সকালে পত্রিকা এলে হাজীসাহেব দেখলেন, আজ ৬ মার্চ দুপুরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশ্যে বেতার-ভাষণ দিবেন। এটা যে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন নস্যাতের আরেকটা অপচেষ্টা, হাজীসাহেব মূহুর্তেই বুঝে গেলেন। ৭ মার্চের জনসভা সামনে রেখে ইয়াহিয়া হয়ত নতুন কোনো চাল চালবেন। তবু তিনি কী বলেন, সেটা জানার আগ্রহ সবারই। দুপুরে অনেকেই রেডিওর সামনে বসে গেল। ইয়াহিয়া তার ভাষণে ২৫ মার্চ আবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করলেন। এদিকে ভুট্টোর দাবির ফায়সালা না করে তার এই ঘোষণা জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। এটা বরং বঙ্গবন্ধু যাতে ৭ মার্চের জনসভায় চরম কোনো ঘোষণা দিয়ে না বসেন, তার দিক থেকে একটা রক্ষাকবচ। একারণে ইয়াহিয়ার ঘোষণা জনমনে কোনো ভাবাবেগ তৈরি করতে পারল না। কোনো আশাবাদ জাগালো না। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা উদ্বিগ্ন সামরিক-বেসামরিক চক্রের অপকৌশল বলেই প্রতিভাত হলো।
পাশাপাশি কটা বিদেশি পত্রিকা কদিন থেকে লিখে যাচ্ছিল, ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান হয়ত স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। ইত্তেফাক থেকে হাজী সাহেবের বন্ধু জানিয়েছিলেন, ৫ মার্চ লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, অবজারভার এবং আজকে ডেইলি টেলিগ্রাফে বঙ্গবন্ধুর একতর্ফা স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। হাজীসাহেব লক্ষ্য করছেন, ২ মার্চের পর থেকে ’৭০-এর নির্বাচন বিরোধী পত্রিকাগুলো হঠাৎই স্বাধীনতাপন্থী হয়ে উঠেছে। তারা স্বাধীন বাংলার দাবিতে অতিবিপ্লবী বেনারহেড করে যাচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার এই প্রচেষ্টায় জামাতমুখপত্র দৈনিক সংগ্রামও যুক্ত হয়েছে। আজ ইত্তেফাক অফিসে একজনের প্রশ্নের জবাবে বার্তা সম্পাদক সিরাজভাই ঢাকাইয়া বোলে বললেন, ‘বেশি লাফাইও না। ওরা যে কী স্বাধীনতা চায়, আমি জানি। মুজিবরে ওরা চাপে রাখছে; যাতে আগামাথা না ভাইব্বা মুজিব স্বাধীনতা ডিক্লেয়ার করে। আর রশিতে ঝুলে।’ এদিকে ছাত্রতোদের একাংশও ইত্তেফাকের বিরুদ্ধে বিষদ্গার করছে। তারা ইত্তেফাক জ্বালিয়ে দেবার হুমকিও দিচ্ছে। সিরাজভাই পরম ধৈর্য্য ও বিচক্ষণতার সাথে বাংলার মুক্তির সংগ্রামকে পৃষ্টপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তাঁর পত্রিকায় অত্যন্ত দায়িত্বশীল বেনারহেড করছেন। কোনো হঠকারিতায় তিনি সুর মেলাচ্ছেন না। তিনি সতর্ক আছেন, যেন শেখ মুজিব তথা বাংলার সংগ্রাম অন্কুরেই বিনাশ হয়ে না যায়।
পরিস্থিতি যে খুবই জটিল আকার ধারণ করেছে, হাজী সাহেবের বুঝতে বাকি রইল না। সামরিক কতর্ৃপক্ষ দৃশ্যতঃ এটাই চাচ্ছে, বঙ্গবন্ধু যাতে কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত না নেন, যেখান থেকে আর ফেরার উপায় থাকবে না। আন্দোলনমুখর আভ্যন্তরিণ চাপ এবং সামরিক সরকারের প্রচ্ছন্ন হুমকি এড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে কী বলবেন, এই নিয়ে সর্বত্র গুঞ্জন। তিনি যদি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেন, তাহলে ইয়াহিয়া যে তড়িৎ সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তখন তারা প্রচার করবে, উদ্ভুত পরিস্থিতে অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকাতে এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে তাদের সামরিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। হাজীসাহেব কদিন ধরেই ইয়াহিয়ার এরকমই মনোবৃত্তির কথা ইত্তেফাক অফিসে বলাবলি হতে শুনেছেন। তিনি পরবর্তী পরিস্থিতি কল্পনা করে শিউরে উঠলেন। লোকজন পরিষ্কার বুঝতে পারছে, ৭ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক চক্রকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এতদিনে তারা ভালোই টের পেয়েছে, বাংলার মানুষের উপর তাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। শেখ মুজিবের আদেশে চলছে বাংলা।
উত্তাল আন্দোলনের স্রোতে ৭ মার্চ হাজির হলো। চায়ের টেবিলে, গলির মোড়ে একই আলোচনা- আজ কী বলবেন বঙ্গবন্ধু! বেলা ২টায় রেসকোর্সে জনসভা। কিন্তু জনতা দলে দলে সকাল থেকেই রেসকোর্সমুখী চলেছে। বয়স, পেশা, সামাজিক মর্যদায় সেই জনতার মধ্যে অমিল সহজেই চোখে পড়ছে। অথচ তাদের রয়েছে আশ্চর্য কিছু মিল- তাদের প্রায় সবার হাতে বঁাশের লাঠি, কণ্ঠে একই শ্লোগান- যেন একই স্বপ্ন তাদের বুকে।
রেসকোর্সে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটেছে। জনতার স্রোত এসে উপচে পড়তে থাকে রেসকোর্সের বৃক্ষশোভিত প্রাঙ্গনে। সহসাই জনস্রোতে সয়লাব হয়ে যায় রেসকোর্স। সমাবেশে এসেছে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবক, শ্রমিক-জনতা, এমন কি অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। বিশালতায়, অভিনবত্বে, আর সংগ্রামী চেতনার স্ফুরণে এই জনসমুদ্র সত্যিই নজিরবিহীন। লক্ষ কণ্ঠে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি যেন প্রলয়রাত্রির বঙ্গোপসাগরের গর্জন। তাদের হাতের লাঠির সমবেত শব্দ দিগন্ত কঁাপিয়ে দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। জনসভা বেলা ২টায় শুরু হবার কথা থাকলেও এখনও বঙ্গবন্ধু পেঁৗছাননি। তবু জনতার মধ্যে অধৈর্য-অসহিষ্ণুতার কোনো লক্ষণ নেই। জনতা সুস্থিরচিত্তে নেতার অপেক্ষা করছে।
এখন বেলা ৩টা ১৫ মিনিট। সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা ও মুজিবকোট পরিহিত বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এসে দঁাড়ালেন। লক্ষ জনতা শ্লোগান মুখরিত হয়ে উঠলো- ‘বঙ্গবন্ধু এগিয়ে চল, আমরা আছি তোমার পিছে।’ বজ্রধ্বনিতে জনতা তঁাকে অভিনন্দন জানালো। নেতা মৃদু হাত নেড়ে জনতাকে অভিনন্দন জানালেন। বঙ্গবন্ধু একবার বলেছিলেন, ‘সংগ্রামী বাংলা দুর্জয় দুর্বিনীত। কারও অন্যায় প্রভূত্ব মেনে নেয়ার জন্য, কারও কলোনি হয়ে, বাজার হয়ে থাকার জন্য বাংলার মানুষের জন্ম হয়নি।’ বাংলার অপরাজেয় জনতা আজ রেসকোর্স ময়দানে সেই ইস্পাত-কঠিন শপথে দীপ্ত।
অনির্বাণ বাবাকে সাথে নিয়ে রেসকোর্সে হাজির হয়েছে। তারা সমাবেশের সামনের অংশে মাঝামাঝিতে একটা সুবিধাজনক জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। অনেকটা মঞ্চে পোডিয়ামের বরাবর। এখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর চোখেমুখে ৭ কোটি মুক্তিকামী সৈনিকের সুযোগ্য সর্বাধিনায়কের তেজস্বী কাঠিন্য ঝলসে উঠছে। বঙ্গবন্ধু মাইকে দঁাড়িয়ে জলদ-গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন। জনতা আকাশ বিদীর্ণকরা মূহুর্মুহু ধ্বনিতে ফেটে পড়ছে। বঙ্গন্ধুর কণ্ঠ বিন্দুমাত্র কঁাপছে না। একমূহুর্ত তিনি থামছেন না। জনতার চোখে জ্বলছে প্রতিরোধের অনির্বাণশিখা। তাদের বুকে বাজছে মুক্তিপিয়াসী মাদল। তবু তারা নেতার মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতারূপে সংযত হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু প্রথমে সামগ্রিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকদের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করলেন। তিনি সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবি জানালেন। অত্যাচার ও সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য বাঙালিদের আহ্বান করলেন। তিনি দাবী আদায় না-হওয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সার্বিক হরতাল চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানালেন। নিগ্রহ ও আক্রমণ প্রতিরোধের আহ্বানের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সংগ্রামের রূপরেখা এবং চরমতম ত্যাগের প্রস্তুতির পন্থা ঘোষণা করলেন। এই দুলর্ভক্ষণে ৭ কোটি বঞ্চিত মানুষ তাদের অবিসংবাদী নেতার অতুল সংগ্রামী রূপ দেখতে পাচ্ছে। সবশেষে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে নেমে এলো এক অমোঘ বাণী- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তখন শেষ-ফাল্গুনের পশ্চিমাকাশের বাসন্তি আলো গোটা রেসকোর্স উদ্ভাসিত করে দিয়েছে। দখনের আচমকা হাওয়া চারপাশের বৃক্ষরাজির ডালে ডালে নতুন নাচন ধরিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সবশেষ উক্তির অনন্য পরশ প্রতিটা মানুষের হৃদয়কে অজানা অনুরণনে জাগিয়ে তুলেছে। সেই বাণী বাঙালির হাজার বছরের কাঙ্খিত আগামীর ছবি দিকে দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সভাশেষে যে কোনো ত্যাগের শপথ দীপ্ত সৈনিকরা দৃপ্ত মিছিলে রাজপথ প্রকম্পিত করে ঘরে ফিরছে। ৭ মার্চের রেসকোর্সের সমাবেশ যেখানে শেষ হলো- বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের চরম অধ্যায়ের সেখানেই যেন শুরু হয়েছে।
অনির্বাণ এইসব অভূতপূর্ব অনুভূতির মধ্যে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলো। বাবার পাশে হঁাটতে হঁাটতে তার মনে হলো, আর তেমন সময় নেই। এইতো যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো বুঝি। হাজীসাহেবও একই ভাবনায় ডুবে রইলেন। তিনি কোনো কথা বলছেন না।
বাড়িতে পা রেখে হাজীসাহেব রানুর গলা শুনতে পেলেন। রানু সন্তানসম্ভবা। এসময়ে সে কেন এলো? হাজী সাহেবের মনে কিছুটা উদ্বেগের ছায়া পড়লো। তিনি ব্যস্ত হয়ে নিজ ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘরে ঢুকে হাজীসাহেব একটু ধাক্কাই খেলেন। রানু মায়ের কাছে কি একটা সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করছে, তিনি আঁচ করতে পেরে শুকনো মুখে বললেন,
‘কিরে, রানু মা? কেমন আছিস তুই?’ রানু উত্তর না দিয়ে উঠে এসে বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। তারপর ভেজা গলায় জিগ্যেস করলো,
‘আমি ভালো। তুই কি কোনো সমস্যায় পড়েছিস?’ তবু রানু মুখ খুলল না। নাজমা বেগম স্বগতোক্তির মতো বললেন,
‘জামাই উৎপাত করছে। তার ব্যবসায় নাকি মন্দা যাচ্ছে। সে কিএক নতুন ব্যবসার কথা ভাবছে। তাই টাকা দরকার। রানুকে চাপ দিচ্ছে, বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনতে। এ নিয়ে রানুর সাথে খুব খারাপ আচরণ করছে।’
‘সে কি? এটা তো ভালো কথা না।’ আচমকা রানু বঁাধভাঙ্গা ঢলের মতো কান্না জড়ানো গলায় বলে উঠলো,
‘তোমরা আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছ, বাবা। কী অপরাধ করেছিলাম আমি? একবার আমাকে আগুনে ফেললে। আবার এনে জলে ফেলে দিলে।’ হাজীসাহেব কথা হারিয়ে ফেলেন। খুব অসহায় বোধ হলো তার। সন্তান যখন দায়িত্বহীনতার অভিযোগ করে, তার ভার কোনো বাবা-মা-ই বইতে পারে না। খানিক চুপ থেকে তিনি ভারি গলায় বললেন,
‘সব তোর মা করেছে। কোনো কথা শোনেনি। কোনো বিবেচনা ছিল না তার। এভাবে নিজের মেয়েকে কেউ জলে ফেলে দেয়? একটা বিয়ে দিতে কোন বাছবিচার কি করতে হয় না? একবার চরম ভুল হলো। দ্বিতীয়বার কেউ একই ভুল করে? সম্বন্ধ এলেই নেচে উঠতে হবে?’ বিষয়টা পুরোপুরি নাজমা বেগমের উপর চেপে গেল বলে, তিনি নিজেকে বঁাচাতে ভিন্নপথ ধরলেন। তিনি হাজী সাহেবের গুরুতর অভিযোগ এড়িয়ে গেলেন। কোনোরকম বিব্রতবোধ না করেই বলেলন,
‘আমি তো ওর শত্রু। ওর ভালো চাই না। প্রথমবার কি শুধু জামাইয়ের দোষ ছিল? রানুর কি কোনো ত্রুটি ছিল না? সংসার চালাতে অনেক কৌশলি হতে হয়। গাছেড়ে দিয়ে সংসার হয় না। নিজের বরকে যে হাত করতে পারে না, সে সংসার ধরে রাখবে কীকরে?’ এবার সুযোগ পেয়ে হাজীসাহেব ছাড়লেন না।
‘তোমার মতো সবাই তো দারোগা হতে পারে না। সাতচড়ে যে মেয়ে কোনোদিন রা করেনি, সে যাবে বরের নাকে দড়ি দিতে!’ রানু এতটা অসহিষ্ণু কখনও হয়নি। মায়ের মুখে উপর তার গলা কোনোদিন চড়েনি। চারদিকের শূন্যতা তাকে দিশাহারা করে তুলেছে। আচমকা মাকে সে বলে বসল,
‘তুমি আমার ভাল চেয়েছ? ভালো চাইলে এরকম সব পাষণ্ডের হাতে আমাকে তুলে দিতে না। দেরিতে বিয়ে বলে ঘাড় ধরে বিদেয় করতে না। তখন যদি তুমি একটু ধৈর্য্য ধরতে, তাহলে আজ আর আমাকে করুণার পাত্র হতে হতো না। আমার ছেলে-মেয়েগুলো অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াত না।’ এটুকু বলতে পেরে রানু হঁাপিয়ে উঠলো। তার বুক থেকে যেন একটা বিশাল পাথর সরে গেল। লিখাপড়া কম বলে মায়ের যে অবহেলা, অন্যায় আচরণের শিকার হয়েছে, তার প্রতিবাদ কোনোদিন সে করেনি। অপারগ বাবাও তার জন্যে এগিয়ে আসতে পারেননি। আজ কিছু না পেলো, একটা ক্ষুদ্রতার বিরুদ্ধে সে যে বলতে পেরেছে, এতেই তার মনোস্তাপ কমেছে। কিন্তু পরবর্তী দুর্ভাবনা তার পিছু ছাড়ছে না। তার মনের এই কালোমেঘ বাবা যেন দেখতে পেলেন। হাজীসাহেব নাজমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
‘শোন। মেয়েটা এখানেই থাকবে। ওকে আর ওবাড়িতে পাঠাবে না। ওবাড়ি রানুর জন্যে আর নিরাপদ নয়। ওর জন্যে কোনোদিন কিছু আমি করিনি। আজ যদি ওর পাশে না দঁাড়াই, আল্লাহ্র কাছে আমি জবাব দিতে পারব না। কখনও জোর দিয়ে কিছু বলিনি। আমি চাই আমার এই কথাটার ব্যত্যয় হবে না।’ বিস্ময়কর হলেও নাজমা বেগম সহজেই যেন পরাজয় মেনে নিলেন। তিনি নিরুত্তর থাকলেন। এথেকেই তার মনোভাব বোঝা গেল। একজন উদ্বাস্তু শেষ আশ্রয়টুকু পাবার আশ্বাসে যেমন নির্ভার হয়, রানু তেমনি বোধ করলো। বিশেষ করে রিমা তার কাছে থাকতে পারবে, এই ভাবনা তাকে স্বস্তি দিল। রিমার কথা ভেবে বরাবরই সে কষ্টপায়। ছোট্টমেয়েটা মা ছাড়া পড়ে থাকে। এই কদিনে মেয়েটা কেমন অচেনা ভাব করছে। তার কাছে খুব একটা আসতে চাইছে না। হয়ত মায়ের প্রতি তার অভিমান জন্মেছে। মা তাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেল। আর যে আসেনা। রিমাটা ছোটখালার খুব নেওটা হয়েছে। মিলাই ওর সব কিছু দেখভাল করে। খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনা, সাজপাড়Ñ এসব। কিছু চাইলেও ছোটখালা। পাড়ার গলিতে মালাই আইসক্রিমওয়ালা এলে, রিমা দেঁৗড়ে এসে ছোটখালাকে ধরবে, ‘আইসক্রিম কিনে দাও।’ রাতে সে ছোটখালার সাথেই ঘুমোয়। মিলাও ওকে নিয়ে মেতে থাকে। মা-ছাড়া মেয়েটা নয়ত কিভাবে বেড়ে উঠবে?
বাড়ি ফিরে অবধি অনির্বাণ ব্যাখ্যাতীত অস্থিরতায় পড়ে আছে। তার কানে কেবলই বঙ্গবন্ধুর সেই তেজদীপ্ত কণ্ঠস্বর বেজে চলেছে, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ কী যেন সে বলতে চাইছে। কী এক অজানা কাজ তার এখনি সারতে হবে। ইদানিং কবিতা লেখার বাতিক হয়েছে তার। মাঝে মাঝে ডাইরি খুলে লিখে সে। এর প্রায় সবকটাই রাজনৈতিক কবিতা। এবেলা কটা শব্দ, কটা লাইন তার মনের ঘরে বিক্ষিপ্ত ছুটোছুটি করছে। অনির্বাণ ডাইরিটা খুলে বসল। কলমটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আনমনা বসে থাকল। তারপর লিখল-
‘শেষ-ফাল্গুনের বিকেলটা বড়োবেশি
রোদ্রকরোজ্জ্বল ছিল; ফুল শোভিত ছিলনা
সুউচ্চ মঞ্চ; পায়রা উড়ানো হয়নি সেদিন
উৎকন্ঠিত লক্ষ জনতা ভীষণ জ্বলজ্বলে চোখে
সমবেত ছিল; এতটা নিশ্চুপ আর
কখনও ছিলনা কেউ।
তার অপেক্ষায় ছিল বঙ্গতট অনাদিকাল;
তিনি আসবেন, দেখবেন আর বলবেন-
একটি শব্দের জন্মের ইতিহাস;
হাজার বর্ষে-
কোনদিন কেউ যা বলেনি,
কেউ যে বলতে পারে না তা।
রমনার বৃক্ষবেষ্টিত প্রাঙ্গন জুড়ে
প্রচন্ড জয়ধ্বনি আসমুদ্রে ছড়িয়ে যায়
চঞ্চল শিশুরা থমকে যায়
রাজশিবিরে থেমে থাকে কর্মব্যকুলতা
তিনি বলে যান
রুদ্ধকারার মুক্তির সনদ দিয়ে যান
যেন গেয়ে যান রণগান!
শেষ-ফাল্গুনের রোদ্রকরোজ্জ্বল
বিকেলে নেমে আসে, অমোঘ সেই বাণী;
‘স্বাধীনতা’ শব্দটি কি উচ্ছাসে,
উন্মুক্ত হয়ে যায় চিরতরে।’
কবিতাটা লেখা হয়ে গেলে ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ যেন মনটা নেচে উঠে। দুবার সে কবিতাটা আবৃত্তি করলো। একটা বড়ো কাজ হলো মনে হয়। ভালোই তো লিখছে। সে কি সত্যিই একদিন কবি হয়ে উঠতে পারবে? সবাই তাকে কী ডাকবে? ‘কবি অনির্বাণ হাসান’? সে তো দেশের কাজে জড়িয়ে থাকতে চায়। রাজনীতিই হবে তার পথ। সাথে কবিতা থাকলে বেশ হবে। এই সুখবিলাসে ভাসতে ভাসতে তার হঠাৎ সুবর্ণার কথা মনে হলো। কয়েকটা বই কিনে নিতে বলেছিল ও। এই সভা-মিছিল-হরতালের মধ্যে ভুলেই গেছিল। অবশ্য হরতালে সব দোকানপাট বন্ধ ছিল এদ্দিন। কিছু করাও যেতো না। যাক। কাল অবশ্যই নিউমার্কেট থেকে বইগুলো নিয়ে আসতে হবে।
রানু বরাবরের মতো শিলার ঘরেই স্থান করে নিল। প্রথমবার বিয়ের আগে এই ঘরটা রানুরই ছিল। রানু চলে যাবার পর শিলা নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। বড়ো’পাকে আবার পেয়ে এই দুঃখের মধ্যেও শিলা ভীষণ খুশি। দুবোন রাত জেগে শতকথায় মজে থাকে। অনেক গল্পের মধ্যে শিলা বলছে,
‘বড়ো’পা, তুমি নিজে কিছু একটা দঁাড় করাও। যা তুমি ভালো পার, তাই কর।’ রানু ভেবে বলে,
‘কী করব? আমি তো কিছু পারি না।’
‘কে বললো পার না? এই যেমন, তুমি খুবভালো রান্না কর। সেলাই করতে পার। এর একটা নিয়েই তো শুরু করা যায়।’
‘বল্ দেখি শুনি।’
‘ধর, তুমি সেলাইয়ের কাজ করবে। বেবিড্রেস করতে পার। আর সেগুলো দোকানে দোকানে সাপ্লাই করতে পার। চাই কি, দোকানিরা তোমাকে অর্ডারও করতে পারে।’
‘টাকা লাগবে না? টাকা কোথায় পাব?’
‘কি যে বল! বাবাই তো বললে টাকা দেবে। আচ্ছা দঁাড়াও। আমি বাবাকে বলব।’ রানু আত্মবিশ্বাস খঁুজে পায় না। সংশয় নিয়ে বলে,
‘সত্যি পারব আমি?’
‘নিশ্চয় পারবে। আমি তোমাকে সাহায্য করব। চল, আমরা একটা প্ল্যান করি।’ এই বলে দুবোন দুম করে উঠে বসে। নানা পরিকল্পনা নিয়ে অনেক রাত অবধি জেগে থাকে দুজন। বাইরের বসন্তের দুরন্ত বাতাস জানালা গলে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ছে। সাইড টেবিলের উপরে রাখা ফুলদানির গোলাপগুলো দুলে দুলে পুরো ঘরে সৌরভ ছড়িয়ে দেয়। চঁাদের একচিলতে মায়াময় আলো তাদের বিছানার একপাশে এলিয়ে পড়েছে। প্রকৃতি যেন নতুন কোনোদিনের পূর্বাভাস নিয়ে এসছে। ধীরে ধীরে রানু মনের গভীরে বয়েচলা একটা ঝর্ণাধারা আবিষ্কার করতে পারে, যে তাকে সুখের এক নিটোল ঠিকানায় নিয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সরাসরি রেডিওতে প্রচারের দাবি থাকলেও সামরিকজান্তা সেটা হতে দেয়নি। এতে রেডিওর বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা কর্মবিরতি পালন শুরু করে। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের দাবি মানা হয়। ৮ মার্চে বঙ্গবন্ধুর রেকর্ডকৃত প্রাণের স্ফূরণে ঝংকৃত ভাষণটা রেডিও থেকে প্রচারিত হয়।
অনির্বাণ বইয়ের প্যাকেটটা সুবর্ণার টেবিলে রেখে অপেক্ষা করে। রেবা বললো, সুবর্ণা ছাদে গেছে। রেবা তাকে ডাকতে গেল। অনি ইচ্ছে করলেই সিহাবের ঘরে যেতে পারত। কিন্তু সে সুবর্ণার অভিব্যক্তি দেখার লোভ সামলাতে পারল না। সুবর্ণা ঝড়ের বেগে এসে ঘরে ঢুকল। সরাসরি অনির দিকে তাকিয়ে বললো,
‘বিশ্বাস কর অনিদা। আমি জানতাম, আজ তুমি আসবে।’ সুবর্ণার্র উচ্ছ্বাস অনির্বাণের মনে অচেনা এক অনুরণন দিয়ে গেল। সত্যি কি সুবর্ণা তার আসার অপেক্ষা করে? কেন করে? তার মনে হলো, কিছু একটা বলা উচিত। কিন্তু এর সীমা তার জানা নেই। পাছে সুবর্ণা তার মনের বিক্ষেপ বুঝে যায়, অনি চুপ করে থাকল। সুবর্ণা অনির নিস্পৃহতা এড়িয়ে গিয়ে বললো,
‘মাঝে মাঝে তো আসতে পার। এত ব্যস্ত থাক কেন?’ এবার অনির্বাণের ঘোর কাটল। সে স্বচ্ছন্দেই বলতে পারল,
‘আচ্ছা, এবার থেকে আসব। দেখ্, খুলে। বইগুলো ঠিক আছে কিনা।’ সুবর্ণা তড়িৎ বইয়ের প্যাকেটে হাত দেয়। এক অপার আনন্দে তার মন ভরে উঠে। চড়া গলায় বলে,
‘দারুণ!’ তারপর অনির্বাণের দিকে চেয়ে বলে,
‘তোমার খুব কষ্ট হলো, অনিদা।’
‘আরে না। এ আর কী কষ্ট? তুই পড়তে চেয়েছিস। আমি অনেক আগেই পড়েছি। অসাধারণ!’ সুবর্ণা বইগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলে,
‘অনিদা, আমি একটা পারিবারিক পাঠাগার করেছি। একটা নাম ঠিক করে দিবে? তিন অক্ষরের হলে ভালো হয়।’ অনির্বাণ শুনে খুশি হয়। বলে,
‘ভালো করেছিস। অনেক বই কালেকশান হবে। অনেক বই পড়াও হবে।’ সে সময় না নিয়েই প্রস্তাব করে,
‘দুটো রাবার স্টাম্প বানাবি। একটাতে ‘প্রতীতি-পারিবারিক পাঠাগার’। আরেকটাতে লেখা থাকবে- ‘এই বই তোমার জ্ঞানের যত্ন করছে; অতএব তুমি এর যত্ন কর।’ সুবর্ণা প্রাণিত হয়ে উঠে। বলে,
‘তুমি সত্যি জিনিয়াস। খুবভালো হবে। আমি আজই আব্বুকে বলব স্টাম্পগুলো বানিয়ে এনে দিতে।’ অনির্বাণ উঠতে যাচ্ছিল। সিহাব এসে দঁাড়ায়।
‘কখন এলি?’
‘এই তো। চল্, ব্যালকোনিতে বসি।’ তিনজন ব্যালকোনিতে এসে বসে। এই জায়গাটা অনির খুব পছন্দের। নারকেলের একটা ডাল ব্যালকোনির একপাশে ঝুলে আছে। কোণার দিকে একটা মধুমঞ্জুরি লতিয়ে উঠেছে। সারালতা জুড়ে লাল-সাদা ফুল ফুটে আছে। দখনের আকাশটা পরিষ্কার দেখা যায়। কোনো এক বৃষ্টির দিনে এখানটায় বসতে ইচ্ছে করে অনির। তিনজনের গল্পের মাছখানে রেবা ট্রে-তে নাস্তা সাজিয়ে হাজির হয়। পেছন পেছন খালাম্মাও আসেন। অনি উঠে দঁাড়িয়ে সালাম দেয়।
‘কিরে, কেমন আছিস? কখন এলি?’
‘এই তো খালাম্মা। কিছুক্ষণ হলো।’ খালাম্মা একটা চেয়ার টেনে বসেন। অনিও বসে পড়ে। খালাম্মা ট্রে’র শরফুসটা সরিয়ে একটা তস্তুরি হাতে নেন। চামচ দিয়ে বড়ো বোলটা থেকে বাড়তে বাড়তে বলেন,
‘তোদের জন্য পাস্তা করেছি। আমার এক বান্ধবি লন্ডন থেকে এনেছিল। তবে অরিজিনাল ইটালিয়ান পাস্তা। আগে কখনও রঁাধিনি। দেখ তোরা, কেমন হলো।’ সিহাব লাফিয়ে উঠে বলে,
‘পাস্তা? তুমি খুব ভালো আম্মু।’ আম্মু হাসেন। সবাই একটু ঝঁুকে দেখে। ঢাকাতে পাস্তা খুব একটা মেলে না। বাইরে থেকে যারা আসে, তারা কেউ যদি আনে! খালাম্মা প্রথমে অনির দিকে এগিয়ে দিলেন। অনি আগ্রহ নিয়ে তস্তুরিটা হাতে নেয়। মুখে দিয়ে মৃদু আহ্লাদ করে বলে,
‘আহা! দারুণ। খুব ভালো করেছ, খালাম্মা।’ খালাম্মা হেসে বলেন,
‘যাক। হলো তাহলে।’ তিনি একে একে বেড়ে দিতে প্রসঙ্গ পাল্টে বলেন,
‘আচ্ছা রে অনি, দেশের কী হবে? বঙ্গবন্ধু তো বলতে গেলে স্বাধীনতা ঘোষণাই করে দিয়েছেন। এখন সমাধানটা কী?’ অনির্বাণ মুখের খাবার শেষ করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
‘খালাম্মা, আমি যতদূর জানি, বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করছেন না, সেনাচক্র বাঙালির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিবে। সেক্ষেত্রে তঁার একটাই পথ- স্বাধীনতা। কিন্তু তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতা। তঁাকে তো নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করেই চলতে হয়। তিনি হঠকারী কিছু করতে পারেন না। সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে, তঁাকে অস্ত্র হাতে নামতে হবে। সেই সুযোগ কই? একটা নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চাট্টিখানি কথা নয়। খালি হাতে লড়তে যাওয়া, আর জেনেশুনে আগুনে ঝঁাপ দেয়া সমান কথা।’ এতটুকু বলে অনির্বাণ থামে। খালাম্মা অধীর হয়ে প্রশ্ন করেন,
‘তাহলে উপায়?’ অনির্বাণ আবার বলতে শুরু করে,
‘জান খালাম্মা, ছাত্রনেতাদের মধ্যে একটা অংশ নির্বচনেই রাজি ছিল না। তারা তখনই অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নামতে চেয়েছিল। এই অংশটার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিরাজুল আলম খান। তারা বঙ্গবন্ধুকে ‘চে গেভারা’ বানাতে চায়। তারা বঙ্গবন্ধুর উপর সেই থেকে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে চলেছে, তিনি যাতে সহসা সশস্ত্র বিপ্লবের দিকে যান। বিশেষ করে এই ৭ই মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু যেন পরিষ্কার স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেন। বঙ্গবন্ধু কি সেটা পারেন? তঁাকে তো শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে। তারপর ঘোষণা। বন্দুকের মুখে খালিহাত সাতকোটি বাঙালিকে ঠেলে দিয়ে কোনোদিনও স্বাধীনতার মুখ দেখা যাবে না, এটা বঙ্গবন্ধুর চেয়ে কে ভালো জানে? কোনো দায়িত্বশীল নেতা এটা করতে পারেন না। তখন না হবে আন্তর্জাতিক সমর্থন, না হবে স্বাধীনতা। বিচ্ছিন্নতাবাদের অপবাদ নিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন অন্কুরেই শেষ হয়ে যাবে। তুমিই বল, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া একটা মুক্তিযুদ্ধ কি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব? তাই বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত হিসেব কষে পা ফেলতে হয়। তার দিক থেকে যেন কোনো ভুল না হয়ে যায়। আবার প্রয়োজনে যেন আন্তর্জাতিক সমর্থন-সহযোগিতা পাওয়া যায়। আমার ধারনা, এখন সামরিকচক্র কী পদক্ষেপ নেয়, তার উপর বঙ্গবন্ধু করণীয় ঠিক করবেন।’ সন্ধ্যার ম্লান- আলো ছড়িয়ে পড়ছে। মধুমঞ্জরীর ঝেঁাপে হাজারটা চড়ুই সাংঘাতিক কিচিরমিচির লাগিয়েছে। দূরের বসন্ত-আকাশে অসংখ্য চিল চক্রাকারে উড়ছে। এই স্বল্প আলোতেও অনির্বাণের উজ্জ্বল মুখ সুবর্ণার নজর এড়ায় না। খালাম্মা এতক্ষণ গভীর মনোযোগে অনির্বাণের কথা শুনছিলেন। তিনি ছেলেটার বিশ্লেষণে মুগ্ধ হলেন। মনে ভাবলেন, এই ছেলে একদিন অনেক বড়ো নেতা হবে। তার মনে আশা জাগল, এই দামাল ছেলেরা একদিন স্বাধীনতা আনবেই। তিনি নিরবে আর্শ্বিাদ করলেন। বায়তুল মোকার্রাম মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলো। খালাম্মা উঠে ভেতরে গেলেন।
সুবর্ণার পাঠাগার গোছানো হয়ে গেছে। দোতলার কোণার রুমটা, যেটা মূলত গেস্টরুম হিসেবে এতকাল ব্যবহৃত হয়েছে, সেটা হয়ে গেল ‘প্রতীতি’। দরজার চৌকাঠে একটা সোনালী রঙের নামফলক লাগানো হয়েছে। রুমের একপাশে লাগোয়া দুটো নতুন আলমারি রাখা। কঁাচের ভেতর দিয়ে থাকে থাকে নতুন সব বই। দেখতে বেশ লাগছে। রুমের অন্যপাশে টেবিল-চেয়ার; পাঠাগারের কাজের জন্যে। তৃতীয় পাশটাতে একটা ডিভান আছে। বাড়ির অতিথি কেউ প্রয়োজনে এখানেই থাকতে পারবেন। পুরো রুমটা হালকা আকাশি রঙ করা। পূর্বদিকে একমাত্র জানালাটায় গাঢ় নীল রঙের পর্দা ঝোলানো। সুবর্ণা নিয়ম করেছে, পাড়ার বান্ধবীরাও পাঠাগার থেকে বই ধার নিয়ে পড়তে পারবে।
আজ ‘প্রতীতি’র উদ্বোধনী। চারদিক নানা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। সুবর্ণা সকাল থেকেই বান্ধবীদের নিয়ে একাজে লেগেছিল। পাঠাগারের খোলা দরজাটা লাল রঙের ফিতে দিয়ে আটকানো। উদ্বোধক সেটা কঁাচি দিয়ে কেটে ভেতরে যাবেন। ব্যালকোনিতে টেবিল পেতে নানা পদের খাবার সাজিয়ে রাখা। বিকেলে সুবর্ণার বান্ধবীরা যথাসময়ে হাজির হয়েছে। সুবর্ণা বান্ধবীদের নিয়ে মেতে আছে। তাকে সবার থেকে আলাদা লাগছে। এমনিতে খুব সুন্দর দেখতে সে। অদূরে সিহাব ও অনির্বাণ পাশাপাশি দঁাড়িয়ে গল্প করছে। এরমধ্যে সিহাবের বাবা-মা এলেন। তারা হাসিমুখে একে একে সবাইকে কুশল জিগ্যেস করছেন। ‘প্রতীতি’ উদ্বোধন করবেন সিহাব-সুবর্ণার আব্বু আনিস সাহেব। সুবর্ণা ছুটে এসে বাবার হাত ধরে ‘প্রতীতি’র দরজার নিয়ে আসে। অন্যরা সব ভিড় করে দঁাড়ায়। সুবর্ণার বান্ধবী নীলা প্লেটে করে একটা কঁাচি এনে আনিসসাহেবের সামনে ধরে। হাস্যোজ্জ্বল আনিস সাহেব কঁাচিটা হাতে নিয়ে ফিতে কেটে দেন। উল্লসিত ছেলে-মেয়েরা হাততালি দিয়ে হুল্লোড় করে উঠে। সম্মিলিতভাবে সবাই পাঠাগারে প্রবেশ করে। সুবর্ণার এই উদ্যোগ খুব ভালো লাগে অনির্বাণের। বই পড়ার নেশা মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়। সে ভাবে, বেশ কিছু বই উপহার হিসেবে নিয়ে আসবে। উদ্বোধনের পর পর অতিথিরা খাবারপর্বে মেতে উঠেছে। ওদিকে গিটার হাতে সিহাব গাইতে শুরু করেছে- “সংকোচের বিহ্বলতা নিজের অপমান/ সংকটের কল্পনাতে হইও না ম্রিয়মান…”। সাথে সাথে সুবর্ণা ও তার বান্ধবীরা গলা মেলাচ্ছে। সবকিছু ছেড়ে সিহাবের কণ্ঠের উদাত্ত ধ্বনি বসন্ত-বিকেলের উজ্জ্বল আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। সে ধ্বনি সমবেতের বুকের মধ্যে অনন্যদৃঢ় এক দীপ্তি জাগিয়ে তুলছে। সত্যি ভালো গায় সিহাব। গান শেষ হতেই স্বতঃস্ফূর্ত তালি পড়ে। সিহাব অনিকে ধরে কবিতা আবৃত্তি করতে। অনির্বাণ পাশকেটে যেতে চায়। সুবর্ণার চাপাচাপিতে সে আর ‘না’ করতে পারে না। অনির্বাণ কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি করে। আসন্ন সন্ধ্যার প্রাঞ্জল প্রকৃতির বুক চিরে যেন ধ্বনিত হয়, “অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে/ উজ্জ্বল করো, নির্মল করো, সুন্দর করো হে…”।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গেলেও একটা অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ইয়াহিয়ার বাগাড়ম্বর এখন আর কেউ বিশ্বাস করছে না। ২৫ মার্চের অধিবেশন যেন একটা টোপ। ভেতরে কী ষড়যন্ত্র চলছে জানা যাচ্ছে না ঠিক; তবে ঘটনাস্রোত বাঙালি বেশ আন্দাজ করতে পারছে। পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদরাই যে অপতৎপরতার নাটেরগুরু সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদিও পশ্চিম পাকিস্তানি কজন রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন করছেন। তারা বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন। এদিকে ছাত্রনেতারা দফায় দফায় মিটিং করছেন। অনির্বাণ তার সহগামী- নাঈম, আরিফসহ অন্যদের নিয়ে সার্বক্ষণিক ইকবাল হলে অবস্থান করে ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। তারা লক্ষ্য করছে, ছাত্রনেতাদের মধ্যে একধরণের যুদ্ধপ্রস্তুতির মনোভাব। কেউ কেউ গোপনে বলছেন, ২৫ মার্চের মধ্যে বড়োরকমের বিপর্যয় ঘটতে পারে। সামরিকজান্তা দমন অভিযানে নেমে বাঙালির মনোবল ভেঙে দেবার চেষ্টা করতে পারে। এর আগে থেকেই বিভিন্ন শহর থেকে গুপ্তহত্যার খবর আসছে।
এই জটিল রাজনৈতিক আবর্তে ইকবাল হলে ছাত্রনেতাদের জরুরি এক মিটিং-এ নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ.স.ম আব্দুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনকে নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ গঠিত হয়েছে। এই পরিষদের উপর স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তারা বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের অনুরোধ জানান। মিটিং-এ ছাত্রনেতারা সিদ্ধান্ত নেন, এখন থেকে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’-এর বদলে শুধু ‘ছাত্রলীগ’ লিখতে হবে। এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এসব পদক্ষেপ থেকে বুঝা যায়, ছাত্রনেতারা পুরোপুরি স্বাধীনতার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর যেন পিছনে ফিরে যাবার সুযোগ নেই। ৯ মার্চে পল্টনের মিটিং-এ মাওলানা ভাসানী ইয়াহিয়াকে স্বাধীনতার দাবি মেনে নিতে বলেন। ২৫ মার্চের মধ্যে কিছু না হলে, তিনি শেখ মুজিবকে সাথে নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুমকি দেন। খবর বেড়িয়েছে, এই জনসভার আগে ভাসানীর সাথে বঙ্গবন্ধুর টেলিফোনে কথা হয়। পূর্বাহ্নে ঘোষিত হয়েছে, কদিনের সফরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তান আসছেন। শত ধেঁায়াশার মধ্যেও লোকে এই সংবাদে কিছুটা আশাবাদী হতে চায়। অনির্বাণ ভাবছে, দেখা যাক, জল কোনদিকে গড়ায়!
সন্ধেবেলাটা অনির্বাণের প্রিয় সময়। নিজের টেবিলে বসে কিছু একটা লিখতে বা একা একা ছাদে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে তার। কদিন থেকে আবার নিয়মিত ডাইরি লিখছে সে। নানা ব্যস্ততায় মাঝখানে ছেদ পড়েছিল। আজও ডাইরি হাতে বসেছে সে। সে লিখল,
“১০ মার্চ ১৯৭১। সারাদেশে আসহযোগ চলছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতে আজও কেউ যায়নি। বঙ্গবন্ধুর আগের নির্দেশ মোতাবেক অফিস-আদালত, বাড়ি বাড়ি কালো পতাকা উড়ছে। এমনকি পুলিশ লাইন ও পুলিশের গাড়িতে কালো পতাকা। কোথাও কোথাও স্বাধীন বাংলার পতাকাও উড়ানো হয়েছে। সবুজ জমিনে লাল বৃত্ত ও সোনালি মানচিত্রখচিত পতাকাটা নতুনদিনের হাতছানি দিচ্ছে। আজ বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতে বলেছেন, ক্ষমতাসীনচক্র প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোবৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তে লিপ্ত।”
“আজ ইকবাল হল প্রাঙ্গণে আজ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উদ্যোগে কর্মিসভা হয়েছে। গুম-খুন-হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে এখন পর্যন্ত যেসব বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উড়ানো হয়নি, সেসব স্থানে তা উড়াতে অনুরোধ করা হয়েছে। ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নেতাদের স্বাক্ষরিত স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আরেক বিবৃতে বাঙালি সেনা, ইপিআর ও পুলিশের সদস্যদের প্রতি পাকিস্তানি উপনিবেশবাদী সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।”