সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৪৬)

সীমানা ছাড়িয়ে

বীরভূম জেলার ভাষা এইরকমই । শুনতে বেশ ভালো লাগে ।

আমি পিছনে পিছনে কথা বলতে বলতে মহাপুরুষের কাছে গেলাম । দেখলাম অনেক লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ।

একজন এগিয়ে গিয়ে বললেন, আমার ভবিষ্যৎ একটু বঁলে দেন কেনে ।
মহাপুরুষ তার সঙ্গীকে বললেন, এর সঙ্গে কথা বলে ওর অসুবিধা আমাকে লিখে পাঠা ।

মহাপুরুষের প্রায় দশজন সঙ্গী । গ্রামের আদিবাসী পাড়ার কয়েকজনকে বশ মানিয়ে নিয়েছে ।বেশ ভালো রকম আয় হচ্ছে তার ।

একটি তরুন এগিয়ে এসে বললো, এই ফোর জি র যুগে চিটিং বাজি ।বেটা দেবো তোমার ব্যবসা গুটিয়ে ।

মহাপুরুষ রেগে বলে উঠলেন ,তোর ফোর জি তে ঝুল জমবে । আমার অভিশাপ বারো ঘন্টার মধ্যে তোর বিপদ হবে ।

তরুণ টি বলে উঠলো, শোনো নি ফাইভ জি চালু হয়েছে অনেক দেশে । তোমার চিটিং বাজি চলবে না ।

পাঁচ ঘন্টার মধ্যে শোনা গেলো তরুণ টি মোটর সাইকেলের ধাক্কায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ।
মন টা খুবই খারাপ হয়ে গেলো । সরল মানুষ গুলিকে এরা ঠকিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন । ক্লান্ত হয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লাম ।
অনেক ঘটনা জীবনে জলছবি হয়ে আছে । ঠিকমতো সাজাতে গেলে সুন্দর মুখও অসুন্দর হয়ে যায় । এই পাগলের প্রলাপ শুনতে জ্যোৎস্না বড়ো ভালোবাসতো। সেই ঘটনাগুলো একটু শেয়ার করলাম। বলুন এর মধ্যে ভালোবাসার গল্প কোথায়। তবু সে আমাকে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম কোনো এক ক্ষণে, মাহেন্দ্র ক্ষণে। সে ভালোবাসা টিকে আছে আজও। শরীর পেরিয়ে এক অনুভবের জগৎ এই ভালোবাসা। সব নিয়ম অমান্য করে জীবনের এই গল্প, এই কবিতা আমার জীবনে চলার পাথেয়।

আজ নববর্ষ । একটা চিঠি লিখলাম জ্যোৎস্না কে । হে নীরবতার অতীত,

নববর্ষের পূণ্য লগ্নে সবার আনন্দে অংশীদারী হয়ে নিজের আনন্দ খুঁজে নেবো । সকলের সুখ দুঃখেই আমার অংশগ্রহণে মনের ময়লা সাফ হয়ে গড়ে উঠবে নতুন পৃথিবী । নববর্ষে শপথ নেবো কেউ কারো নিন্দা করবো না । ভালোবাসা স্নেহ মায়া মমতা দিয়ে পারস্পরিক বোঝা পড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবো ।সকলের সুখেই সমাজের মঙ্গল । ভারতবর্ষের এই সনাতন ঐতিহ্য অটুট রেখে , জাত পাতের বালাই দূরে রেখে এগিয়ে যাবো সবাই এক সুন্দরের আহ্বানে । আপন আপন কর্মে সবাই স্থির থেকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবো । একজন আদর্শ মানুষ হবার চেষ্টায় রত থাকলে হিংসা ,ঘৃণা ,পরশ্রীকাতরতা দূরে সরে যাবে ।মনে রাখতে হবে কবির বাণী , সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে । আর মনে রাখতে হবে কিছুই আমি সাথে আনি নি, কিছু আমরা নিয়েও যাবো না । একমাত্র ত্যাগের এই সনাতন বাণী আমাদের প্রকৃত মানুষের মর্যাদা দিতে পারে।

এই চিঠি লেখার অনেক পরে জ্যোৎস্নার চিঠি পেয়েছিলাম। জানতে পেরেছিলাম তার অনেক খবর। সে স্বাধীন, মুক্ত বিহঙ্গের জীবন দর্শন তার। আমার সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করবার আভাষ জানিয়েছিলো। আমি চাই নি।আমার মন বাধা দেয় বারবার।
আমাদের গ্রামে পটুয়াপাড়ায় পটচিত্র তৈরি হত। আমার বন্ধু দীপু পট দেখিয়ে বেড়াত। তালাড়ি গ্রামে বাড়ি তার। আমরা ওদের বাড়ি গিয়ে দেখেছি কাপড়ের ওপর ওরা নক্সা কেটে পটচিত্র বানাতো। বিশু বলল, এই পটচিত্র সম্বন্ধে আমাদের কিছু জানাতে পারিস। দীপু লেখাপড়া জানা ছেলে। সে বলতে শুরু করল, লোকচিত্রকলার এক বিশিষ্ট অঙ্গ পটচিত্র । পটশিল্পের সূচনা-ইতিহাস নির্দিষ্ট করে জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, এ-শিল্পের উদ্ভব প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। প্রাচীন কাল থেকে পটুয়ারা এ-উপমহাদেশের সাধারণ মানুষকে দর্শন-শ্রবণের মাধ্যমে বিনোদন ও শিক্ষা দিয়ে আসছেন। ভারুত, অমরাবতী, অজন্তার চিত্রকলায় ‘গল্প বলা’র যে ঢঙ বা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়, তা পটচিত্রেরই অনুরূপ। কাপড়ের ওপর ছবি আঁকার শিল্পই হল পটচিত্র। অনেকে পট অর্থ ইংরেজি (চড়ঃ) মনে করে পটচিত্র বলতে পাত্রের গায়ে আঁকা ছবি মনে করেন। আসলে পট শব্দটি সংস্কৃত পট্ট বা পালি পট্টিকা থেকে এসেছে, যার অর্থ কাপড়। যারা পটে ছবি আঁকতেন তাদের বলা হত পটুয়া। পটুয়ারা ছিলেন লোকশিল্পী বা গ্রামীণশিল্পী। পটুয়ারা বংশ পরম্পরায় ছবি আঁকতেন। আজকাল এঁদের আর দেখা যায় না।
কাপড়ের ওপর কাদা ও গোবর মিশ্রিত একধরনের আস্তরণ দিয়ে তা শুকিয়ে সেই কাপড়ের ওপর ছবি আঁকা হত। কখনও কখনও আবার কাপড়ের ওপর কাগজ সেঁটে তার ওপর চুন বা খড়ি মাটির প্রলেপ দিয়ে পটের জমিন তৈরি করা হত। তাঁরা দেশীয় একধরনের মোটা কাগজের ওপরও ছবি আঁকতেন। পটচিত্রে সাধারণত কালো, লাল, হলুদ, সবুজ খয়েরি ও নীল রঙের ব্যবহার দেখা যায়। সোনালি ও রুপালি রঙের ব্যবহারও মাঝে মাঝে লক্ষ্য করা যায়। রঙ তৈরির জন্য পটুয়ারা বনজ বা খনিজ পদার্থ ব্যবহার করতেন। চাল কালো করে ভেজে কালো রঙ, সিঁদুর বা পাকা তেলাকুচা ফল থেকে লাল, হরিতাল বা কাঁচা হলুদ আর ঘুষুংমাটি মিশিয়ে হলুদ, খড়িমাটি দসাদা, ময়ুরকণ্ঠী গুঁড়ো দিয়ে নীল রঙ বানানো হত। শুকানোর পর রঙ যেন টেকসই হয়, সে-জন্য তেঁতুল বিচি গরম পানিতে ভেজানো আঠা অথবা বাবলা বা নিম গাছের আঠা কিংবা খয়েরের আঠা বা গাদের আঠা বা শিরীষের আঠা বার্নিশের মতো ব্যবহার করা হত। তুলি তৈরি করা হত সাধারণ বাঁশকাঠির সঙ্গে ছাগলের লোম সুতা দিয়ে বেঁধে। পটের ছবিগুলো সাধারণত দ্বিমাত্রিক। ছন্দায়িত রেখা ও রঙ গাঢ় উজ্জ্বল। সরলতা, বাস্তবতা, গতিময়তা, দৃঢ়তা, বলিষ্ঠতা পটচিত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ছবির মুখ সাধারণত পাশ থেকে আঁকা। লম্বা চোখÑদেখতে পাতার মতো, ছুচল নাক ও চিবুক, ভারি পোশাক এ-সব ছবির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি নেই, নেই দূরের ছবিও। চিত্রে লোকজরীতি সুস্পষ্ট, ধ্রুপদীরীতি অনুপস্থিত। কেবল নান্দনিক গুণার্জনের জন্য পটুয়ারা ছবি আঁকতেন নাÑজ্ঞান, শিক্ষা, আনন্দ ও পুণ্যকে আদর্শ মেনে গ্রামবাংলার জনজীবনকে চেতনাগতভাবে সমৃদ্ধ করাই ছিল পটশিল্পীদের মূল লক্ষ্য। পটুয়ারা কেবল চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার ও সুরকার। সাধারণত পারলৌকিক ও ধর্মীয়ভাব মিশ্রিত বিষয় নিয়ে পট নির্মিত হলেও পটুয়ারা বিষয় নির্বাচনে রক্ষণশীল ছিলেন না। কর্মে ও চেতনায় তারা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, বলা যেতে পারে ধর্মনিরপেক্ষ। সমাজের নানা অন্যায় অবিচার পটুয়াদের পটে চিত্রিত হয়েছে দ্রোহের হাতিয়ার হিসেবে। গ্রাম-বাংলার হাট-বাজার, পথে-ঘাটে বিভিন্ন লোকালয়ে পট দেখিয়ে গান গেয়ে, গল্প বলে তারা মানুষকে জ্ঞান ও আনন্দ বিলাতেন, বিনিময়ে জীবনধারনের মতো অর্থ উপার্জন করতেন। সে-কারণে তাঁদের বলা হত ভবঘুরে চিত্রকর। তাঁদের নীতিজ্ঞান ছিল উঁচু পর্যায়ের। সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায়ে রাখতে পটশিল্পীরা ছিলেন সদা সচেষ্ট, যার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁদের ছবি ও গানে। পটুয়ারা কেবল লোকরঞ্জকই ছিলেন না, ছিলেন লোকশিক্ষকও।
সাধারণত দু’ধরনের পটচিত্র দেখা যায়। একটি হল ‘জড়ানো পট’। এই চিত্রের কাপড় আট থেকে পঁচিশ হাত লম্বা এবং দু’ থেকে আড়াই হাত চওড়া হয়ে থাকে। একটি কাঠের দণ্ডে পট পেঁচিয়ে বা জড়িয়ে রাখা হত বলে এ-ধরনের পটকে ‘জড়ানো পট’ বলা হত। এতে ধারাবাহিকভাবে ছবি আঁকা থাকত। পটুয়ারা জড়ানো পট খুলে গানের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ছবির বর্ণনা করতেন। আর একটা ছিল আয়তকার ‘চৌকশ পট’। এগুলো আকারে ছোটÑএকটি ফুলস্কেপ কাগজের চেয়ে সামান্য বড় হত। এতে একটি মাত্র ছবি আঁকা থাকত।বাংলাদেশের বরিশাল, পটুয়াখালি, কুমিল্লা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ জেলায় এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া জেলায় পটুয়াদের বাস ছিল। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার পটুয়াটোলা আর বাংলাদেশের পটুয়াখালির নামকরণ ‘পটুয়া’ থেকে হয়েছে বলে কেউ কেউ ধারণা করেন। এ থেকেই অনুমান করা যায়, এককালে পটুয়াদের বিচরণক্ষেত্র ও পটশিল্পের প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল। তবু সামাজিক অবিচার, বঞ্চনা, অবহেলা আর উপেক্ষা যুগ যুগ ধরে পটুয়াদের নিষ্পেষিত করেছে। পটুয়ারা ছিলেন মূলত নিম্নবর্ণের হিন্দু। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারে অনেক পটুয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মুসলমান সমাজেও যে তাঁরা মর্যাদাবন হয়ে উঠতে পেরেছিলেন এমন সাক্ষ্যও ইতিহাসে পাওয়া যায় না। মুসলমান পটুয়ারা গাজী পীর বা ধর্মযোদ্ধাদের কাল্পনিক বীরত্বকাহিনির পাশাপাশি হিন্দু দেবদেবী, পুরাণ, মঙ্গলকাব্য প্রভৃতি বিষয়কে পটের উপজীব্য করেছেন। বাংলাদেশ অঞ্চলে কালুগাজীর পট বেশি জনপ্রিয় ছিল। গাজীর পটে বাঘের পিঠে গাজী এবং বনবিবির ছবি দেখতে পাওয়া যায়। কলকাতার কালীঘাট মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ‘চৌকশ পট’ শিল্প। মূলত মন্দির ঘিরেই শিল্পটি বিকশিত হলেও সমকালীন ঘটনা, বিষয় ও চরিত্র পটশিল্পীদের উপজীব্য হয়ে উঠেছিল। কালীঘাটকেন্দ্রিক পটচিত্রের সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছিল। কালীঘাটের পটুয়াদের মধ্যে শিল্পী হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন কালীচরণ ঘোষ, নিবারণচন্দ্র ঘোষ, বলরাম দাস, গোপাল দাস ও নীলমণি দাস। ছাপাখানার আবির্ভাব ও বর্তমানে বিনোদনের বিভিন্ন আধুনিক মাধ্যম প্রচলিত হওয়ায় পটচিত্র মাধ্যমটি বিলুপ্ত প্রায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আশুতোষ জাদুঘর ও গুরুসদয় দত্ত সংগ্রহশালায় এবং বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে লোকশিল্প জাদুঘর ও বাংলা একাডেমিতে কিছু পটচিত্র সংরক্ষিত আছে। পটচিত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণে যাঁরা অগ্রণী ভুমিকা রেখেছেন তাঁদের মধ্যে গুরুসদয় দত্ত ও দীনেশচন্দ্র সেনের ভূমিকা ও অবদান স্মরণযোগ্য। তাঁরা কেবল পটচিত্র সংগ্রাহকই ছিলেন না, ছিলেন এর একনিষ্ঠ প্রচারকও। যে শিল্পীরা পটচিত্রের শৈলীকে শিল্পমর্যাদা দিতে সচেষ্ট ছিলেন তাঁদের মধ্যে যামিনী রায় ও কামরুল হাসান অগ্রগণ্য। আমরা জানি যে কামরুল হাসান নিজেকে ‘পটুয়া’ বলে পরিচয় দিতেই স্বাছন্দ্য বোধ করতেন।সম্প্রতি যিনি বাংলাদেশে পটচিত্র নিয়ে কাজ করে দেশে-বিদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছেন তিনি শআচার্য। মুন্সিগঞ্জের রিকাবীবাজারের কালিন্দি পাড়ার নিজ বাড়িতে শম্ভু আচার্য তাঁর পটচিত্রের শিল্পচর্চা করে যাচ্ছেন। তাঁর কাছ থেকে জানা যায় প্রায় সাড়ে চারশ’ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় তাঁরা পটচিত্রের কাজ করছেন। তিনি পটচিত্র শিল্পধারার নবম পুরুষ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।