ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৩১)

তীর্থভূমি বীরভূম ,ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম

বীরভূমের দুবরাজপুর শহরে অনেকগুলি ইটের তৈরি শিব মন্দির আছে। মন্দির গুলির মধ্যে বাজারের নিকট অবস্থিত ‘ত্রয়োদশ
রত্ন’ সমন্বিত
শিব মন্দিরটি দর্শনীয়। মন্দিরের প্রধান প্রবেশপথের খিলানের উপর শিবের কৈলাস আক্রমণের ঘটনাবলী উৎকীর্ণ। পাশের লম্বমান ফলকগুলির মধ্যে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি ক্ষোদিত আছে। অন্যান্য ফলক গুলির মধ্যে দেবদেবী, অবতার, সামাজিক এবং পৌরাণিক দৃশ্যাবলী সমূহ উৎকীর্ণ। মন্দিরের দরজার উপরে একটা প্রতিষ্ঠা ফলক আছে। এই ফলকটি পোড়ামাটির। তবে তা অক্ষরসহ পোড়ানো নয়, একটি মসৃণ টাইলের উপরে কোন সূক্ষ্ম অস্ত্র দিয়ে ক্ষোদিত। ওই প্রতিষ্ঠা ফলকে লেখা আছে মন্দিরটি তৈরি করার কারিগরের নাম………
‌ .”খোদিত কারিগর শ্রী গোপিনাথ হাড়ি
সাং দুবরাজপুর এবং ১২৯৬ সাল।”
এই লিপি থেকে বোঝা যায় যে, ওই এলাকার হাড়িগন এককালে মন্দির নির্মাণ কার্যে নিপুণ ছিলেন। যদিও বর্তমানে বীরভূম জেলার হাড়ি সম্প্রদায়ের লোকেরা সমাজের নিম্নকোটি শ্রেণীভুক্ত।
এই মন্দিরটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ভিতরে অধিষ্ঠিত আছেন বৃষবাহনসহ তিনটি শিবলিঙ্গ।
দুবরাজপুরের ময়রা পাড়ায় একটি ত্রয়োদশরত্ন মন্দির ও দুটি সাধারণ টেরাকোটা মন্দির আছে।
নামোপাড়া বা ওঝাপাড়ায় উত্তরদুয়ারী পাঁচটি শিব মন্দির আছে। ত্রয়োদশরত্ন মন্দিরটির দুই পার্শ্ব বৃহৎ আকারের মৃৎফলক দ্বারা সজ্জিত।
রামায়ণের ঘটনাবলী, নরসিংহ অবতার, নারদ ,নৌকা বিহার, গজপৃষ্ঠে শিকারি ইত্যাদি প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ হলেও কোথাও প্রতিষ্ঠাতা অথবা কারিগরের নাম লেখা কোন ফলক নেই।

জয়দেব কেন্দুলির রাধাবিনোদ মন্দির টি পোড়ামাটির টেরাকোটা চিত্রিত নবরত্ন মন্দির।
মন্দিরটি আয়তনে বেশ বড়। মন্দিরের ভিতরে আছে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি। এই অপূর্ব সুন্দর মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন বর্ধমানের মহারানী নৈরানী দেবী ১৬০৫ শকাব্দে (মতান্তরে 1614 শকাব্দে ) অর্থাৎ ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে অথবা ১৬৯২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে মন্দিরটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষার সংরক্ষণাধীনে আছে। মন্দিরের সামনে মৃৎ ফলকের উপর সুন্দর অলংকরণ আছে । বাম পাশের প্রবেশ তোরণের উপর শিব ,বিষ্ণু ,ব্রহ্মা ,বায়ু,যম , ইন্দ্র প্রভৃতি দিকপাল এবং দশাবতারের প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ আছে। অন্য খিলান গুলির উপরে রামায়ণের ঘটনাবলী বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা লিপিটি প্রায় ৯৫-৯৬ বছর আগে তিন চার দিনব্যাপী ঝড়-বৃষ্টির সময়ে ভেঙে পড়ে যায়।

দুবরাজপুর শহরের কাছেই প্রাচীন জনপদ হেতমপুরে প্রচুর মন্দির আছে।। তার মধ্যে কয়েকটি শিল্প নৈপুণ্যে উল্লেখযোগ্য।
গোবিন্দ সায়রের এক কোণে বিবিধ কারুকার্য খচিত চন্দ্রনাথ শিব মন্দির প্রতিষ্ঠিত আছে। হেতমপুরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বঙ্গাব্দ ১২৫৪ সালে অর্থাৎ ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দির গাত্রে নিম্নে বর্ণিত লেখ উত্তীর্ণ আছে।
” স্থাপিত শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র কৃষ্ণচন্দ্র মুদেকর
চন্দ্রনাথ শিবাসচন্দ্র হরমেস্নী চন্দ্রশেখর।।
অষ্ট কোণাকৃতি এই মন্দিরটি পূর্ব দুয়ারী। মন্দিরের গায়ে মৃৎফলকে গণেশ জননী, জগদ্ধাত্রী, স্নানরতা রমণী, গজলক্ষী প্রভৃতি হিন্দু পৌরাণিক ও সামাজিক দৃশ্যাবলীর রূপায়ণ ছাড়াও ইউরোপীয় প্রভাবে মন্ডিত শিল্পশৈলীর
সার্থক রূপায়ন এই মন্দিরে উৎকীর্ণ।
ইউরোপীয় প্রভাবে উৎকীর্ণ বিভিন্ন জননায়ক, কবি, রানী ভিক্টোরিয়া ইত্যাদির প্রতিকৃতি এমনকি ইউরোপীয় অলংকার শৈলীও সুন্দরভাবে মৃৎফলকে রূপায়িত দেখা যায়।

মন্দির চূড়ায় প্রতিষ্ঠিত মূর্তি গুলি সম্ভবত দেবদূত বা দেব কন্যা গনকে সূচিত করে। নবরত্ন মন্দির ইউরোপীয় ভাবাদর্শের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে এই মন্দির স্থাপত্যে নতুন রূপের সৃষ্টি করেছে।
এই মন্দির থেকে কিছু দূরে ‘ দেওয়ানজী শিব মন্দির’ নামে অভিহিত একটি মন্দির আছে। দক্ষিণ দুয়ারী এই মন্দিরের দুপাশে মৃৎ ফলকের উপর অলংকরণ আছে। প্রবেশপথের উপরিভাগে সিংহাসনে উপবিষ্ট রাম সীতা এবং পূর্ব দিকে গোপিনীসহ শ্রীকৃষ্ণের প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ আছে। এই মন্দিরের উপরিভাগে পৌরাণিক কাহিনীসমূহ রূপায়িত। দক্ষিনে শ্রীকৃষ্ণের মথুরাযাত্রার দৃশ্য ফলকের মধ্যে ক্ষোদিত।
এই মন্দিরের পাশে অবস্থিত দুটি মন্দিরে কোন অলংকরণ নেই। দেওয়ানজি ও তার পার্শ্ববর্তী মন্দিরটি রাজ্য সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত হয়েছে।
মহম্মদবাজার থানার গণপুরে ফুল পাথরের নকশামণ্ডিত প্রচুর মন্দির ও দোলমঞ্চ আছে।
এই গণপুর এক সময়ে দেশীয় প্রক্রিয়ায় লৌহ নিষ্কাশনের কেন্দ্র ছিল এবং এখানের চৌধুরী বংশীয়রা লৌহ ব্যবসায়ে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
একটি ছোট গ্রামে এতগুলি সুন্দর অলংকরণ বিশিষ্ট মন্দিরের অবস্থিতি বীরভূম জেলার অন্যত্র দেখা যায় না।
গ্রামমধ্যে কালীতলায় ১৪ টি চারচালা রীতির
শিব মন্দির এবং একটি দোল মঞ্চসহ এক মন্দির উল্লেখযোগ্য। মন্দির গুলির অবস্থিতি এরকম—-পূব দিকে সাতটি মন্দির, পশ্চিমে চারটি, উত্তরে তিনটি মন্দির এবং একটি দোল মঞ্চ। এই মন্দিরগুলির মধ্যে একটি মন্দিরের গায়ে মন্দির প্রতিষ্ঠার সন তারিখ উৎকীর্ণ আছে। মন্দির গুলি ১৭৬৭ থেকে ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চৌধুরী পরিবার দ্বারা নির্মিত হয়। জনশ্রুতি এই যে, ওই সময়ে বীরভূমে দারুণ দুর্ভিক্ষ হয় এবং সেই সময়ে দরিদ্র গ্রামবাসী দিগকে মন্দির নির্মাণকার্যে সহায়তার বিনিময়ে তাহাদের আহার্যসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
মন্দিরের সম্মুখভাগে খিলানের উপর এবং দ্বার পার্শ্বে ফুল পাথরের ফলক গুলি সাজানো আছে। প্রধান ঘটনাবলীর মধ্যে রামরাবণের যুদ্ধ, দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী, অনন্ত শায়ী-বিষ্ণু, ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন, কার্তিক গণেশ, রাস মন্ডল, কৃষ্ণ এবং লম্বালম্বি ভাবে সজ্জিত ফলক গুলির মধ্যে দশাবতার, কৃষ্ণ লীলা এবং অন্যান্য দেব-দেবী প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ আছে। মন্দিরের ভিত্তির নিকটের ফলক গুলিতে শোভাযাত্রা ও যুদ্ধের দৃশ্যাবলী ক্ষোদিত আছে।
ওই গ্রামে শ্রী কীর্তি ভূষণ মন্ডলের গৃহ সংলগ্ন প্রাচীরের গায়ে একই ধরনের দুটি ছোট মন্দিরের অবস্থিতি লক্ষণীয়।
উপরোক্ত মন্দিরগুলি থেকে কিছু দূরে শ্রী মহাদেব ভট্টাচার্যের ঘরের সামনে পাঁচটি চারচালা রীতির মন্দিরের অবস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই মন্দির পাঁচটি কোন সময় নির্মিত হয়েছিল তার উল্লেখ নেই। ফুল পাথরের ফলকে সজ্জিত এখানের খিলানের উপর উৎকীর্ণ দৃশ্যাবলীর শিল্পশৈলী দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দৃশ্য গুলির মধ্যে কৃষ্ণের জন্ম, দুঃশাসন কর্তৃক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ এবং কৃষ্ণ কর্তৃক দ্রৌপদীকে রক্ষা, সমুদ্র মন্থন এর ঘটনাবলী ও দেবা সুরের মধ্যে মোহিনী কর্তৃক অমৃত বিতরণ এবং পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যে বর্ণিত অন্যান্য ঘটনাবলী ফলক গুলির অলংকরণে দৃষ্ট হয়।
ফুল-লতাপাতা এবং অন্যান্য পশু পাখির প্রতিকৃতি এবং গ্রামের দৈনন্দিন ঘটনাবলী মন্দিরের গায়ে উৎকীর্ণ আছে।
গ্রামের উত্তর দিকে শ্রী জয় কৃষ্ণ মন্ডলের গৃহসংলগ্ন জীর্ণ এবং পরিত্যক্ত এক আটচালা বিষ্ণু মন্দির দর্শনীয়। পিরিত রাম মণ্ডল কর্তৃ ক ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে (বঙ্গাব্দ 1176 সালে) মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে জানা যায়। আয়তনে অন্য মন্দিরগুলি থেকে বড় এবং মন্দিরের গায়ে বেলে পাথরের উপর ফলকে রাম রাবণের যুদ্ধ, মহিষাসুরমর্দিনী, গোপিনীসহ কৃষ্ণের প্রতিকৃতি প্রবেশপথের খিলানের উপরে উৎকীর্ণ।

বোলপুর থানার আদিত্যপুরে একটি দেউল রীতির ছোট্ট মন্দির আছে। প্রতিষ্ঠা ফলক থেকে জানা যায়, এটি ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং উৎসর্গিত হয়েছিল রুদ্রায়ন আচার্যের নামে—
শ্রী শ্রী ঈশ্বর মণু শকাব্দ ১৭৩৯ সাল
শ্রী ঈশ্বর রুদ্রায়ণ আচার্য।

লিপিপঠে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত জানা যায়। প্রবেশ পথের উপর মৃৎ ফলকে সিংহাসনে উপবিষ্ট রাম সীতার প্রতিমূর্তি উৎকীর্ণ। পাশে লক্ষণ, ভরত ,শত্রুঘ্ন, হনুমান দন্ডায়মান। দ্বারের দুই পাশে এবং তার উপরে শ্রেণীবদ্ধভাবে সজ্জিত ফলক গুলিতে পৌরাণিক কাহিনী সমূহ বর্ণিত এবং দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাবলী রূপায়িত। দক্ষিণ পার্শ্বে এক নকলদ্বারের উপরিভাগে খিলানে আম্র পল্লবের মধ্যে উপবিষ্ট গণেশ মূর্তি লক্ষণীয়। গণেশের দুপাশে ময়ূর এবং শুক পাখির প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ। চারদিকের বনরাজী এবং তত্রস্থ পক্ষী গনের বিচরণ ক্ষেত্রের মধ্যে গণেশের অবস্থিতি সহজে নজরে আসে না।
গ্রামের লৌকিক দেবতারূপে পরিগণিত কাঞ্চীশ্বর শিব সারা বছর জলে নিমজ্জিত থাকেন এবং বৈশাখী পূর্ণিমায় জল থেকে তুলে আড়ম্বর সহকারে পূজা হয়। গ্রামের চাঁদরায় নামে অভিহিত ধর্ম ঠাকুরের আকৃতি মস্তকহীন মনুষ্য দেহের মতো কথিত হয়।

 

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।