গল্পেরা জোনাকি তে স্মার্ত পরিয়াল – অন্তিম

আই ফিল দ্য এন্ডিং, বিফোর ইট ইভেন স্টার্টস

এরপর যে যার ঘরে চলে গেলাম। সত্যিই তো,এই দুনিয়াতে সব কিছুই কেমন অবাস্তব। আগে মাথায় আসেনি কেন এসব কে জানে। আসলে স্বপ্নগুলো দেখার পর থেকে মন মেজাজ ঠিক থাকত না,ওই নিয়েই ভাবতে থাকতাম। তাই আর অন্য কোনোদিকে খেয়াল করিনি ঠিক করে। এসব ভাবতে ভাবতেই সারাদিন কেটে গেল। মনে হল আমার তো আর অস্তিত্ব থাকবে না। বরং কিছু একটা করি যাতে আমার সৃষ্টি থেকে যায়। তখনই ভাবলাম ঘটনাটা লিখে যাই। আমার মৃত্যুর পর সবাই জানতে পারবে কীকরে এতকিছু হল। আর এমনটা আসলেই হয়। সেইদিনই লিখে ফেললাম পুরো গল্প। পরের দিন কী হবে জানি না।

ঘুম ভাঙল। স্বপ্নও দেখলাম। একটা বাজে স্বপ্ন। মরতে যদি আমাকেই হতো বিষয়টা অনেক সহজ হতো। বিষয়টা অংশুমানকে বললাম। ও বলল,’বাহ,তাহলে তো হয়েই গেল।কিন্তু কীভাবে?’
-‘আমি ফোর্থ ডাইমেনশনাল অবজেক্টটা দেখেছি। একটা বিশাল বড়ো স্পেসশিপের অংশ।’
-‘হুমম। অস্বাভাবিক কিছুই নয়। দিনে না রাতে?’
-‘দিনেই। কিন্ত আমাকে খুন করতে হবে না। ওটা নিজেই এসে ধাক্কা মারবে তোর রুমে। ভেঙে গুড়িয়ে যাবে তোর রুমটা। আর এভাবেই….’
-‘ঠিক আছে বন্ধু। আর কয়েক ঘণ্টা বাকি জীবনের। চলো সেটা নেশার ঘোরে কাটাই। কষ্ট কম হবে।’
চোখে জল চলে আসছিল আমার। কিন্তু নেশা করতে চাইছিলাম না। কারণ আমাকে সজাগ থাকতেই হবে। ওকে ওর ঘরে পাঠাতে হবে। নাহলে সব শেষ হয়ে যাবে। আমি ভাবতেও পারছি না আমাদের এতদিনের বন্ধুত্ব এই পরিণতি পাবে। দুজনে ঠিক করে নেশাও করিনি। যে যার ঘরে চলে যাচ্ছিলাম। এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। অংশুমান নিজের রুমে যাওয়ার আগে বলল,’হয়তো সবাই আমাকে ভুলে যাবে। ট্যানজেন্ট ইউনিভার্সে যে হারিয়ে যায় তার কথা কারুর মনে থাকে না। তবে বলতে কষ্ট হচ্ছে যে তোর মনে থাকবে আমাকে। সবকিছুই মনে থাকবে,কারণ তুই হিরো।’
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। দুজনে দুজনকে আলিঙ্গন করে যে যার ঘরে চলে এলাম। এখন মনে হচ্ছে নেশা করলেই হতো। কষ্টটা এতটা হতো না। অংশুমান কিছুক্ষণ পর আমাকে ফোন করে বলল ওর ঘরে আসতে। একটু অবাক হলেও গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হল?’
ও বলল,’বস একটু।’
এই বলে অংশুমান দরজাটা দিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। হঠাৎ শুনতে পেলাম দরজা লক করার আওয়াজ। আমি চমকে গেলাম!থতমত খেয়ে বললাম,’অংশুমান!কী করছিস?দরজা দিচ্ছিস কেন!’
অংশুমান বলল,’এই রুমেই দেখেছিস না আমাকে মরতে?এবার মর তুই।’
আমার প্রচন্ড রাগ হল, বললাম,’দরজা খোল তুই পাগলামি করিস না। মরতে তোকেই হবে,আমি মরলে সব শেষ হয়ে যাবে।’
-‘কিচ্ছু শেষ হবে না। তুই বা আমি একজন মরলেই হবে। সবচেয়ে বড়ো বলিদান হয় যে হিরো সে নিজে সুইসাইড করলে। আমাকে এসব শেখাতে আসিস না।’
-‘কিন্তু কেন করছিস এমন?তুই চাস আমি…’
-‘হ্যাঁ,চাই। নিজের জীবনের থেকে বড়ো কিচ্ছু হয় না। আমি বাঁচব তুই মরবি। আর একটু পর তোর কোনো স্মৃতি আমার থাকবে না,কারণ হিরো তুই,আমি না। বাকি জীবন আমার কোনো আফসোস হবে না এই ঘটনা নিয়ে।’
-‘অংশুমান,আমার কথা শোন আমি তোকে মিথ্যে বলেছি। স্বপ্নে তোকে নয়,আমি নিজেকে দেখেছি। হ্যাঁ এটাই সত্যি। আমি দেখেছি অবজেক্টটা তোর রুমে না আমার রুমে এসে পড়েছে বিশ্বাস কর।’
ওদিক থেকে কোনো শব্দ পেলাম না। জোরে ধাক্কা দিতে থাকলাম দরজা। আমি মিথ্যে বলেছিলাম যাতে একটুকু মুহূর্তও ওর খারাপ না লাগে। আমি মরলে পরে ও এমনিই ভুলে যেত সব। কিন্তু ও এমন করবে আমি ভাবতে পারিনি। এতদিনের বন্ধুত্ব নিজের বেঁচে থাকার কাছে হেরে গেল। আমি ওকে ফোন করলাম। বললাম সব,যে আমি নিজেকে দেখেছি ওকে দেখিনি। ও কিছুতেই শুনল না আমার কথা। বলল,’এখন আর ভাট বকে লাভ নেই। আর কিছুক্ষণ তারপরেই।’
আমি বললাম,’তুই ওই রুম থেকে না বেরোলে তুইই মরবি। আমাকে এই রুমে আটকে রাখছিস রাখ কিন্তু নিজে ওই রুমে থাকিস না! যা ওখান থেকে….’
সঙ্গে সঙ্গেই বিশাল জোরে একটা শব্দ পেলাম,’হ্যালো,অংশুমান….হ্যালো!’
কোনো উত্তর এল না। কোনরকমে দরজা ভেঙে পাশের ঘরে গিয়ে দেখলাম,একটা স্পেসশিপের টুকরো ছাদ ভেঙে ঢুকে পরেছে অংশুমানের দেহের ওপর। প্রাণ এখনো আছে। ওর কাছে গিয়ে বললাম,’এটা তুই কী করলি?কেন করলি?’
অংশুমান বলল,’চিন্তা করিস না,তোর কোনো স্মৃতি থাকবে না।’
আমি চমকে গেলাম! তার মানে হিরো আমি না! ওটা অংশুমান ছিল! আমি জিজ্ঞেস করলাম,’কীকরে?কেন বল?’
ও বলল,’ওরে পাগল,বলেছিলাম না হিরোর কাছে অনেক ক্ষমতা থাকে,আর অন্য সব শক্তি হিরোকে সাহায্য করে সেই কাজটা করতে? এখানে তো তুইই আমাকে সাহায্য করতিস স্বপ্ন দেখে।’
-‘কিন্তু,তুই কীকরে বুঝলি যে আমি মিথ্যে বলছি?’
-‘কিছু ক্ষমতা আমারও ছিল। মাইন্ড রিড করার ক্ষমতা ছিল আমার। প্যারালাল ইউনিভার্সে হয়তো তুই মরেছিস,কিন্ত এই ট্যানজেন্ট ইউনিভার্সে আমি মরলাম। আত্মবলিদান!’
এরপর আসতে আসতে অংশুমানের দেহটা মিলিয়ে যেতে লাগল। অদৃশ্য হতে থাকল। আর তার সাথে সাথে চোখের সামনে সবকিছু মিলিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছি আর সময় নেই। আসল পৃথিবীতে আমার এই বন্ধুটার কোনো স্মৃতি থাকবে না। কেউ জানবে না,এই বন্ধুটা এই পৃথিবীর জন্য কী করেছে।

ট্যানজেন্ট ইউনিভার্সের পতনের পর আসল পৃথিবীতে,
পুরনো জিনিসপত্র ঘাটছিলাম। কত বইপত্র। কত কী নষ্ট হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখের সামনে একটা ডায়েরি দেখলাম। আরে এতো আমারই হাতের লেখা। কিন্ত আমার তো মনে পড়ছে না এই লেখা সম্পর্কে। দেখি তো পড়ে দেখি। প্রথম লাইনেই লেখা,’I feel the ending, before it even starts’।

 

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।