সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৫)

পুপুর ডায়েরি
তখন নটার সাইরেন বাজত। আওয়াজ হত ভোঁ করে । সব বাড়িতে লোকে ঘড়ি মেলাত তার সংগে । বাবা মশাই রোজ দাড়ি কাটেন সেই সময়। অফিসের গাড়ি আসবে । হঠাৎ এক দিন এক গাল হেসে গুন গুন করে বললেন , এই শোন গানটা ।
“ বাঁশী বাজল কোথায় ?
গোকুলে ত নাইরে কানু
সে যে গেছে মথুরায়
তবে বাঁশী বাজল কোথায় ?”
মা রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে বললেন , “ এটা বুঝি নটা বাজার গান ? পাশের বাড়ির দিপির মা মাসিমা বলেন বটে শ্যামের বাঁশি । হ্যাঁ গো লিখবে না ?”
বাবার এক গালে সাবান মাখা । বললেন, “আহা অক্ষয়বাবু কি বলেন মনে নেই? সখী শেষ করা কি ভাল , তেল ফুরোবার আগেই আমি নিভিয়ে দেব আলো –”
আরও একটু বড় হয়ে ক্লাস সেভেন এইটে পুপু রবীন্দ্র রচনাবলীতে খুঁজে পেয়েছিল এ ডায়ালগ। বড় ভাল লেগেছিল এ নাটক তার। রোজ পড়ে পড়ে মুখস্তই হয়ে গেল সব সংলাপ। চিরকুমার সভা ।
সেই সাবান মাখা গান গাওয়ায় দুদিন বাদে, বাবা ডায়েরী খুলে মাকে গান শোনাতে বসলেন। খাটে দুজনের মাঝখানে গুটিসুটি পুপু ।
বাঁশী বাজল বাজল
বাজল কোথায় ?
গোকুলে ত নাইরে কানু
সে যে গেছে মথুরায়
তবে বাঁশী বাজল কোথায় ?
নহে ত যমুনা কূলে
নহে ত কদম্ব মূলে
বাঁশুরিয়া নাই গোকুলে
বাঁশী তবু কাজ ভুলায়
তবে বাঁশী বাজল কোথায় ।
সে দিনের সেই মিষ্টি সময়টা থেকে কত দিন কত রাত পেরোলে পুপু পঞ্চাশের দোরগোড়ায় দাঁড়াবে তখন জানা ছিল না। স্নেহের নিরাপদ ডানায় মুড়ে রাখা ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীরা , “ভাল থেকো ” বলে তেপান্তরে উড়ে চলে যায় , পুপু তখন কল্পনা ও করতে পারেনি ।
জীবন কত ব্যস্ত । জীবনে কত যুদ্ধ । তার মধ্যেই মনের চারপাশে লক্ষ্মণ রেখার রক্ষা কবচের মত ঘুরে চলে শব্দের ইলেকট্রন , সুরের প্রোটন , আলোর ফুলকি। গ্লানি থেকে বিষাদের দৈন্য থেকে বাঁচিয়ে রাখে ।
শব্দ ।অক্ষর ।মায়ের হাতে শব্দজব্দের ছক। রিডার্স ডাইজেস্টের ইংরেজি শব্দের অর্থ নিয়ে খেলা । এরা রোজকার ধোঁয়া , ধুলো , যানজট , সন্ত্রাস , বিরক্তির ওপর দিয়ে আকাশের দিকে তাকাতে বলে । সেইখানে কলকাতার ব্যস্ত ফ্লাইওভারের ওপরে কি দেখা যায় জানো ? সারা আকাশ জুড়ে থাকা এপার ওপার রামধনু। কখনও দুটো এক সঙ্গে ।সত্যি । সে যে কি আশ্চর্য ভালো ! অথচ নিচের কলকাতা তাকে দেখতেই পায়না । সবাই বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে যার যার দৌড়ে ব্যস্ত। ফুরিয়ে যাচ্ছে আস্ত আস্ত দিন এক একটা।
অক্ষরের বেলুন পুপুকে আকাশের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় । সাদা চুলের ক্লান্তি মুছে দিয়ে বলে –
“ টক টক থাকে নাকো হলে পড়ে বৃষ্টি
তখন দেখেছি চেটে একেবারে মিষ্টি ।”