ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৫০)

সুমনা ও জাদু পালক
সুমনা মনে মনে, বাবা ভোলানাথ কে স্মরণ করে বলল, হে দেবাদিদেব মহাদেব, আমি আমার বাবাকে দেখতে চাই। কতদিন দেখিনি বাবাকে। হে সর্বশক্তিমান দয়াল, একটা চমৎকার দেখাও প্রভু। আমার বাবা যেখানেই থাকুক যেন বেঁচে থাকে।
মনে মনে শিব ঠাকুরের কাছে এই প্রার্থনা করে সুমনা লাল মুক্তটা হাতে নিয়ে লাল মুক্তার কাছে প্রার্থনা জানালো, হে শক্তিশালী লাল মুক্তা, আমার বাবা অনেকদিন আগে হারিয়ে গেছে। যদি সে বাবা ভোলানাথের দয়ায় এখনো বেঁচে থাকে, তাহলে তাকে দেখাও আমাকে।
সুমনার কথা শেষ হতে না হতেই আবার লাল মুক্তার মধ্যে নানা বর্ণের আলোর বিচ্ছুরণ হতে শুরু করল, শুরু হলো প্রচণ্ড আলোড়ন, প্রচন্ড গতিতে একের পর এক ছবি সরে সরে যেতে শুরু করলো। সুমনা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে লাল মুক্তার দিকে। কিন্তু না, কোন ছবিই তো দাঁড়াচ্ছে না। তবে কি সুমনার বাবা….…..?—- হে প্রভু ভোলানাথ, দয়া কর, আমার বাবাকে বাঁচিয়ে রেখো।
সুমনা মনে মনে এরকম প্রার্থনা করার কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ দেখা গেল লাল মুক্তার বুকে একটা ছবি ভেসে উঠলো। ঘন জঙ্গলের ভিতরে একটা ভাঙ্গা মন্দিরের ছবি।
দূরে উঁচু উঁচু পাহাড় দেখা যাচ্ছে। কোথায় এই জায়গাটা? শুধু ভাঙ্গা মন্দির, জঙ্গল আর পাহাড় দেখাচ্ছ কেন? বাবাকে কেন দেখাচ্ছে না?
তবে কি সুমনার বাবা আর……?—না,তা হতে পারে না। হে শিব ঠাকুর, এরকম কোরোনা ঠাকুর, যেখানেই থাক, আমার বাবা যেন বেঁচে থাকে ঠাকুর।
মুহূর্তেই পট পরিবর্তন হয়। এবারে মন্দিরের ভিতরটা দেখা যাচ্ছে। আরে এটা তো একটা শিব মন্দির। ভিতরে ওইতো শিবলিঙ্গ। মন্দিরের বাইরেটা ভাঙাচোরা হলে কি হবে, ভিতরে শ্বেত পাথরের শিব লিঙ্গ ঝকঝক করছে। শিবলিঙ্গের মাথায় টাটকা ফুল বেল পাতা দেখা যাচ্ছে। আরে ওটা কে শুয়ে আছে শিবলিঙ্গের ওপাশে, একটা ছেঁড়া কম্বলের উপরে? কে লোকটা,? কোন সাধু সন্ন্যাসী? কিন্তু পরনে তো গেরুয়া পোশাক নেই। একটা ময়লা ধুতি আর ছেঁড়া জামা পড়ে আছে লোকটা। পুরো মুখটা তো দাড়ি গোঁফ এর জঙ্গলে ঢেকে আছে। কে ও? লাল মুক্তা ওকে দেখাচ্ছে কেন? সুমনা খুব ভালো করে লোকটার মুখ দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু না, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না তো। হঠাৎ সুমনার চোখে আসে, লোকটার ডান ভ্রুর উপরে একটা লম্বা পুরোনো কাটার দাগ। আবার ভালো করে লক্ষ্য করে সুমনা। মুহূর্তেই তার মনে পড়ে যায় এমন একটা কাটা দাগ তো তার বাবার কপালে ছিল।
মনে পড়ে যায় ঘটনাটা । খুব ছোটবেলায় একবার হোলির দিনে বাবা তাকে বাঁশের একটা ছোট টুকরো দিয়ে পিচকারি বানিয়ে দিয়েছিল। সেই পিচকিরি রংয়ের বালতিতে ডুবিয়ে রং তুলে নিয়ে খেলা করছিল বাবার সঙ্গে। হঠাৎ কি মনে হয়েছিল তার। পিচকিরিটা বোঁ বোঁ করে ঘোরাতে শুরু করেছিল। হঠাৎ তার হাত থেকে পিচকারিটা ছিটকে গিয়ে বাবার ডান ভ্রুর উপর খুব জোরে আঘাত করেছিল। অল্পের জন্য চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি ঠিকই,ভ্রুতে অনেকটা জায়গা কেটে প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল। ক্ষতটা পরে শুকিয়ে গেলেও
দাগটা রয়ে গেছিল। তাহলে কি ওটা সুমনার হারিয়ে যাওয়া বাবা? সুমনা আরেকবার ভালো করে মুখটা দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু না ,মুখটা বোঝা যাচ্ছে না ।
লোকটা যদি বাবা হয় তাহলে ওখানে জঙ্গলের ভিতরে ওই ভাঙ্গা মন্দিরে কি করছে? জায়গাটা কোথায় ? কোথায় আছে বাবা?
সুমনা কি করে খুঁজে পাবে বাবাকে?
সুমনা এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ঘোড়ার খুরের আওয়াজ ভেসে আসে কানে।
অদৃশ্য কন্ঠ ফিসফিস করে সুমনার কানে কানে বলে, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা ফিরে এলো বোধহয়। তুমি তাড়াতাড়ি মুক্তাটা খোলের ভিতরে ঢুকিয়ে দাও।
—– হ্যাঁ হ্যাঁ, দিচ্ছি।
সুমনা তাড়াতাড়ি ঝিনুকের একটা খোলের ভিতরে মুক্তাটা রেখে আরেকটা খোল দিয়ে চাপা দিয়ে বলতে শুরু করল,” জন্ম ঘরে আছি আমি বন্ধু স্মৃতি নিয়ে,// সুরক্ষিত থাকবো হেথায় শত্রুকে ছাই দিয়ে”।
মন্ত্র বলা শেষ হতেই ঝিনুকের মুখটা শব্দ করে জুড়ে গেল! সুমনা ওটা পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে রাখলো।
মন্দির চত্বরে এসে দাঁড়ালো দুধরাজ। দুধরাজের পিঠ থেকে নিচে নামলো রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা । চন্দ্রকান্তার হাতে এক গোছা টুকটুকে লাল রঙের শিকড় সমেত একটা টাটকা লতা ঝুলছে।
চলবে