সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৪৭)

পুপুর ডায়েরি 

পুপুকে ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হত । অফিস করা মায়ের দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না।
কিন্ত , পুপু ভালো মেয়েও ছিলো । আর খুব ,“প্রপার ” , তাই কোন ক্যাওঁ ম্যাওঁ করত না ।

মুখটা বিচ্ছিরি করে খেয়ে নিতাম । মা বুঝতে পেরে ওষুধ খাওয়ার পরেই মুখে একটা ভালো কিছু , এই যেমন তাল মিছরি বা টক নোনতা ভাস্কর লবণ দিয়ে দিতেন ।

এখন ঢের বড় হয়ে , ডাক্তারি করতে করতে ছেলে মেয়েকেও বড় করতে গিয়ে বুঝি , বাচ্চাদের একটু আধটু অসুখ করেই । হয়ত পুপুর ইমিউনিটি একটু কম , হয়ত লো বার্থ ওয়েট বেবি , তাই একটু বেশি হত অসুখ , কিন্তু মা ভয় পেতেন খুব ।
একে ত আমি তার সাত রাজার ধন এক মানিক , তার ওপর নিজে ডাক্তারি পড়তে পড়তে ছেড়ে দিয়ে এসেছেন যে হেতু চিকিৎসা বিজ্ঞান , আর ডাক্তারি ব্যাপারগুলো , আম জুনতার থেকে বুঝতেন বেশি । তাই ভয় ও পেতেন বেশি ।
তখনও ,মানে উনিশশ সত্তরের দশকে , অনেক সচ্ছল বাড়ির বাচ্চারাও ভ্যাকসিনেশন পেতো না ।
আমি কিন্তু পোলিও থেকে শুরু করে সমস্ত টিকে পেয়েছি ।

ইন ফ্যাক্ট ,পোলিওর টিকে ত একটা বিশেষ ঘটনা ।
কলকাতায় তখনও পোলিওর টিকে দেয়া শুরু হয়নি । কিন্তু বাচ্চাদের অনেকেরই পোলিও হত । পরে , আমার শ্বশুর বাড়িতেও দেখেছি কাছাকাছি বয়েসের মানুষকে এই রোগে আক্রান্ত ।
তো , আমার যখন বছর দুয়েক বয়স , জাহাজে করে , পোলিওর ফরেন ভ্যাকসিন এসেছিল কয়েক দিনের জন্য কলকাতায় ।

গোল গাবলু পুপুকে ঘাড়ে করে জাহাজঘাটায় নিয়ে গিয়ে , সন্ধ্যে অবধি লাইনে একা দাঁড়িয়ে থেকে মা পুপুকে পোলিওর ড্রপ , খাইয়ে এনেছিলেন । বাবার অফিস ছিল । একাই গিয়েছিলেন মা নিজের অফিস ছুটি করে ।
বাবা কাছে থাকলে , পুপু মাকে কষ্ট দিত না । বাবার ঘাড়ে উঠে মাথাটা পিঠের দিকে ঝুলিয়ে দিত ।

আমার বাচ্চাদের জন্যে কখনও এতো দৌড়োদৌড়ি বোধহয় করিনি ।
বাট দেন , আমার মায়ের মত মা কটা হয় পৃথিবীতে ?
এমন মা , যার কাছে তার সন্তানই তার পুরো পৃথিবী । সব সময় মহামূল্য রত্নের ময় বুকের মধ্যে আঁকড়ে রেখেছেন যে ।
খুব পুণ্যের কাজ কিছু করেছিলাম নির্ঘাত । না হলে এ রকম মা পাই ?

সেই ভরসাতেই বসে আছি কাঁচুমাচু হয়ে ,… মা আসবে , বাবাইয়ের গরম হাতটা বাড়ানো দেখতে পেলেই ধরে ফেলবো ; আর তারপরেই যথারীতি ঘাড়ে চড়া পুপু ।
এ অনুভূতিটা খুব পরিষ্কার তুলে রাখা আছে পুপুর ভেতরে ।
বাবার পিঠে ঝুলে আছি সারা ভার ছেড়ে দিয়ে । পুপুর দু হাত ঝুলছে বাবার পিঠের দিকে।
পিছনে মা হেঁটে আসেন মিটিমিটি হাসি মাখা সুন্দর মুখখানায় ।
বা মশাইয়ের হাঁটার তালে , পুপুর ঝাঁকুনি লাগছে দুলে দুলে , সে ভারি আরাম ।

সে হাঁটার তালটা আমার অস্তিত্বের গভীরে গাঁথা ।
কী নিশ্চিন্তে পৃথিবীটা উলটো হয়ে দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছি …

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।