সেটাও এক মহাষষ্ঠীর সন্ধ্যে। সাড়া শহর আলোর মালায় মোড়া। উল্টোডাঙ্গা ভীড়ে থিকথিক। অলি গলি দিয়ে খানিকটা ভেতরে ঢুকে বোস-বাড়িতে তখন দেবীর বোধন চলছে। তারপর অধিবাস। ঠাকুরদালান লোকে ভরতি। ধুপ-ধুনোর গন্ধ, ঢাক-কাঁসরের শব্দ, শাঁখ আর সমবেত উলুধ্বনিতে যখন উঠোনের মাঝখানেই একফালি স্বর্গ নেমে আসছে আস্তে আস্তে, শতাধিক বছরের পুরোনো ঐ বাড়ির ছাদের কার্নিশে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে আঠারো বছরের রঙ্গন আর ষোলোর দেবারতি। দুজনেরই চোখ নীচের দিকে, পুজো দেখার উৎসাহে নয়, কখন বাড়ির কে ছাদে চলে আসে সেটা খেয়াল রাখার জন্য।
– নীচে চলো রঙ্গনদা, হাত ছাড়ো। আমার ভয় করছে।
অত হট্টগোলের মাঝে দেবারতির কণ্ঠস্বর যেন ঠিক রঙ্গনের কানে গেলোনা।
দেবারতি টেনে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। রঙ্গন আরও জোড়ে হাতটা মুচড়ে ধরলো।
-কি করছো কি এসব? পুজোর দিনে? ছাড়ো বলছি।
দেবারতি আবার একবার জোড়ে হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো।
-পারবি ছাড়াতে!
বলেই ঠোঁটের কোণে মুচকি একটা হাসি নিয়ে ওর দিকে তাকালো রঙ্গন।
-পুজোর দিনে পাপ হবে।
-আচ্ছা! তাই নাকি! তাহলে কবে? একাদশীর দিন? আমি তো বাড়ি ফিরে যাবো সকালেই।
-আমি জানি না। কি হবে বলো তো? তুমি তো আমার দাদা, দাদার সাথে আবার এসব হয় নাকি!
-কেন, হচ্ছে তো!
নীচে আরতি শুরু হয়েছে। ঝাড়বাতির আলো, প্রদীপের দুলতে থাকা শিখা, প্রতিমার জড়ির সাজ সব মিলিয়ে যেন এক চোখ ধাঁধানো জৌলুস চলকে পড়তে থাকলো বাড়ি জুড়ে। সেই আরতির আঁচ বাতাসের সাথে মিশে উড়ে গেলো ছাদে। দেবারতির বুক, চিবুক, গাল ছুঁয়ে কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে যেই সেই আঁচ উঠে গেলো আকাশের দিকে, ওর মুখ যেন কোনো অকাল বসন্তের আবাহনে রাঙা হয়ে উঠলো এই মধ্য শরতে।
দুই নিকট আত্মীয় ভাই-বোন নাকি প্রণয়াসক্ত যুবক যুবতী আলিঙ্গন করলো নিজেদের। কোলকাতার আকাশে তখন অজস্র বাজির মেলা। কত উড়োজাহাজ উড়ে যাচ্ছে অগ্নি থেকে ঈশান কোণে। কাছের, দূরের কত মন্ডপ থেকে ভেসে আসছে কত ঢাকের আওয়াজ, মাইকে মন্ত্রোচ্চারণ। তিলোত্তমা জুড়ে শারদোৎসব বিকশিত হচ্ছে কত সহস্র আয়োজনের চরিতার্থতায়।
আলিঙ্গনের পর তখন ওরা পাশাপাশি বসে আছে। বাড়ির পোষা কুকুর ‘টুল্টুল’ ছাড়া ওদের সেই নির্বাক প্রেম বিনিময়ের আর কোনো সাক্ষী নেই।
দেবারতির হাতটা রঙ্গনের কোলে। রঙ্গন একহাতে ওর হাত ধরে আছে আর অন্য হাতে ‘টুল্টুল’-র মাথায় হাত বোলাচ্ছে। ক্রমশ যেন ওর ঘোর লেগে আসছে। দেবারতি ওর মামার মেয়ে। ওর থেকে দু’বছরের ছোটো। ও নিজে এবছরই কলেজে ভরতি হয়েছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং –এ। ছোটো থেকেই ওর ছবি আঁকার খুব শখ, কিন্তু ও তো খুব ‘ব্রাইট’ স্টুডেন্ট, তাই বাড়ির লোকের মতানুসারে ঐ ইঞ্জিনিয়ারিং-ই কেবলমাত্র ওর মেধার যোগ্য পরিচায়ক। দেবারতি যদিও খুব যে মেধাবী তা নয়, তবে মোটামুটি নম্বর পেয়েই পাস করে যায়। কিন্তু ও খুব ভালো নাচে। সেবার সরস্বতী পুজোয় পাড়ার স্টেজে বাসন্তী রঙের শাড়ি পড়ে সেই যে ‘মধুর ধ্বনি বাজে’তে নেচেছিলো, সেই নাচ দেখেই রঙ্গনের মনে প্রথম সেই উষ্ণতার পরশ লাগে। নিজেকে বিশ্বাসই করতে পারেনি ও। স্কুলের একজন বন্ধুকে বলেছিলো পরের দিনই।
– ধুর, এটা আবার হয় নাকি! ও তো তোর বোন হয়!
এই কথাটাই বলেছিলো সেই বন্ধুও।
হয়না, হয়না, কিন্তু হচ্ছে তো!
ক্লাস টেনে ভালো রেজাল্ট করার পর শহরের নামী ইংরাজী স্কুলে চলে যায় রঙ্গন। নির্ভেজাল বাংলায় গল্প করা সোজাসাপ্টা ছেলেটার সঙ্গ পাল্টাতে বিশেষ দেরী হয়না। কথার মাঝে মাঝে দু-তিনটে ইংরাজী গালি দিতে শেখে, টিউশনের ফাঁকে সিগারেটের ধোঁয়া, বন্ধুর বাড়িতে পড়তে যাওয়ার নাম করে গিয়ে সেই সব ছবি দেখা যাদের নাম বলা বারণ, সুযোগ বুঝে বাবার পকেট থেকে ইচ্ছে মতন সম্পত্তি আহরণ – পড়াশোনার পাশাপাশি সবেতেই নিজের দক্ষতার ছাপ রেখে যায় রঙ্গন মিত্র।
এরপরেই মামার বাড়ি এসে কখন সেই লুকোচুরি খেলার ফাঁকে দেবারতিকে এসব বলে দেয় ও। কিশোরী দেবারতি কিছু বুঝে, কিছু না বুঝেই দুর্বল হয়ে পড়ে রঙ্গনদার ওপর।
সবার চোখের সামনে থেকেও যে কীভাবে কোন গোপন পথে এই অভিসার চলেছে, তার কেউ টের পায়না।
মহাষষ্ঠীর সন্ধ্যায় শিশির ঢালা ছাদের কোলে দেবারতির পাশে বসে থাকা রঙ্গনের মাথায় এসবই ভীড় করতে থাকে। ও চোখ বন্ধ করে গুম হয়ে বসে।
———————————————————————————-
– কি হলো রঙ্গন দা! শরীর খারাপ লাগছে?
চোখ খোলে রঙ্গন।
কোথায় ওর মামার বাড়ির ছাদ! কোথায় সেই ষোড়শী দেবারতি, যে ‘প্রেম’ শব্দটার মানে জানার আগেই উপলব্ধি করতে হাবুডুবু খেয়েছিলো একদিন! ও তো কোলকাতা এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে আছে!
অদিতি বোস – বাংলা চলচ্চিত্র জগতের প্রথম সারির অভিনেত্রী, নায়িকা।
– ওয়াশ রুম থেকে একবার ঘুরে আসবে?
দেবারতি, থুরি অদিতি নিজের হাতটা দিয়ে রঙ্গনের কপালটা ছুঁয়ে দেখে।
– না, গা তো গরম নেই।
তুমি সিওর? ফ্লাইটে কোনো অসুবিধা হবেনা, তোমার?
এবার রঙ্গন উত্তর দেয়।
– নারে, প্রবলেম হবেনা।
সাতজন ছেলেমেয়ের একটা দল হই হই করতে করতে হাজির হয় অদিতির সামনে। খাতা, পেন বাড়িয়ে দেয়
– ম্যাম, অটোগ্রাফ প্লিজ।
– সিওর।
খাতা-পেনটা নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে নিজের নাম লিখে দেয় অদিতি। সঙ্গে আরও দু’টো শব্দ, ‘উইথ লাভ’।
– ম্যাম, ওয়ান সেলফি টু, প্লিজ।
অদিতির মুখে একটা প্লাস্টিক হাসি, বাঁ হাতে করে সামনের চুলটা একটু অগোছালো করে ওদের সঙ্গে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে যখন অদিতি হাসছে, ওর মুখের দিকে তাকায় রঙ্গন। বাঁ কাঁধের ওপর ছোট্ট তিলটা ছাড়া আর কোথাও কোনো মিল পায়না সেই দেবারতির সাথে। না সেই ভাসা ভাসা চোখ, না সেই লাজুক অকৃত্রিম হাসি, না সেই বোকা বোকা চুপ করে থাকার প্রবণতাটা। এখন ও বাকপটু, মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে পাল্টে ফেলতে পারে অবলীলায়।
অ্যানাউন্সমেন্ট হয়।
ছেলেমেয়েগুলো ছবি তুলে ফিরে যায়। যাওয়ার সময় ওকে উইশ করে যায়,
– হ্যাপি পুজা ম্যাম।
ও পাল্টা উত্তর দেয় – হ্যাপি পুজা টু ইউ টু। সঙ্গে সেই কৃত্রিম হাসিটাও।
রাতারাতি দেবারতিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো কার্সিয়াং-এর বোর্ডিং স্কুলে।
মেধাবী ছাত্র এবং ছেলে – এই কারণে কোনো আঁচই অবশ্য তেমন লাগেনি রঙ্গনের গায়ে। তারপর থেকে কোনো পুজোয় দেবারতি বাড়ি আসেনি।
বছর চারেক পর রঙ্গন খবর পেয়েছিলো যে ও কোলকাতা ফিরে আসছে, মডেলিং করার জন্য। পারিবারিক অশান্তির জন্য উল্টোডাঙ্গার ঐ শরীকী বাড়ি ছেড়ে চলে যায় দেবারতি।
বছর কয়েক পর টেলিভিশন, ছবির পর্দায় যখন ওর মুখটা চিনতে পারে রঙ্গন, তখন বিয়ের পর ওর ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে।
তারপর জাতীয় পুরস্কার, নামকরা পরিচালকদের ছবিতে মুখ্য অভিনেত্রীর সম্মান, ছবির জগতে ধূমকেতুর মতন আবির্ভাব অদিতি বোসের।
এখন রঙ্গন সত্তর হাজার টাকা মাইনের চাকরি করে। আজ ষষ্ঠী, অফিসের কাজে ব্যাঙ্গালোর যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে লাউঞ্জে অপেক্ষা করছিলো ও। চোখ বন্ধ করে বসেছিলো, হঠাৎই চেনা গলা শুনে চমকে ওঠে।
পাশে দাঁড়িয়ে নাম ধরে ডাকছে দেবারতি, না, অদিতি বোস।
———————————————————————————–
মাথাটা আবার যেন ধরে আসছে। বাড়ি ফিরে এসে প্রেসারটা চেক করাতেই হবে এবার।
অ্যানাউন্সমেন্ট হলো আবার। এবার রঙ্গনের ওঠার পালা।
উঠে দাঁড়াতেই চোখে পড়লো সীটের পাশেই পড়ে থাকা একটা কাগজে দেবারতির সই, ‘অদিতি বোস’ উইথ লাভ।
ও বুঝতে পারলো যে, হই হই করতে গিয়ে ছেলেমেয়ের দলের থেকেই কেউ ফেলে রেখে গেছে অটোগ্রাফটা।
কাগজটা তুলে ভাঁজ করে নিজের পার্সের ভেতর ভরে রাখলো রঙ্গন।
মনে মনে ভাবলো, দেবারতি নাই হোক, অন্তত নায়িকা অদিতি বোসের সঙ্গে সাক্ষাতের একটা চিহ্ন তো রয়ে গেলো।