গদ্যানুশীলনে শিবাজী সান্যাল

ভাল থেকো

    আজ কোর্টে সিদ্ধান্ত ঘোষণা হল । ওদের ডিভোর্সের আবেদন গৃহীত হয়েছে । কোর্টের বাইরে এসে মোহিত  বলল , “ যদি কখনও প্রয়োজন হয় , আমাকে জানিও , ভাল থেকো । ” উত্তরে শম্পা কিছুই বলল না । নিজের উকিলের সঙ্গে চলে গেল । 
        ওদের বিয়েটা খুব তাড়াতাড়ি হয়েছিল । কিছুদিন হল ওদের পরিচয় । লাঞ্চ আওয়ারে দেখা হত , তখন সামান্য কথা হত । দুএকবার ছুটির পর একসঙ্গে সিনেমা দেখতে গেছে , এই যা । বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য খুব তাড়া আসছিল । ওরা একটি রেস্তোরাঁয় , মোহিত বলল , “ কী যে করি , বাড়ি থেকে  মেয়ে দেখছে ।  বিয়ের জন্য প্রেসার দিচ্ছে । ”
        শম্পা বলল , “ বেশ তো , বিয়ে কর । তোমার কী কোনো নিজের পছন্দ  আছে ? ”
         “ আছে , তবে সে তা জানে না । ”
         “ তাকে বলে দেখ । ”
         “ তুমি আমাকে বিয়ে করবে ? ”
         “ মানে ? ”
         “ তুমি তাকে বলতে বললে , তাই বলে ফেললাম । ”
         এরপর সব খুব তাড়াতাড়ি এগোলো । দুবাড়ি থেকেই সম্মতি পাওয়া গেল । দুমাসের মধ্যে বিয়ে , তারপর দার্জিলিংএ হানিমুন । 
         কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই ওদের দুজনের মানসিক ভিন্নতা প্রকাশ পেতে লাগল ।  শম্পার চাহিদা , জীবন সম্পর্কে ধারণা , চালচলন , প্রায় সর্ব ক্ষেত্রেই মোহিত মিলিয়ে উঠতে পারছিল না । ফলশ্রূতি — নানা বিষয়ে মতভেদ , কথা কাটাকাটি তারপর ঝগড়া । শেষে শম্পা , মোহিতের সব চেষ্টা অগ্রাহ্য করে , পরিষ্কার জানিয়ে  দিল , “ না , এভাবে চলতে পারে না । আমি এত কমপ্রোমাইজ করতে পারব না । আমাদের আলাদা হওয়াই দুজনের জন্য মঙ্গল । ” আজ ওদের ডিভোর্স হয়ে গেল । 
        কেস চলাকালে , যখন শম্পা আলাদা থাকতে শুরু করেছে , একবার বলেছিল , “ একটি অনুরোধ , মার শরীর ভাল না ।  মা যেন আমাদের  এসব না জানে । সহ্য করতে পারবে না ।  পুরোনো যুগের মানুষ ।  ”

         হঠাৎ একদিন শম্পার মা মায়াময়ীর ফোন এল । বলল , “ মোহিত বাবা , শম্পাকে ফোন করে কোনো উত্তর পাচ্ছি না । আমার শরীর খুব খারাপ ।  তোমরা যদি - - -।  ”
        মোহিত শম্পাকে ফোন করল , সুইচ অফ ।  ওদের বাড়িতে একমাত্র দেখাশোনা করে সরলাদিকে ফোন করে জানল ডাক্তার বলেছে কলকাতা সত্তর নিয়ে যেতে । পরিস্থিতি গুরুতর । অগত্যা মোহিত  গিয়ে নিয়ে এসে হাসপাতালে ভর্তি করল । রোজ অফিসের  পর গিয়ে দেখা করত । মায়াময়ী বারবার শম্পার কথা জিজ্ঞেস করতেন , মোহিত নানা মিথ্যে বলে সামাল দিত ।  এর মধ্যে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও শম্পাকে পেল না । মায়াময়ী যখন অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেন সৌভাগ্যক্রমে  শম্পাকে পাওয়া গেল । মোহিত বলল , “ কোথায় ছিলে জানি না । মা হাসপাতালে , সুস্থ হয়েছেন । তুমি গিয়ে দেখা কর । ”

         ফেরার  পথে মায়াময়ী ট্যাক্সিতে বলল, “ কোথায় থাকিস তুই ? মোহিত ছেলের  চেয়েও বড় কাজ করল । ওর জন্যই আজ আমি বেঁচে  আছি । অনেক ভাগ্য তোর যে মোহিতের মত ছেলেকে স্বামী হিসেবে পেয়েছিস । ”

        মোহিত দেখল ফোনটা বাজছে , শম্পার কল । দুবার বেজে গেল , ও তুলল না। ও একটি হোয়াটস্আপ মেসেজ পাঠাল , “ ধন্যবাদ জানাতে হবে না । ”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।