T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় সুব্রত ভট্টাচার্য্য

প্রতিশ্রুতি
রমনা ও রমেশের বিবাহিত জীবনের বয়স সবেমাত্র একবছর হলো। “ওরা উভয়েই এখনো পর্যন্ত একে অপরকে চেনার এবং বোঝার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ক’রে উঠতে পারেনি। নিজেকে বিশ্লেষণ ক’রে রমনার তো এটাই মনে হলো”, এরকমই একটা ভাবপ্রকাশের আভাস রমনার মুখমণ্ডলে লক্ষিত হলো। রমনা অনেকটাই অন্তর্মুখী, লাজুক ও নিরীহ স্বভাবের মেয়ে। ছাত্রীজীবনে রমনার অন্তঃস্থলে বন্ধু-বান্ধবীরা বিশেষ কোনো ভূমিকা অংশগ্রহণ করতে পারে নি। মৃদুস্বরের মৃদুভাষীনি রমনার পটলচেরা নয়নজোড়ার উজ্জ্বল চাউনি এবং দোহারা চেহারার মধ্যে সৌন্দর্যের মাধুর্য সত্যিই সকলের কাছে রমনার মতো অর্থাৎ বৃক্ষশোভিত রম্য স্থানের ন্যায় নয়নাভিরাম। তুলনামূলকভাবে রমেশও রমনার পাশে কোনো অংশে কম নয় কেননা রমেশ তো ভগবান নারায়ণ বা বিষ্ণুরই একটি অপর নাম। আর সেই সুত্রেই তো রমনা রমেশকে তার স্বামী হিসেবে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করে। যাইহোক, নামদুটি কতটুকু সঠিকভাবে চরিতার্থ হয়েছে তাদের চরিত্রে, সেটা একে অপরের বোঝার সময়টা এখনো পরিপক্ক হয়ে ওঠে নি। তবে, রমেশের স্বভাবের মধ্যে নম্রতার কোনো স্থান নেই। বন্ধুবান্ধবদের জালে নিজেকে ফাঁসিয়ে রাখতে সে খুব ভালোবাসে। বান্ধবীর পরিধিটাও ক্রমবর্ধমানের প্রবনতাকেই নির্দেশ করে। রমেশ ও রমনার স্বভাবের তারতম্য হলো “উত্তরমেরু-দক্ষিনমেরু”। রমনা অবশ্য রমেশের স্বভাবকে কেন্দ্র ক’রে কোনো আপত্তি প্রদর্শন করার সাহস পায় নি বা এরকম ভাবনাকে প্রশ্রয়ও দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না। সবেমাত্র তো বিবাহিত জীবন জন্মগ্রহণ করলো!
রমনা তার দাম্পত্যজীবনে আজ প্রথম রমেশকে রাতে বাইরে যেতে দেখল। রমেশ রমনাকে বলল, “আজ রাত ৮টায় অফিসে একটা বিশেষ প্রয়োজনীয় বৈঠক(মিটিং) আছে।” রমেশ আনুমানিকভাবে এটাও বলল, “ঘন্টা খানেক চলবে বৈঠকটা; ফিরতে একটু দেরী হতে পারে।” রমেশ একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে; তবে ওকে কোনদিন নাইট ডিউটি করতে হয় না। তাছাড়া, খুব বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া, রাত্রিতে কোনো ডাকও আসে না। সে যাইহোক, মৃদুস্বরে দরজার আড়াল থেকে রমেশেকে ঈঙ্গিত ক’রে বলল, “তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো।” রমেশের ইতিবাচক ইশারা রমনাকে অপেক্ষা করার অনুমতি দিল। আজ ওদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। তাই, সকালেই রমেশ রমনাকে ব’লে রেখেছিল যে তারা তাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে আজ রাত্রিতে বাইরে কোনো হোটেলে খাওয়া দাওয়া করবে। সঙ্গে রমেশের দুই প্রিয় বন্ধুও থাকবে। যদিও রমেশের ঐ ইশারাটা যে খুব শক্তিশালী ছিল সেটা তার শারীরিক ভঙ্গিমাতেয় বুঝতে পেরেছিলো, কিন্তু তবুও রমনার মনে হয়তো কোনো সংশয় বা আশংকা বাসা বেঁধে ছিল, কেননা রাত্রিতে তো কোনদিন অফিস যেতে দ্যাখে নি! তাই, রমেশের বুকে মাথা রেখে পুনরায় একবার তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসার কথা বলল। রমেশ রমনার অনুভূতিটাকে সম্মানিত করার উদ্দেশ্যে, তার চিবুককে ধ’রে কথা দিলো, “আচ্ছা ঠিক আছে, চিন্তা কোরো না, আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিলাম, যথাসময়ে ফিরে আসবো।” একটা দীর্ঘশ্বাসের সাহারা নিয়ে রমনা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে এটা একটা রমেশের দেওয়া প্রতিশ্রুতি; সুতরাং, রমেশ সময়ের অপব্যবহার না ক’রেই বাড়ি ফিরে আসবে – এই ভেবে রমনা নিশ্চিত চিত্তে চিত্তরঞ্জনের জন্য দুরদর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হলো। এদিকে, রমনার অপেক্ষার সীমা লঙ্ঘনের সময় ক্রমশ ঘনিয়ে এলো। চিত্তরঞ্জনের আকর্ষণও ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করলো। অবশেষে ধৈর্য্যচুতিতে পা রাখতেই দুরদর্শনটি বন্ধ করে দিলো এবং একটা আতঙ্কবাহী ঝটকায় মাথার মধ্যে নানান ধরণের চিন্তার কোলাহলপূর্ণ প্রতিযোগিতা শুরু হলো। মানসিক দ্বন্দ্বের এই প্রতিযোগিতার ফলাফলের কোনো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত হওয়া অসম্ভব। শিথিলতাও শরীরকে চারিদিকে জর্জরিতভাবে আক্রমণ করলো। লোমকূপ ছিদ্র থেকে নিঃসৃত ঘামের ধারা কিছু অঘটনেরই ঈঙ্গিতবাহী। “না! এমনটা কেন ভাবছি?” এই ভেবে, মনকে নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করলেও বাধ্য হয়ে সংশয়ের উপর আশ্রিত হতে হলো এই ভাবনাকে কেন্দ্র ক’রে, “রমেশ মিথ্যে কথা বলেছে, সে হয়তো অফিস না গিয়ে অন্য কোথাও অর্থাৎ বন্ধু বান্ধবীদের সাথে কোনো পার্টি উপভোগ করতে গিয়েছে, কেননা ওতো বন্ধু প্রেমিক মানুষ।” এই ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য এটাও ঐ ভাবনার উপর আচ্ছাদন দিল যে তাহলে, কি সে আমাকে ভালোবাসে না, স্বভাব চরিত্রে কি কোনো অশিষ্টতার প্রভাব থাকতে পারে? এই সমস্ত অনিশ্চয়তাবোধ পুর্বানুমান চিন্তার আবেগ রমনার সংশয় কেন্দ্রিক মনকে ক্রমশঃ ঘৃনা যুক্ত রোষানলে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠার প্রশ্রয় দিতে শুরু করল। ততক্ষণে প্রায় মধ্য রাত্রির পরিবেশ পরিবেষ্টিত হয়েছে। ঘরে একাকিত্ব ও বাইরে নিস্তব্ধতা – এই দুয়ের মাঝে দুশ্চিন্তাজনক মনের উচাটন রমনাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পরাস্ত করে ফেললো। নয়নাভিরাম প্রদানকারী রমনার ঐ পটলচেরা নয়নজোড়া করুণ সজলে উদ্ভাসিত। গোলগাল দোহারা চেহারায় ভূষিত সৌন্দর্যের মাধুর্য বহনকারী শরীর রোষানলের আগুনে দাউ দাউ ক’রে জ্বলতে শুরু করলো। রমেশ তো আমাকে কথা দিয়েছিল যে সে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে, কিন্তু… “অস্বস্তিভরা দীর্ঘশ্বাসের দ্বারা অন্তর্নিহিত প্রলয়ের এক বহিপ্রকাশ”!
রাত প্রায় পৌনে একটা বাজে। বাড়ির গেটের সামনে একটি হর্নের আওয়াজ। ইতিমধ্যে মোবাইলটাও ক্রিং ক্রিং ক’রে বেজে উঠল। ফোনটা রিসিভ না ক’রেই দরজা খুলে রমনা দেখতে পেল একটা আ্যম্বুলেন্শ এসে দাঁড়ালো। ভয়ে চকিত হয়ে ক্রমশ এগিয়ে আসতেই দেখলো, সুরেশ আর পরেশ দুজনে মিলে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা মৃতদেহ বাইরে বের করে নীচে মাটিতে রাখছিল। পরেশ, রমেশ ও সুরেশ একই অফিসে একই বিভাগে কাজ করে এবং সেই সূত্রে, তিনজনের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গ’ড়ে উঠেছিল। পরেশ ও সুরেশ একটা গাড়িতে ছিল এবং রমেশ তার নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে ফিরছিল। রমেশ আগেই ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, রমেশের গাড়ির ব্রেক ফেল হওয়ায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং সামনে একটি ইলেকট্রিক পোলে ধাক্কা লাগে ও রমেশের মাথার সামনে ও কপালে আঘাত লাগে। পিছনেই পরেশদের গাড়িটা ছিল। ওরা দুজনে নেমে দেখলো, রমেশের মাথার সামনেটা স্টিয়ারিং- এর উপর নুইয়ে আছে এবং রক্তপাত হয়েছে অনেক। তাড়াতাড়ি ক’রে বাইরে বের ক’রে নিজেদের গাড়িতে উঠিয়ে হাসপাতালের দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু, আঘাতের ও রক্তপাতের মাত্রা এতোটাই বেশি ছিল যে ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারলো না। অবশেষে, ডাক্তার এটাই বলতে বাধ্য হলো, “He is no more. ” এদিকে, রমনা রমেশের মৃতদেহ দেখে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে শায়িত।
রমেশ বাড়ি ফিরে রমনাকে নিয়ে হোটেলে যাবার কথা ছিল এবং সুরেশ ও পরেশের সোজা হোটেলে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মধ্যবর্তী রাস্তায় তার ইচ্ছার সুতো ছিঁড়ে গেল। পরেশ ও সুরেশ রমনার চোখে মুখে জলের ছিটা দিয়ে ওকে সজ্ঞানে ফিরিয়ে এনে ঐ প্রস্তাবটার কথা বলল। রমনা নিজেকে যথাসম্ভব সামলানোর চেষ্টা করতে থাকলো। ততক্ষণে প্রায় কাকভোরের আঁচলে পাখিদের কলরব শুরু হয়েছে। এদিকে শোকাহত পরেশ ও সুরেশ বন্ধুর সৎকারের ব্যবস্থায় নিযুক্ত হলো।
“তুমি সবসময় সাথে থাকবে কথা ছিল। এটাও কথা ছিল যে আমরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে আমাদের নতুন জীবন শুরু করবো”, রমনার হৃদয়ে রমেশকে নিয়ে এই সমস্ত ভাবনার স্রোতে ভেসে যাওয়ার পুর্বমুহুর্তে রমেশের বাড়ি ফিরতে দেরিকে কেন্দ্র ক’রে মনের মধ্যে কতো কী অনর্থক কুচিন্তা অতিবাহিত হচ্ছিল যেগুলো এখন রমনার কাছে অনুশোচনার অন্তর্ভুক্ত। সেইজন্যই, “কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারাটা কখনো কখনো অপরাধের জালে ফাঁসে না বরং বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে” – এটা ভেবেই রমনার চেহারাতে একরাশ উপলব্ধি ভরা অভিব্যক্তি, “আমি ভাবতে পারিনি যে ভাগ্যের চাকা চালানোর জন্য নিজস্ব স্টীয়ারিং এর কোনো ভুমিকা নেই, তা না হলে, রমেশের দেওয়া কথাটাকে মনের মধ্যে ধরে রাখতাম না। রমেশের কথা অনুযায়ী, আমি আমার আসন্ন জীবনকে নিরাপত্তার আঁচলে সাজিয়ে রাখবো ভেবেছিলাম। এটা ও মনে হয়েছিল , একমাত্র স্বামীই তো স্ত্রীর জীবনের মেরুদন্ড আর সেই সূত্রে প্রয়োজনানুযায়ী মনে শক্তির যোগান পাওয়া যায়। কিন্তু, হায় এ কি হলো ! যমরাজ যে ওকে অসময়ে ছিনিয়ে নিয়ে আমার জীবন্ত লাশকে সর্বনাশের আঁচলে শুইয়ে দিল”! এই সমস্ত অসহায় ভাবনার জালে রমনা নিজেকে জড়িয়ে মৃতদেহের পাশে বেদনাভরা বদনে রোদনের কোলে আশ্রিত হলো। সুরেশ তার তৎক্ষণাৎ কাজের ব্যস্ততাকে পরেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে, রমনার কাছে এসে শ্রদ্ধাশীলপুর্বক তাঁর মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে লাগলো, ” বৌদি, ঘটন- অঘটন সবই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে; আমরা তো এই ভবসাগরে কাঠপুতুলির ভুমিকা পালন করতে এসেছি মাত্র যেখানে দুঃখ ও সুখ উভয় পরিস্থিতির ঢেউয়ের সাথেই আমাদের অতিবাহিত হতে হবে; আমাদের মনে রাখতে হবে, we are on the mercy of God, তাছাড়া, আপনার আঁচলে রমেশের আদর্শ নিয়ে যে অতিথি আসতে চলেছে তার কর্ণধার তো শুধু আপনিই! তাইতো, আপনাকে দাঁড়াতে হবে; আসুন, রমেশের বুকে হাত রেখে ওর আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্পণ ক’রে ওর আত্মার প্রতি শান্তি প্রদান করুন, কিন্তু হ্যাঁ, কোনো প্রতিশ্রুতি নয়। ”
“কথায় কথায়, স্থুলভাবে প্রতিশ্রুতি শব্দটির প্রয়োগ বাঞ্ছনীয় নয়, ‘প্রতিশ্রুতি’ শব্দটি জীবনদর্শনে প্রয়োগ করার আগে দুরদর্শিতার দৃষ্টিকোণ থেকে এবং সময় সাপেক্ষিক পরিস্থিতিকে ভিত্তি করে যুক্তিবাদীর ও আত্মবিশ্বাসের ওজনটা জীবনে কতটা প্রযোজ্য সেটা অবশ্যই আত্মস্থল থেকে ভেবে নেওয়া উচিৎ যেখানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অথবা কোনো দুর্ঘটনার কারণের থাকবে অগ্রাধিকার”, রমনা তার এই বেদনার কলিতে প্রস্ফুটিত অনুশোচনার ফুলটিকে ছিঁড়ে ফেলার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মনের ভেতর সান্ত্বনা আনার প্রচেষ্টায় পুনরায় এরকমই একটি ভাবনার গভীরে প্রবেশ ক’রে রমেশের দ্বারা প্রদত্ত আদর্শের অপেক্ষায় বাকি জীবনের অজানা দিগন্তের দিকে চেয়ে চেয়ে অজস্র নমিত অশ্রু ধারায় নিশ্চুপ হ’য়ে ব’সে রইল।