কিছুদিন আগে অবধিও ভারতবর্ষের ‘শিক্ষা মন্ত্রক’ বা মিনিষ্ট্রি অফ এডুকেশনের বেশ গালভরা একটি নাম ছিলো, ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক’ বা মিনিষ্ট্রি অফ হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট। সাম্প্রতিক বিপজ্জনক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই মন্ত্রককে পুনরায় কেবল শিক্ষা মন্ত্রক নামেই আখ্যায়িত করা হ’য়েছে। সম্ভবতঃ শিক্ষানীতিতেও কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে ব’লেই রাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত, যদিও সেই নীতির উপযোগিতা বা প্রায়োগিকতা এখনও সেভাবে পরীক্ষিত নয়।
আজ থেকে প্রায় ১১বছর আগে শ্রী রাজকুমার হিরানি পরিচালিত ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিটি সারাদেশে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিলো। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ভিন্নতর সমস্যাকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ সেখানে ব্যবহৃত হয়। তাদেরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিলো, “তোমার বাবা এখানে কোনো উচ্চশিক্ষালয় চালাননা। তিনি একটি কারখানা চালান শুধুমাত্র, যেখানে কোনো প্রযুক্তিবিদ নয়, কেবল কিছু উন্নততর গর্দভ উৎপন্ন হয়।”।
মাত্র একদশক পূর্বের একটি সামান্য সংলাপই যেখানে আপামর ভারতবাসী ক্ষণিক উপভোগ ক’রেছে এবং পত্রপাঠ বিস্মৃত হ’য়েছে, সেখানে তো বাঙালি এমনিতেই একটি ‘আত্মঘাতী জাতি’। অতএব প্রায় দু’শোবছরেরও বেশী আগে কোন মণীষী কোথায় ব’সে চার দেওয়ালের মধ্যে শিক্ষাদানের ব্যবস্থাকে (বা পূর্বোক্ত রাসভ নির্মাণের প্রক্রিয়াকে) অস্বীকার ক’রে গেছেন তাতে তার কীই বা আসে যায়? আশ্চর্যের বিষয় যে মাত্র একটি দিনের এই ছাত্রকে নিয়েই আজও তার তথাকথিত কৃতিদের তুলনায় অধিকতর গর্বিত তাঁর প্রাক্তন শিক্ষাঙ্গন। তার থেকেও বেশী যে বিষয়টি রীতিমতো হাস্যরসের উদ্রেক করে যে এখনও সেখানে তাঁর নামটি ব্যবহার ক’রে সেই মনুষ্যেতরই তৈরী করা হয়, মানুষ নয়।
মানুষের মানুষ হ’য়ে ওঠবার প্রতিফলন যে তার মানবতায়, নিছক মানবসম্পদ হ’য়ে ওঠায় নয়, তা আমাদের ‘প্রজাতান্ত্রিক গণতন্ত্র’ তো কোনোকালে বোঝেইনি, বোঝেনি বিপ্লবোত্তরকালে অর্থনৈতিক বিচারে অভূতপূর্ব উন্নতি করা সোভিয়েত রাশিয়াও (যে দেশ আজ থেকে একশো বছর আগেও ভারতবর্ষের বিচারে নৈতিকতায় ন্যূনতম তিনশো বছর এগিয়ে ছিলো)। তাই প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় একটিও সনদ অপ্রাপ্ত জনৈক নোবেলজয়ীকে তাঁদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত রাষ্ট্রনেতৃত্ব। সমস্যা এটুকুই যে তাঁদেরও সেভাবে বোধগম্য হয়নি যে আমন্ত্রিত এই ব্যক্তির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কিন্তু নেহাতই সাধারণ ছিলোনা।
অতএব সারা পৃথিবীর তাবড় বুদ্ধিজীবীরা যখন সোভিয়েতের মানবসম্পদ গ’ড়ে তোলবার ব্যবস্থাপনার পক্ষে দাঁড়ালেন (এমনকি তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিবিদেরাও), কেবল ইনিই ব’লে ব’সলেন যে ‘ছাঁচে ঢালা মনুষ্যত্বের’ অস্তিত্ব বেশীদিন থাকেনা। ফলস্বরূপ সমগ্র বিশ্বে, এমনকি স্বদেশীয় সাম্যবাদীদের চোখেও তিনি অন্যতম খলনায়ক হ’য়ে দেখা দিলেন। সত্যিই তো এ অতি সাধারণ প্রশ্ন যে নিজেকে বিক্রয়যোগ্য পরিষেবাদায়ী সম্পদরূপে গ’ড়ে না তুলতে পারলে জনৈক সাধারণ মানুষ তার অস্তিত্ব বজায় রাখবে কী ক’রে? ভারতীয় প্রাচীন দর্শনে উল্লিখিত ব্রহ্মচর্যের উপযোগিতা (স্মর্তব্য, পরবর্তীকালে শাস্ত্র-উল্লিখিত এই নীতিতেই শান্তিনিকেতন শিক্ষাঙ্গনের সৃষ্টি) কি কখনও শ্বেতাঙ্গ-প্রবর্তিত আধুনিক নিয়মানুবর্তিতার তুলনায় অধিক হ’তে পারে?
আসলে আলোচ্য গুরুতর সমস্যার বীজটিও ঠিক ঐ প্রথম প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত আছে। আর্থসামাজিক বৈষম্যের তুলনায় যেহেতু আর কোনো সমস্যাই পৃথিবীর সংখ্যাগুরু অংশ বিশেষভাবে অনুভব করেনা, অতএব এর বিরূদ্ধে দীর্ঘকাল যাবৎ ব্যক্তিগত পরিসরে যুদ্ধ ক’রতে ক’রতে ঘরে-বাইরে প্রতিযোগিতার নেশা তাদের মজ্জাগত হ’য়ে যায়। তাদের মতে মানুষ যে কেবল কলুর একটি বলদ নয় এ ধারণা কেবল তাঁর পক্ষেই পোষণ করা সম্ভব যাঁকে কখনও অস্তিত্বসংগ্রাম ক’রতে হয়নি। সভ্যতার ইতিহাস মাত্রেই যেখানে জনযুদ্ধের, সেখানে কে এই পরজীবী?
অতএব বিপণনের পৃথিবীতে ভারতকে অংশীদার হিসাবে গ’ড়ে তুলতে প্রথম বিশ্বের প্রত্যক্ষ ইন্ধন তো ছিলোই, উপরন্তু দীর্ঘকালীন ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ভারতবর্ষ তার সংস্কৃতির মূল বিস্মৃত হ’লো। সে ভুলে গেলো যে যেকোনো অনুভূতিকে পণ্য ক’রতে গিয়ে তার সকল দেশবাসীর প্রাপ্য ন্যূনতম অধিকারগুলিও (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা ইত্যাদি) কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর কুক্ষিগত হ’য়ে প’ড়লো এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবশতঃ এই বৃহত্তর অন্যায়ের বিরোধিতা করবারও কেউ র’ইলোনা। মানবসম্পদ তৈরী ক’রতে গিয়ে কতোগুলি মননবিহীন যন্ত্র তো জন্ম নিলোই, সর্বোপরি মনুষ্যত্বের অভাবে একটি বিশেষ স্বার্থপর প্রজন্ম গ’ড়ে উঠলো যারা ব্যক্তিগতর বাইরে সামগ্রিক পরিসর সম্পর্কে আদৌ অবগতই নয়। ফলস্বরূপ দেশে অার্থিক সম্পদ সমাগমের পরিবর্তে এই তথাকথিত মানবসম্পদগুলি বিদেশে নিষ্ক্রান্ত হ’লো এবং সমগ্র প্রক্রিয়ার মূল যে উদ্দেশ্য দেশীয় আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতিসাধন, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হ’য়ে গেলো।
বর্তমানে মধ্যপন্থী নৈতিকতার গালভরা নাম নিয়ে দিনে দিনে ভারতবর্ষ একপ্রকার ত্রিশঙ্কু অবস্থায় জগৎসভার শ্রেষ্ঠ বাজারে পরিণত হ’চ্ছে। আবেগ ও অনুভূতিহীন একটি প্রজন্মকে মনশ্চক্ষে প্রত্যক্ষ ক’রেছিলেন যে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা তিনি সমাজের নিম্নস্তরে হয়তো সত্যিই কখনও অবস্থান করেননি, কিন্তু দার্শনিক হিসাবে তাঁর নিরপেক্ষ অনুমান একেবারে একশো শতাংশ নির্ভুল প্রমাণিত হ’য়েছে। তিনি ছাত্রই তৈরী ক’রতে চেয়েছিলেন, শ্রমিক নির্মাণে তাঁর আগ্রহ আদৌ ছিলোনা। আজ ভারতবর্ষে প্রকৃত শিক্ষিতের হার এতোই কম যে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতি আমাদের নৈতিকতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বিষয় সম্পর্কে মতামত দিতে অক্ষম যুবশক্তিও নিশ্চিতভাবে আজকের মতামত দিতে অনিচ্ছুক যুবশক্তির তুলনায় যথেষ্ঠ উপযোগী হ’তো…