ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৪৩)

সুমনা ও জাদু পালক

—— তোমরা যা বলবে আমরা সেটাই করব, কথা দিচ্ছি । কিন্তু দয়া করে তার আগে ওই পালক চারটা আমাদের লেজের উপর থেকে সরিয়ে নাও। অসহ্য জ্বালা -যন্ত্রণা হচ্ছে আমাদের শরীরে।
অদৃশ্য কন্ঠ বললো,ওটা সরিয়ে নিলে তোমরা যে তোমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে তার নিশ্চয়তা কী?
——–আমরা চারজন, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার বরে চতুরানন ।এই বিশাল বানর রাজ্যের চার সেনাধ্যক্ষ আমরা। আমি আমাদের রাজ্যের রাজা বানররাজ মহামতি মহাগ্রীবের নামে শপথ করে বলছি যে, দয়া করে ওই পালকগুলো সরিয়ে নিলে আমরা আপনাদের সমস্ত কথা মেনে চলবো।
সুমনা বলল, “বেশ, আমাদের বন্ধু আসমানি পালক দের অনুরোধ করছি যে, তাঁরা যেন অল্প সময়ের জন্য ওই চার চতুরানন বানরের পুচ্ছের উপর থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে রাখেন।”

সুমনার কথা শেষ হতে না হতেই আসমানি রংয়ের চারটে ছোট পালক বানরদের লেজের উপর থেকে সরে গিয়ে ওদের চারিদিকে চক্রাকারে ঘুরতে লাগলো। বানর চারটা ওদের লেজ গুটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো। ওদের চেহারার অস্বস্তিকর ভাব সরে গিয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলো।
আসমানি রং এর পরীর পালক সুমনার কাছে কানে কানে বলল, এখন আমরা যাচ্ছি। আমার মনে হয়,এই আসমানি বানরদের রাজ্যে আমার সাহায্য আর প্রয়োজন হবে না তোমার। যদি প্রয়োজন হয়, স্মরণ করা মাত্র চলে আসবো আমি।
সুমনা বলল, তোমাকে আমার নমস্কার ও ধন্যবাদ জানাই।বিদায় বন্ধু।
আসমানি পরীর পালক অদৃশ্য হতেই যে বানরটি প্রথম থেকে কথা বলছিল ,সে দুই হাত একত্রিত করে নমস্কার করার ভঙ্গিতে বলল, “রাজকুমারী রত্নমালা, আমরা আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে কথাবার্তা শুরুর আগে আমাদের পরস্পরের পরিচয় জানা প্রয়োজন।”
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, শুভ্র ঘোটক দুধরাজের পিঠে যে সুন্দরী কিশোরী বসে আছেন,উনি রাজকুমারী রত্নমালা।
—– তোমরা কোথায় চলেছ?
—— জাদুকর হূডুর রাজ্যে চলেছেন রাজকুমারী রত্নমালা।
—— কি সব্বনাশ! এই সুন্দরী কিশোরী চলেছে জাদুকর হূডুর রাজ্যে! সেতো ভয়ঙ্কর দুষ্টু জাদুকর। তার কাছে কেন চলেছ তোমরা?
—- রাজকুমারী রত্নমালা তাঁর পিতৃরাজ্যকে অভিশাপ মুক্ত করতে চলেছেন ।আর সেইসঙ্গে হূডুর রাজ্যে বন্দী পরী রানীকেও উদ্ধার করবেন তিনি‌। এবার তোমরা তোমাদের পরিচয় দাও।
—– আমিতো পূর্বেই বলেছি যে , আমরা চার চতুরানন বানর এই বিশাল বানর রাজ্যের চতুঃসীমা রক্ষা করি। আমাদের চারটি আননের সাহায্যে আমরা চারিদিক দেখতে পাই অতি সহজে । আমাদের প্রত্যেকের অধীনে কমপক্ষে দুই সহস্র বানর সেনা আছে। আমার নাম ‘প্রাচী’। আমি এই বানর রাজ্যের পূর্ব সীমা রক্ষা করি। চারজন সেনাধ্যক্ষের মধ্যে আমি বয়জ্যেষ্ঠ। আমাদের বানর রাজ্যের নিয়মানুসারে তাই সবাই মেনে চলে আমাকে।আমি ছাড়া
বাকি তিনজন সেনাধ্যক্ষদের নাম, ‘প্রতীচী’,’উদীচ্য’ ও দক্ষিণসেন। ওরা যথাক্রমে এই রাজ্যের পশ্চিম উত্তর ও দক্ষিণ সীমা রক্ষা করে।
—– বাহ! তোমাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো। তোমাদের নামগুলো খুব সুন্দর। সবটাই তো শুনলে, এবারে তোমাদের বানর সেনাদের লাঙ্গুলের সাহায্যে তৈরি জালিকার বাধা অপসারণ করে দুধরাজের পথ পরিষ্কার করে দাও।
চারিদিকে গাছের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বানরগুলো নিজেদের ভাষায় উত্তেজিত স্বরে কি যেন বলতে থাকলো। প্রাচী ওদের নিজস্ব ভাষায় সজোরে ধমকে ওদের চুপ করিয়ে দিল।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল,কী হল,কোন সমস্যা?
—– তেমন কিছু নয়। ওদের দাবি এই যে, আপনারা যখন এই রাজ্যের উপর দিয়ে যাচ্ছেন,তখন এই বানর রাজ্যের মহারাজা মহামতি মহাগ্রীবের সঙ্গে একবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করা একান্ত প্রয়োজন। হয়তো আমাদের মহারাজা আপনাদের এই অভিযানের বিষয়ে কিছু জরুরী পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। তাই আমাদের একান্ত অনুরোধ, আপনারা দয়া করে একবার আমাদের মহারাজের সঙ্গে দেখা করুন।
—— বেশ, চলুন কোথায় যেতে হবে।
অদৃশ্য কন্ঠের কথা শেষ হতেই রাজ্যের পূর্ব সীমানার সেনাধ্যক্ষ প্রাচী আবার নিজেদের ভাষায় কি যেন বলল সবাইকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত বানরগুলো তাদের লেজ গুটিয়ে রাস্তা পরিস্কার করে দিল। দুধরাজের পিঠে উপবিষ্ট সুমনার সামনে বানর সেনাধ্যক্ষ প্রাচী এসে হাত জোড় করে বলল, “আসুন রাজকুমারী রত্নমালা, আমার সাথে আসতে আজ্ঞা হোক।”
—– বেশ, চলুন।
সামনে পথ দেখিয়ে চলল চার বানর সেনাধ্যক্ষ ‘প্রাচী’, ‘প্রতীচী’,’উদীচ্য’ ও ‘ দক্ষিণসেন। দুপাশে অসংখ্য বানর সেনা, কেউ হেঁটে, কেউ এ গাছ ও গাছ করে লাফিয়ে নানা রকম শব্দ করতে করতে এগিয়ে চলেছে উত্তর দিকে।
আর এই বিশাল বানর সেনানীর মাঝে শুভ্র কেশর দুলিয়ে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলেছে দুধরাজ।
পথের চারিধারে অসংখ্য জানা-অজানা ফলের গাছে কাঁচা -পাকা ফল ঝুলছে,দুলছে। সুমনা বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখছে চারদিক ।
একটা মস্ত পাহাড়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল চার বানর সেনাধ্যক্ষ। এতক্ষণ হইচই চেঁচামেচি করছিল যে বানরগুলো, তারা হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে গেল।কেন?

চলবে

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!