ক্যাফে গল্পে সঞ্জীবন হাটী

রূপকথা

রুক্ষ শুস্ক শীতের তখন ফিরে যাওয়ার পালা। আদর-করা উষ্ণতা নিয়ে হেমন্ত আসছে এই সনাতনী পুণ্যভূমিতে। ভারতবর্ষে। এখানেই দেখা হয়েছিলো শকুন্তলার সাথে দুস্মন্থের। দেবতার স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন পাথর হয়ে যাওয়া অহল্যা। মাটির তলা থেকে উঠে এসেছিলো এক সদ্যজাতা শিশুকন্যা, সীতা। অগ্নির থেকে সৃষ্টি হয়েছিলেন পাঞ্চালী। অর্জুনের সান্নিধ্যে নিজের লাস্যকে আবিস্কার করেছিলেন চিত্রাঙ্গদা। যে ভারতবর্ষে বারবার এরকম ভাবেই বদলে গিয়েছে চেনা ছকে বাঁধা ক্লীব পথের যাত্রা, সমস্ত সংজ্ঞাকে ধুলুণ্ঠিত করে তৈরি হয়েছে নতুন জীবনের, শৈলীর, দর্শনের, মাত্র কয়েকদিন আগে সেই ভারতবর্ষেই ঘটে গেলো সেরকমই আরও একটা ঘটনা। দক্ষিণে কেরালার মন্দিরে মন্দিরে তখন হয়তো যক্ষিণীদের আনাগোনা। হয়তো আকাশ থেকে নিনাদিত হচ্ছে শঙ্খ। পুষ্পবৃষ্টিতে স্নাত হচ্ছে রাজপথ। গোধূলির মায়াভরা আলোয় সেজে স্বর্গ থেকে আশিস বর্ষণে ব্যস্ত দেবতারা। জন্ম নিচ্ছে এক ফুটফুটে শিশু। প্রসব করছেন তার বাবা। তার মা অপেক্ষারত কাছেই, কিন্তু তিনি জন্মদাত্রীর ভূমিকা পালন করছেন না।

আসমুদ্রহিমাচলের সমস্ত জড়তাকে আঙুল দেখিয়ে, মানসিক সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করে, সারা বিশ্বের অগণিত মানুষের শুভেচ্ছাকে সঙ্গে করে, এই পবিত্র মাটিতে ভূমিষ্ঠ হলো দেশের এক রূপান্তকামী দম্পতির প্রথম বায়োলজিকাল চাইল্ড।

এ যেন এক রূপকথা। সন্তানের মা জিয়া, জন্মেছিলেন পুরুষের শরীর নিয়ে। বাবা জাহাদ, নারীর শরীরে। কিন্তু অদৃশ্য মনের শক্তি এই নশ্বর শরীরের তুলনায় এতোটাই বেশী, যে ওদের শারীরিক রূপান্তরকে আটকে রাখা গেলোনা। বাড়ি ছাড়লেন দুজনেই। শুরু হলো একসঙ্গে ঘরকরা। দেশের প্রত্যন্ত স্থানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এ হেন সিদ্ধান্তে অনড় থাকা যে কতোটা সাংঘাতিক মানসিক প্লবতার পরিচয় দেয়, তা হয়তো সত্যিই অনেকের কাছে দুর্বোধ্য। তখন ওদের দুজনেরই হরমোন থেরাপি চলছে। জিয়ার শরীরে ফুটে উঠছে রমণীয় লাস্য। জাহাদের শরীরে পৌরুষের চিহ্ন। সেসময়ই সন্তানের কথা মাথায় আসে ওদের। সম্পূর্ণ রূপান্তরের পরে বায়োলজিক্যালি সন্তান ধারণে অনেক রকম সমস্যার আশঙ্কা থেকে যায়। জটিলতা থাকে দত্তক সন্তান গ্রহনেও। কিন্তু থামলে তো চলবে না! অতএব পদ্ধতিতে বিরতি। জাহাদের শরীরে তখনও সন্তান ধারণের প্রয়োজনীয় অঙ্গ বর্তমান। সেখানেই সৃষ্টি হলো প্রাণের। মায়ের গর্ভে যেমন দশমাস দশদিন ধরে অঙ্কুরের মতন বেড়ে ওঠে একটি সন্তান, জাহাদের অভ্যন্তরে সেরকম ভাবেই একটু একটু করে গড়ে উঠছিলো এই দেবশিশু। ভাবতে বিস্ময় লাগে যে তখন জাহাদের চুল ছোটো করে কাটা, ঠোটের ওপর পুরুষালি গোঁফের রেখা, স্তন সমতল। সে সন্তানের বাবা। আর তাকে আগলে রয়েছেন জিয়া। এক পরিপূর্ণ লাস্যময়ী নারীর প্রতিমূর্তি। সে সন্তানের মা।

বাবা, মা, সন্তানের আগমনের যে চেনা ছবিটা দেখে সেটাকেই ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নিয়েছিলো উত্তরের পাহাড় থেকে দক্ষিণের দামাল জলরাশি ছাপিয়ে সমগ্র পৃথিবী, এক লহমায় সেই ছবিটাই উল্টেপাল্টে এক নতুন ছবি সাজিয়ে দিলো সেই অদৃষ্ট কারিগর, যার সৃজনের কাছে আমাদের ক্ষমতার উদ্ধত আস্ফালন নেহাতই বালখিল্যতার পরিচয় দেয়। ২০১৪ সাল থেকে যে রূপান্তরকামী গোষ্ঠীকে খাতায় কলমে তৃতীয় লিঙ্গের আওতায় নথিভুক্ত করেও বাস্তবে প্রতি পদক্ষেপে শুধু লাঞ্ছিতই করা হয়েছে, জাহাদ আর জিয়ার বাবা মায়ের ভূমিকায় উত্তরণ তাদের যাত্রাপথে এক রাজমুকুটের মতন উজ্জ্বল হয়ে থাকলো। প্রচার মাধ্যমে কোথাও শিশুটির লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তটি বড়ো সংবেদনশীল মননের এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চিত্রাঙ্গদা’ ছবির শেষ সংলাপটি মনে পড়ে যায়, ‘… জাস্ট বি হোয়াট ইউ উইশ টু বি। ইটস ইয়োর উইশ’। এই সন্তান বড়ো হয়ে যা হতে চাইবে, ঠিক যেভাবে নিজের পরিচয় দিতে চাইবে, সেভাবেই দেবে, তার শারীরিক চিহ্নটা যে কখনোই তার মনের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ নয়, জাহাদ – জিয়ার এই সিদ্ধান্ত যেন সেই বার্তাই বয়ে নিয়ে এলো ঘরে ঘরে।

শরীর আর মনের দ্বন্দ্ব তো চিরকালীন। পুরুষ থেকে নারী, নারী থেকে পুরুষ, অথবা মধ্যবর্তী এক স্থিতাবস্থা বা এসবের মধ্যে কোনোটাই নয় – এই যে বিচিত্রতা, এটাই তো স্বাভাবিক। একটা বাগানে যেমন একরকমের গাছই থাকেনা এবং অনেক রকমের গাছ থাকে বলেই সেটা এতো মনোগ্রাহী হয়, মনুষ্যকুলেও তো সেরকমটা থাকাই অভিপ্রেত নয় কি? এই যে রূপান্তরের এক অন্তহীন যাত্রা এবং তার মধ্যে দিয়ে গিয়ে এক শাশ্বত সত্যের সামনে উপনীত হওয়া, যেখানে এই দহনীয় শরীরের আপাত সীমাবদ্ধতাটুকু অতিক্রম করে মন বা আত্মার উপস্থিতিটাকে প্রধান করে তোলা, – এটা কি নিজেই এক সাধনার থেকে কম কিছু? আর সেই সাধনার মধ্যে দিয়ে যখন এক নতুনের আবির্ভাব হয়, যাকে দেখে খুলে যায় সকল আগল, মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখে, আশা করে, অচলায়তনের দরজায় ধাক্কা মারে দক্ষিণ হাওয়া, তখন সে কি সত্যিই কোনো দৈব আশীর্বাদের থেকে কম কিছু হয়?

জাহাদ ও জিয়ার সাহসকে কুর্নিশ। শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক অভিনন্দন ওদের সকল শুভানুধ্যায়ী, বন্ধুবান্ধব ও চিকিৎসকদের। ভারতবর্ষের অমর গাথার মধ্যে স্বর্ণাক্ষরে গ্রথিত হয়ে থাকলো আরও একটা রুপকথা, দেশের প্রথম ট্রান্স দম্পতির সন্তান ধারণের গল্প।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।