করেন, বীরভূম জেলার লাভপুরের কাছেই এই পীঠ এবং দেবীর নাম শাস্ত্র সঙ্গত অর্থাৎ ফুল্লরা।
‘তন্ত্র চূড়ামণিতে’ যে ৫১ পীঠের উল্লেখ আছে, সেখানে ৪৯ তম পীঠ হিসেবে দেবী ফুল্লরা ও ভৈরব বিশ্বেশ এর উল্লেখ আছে।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাংলা ভাষার অভিধানে নানা বিচারের পর দেওয়া হয়েছে ৫১ পীঠের তালিকা। এখানেও কলকাতা থেকে ৫৬ ক্রোশ দূরে লাভপুরের নিকটে ফুল্লরা দেবীর অধিষ্ঠানের কথা উল্লেখিত হয়েছে।
পন্ডিত যতীনন্দন দেব শর্মন তাঁর শক্তিপীঠ গ্রন্থে বলেছেন, অট্টহাসেচোষ্ঠপাতো দেবী সা ফুল্লরা স্মৃতা ।/ বিশ্বেশো ভৈরবস্তত্র সর্বাভীষ্ট প্রদাযকাঃ।। পীঠনির্ণয়তন্ত্রে এভাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে ফুল্লরা তীর্থকে।
তাঁর মতে বীরভূম জেলার লাভপুরেই এই পীঠস্থান।
দেবীর পূজার পর দেবীর ভোগ নিয়ে ডাকলেই দ শিয়াল আসে এবং ভোগ গ্রহণ করে।
সতী পিঠের স্থানগত নির্ণয়ের প্রসঙ্গে যার অবদান সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য সেই গবেষক D.C.Sarkar মহাশয় এর মতে অট্টহাসের প্রকৃত স্থান হল বীরভূম জেলার লাভপুরে ,বর্ধমান জেলার কেতুগ্রামের কাছে নয়। বীরভূমে লাভপুরে পীঠস্থান সম্পর্কে আমরা প্রমোদ কুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় এর লেখা বিখ্যাত বই’ তন্ত্রাভিলাষীর সাধুসঙ্গ’ থেকে জানতে পারি যে, লাভপুর স্টেশনের কাছেই ‘ফুল্লরা পীঠ ‘। দেবীর ছোট পুরনো মন্দির, মন্দিরের নাট মন্দির, নাঠ মন্দিরের সামনে উপরের ছাদ দেওয়ার চাঁদনী, চাঁদনীর পর ঘাট বাঁধানো পুকুর। স্থানটির চারিদিকে শ্মশান ভূমি।
কঙ্কাল ও অস্থি চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে। রক্তবস্ত্র আচ্ছাদিত স্তূপাকৃতি মূর্তি। পুরোহিতের মতে, ঢাকা যে মূর্তি উহা বহু কাল হইতে বাহির দেখাইবার নিয়ম নাই। স্নান ও বেশের সময় দ্বার বন্ধ করিয়া লোকচক্ষুর অগোচরে বাহির করিয়া পূজা-অর্চনার পর পুনরায় ঢাকা দিতে হয়। পুরোহিত ব্যতীত সেই মূর্তি আর কেহ দেখিতে পায় না।
1910 সালে প্রকাশিত Birbhum District
Gazetteers এ L.S.S O’ MALLEY লাভপুর সম্পর্কে লিখেছেন, “The village is regarded as a pithasthan i.e one of the 52 sacred spots on which portions of Sati’s dead body fell when dismembered by the discus of Vishnu; it is said to derive its name from the fact that her lips fell here.The most noteworthy building in the village is the temple of the goddess Phullara,attached to which there is an enclosure for feeding jackals,which are regarded with veneration as animals sacred to the goddess.Before presenting rice bhog to the goddess,a portion of it is given to the jackals ,which are quite tame and advance without hesitation from the adjoining jungle,answering to the call of the name Rupi-Supi .The remainder of the food left by the jackals is taken as prasad by the Hindus.”
ভবদেব ভট্ট সম্পর্কে বলতে গিয়ে লাভপুর প্রসঙ্গে এসে পড়ায় বীরভূমের পঞ্চ সতী পীঠের অন্যতম লাভপুরের দেবী ফুল্লরা সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা এসে যাওয়াতে আমরা বীরভূম সম্পর্কে যে আলোচনা করছিলাম, সেখান থেকে একটু সরে এলেও, ফুল্লরা পীঠের কাহিনী বীরভূমের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে কিছুটা আভাস দেয়।
ডক্টর হরে কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘ গৌড়বঙ্গ সংস্কৃতি’ শীর্ষক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে,” ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিগ্বিজয়ী গৌড়বঙ্গ আক্রমণ করিয়াছেন।১০০২ খ্রিস্টাব্দে মধ্য ভারতের মহারাজা ধঙ্গ রাঢ় এবং অঙ্গদেশ আক্রমণ করিয়াছিলেন। ধঙ্গের খাজুরাহো লিপিতে লিখিত আছে তিনি রাঢ় এবং অঙ্গদেশের রাজা রানী কে বন্দী করিয়া লইয়া গিয়েছিলেন। এই সময় কে রাঢ়াধিপ ছিলেন ,কোন সুযোগে রাঢ় স্বাতন্ত্র অবলম্বন করিয়াছিল,আজও তাহা জানা যায়নি।
মহামাণ্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ রাঢ়াধীশ্বরের বংশধর বলিয়া নিজের পরিচয় দিয়াছেন।”
বিভিন্ন সময়ে বীরভূম (রাঢ় দেশ) বারবার বিভিন্ন রাজ শক্তির পদানত হয়েছে। মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব যুগের কোন এক অধ্যায় ভীমের সঙ্গে বীরভূম অঞ্চলের অনার্য অধিবাসীদের যুদ্ধ হয়েছিল। বীরভূমে ঐতিহাসিক যুদ্ধের প্রথম খবর পাওয়া যায় নবম শতকে। তখন অজয়ের তীরে ঢেকুর ছিল বীরভূমের অধীন। এখানে কর্ণ সেন নিজের নামে কর্ণগড় নামে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই কর্ণ সেনকে সিংহাসনচ্যুত করেন গোপ নায়ক ঈশ্বর ঘোষ। ঈশ্বর নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন ও গৌড়ের নৃপতি দেবপালের বশ্যতা অস্বীকার করেন। দেবপাল তার সেনাপতি লাউসেনকে পাঠান ঈশ্বরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। লাউসেন কালু বীরবংশীকে সঙ্গে নিয়ে রণযাত্রা করেন। যুদ্ধে ঈশ্বর ঘোষ পরাজিত ও নিহত হয়।
এরপর একাদশ শতকে চেদিরাজ কর্ণের সঙ্গে পাল নৃপতি নয়পালদেব ও তাঁর পুত্র তৃতীয় বিগ্রহ পাল বীরভূম অঞ্চলে যুদ্ধ করেছিলেন।
এর কিছু করার আগে কাঞ্চির রাজা মহা শৈব রাজেন্দ্র চোলের একটি সেনা দল বীরভূম অংশে এসেছিলেন এবং পাল নৃপতি প্রথম মহিপালদেব চোল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সম্ভবত উত্তর পূর্ব বীরভূমের ডবাক পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন।
চোল আক্রমণের শতবর্ষ পরে বীরভূমে যাজপুরের নৃপতি গঙ্গা বংশীয় দ্বিতীয় অনঙ্গ ভীমের মন্ত্রী বিষ্ণু বীরভূম আক্রমণ করেন এবং তৎকালীন বীরভূমের রাজা দুর্বল কেশব সেনকে রাজনগর থেকে তাড়িয়ে নগর দখল করেন।
ওই সময় গৌড়ের নবাব ছিলেন গিয়াস উদ্দিন
ইয়ুজ শাহ। তিনি যখন খবর পেলেন রাজনগর উৎকলী সৈন্যরা দখল করেছে ,তখন একটি ঘোষণা করেন। সেই ফরমানে বলা হয় ইসলাম বিপন্ন ,সুতরাং ইসলামের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এক বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে ও দ্রুত লক্ষ্নৌতি বা গৌড় থেকে নগর যাত্রা করেন। বিষ্ণু গিয়াসের সৈন্যশক্তি কত অবগত হয়ে উৎকল অভিমুখী হন।
এরপর আফগানদের অধিকার এ বীরভূম এলে কীর্নাহারের আয়মাদার কিলগির খাঁর সঙ্গে গোপরাজ কিঙ্কিন এর যুদ্ধ বাধে।
সপ্তদশ শতকে রাজস্ব না দেওয়ার অপরাধে উত্তর বীরভূমের কনকপুরে রাজা উদয়নারায়ণ মুর্শিদ কুলি খানের বিরাগ ভাজন হন। হলে মুর্শিদকুলি কনক পুর আক্রমণ করেন। কনকপুর গ্রামের পশ্চিমে রাজা ও নবাব সৈন্যের মধ্যে যুদ্ধ হয়। নিকটে জগন্নাথপুর গড়ে রাজা উদয়নারায়ণের সৈন্যরা শিবির স্থাপন করেছিলেন। রাজা উদয়নারায়ণের পক্ষে গোলাম মোঃ জান এবং লহরীমল সেনাপতিত্ব করেন। উভয় পক্ষের বহু সৈন্য হতাহত হয়। গোলাম মোহাম্মদ যুদ্ধে নিহত হন। রাজা উদয়নারায়ণের পুত্র সাহেবরা এই যুদ্ধ পরাজিত হয়ে পিতার সঙ্গে দেবীনগর পালিয়ে যান। মুর্শিদকুলি খানের সৈন্যরা কনকপুরের রাজধানী ও রাজপ্রাসাদ ধ্বংস করে।
এই সমস্ত যুদ্ধ এবং বারংবার শক্তির হাত বদলের প্রভাব পড়ে সাধারণ জনজীবনে এবং ধর্ম বিশ্বাসে।
১৮৫৮ সালের পূর্বে ঝাড়খণ্ডের দেওঘর থেকে মেদিনীপুরের তমলুক পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূমি খন্ড বীরভূমের গভীর অরণ্যের অভ্যন্তরে ছিল নানা মুনি ঋষি সাধু তপস্বী ও ধর্মপ্রবর্তকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আশ্রম, তপোবন।
বীরভূমের বেশ কিছু পল্লী জনপদে অতীতের সাধুদের বসতির প্রমাণ বিদ্যমান। এই জিলাপি আছে বিভান্ডক মুনি র স্মৃতিবিজড়িত বিভন্ডেশ্বর শিব,, বিভান্ডক পুত্র ঋষ্য শৃঙ্গের না আছে শিয়ান জনপদে। তার আশ্রম আজও ‘মুনি তলা ‘নামে খ্যাত। কিন্নাহার থেকে কিছু দূরে অরণ্যময় একটি ক্ষেত্রে মূল্যমালী তলা ছিল দত্তাত্রেয়র সাধন ভূমি। দত্তাত্রেয় ভৃগু এবং বৈশিষ্ট্য একত্রে তন্ত্র সাধনা করেছিলেন দ্বারকা নদীর তীরে তারাপুরে। দুবরাজপুরের শৈলশি রায় ছিল আরুনি উদ্যালকের আশ্রম। এর কন্যা সুনীতির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল মহর্ষি কহোড়র।কহোড়ের পুত্র অষ্টবক্র স্থাপন করেছেন বক্রেশ্বর লিঙ্গ। সন্দীপন মুনির আশ্রম ও বিদ্যামন্দির নিয়ে গড়ে উঠেছিল সন্দীপনপুর।কাদপুরে ছিলেন কর্দম ঋষি। বর্গদেব থাকতেন গোয়া গ্রামে। মহর্ষি ভার গভীর বাসস্থান ভোগপুর। উত্তর বীরভূমের মন্ডগ্রাম বা বর্তমানের মাড়গ্রাম
ছিল বহু অতীতে মান্ডব্য ঋষির আশ্রম। বক্রেশ্বর নদীর তীরে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভরদ্বাজ মুনি। এই জায়গাটি বাহিরা নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে রাজস্থানের জয়পুরের রাজা এখানে শক্তি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই সমস্ত কাহিনী যে গল্পকথা নয়, তা প্রমাণিত হয় যখন ভূবিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন যে দুবরাজপুরের অতি ভগ্ন পাহাড় টি হিমালয়ের চেয়েও প্রাচীন। এই জেলার কুয়ে কোপাই হিংলো ব্রহ্মানী দ্বারকা ময়ূরাক্ষীর ধারা গঙ্গা বা যমুনার চেয়েও প্রাচীন।
ইতিহাস পূর্ব যুগে শবর ,কিরাত , মুন্ডা বিজাতীয় আদি অস্ট্রাল গোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন মুনি ঋষিরা এই জেলায় তাদের আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই যুগে বীরভূমের মানুষের ধর্ম বিশ্বাস অনার্য প্রভাবে পুষ্ট ছিল।
পৌরাণিক যুগে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা ধর্মবিশ্বাসের কিছুটা ছিল বৈদিক সংস্কৃতি সঞ্জাত। এরপর ইতিহাসের যুগে পরপর বৌদ্ধ, জৈন, নাথ, মৌর্য,শুঙ্গ ,গুপ্ত ও হিন্দু জাতিগুলির রাজত্ব ও সংস্কৃতি বিন্যাসের প্রভাবে প্রভাবিত।
চলবে