মেঘ বার্তায় স্বর্ভানু সান্যাল (শিকাগো)

আজকের সম্পাদকীয় বিষয় হল বাংলা সাহিত্যে শৈথিল্য। বাংলা ভাষা তার জন্মলগ্ন থেকে অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে। চর্যাপদের সান্ধ্যভাষা থেকে আজকের পোস্ট মডার্ন পোয়েট্রির ভাষা – এই যে পথ চলা তা অন্য কোনো ভাষার বিবর্তনের থেকে কম রোমাঞ্চকর নয়। বঙ্কিমচন্দ্র ও বিদ্যাসাগরের হাত ধরে যে ভাষার আধুনিকীকরণের সূত্রপাত, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে যে ভাষার ব্যাপ্ত মূর্ছনাময় প্রকাশ আর উত্তর রবীন্দ্র যুগে কবি সমর সেন, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে যে ভাষা আধুনিক আজকের রূপটি পেয়েছে, অজস্র কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার সেই বাংলা ভাষার ভান্ডার মণিমানিক্যে ভরিয়ে দিয়েছেন। আজও সাহিত্যের অনলস সাধনা নীরবে করে চলেছেন অনেক কবি সাহিত্যিক ঔপন্যাসিক।
সভ্যতার অগ্রগতির হাত ধরে প্রযুক্তি আমাদের দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া, সামাজিক মাধ্যম। বাংলা ভাষার কারিগররা সেই সামাজিক মাধ্যমকে আলিঙ্গন করেছে পূর্ণোৎসাহে। একদিন যেখানে প্রতিভাবান স্ট্রাগলিং রাইটারকে নিজের লেখাকে দিনের আলো দেখানোর জন্য, পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে মাথা কুটতে হত, তাঁরা আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হলেন ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে। আর যে বা যারা মুদ্রিত মাধ্যমে আসার জন্য প্রকাশকের দ্বারস্থ হয়েছে, তাদের সকলেরই কিছু কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকবে, সে কথা সত্যিই বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলা প্রকাশনার অধুনা অসাধুতার ব্যাপারটি অন্য একটি সম্পাদকীয়র জন্য তোলা থাক। প্রসঙ্গে ফিরি। সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষতঃ ফেসবুক সাহিত্যের প্রকাশনার ক্ষেত্রে এই বাধাটি তুলে দেওয়ায় অনেক অখ্যাত লেখকের লেখা কিন্তু উঁচু মানের লেখার পড়ার সৌভাগ্য পাঠকের হয়েছে। কিন্তু এই ওয়ান-ক্লিক-অ্যাওয়ে প্রকাশ ক্ষমতা কারণে বানের জলের মত ভেসে এসেছে অজস্র অকবি অসাহিত্যিক। পার্সোনাল ফেসবুক ওয়াল পেজ, গ্রুপ ছাড়াও আছে অনেক ডিজিটাল ওয়েবজিন। বাংলা সাহিত্যের পরিমাণ এমন প্রভূত হারে বাড়ছে যে পাঠকের পক্ষে মুড়ি আর মুড়কির মধ্যে বিভেদ করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে গেছে। আর সকল বস্তুরই লার্জ স্কেল প্রোডাকশান শুরু হলে তার গুণগত মান হ্রাস পেতে থাকে। বাংলা সাহিত্যও তার ব্যতিক্রম নয়। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে নিষ্ঠার অভাব প্রায় ক্ষেত্রেই লক্ষিত হয়। কবিতা বা গল্পের গুণগত মানের কথায় যাচ্ছি না, যদি একটি লেখার কারিগরি দৃষ্টিকোণের, অর্থাৎ বানানের শুদ্ধতা, যতিচিহ্নের সামঞ্জস্য, বাক্যের গঠনগত শুদ্ধতা, ইত্যাদির উপর নজর দেওয়া হয়, দেখা যাবে খুব দৃষ্টিকটু রকমের ভুল ছড়িয়ে আছে অনেক প্রকাশিত লেখাতেই। দুর্ভাগ্যের বিষয় বাংলা ভাষায় এখনো কোনো স্পেল চেকার তৈরী হয় নি। তবে বাংলা ইউনিকোড ফন্টের বয়স ইংরেজি ফন্টের বয়সের তুলনায় অনেক কম। আমরা আশা করব বাংলা স্পেল চেকার অচিরেই আসবে কিন্তু তার আগে পর্যন্ত এ দায়িত্ব নিশ্চিত ভাবে লেখক ও সম্পাদকের ওপর বর্তায়। To err is human, কথাটি সত্য কিন্তু আজকের সম্পাদকীয় ভাবনাটি হল, Trying not to err is also very human. আমরা যারা কথাশিল্পী এবং ডিজিটাল পোর্টালের সম্পাদক, এই সব অনবধানতা মূলক ত্রুটিগুলি পরিহার করার জন্য আমরা দৃঢ়তম অভিনিবেশ করছি তো, এই প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করার সময় বোধ হয় এসেছে।
এই পর্যন্ত পড়ে পাঠক নিশ্চিতভাবে সম্পাদক অর্থাৎ আমাকে উদ্ধত এবং মেগালোম্যানিয়ায় ভোগা মানুষ বলে মনে করছেন। অতএব একটি উদাহরণ দিয়ে পাঠকের সন্দেহ এবং মানভঞ্জন করার চেষ্টা করব। কিছু দিন আগে কোনো একটি সাহিত্য পোর্টালে সম্পাদকের পছন্দ একটি আর্টিকেলে ফার্স্ট সেন্টেন্সে সুখ শব্দের বানান দেখলাম সূখ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে লেখক কি সুখ বানান জানেন না? নিশ্চয়ই জানেন। সম্পাদক কি সুখ বানান জানেন না? নিশ্চয়ই জানেন। সুখ কি বাংলা ভাষায় খুব অপ্রচলিত, অব্যবহৃত শব্দ? নিশ্চয়ই না। অতএব বলা যেতেই পারে এটি নেহাত মুদ্রণ প্রমাদ এবং প্রথম বাক্যেই। এক আধটি হলে নিশ্চয়ই তা ক্ষমার্হ কিন্তু যদি প্রতিটা সেন্টেন্সে দুটো করে এমন দেখা যায় তবে বলতেই হবে লেখক নিজের লেখাটি প্রুফ রীড করেন নি এবং সম্পাদক লেখকের লেখাটি কপি পেস্ট করেছেন তাঁর পোর্টালের পাতায়। ভাষার কারিগররাই যদি ভাষাটিকে এইভাবে রক্তাক্ত করে তবে তা ভীষণই দুঃখের কথা। ইংরেজি লেখায় স্পেলিং মিস্টেক দেখলে আমরা নাক কুঁচকোই। বাংলায় নয় কেন? আমাদের অবচেতনে কোথাও এই কথা লেখা নেই তো বাংলায় মিস্টেক করা যায়? বাংলা পিছিয়ে পড়া একটি ভাষা? ইংরেজি ভাষার সাথে এক আসনে বসার অযোগ্য একটি ভাষা? মাথায় যদি এমন কোনো চিন্তা না থাকে, তবে এই ল্যাক্স অ্যাটিচুডের কারণ কী? আমি বহু পূর্বে একজন লেখককে কৌতূহলবশত জিগেস করেছিলাম, হাজার তিনেক শব্দের একটি গল্প লিখলে কতবার প্রুফরীড করেন? প্রশ্ন শুনে তিনি এমন হকচকিয়ে গেছিলেন যে আমি নেহাত অপ্রস্তুত হয়ে প্রশ্ন ঘুরিয়ে নিই। মোদ্দা কথা, আমাদের অনেকেরই ফেসবুক ওয়ালে লেখা পোস্টানোর তাড়া এত বেশি থাকে, যে একবারও লেখাটি প্রুফরীড করার সময় থাকে না। লেখালেখির ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার যথেচ্ছ ব্যবহার বিষয়ে অন্য একটি সম্পাদকীয় তোলা থাক।
পাংচুয়েশান মার্কের ক্ষেত্রেও একই শৈথিল্য দেখা যায়। একই লেখায় বিভিন্ন স্টাইলের কোটেশান, দাঁড়ি কমার ক্ষেত্রে ইউনিফর্মিটির অভাব। ভাষাটাকে ভালবাসলে নিজের ফেসবুক ওয়ালে লেখা প্রকাশ করার আগে নিজের মধ্যেই একটা সম্পাদককে ইনস্টল করার দরকার বোধ হয় আছে। আর ডিজিটাল ওয়েবজিনের সম্পাদকদের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, অন্তত লেখাটি একবার প্রুফরীড করুন। আর যদি সময়াভাবে স্পেলিং কারেকশান না করতে পারেন, অনেক বানান ভুল চোখে পড়লে লেখাটি লেখককে ফেরত পাঠান স্পেল চেক করার পরামর্শ দিয়ে। একজন লেখক হিসেবে নয়, বাংলা ভাষার একজন একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে এ কথা আমি হলফ করে বলতে পারি, এ ধরণের লো কোয়ালিটি কনটেন্ট যত প্রোডিউস করা হবে পাঠক হিসেবে আমি, আমরা তত মুখ ফিরিয়ে নেব। আর পাঠকের অভাবে ভাষাশিল্প অন্ধকার চোরাকুঠুরিতে দাঁড়িয়ে পরিত্যক্ত হওয়ার যন্ত্রণায় মাথা ঠুকবে।
আজকের সাহিত্য মেঘে আমরা একজন দরদী কথাশিল্পী দেবাশিস গুপ্তর একটি ছোট গল্প রাখলাম। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে। থাকছে মৈনাক চৌধুরী ও দেব বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি করে অপূর্ব কবিতা। কবি দ্বয়ের গভীর মননের ছাপ দীক্ষিত পাঠক নিশ্চয়ই খুঁজে পাবেন। থাকছে মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর একটি ভ্রমণ। পড়তে থাকুন। সৃজনে থাকুন। ভাল থাকুন।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!