গারো পাহাড়ের গদ্যে রবীন জাকারিয়া

বাংলাদেশর ঈদ উৎসব

ভূমিকা: ঈদ (প্রমিত বানান ইদ) শব্দটির অর্থ উৎসব। ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব গুলোকে ঈদ বলা হয়।

ঈদুল ফিতর (আরবি: عيد الفطر অর্থাৎ “রোজা ভাঙার দিবস”) ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি।[১] দ্বিতীয়টি হলো ঈদুল আযহা। ধর্মীয় পরিভাষায় একে ‍ইয়াওমুল জায়েজ‍ (অর্থ: পুরস্কারের দিবস) হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখা বা সিয়াম সাধনার পর মুসলমানেরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্যপালনসহ খুব আনন্দের সাথে পালন করে থাকে।[২] عيد الفطر
মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সারা বিশ্বে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যন্ত জাঁকজমক ও ধুমধামের সঙ্গে এই ধর্মীয় দিবস দুটি পালিত হতে দেখা যায়। ঈদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রথম ঈদ পালিত হয় দ্বিতীয় হিজরির ০১ শাওয়াল মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ মদিনায়। আর মক্কায় প্রথম ঈদ পালিত হয় অষ্টম হিজরি মোতাবেক ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর প্রায় ১১ দিন পর। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয় ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ। বাংলাদেশে প্রথম কোথায় ঈদ পালিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে ধারণা করা যায় সন্দ্বীপ অঞ্চলে প্রথম ঈদের জামায়াত হয়েছিল। ঢাকায় সম্ভবত প্রথম ঈদ উদ্‌যাপিত হয় সুলতানি আমলে (১৩০০-১৫৩৮ খ্রি.) মোটামুটি দুই শত বছরের বেশি সময়ে নগরকেন্দ্রিক ঈদ উৎসবের কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে এখন যেভাবে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে, ১০০ বছর আগেও কি এভাবে হতো? সাধারণ মানুষ কি আজকের মতো অধীর আগ্রহ, উৎসাহ নিয়ে তাকিয়ে থাকতেন ঈদের চাঁদের দিকে? ঈদের ধুমধামের দিকে? ইতিহাস বলে ‘না’। তবে সে আমলে কীভাবে বাংলাদেশে ঈদ উৎসব পালিত হতো।

আমাদের সবারই স্মরণ রাখতে হবে বিশ্বাসের সঙ্গে জিজ্ঞাসা মেলে না। জ্ঞান আহরণের উৎসই জিজ্ঞাসা। রাসূল (সা.) বলেছেন ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনেও যাও। সুতরাং এই প্রবন্ধে বর্তমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কারও ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি আঘাত দেওয়ার জন্য আমার এ লেখা নয়। প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার জন্য আমার এই অবগাহন। আমি একজন মুসলমান হয়ে নিজেকে অত্যন্ত গৌরবান্বিত মনে করি।

রমজান মাস মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মাস এবং কোরআনে একমাত্র এ মাসের কথাই উলেস্নখ করা হয়েছে। এ মাসেই নাজিল হয়েছে কোরআন শরিফ। প্রথম ওহি পেয়েছিলেন মুহম্মদ রাসূল (সা.)। গিয়েছিলেন তিনি মেরাজে। মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার আগে রমজানের সঙ্গে পরিচয় ছিল না মুসলমানদের। এর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল হিজরতের পরেই। রমজান শব্দটি আরবি ‘রমজ’ ধাতু থেকে আগত। রমজান মানে দাহ, তাপ বা পোড়ানো। চন্দ্রবর্ষই নিয়ন্ত্রিত করে করে মুসলমানদের উৎসব। অনেক আগে প্রাচীন কালে গরমের মৌসুমে এই মাস পড়ত বলে এর নাম হয় রমজান। রমজানের সঙ্গে উপবাসের প্রতি শব্দের ধ্বনিগত কোনো মিল নেই। উপবাসের আরবি নাম হচ্ছে ‘স ও ম’। এর অর্থের সঙ্গে উপবাস ব্রতের কোনো মিল নেই। এর আভিধানিক অর্থই হলো আরাম বা বিশ্রামে থাকা। রমজান শেষে ঈদুল ফেতর। ঈদের অর্থ হলো উৎসব এবং আভিধানিক অর্থ হলো বারবার ফিরে আসা। ঈদ শব্দটি মূলত সিরিয়ার। ঈদ শব্দটির আদি অর্থ ও তার আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম নিরীক্ষণ করে দেখে মনে হয় হয়তো এককালে এ ধরনের এক সামাজিক উৎসবের সঙ্গে পরিচিত ছিল সিরিয়ার দামেস্কের জনগোষ্ঠীর অধিবাসীরা। হয়তো সিরিয়ার দামেস্কের কৃষিজ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল এই আজকের ঈদ উৎসব এবং তাদের কাছ থেকেই আচার-অনুষ্ঠান জ্ঞাপক শব্দের মতোই আরবরা আমদানি করেছেন বর্তমান এই ঈদ উৎসব ও তার প্রকৃতিকে। ঈদ উৎসব মানুষের লোকায়ত বিশ্বাস বিশ্লেষণ করলে আমাদের মনে রাখতে হবে এদেশে মুসলমানরা ছিল বহিরাগত। কারণ যেভাবে অতীতে পালিত হতো এই ঈদ উৎসব তাতে লোকায়ত বিশ্বাস আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে হিন্দু রীতিনীতি প্রভাবই ছিল বেশি।

ইসলাম প্রচারের শুরুতে অর্থাৎ আদি বাঙালি মুসলমানরা কীভাবে ঈদ উৎসব পালন করত তা রীতিমতো গবেষণার বস্তু। তবে বলা যেতে পারে আদিতে প্রচার করা আরবের উদ্‌যাপিত ঈদের আদি রূপই হয়তো তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু কালের গর্ভে সময়ের বিবর্তনে সে রূপ চিরতরে হারিয়ে গেছে। কখনো ধর্ম নেতারা মূল অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তাদের নিজের গড়া নতুন অনুষ্ঠান। কখনো শাসক শ্রেণির নির্দেশে যুক্ত হয়েছে বিশেষ বিশেষ ক্রিয়াকর্ম। কখনো বা লৌকিক ধর্মের প্রভাব এসেছে লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে। সে জন্য আবারও বলতে হয় বাংলাদেশে যেভাবে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে তাতে সেখানে প্রভাব ফেলেছে কৃষিজীবী মানুষের লোকায়ত বিশ্বাস।

শাসক ইংরেজরা স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের ঈদকে গুরুত্ব দেয়নি। এজন্য সরকারি ছুটিও বরাদ্দ ছিল কম। তা ছাড়া মুসলমানদের পক্ষে ঈদকে সে আমলে উৎসবে পরিণত করা সম্ভব ছিল না তাদের পক্ষে। কারণ গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মুসলমান ছিল বিত্তহীন ও নিরক্ষর।

‘তাবাকাৎ-ই-নাসিরি’র লেখক ঐতিহাসিক মিনহাজ উস-সিরাজ সেকালের ঈদ উৎসব সম্পর্কে জানিয়েছেন, ‘বাদশাহ ধর্মীয় আলোচনায় ব্যস্ত থাকতেন, ঈদের নামাজ পড়ানোর জন্য নিয়োগ করতেন ধর্মীয় ইমাম। শহরের বাইরে উন্মুক্ত জায়গায় অথবা গ্রামে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো এবং এসব স্থানকেই ঈদগাহ নামে অভিহিত করা হতো।’

আগেই বলা হয়েছে ঈদ সম্পর্কে আমরা সেকালে যে বিবরণ পাই তা থেকে ধরে নেওয়া যায় রমজান মাস থেকেই শুরু হতো ঈদের প্রস্তুতি। এ উৎসব শুরু হতো রমজানের চাঁদ দেখা থেকে। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এর তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না।

আবুল মনসুর আহমেদ সেকালে ঈদের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে আরও বলেছেন, ‘এই অঞ্চলে কোনো মসজিদ বা জুমার ঘর ছিল না। বছরে দুইবার ঈদের জামায়াত হইতো বটে কিন্তু তাতে বড়রাই সামিল হইতো। তাই জামাতে খুব অল্প লোকই দেখা যাইতো। সাধ্যমতো নতুন কাপড় চোপড় পরিয়া লোকেরা বেদম গান বাজনা করিত। সারারাত ঢোলের আওয়াজ পাওয়া যাইতো। প্রায়ই বাড়ি বাড়ি ঢোল-ডাগর দেখা যাইতো। ঈদের জামাতেও লোকেরা কাছা, ধুতি পরিয়াই যাইত। নামাজের সময় কাছা খুলিতেই হইতো। সে কাজটাও তাহারা নামাজে দাঁড়াইবার আগেতক করিত না। প্রথম প্রথম নামাজের কাতারে বসিবার পর অন্যের অগোচরে চুপি চুপি কাছা খুলিয়া নামাজ শেষ করিয়া কাতার হইতে উঠিবার আগেই আবার কাছা দিয়া ফেলিত’।

অজ্ঞতা ও কুসংস্কার তখন বাঙালি মুসলমান সমাজকে নিদারুণভাবে গ্রাস করে। তারা সহজ-সরল ইসলাম ভুলে গিয়ে রমজানে ও ঈদ উৎসবের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বহু কুপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস, ইসলামবিরোধী আচার-অনুষ্ঠানে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সে সময় সত্যিকারের ইসলাম হারিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে কুসংস্কার ও অনৈসলামিক কার্যকলাপে লিপ্ত থেকে অন্ধকারের অতল তলে হারিয়ে যায়। তখনকার মুসলমানদের সমাজে এই অধঃপতন দেখে সে সময়ে ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তুলস্নাহ (১৭৮১-১৮৪০ খ্রি.) স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। জেমস ওয়াইজ আরও লিখেছেন দীর্ঘকাল হিন্দুদের সংস্পর্শে থাকার ফলে ঈদ উৎসবের ধর্মীয় ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের মতো যেসব কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস প্রবেশ করে তার বিরুদ্ধে হাজী শরীয়তুলস্নাহ সর্বপ্রথম আন্দোলন আরম্ভ করেন। তিনি ইসলাম ধর্মের বহু দেব-দেবী, ভ্রান্ত অলীক বিশ্বাসও পাপপূর্ণ নতুন প্রথাগুলোর উচ্ছেদের জন্য আন্দোলন করেন। এভাবে হাজী শরীয়তউলস্নাহ দীর্ঘকাল ধরে পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজ থেকে বহু অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করেন।

এ শতকের তৃতীয় চতুর্থ দশকের গ্রামাঞ্চলে ঈদ পালনের কয়েকটি বর্ণনা পাই খন্দকার আবু তালিবের নিবন্ধ থেকে ‘রোজার পনেরো দিন যাওয়ার পর হতেই গৃহবধূরা নানা রকম নকশি পিঠা তৈরি করতে শুরু করত। এদের মধ্যে ফুল পিঠা, পাপর পিঠা, ঝুরি, হাতে টেপা সেমাই ইত্যাদি উলেস্নখযোগ্য। শবেকদরের রাতে মেয়েরা মেহেদী এনে তা বেটে হাতে নানা রকম চিত্র আঁকত। ফুল পিঠা তৈরি করার সময় বউয়েরা ‘প্রিয় স্বামী’, আর অবিবাহিত মেয়েরা ‘বিবাহ’ ও ‘প্রজাপতি’ এঁকে রাখত। ঈদের দিনে যুবক-যুবতী বন্ধু-বান্ধবীদের পাতে দেওয়ার জন্যই এ ধরনের ফুল পিঠা তৈরি করা হতো’।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আগেও যেমন বঞ্চিত ছিলেন ঈদের আনন্দ থেকে এখনো বঞ্চিত আছেন তদ্রূপ, প্রতিনিয়ত, মোগল আমলের ইতিহাসে আমরা দেখেছি বিত্তবানরা ঈদের দিন ছুড়ে দিচ্ছেন রেজগি পয়সা আর সাধারণ, নিরন্ন, বঞ্চিত মানুষ তা কুড়িয়ে নিচ্ছেন কাড়াকাড়ি করে। এখনো তার এ আমলে কোনো হেরফের হয়নি বরং বঞ্চনা আরও বেড়েছে। আমরা চোখের সামনে দেখেছি বাংলাদেশে ধনীর গৃহে জাকাতের কাপড় নেওয়ার জন্য ছিন্নমূল মানুষের হুটোপুটি লাইন তা আমাদের হতভাগ্য, বঞ্চিত, দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের চেহারাই তুলে ধরে। সুতরাং ঈদুল ফিতরের আনন্দ সাধারণ মানুষের মনে আজ আর কোনোই রেখাপাত করে না। ঈদুল ফিতরের জামাতের আগে থেকেই বিত্তবানদের ফেতরার অর্থ ও সাহায্য নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় শত শত ছিন্নমূল মানুষকে। উৎসব সর্বাঙ্গীণ আনন্দময়, স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে তখনই যখন আসে বিত্ত বণ্ঠনের সামঞ্জস্য। তা নাহলে ধর্মীয় উৎসব (ঈদুর ফিতর) মূল আবেদন হ্রাস পায়।

ফরায়েজী আন্দোলন এবং পরবর্তী ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনগুলো পাল্টে দিতে পেরেছিল বাংলাদেশের এই মুসলমানদের মনমানসিকতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও লৌকিক, স্থানীয় উপাদানগুলো বিভিন্ন সময়ে যুক্ত হয়েছে ঈদের সঙ্গে।

এই শতকের শুরু থেকেই যখন রাজনৈতিকভাবে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই গুরুত্ব পেয়েছে ঈদ। বাংলাদেশের দুটি ঈদ (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।

দেড়শ দু’শো বছর আগে ঢাকা ছিল নিতান্ত অস্বাস্থ্যকর, অসুন্দর নোংরা এক শহর; নিরানন্দ তো বটেই। তবুও প্রতিবছর বিশেষ বিশেষ সময়ে হঠাৎ দু-একদিনের জন্য বদলে যেত ঢাকা শহরের চেহারা। মেলা, রঙিন নিশান, লোকজনের ব্যস্ত চলাফেরায় ঢাকা পড়ে যেত শহরের নোংরা চেহারাটা। নিরানন্দ শহর দু-একদিনের জন্য হলেও ঝলমল করে উঠত, জমকালো সব মিছিল দেখতে সাড়া পড়ে যেত। এর মূলে ছিল কয়েকটি উৎসব– ঈদ, মুহররম ও জন্মাষ্টমী।

ঊনিশ শতক পর্যন্ত বর্তমান বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে এ তিনটি উৎসবই ছিল প্রধান উৎসব। এ কথা ঠিক, মূলত তিনটি উৎসবই ধর্মীয়, কিন্তু মুহররম ও জন্মাষ্টমী ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেকাংশে পরিণত হয়েছিল সর্বজনীন উৎসবে। ঈদ বা ঝুলন সে অর্থে ধর্মের গণ্ডি ছাড়াতে পারেনি। মুহররম বা ঈদ বাংলাদেশের বাইরে থেকে আমদানি করা হলেও অজস্র লোকায়ত উপাদান এদের আমদানিকৃত কঠোর শুদ্ধ চরিত্র বদলে দিয়েছিল। ফলে, এক সম্প্রদায়ের লোকের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল আরেক সম্প্রদায়ের উৎসবে যোগ দেওয়া। এখানে একটি কথা উল্লেখ্য, ঈদ, মুহররম এবং জন্মাষ্টমী, এই তিনটি উৎসবেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মিছিল। জমকালো, উল্লাসমুখর সে মিছিল এখন স্মৃতি।

এখানে ঢাকার উৎসব ও ঝুলন-এর কথাই প্রধানত আলোচনা করব; আলোচনা সীমিত থাকবে ঢাকা শহরের মধ্যেই। আলোচনার শুরুতে ঈদ উৎসবের উৎস, তারপর ঢাকায় এর বিকাশ এবং স্থানীয়, সামাজিক ও লোকায়ত উপাদান কীভাবে সৃষ্টি করেছিল আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের, তা তুলে ধরার চেষ্টাি করব।

মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উৎসব হচ্ছে ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা। আমাদের দেশে এ দুটি ধর্মীয় উৎসব পালিত হয় যথেষ্ট ধুমধামের সঙ্গে। ঈদ-উল-ফিতর আবার যুক্ত মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মাস রমজানের সঙ্গে। আর ঈদ-উল-আজহা যুক্ত পবিত্র হজব্রতের সঙ্গে। এখানে, এখন যেভাবে ঈদ পালিত হচ্ছে, একশ বা দেড়শ বছর আগেও কীভাবে পালিত হত ঈদ? এ দুই উৎসবের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল কৃষিজীবী মানুষের লোকায়ত বিশ্বাস?

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বিশ্বাসের সঙ্গে জিজ্ঞাসা মেলে না; জ্ঞানের উৎস জিজ্ঞাসা। আর রসূল (দ:) নিজেও বলেছেন, জ্ঞানার্জনের জন্যে প্রয়োজন হলে সুদূর চীনেও যেতে। সুতরাং বর্তমান আলোচনা সে পরিপ্রেক্ষিতেই, কারও ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়।

সম্প্রতি ‘ইসলামি পার্বণের সামাজিক নৃতত্ত্ব’ নামক এক প্রবন্ধে বাহারউদ্দিন সামগ্রিকভাবে ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আলোচনা করেছেন তিনি রমজান, হজ সম্পর্কেও, মূলত প্রাচীন লোকবিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে।

প্রবন্ধকার জানিয়েছেন, ‘‘ঈদ, সওম এবং রমজানের মূল অর্থ তাদের উৎসভূমির ভিত্তিতেই। অনুমান হয় রোজার উপবাস জন্ম দিয়েছে কৃষিনির্ভর সমাজে, হয়তো-বা প্রাচীন সিরিয়ায়। রমজান মাস মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মাস এবং কোরানে একমাত্র এ মাসের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। এ মাসেই নাজেল হয়েছিল কোরান, প্রথম অহী পেয়েছিলেন মুহম্মদ (দ:), গিয়েছিলেন তিনি মেরাজে। বাহারউদ্দিনের মতে, মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার আগে রমজানের সঙ্গে পরিচয় ছিল না মুসলমানদের। এর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল হিজরতের পরেই। এ অনুমানের ভিত্তি– ‘রমজান’ শব্দটি আরবি ‘রমজ’ ধাতু থেকে আগত। রমজ মানে দাহ, তাপ। পুরনো আরবি শব্দতাত্ত্বিকদের ধারণা, চান্দ্রমাস চালু হওয়ার [চন্দ্রবর্ষই নিয়ন্ত্রিত করে মুসলমানদের উৎসব] অনেক আগে, প্রাচীনকালে গরমের মওসুমে এই মাস পড়ত বলে এর নাম হয় ‘রমজান’।’’

‘‘রমজানের সঙ্গে উপবাসের আরবি প্রতিশব্দের ধ্বনিগত কোনো মিল নেই। উপবাসের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘সওম’। এর অর্থের সঙ্গেও উপবাসব্রতের কোনো মিল নেই। এর অর্থ হল আরাম বা বিশ্রামে থাকা। হিজরতের পরেই সম্ভবত ইহুদি সিরিয়াক সূত্র থেকে উপবাসের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সওম’ শব্দটি গ্রহণ করেন মুহম্মদ (দ:)। কোরানের ১৯ নং সূরা মরিয়মের ২৭ নং আয়াতে ‘সওম’ শব্দটি আছে।’’

‘‘দ্বিতীয় হিজরিতে নির্দেশ এসেছিল অবশ্য কর্তব্য হিসেবে রজমান পালনের এবং এ উপবাসের সঙ্গে মিল আছে আবার পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিস্টানদের, যারা নির্দিষ্ট সময়ে চল্লিশ দিন পালন করেন উপবাস। রমজান শেষে ঈদ-উল-ফিতর। ঈদের অর্থ উৎসব। তবে আভিধানিক অর্থ ‘পুনরাগমন’ বা বারবার ফিরে আসা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানজ্ঞাপক অধিকাংশ শব্দের মতো ঈদ শব্দটি মূলত সিরিয়াক।’’

আরও লিখেছেন তিনি, ‘‘ঈদ শব্দটির অর্থের সঙ্গে আজকের অর্থের কোনো যোগাযোগ নেই, কিন্তু সামাজিক উৎসবের প্রকৃতিকে অর্থবহ করে তোলে তার আদি অর্থ। সামাজিক উৎসব বারবার ফিরে আসে আর ঈদ শব্দের আদি অর্থেও আছে তার ইঙ্গিত।

ঔপনিবেশিক আমলে যে উৎসব সবচেয়ে ধুমধামের সঙ্গে পালিত হত এবং যে ধর্মীয় উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি ছুটি বরাদ্দ ছিল, তা হল ক্রিসমাস। এর কারণ স্বাভাবিক। ইংরেজরা ছিল শাসক। সুতরাং তাদের উৎসব যে শুধু জাঁকালো হত তা নয়, এ নিয়ে মাতামাতিও কম হত না। স্থানীয় ভদ্রলোকেরাও যোগ দিতেন ক্রিসমাসে। তৎকালীন বাংলার কলকাতা ছিল ক্রিসমাস উৎসব পালনের প্রধান কেন্দ্র। কারণ, কলকাতা ছিল রাজধানী এবং শাসকগোষ্ঠী ও শহরের সম্পন্ন ভদ্রলোকদের বেশিরভাগ সেখানেই থাকতেন। তবে গ্রামাঞ্চলের কথা দূরে থাক, শহর বা মফস্বলের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না।

ওই সময় বিত্ত-বিদ্যার দিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে মুসলমানদের থেকে হিন্দুরা সম্প্রদায় হিসেবে এগিয়ে ছিলেন অনেক। ফলে ক্রিসমাসের পর সরকারিভাবে তো বটেই, সম্প্রদায়গত আধিপত্য এবং ঐতিহ্যের কারণেও এ অঞ্চলের দুর্গাপুজা হয়ে উঠল সবচেয়ে জাঁকালো এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। সরকারি ছুটির পরিমাণ ঈদের থেকেও পুজোর জন্য ছিল বেশি। পুজোর ছুটিতে সম্পন্ন ভদ্রলোকরা বেরিয়ে পড়তেন ভ্রমণে। চাকরিজীবীরা ফিরতেন গ্রামের বাড়িতে; আসতেন জমিদাররা শহর থেকে প্রজাদের খোঁজখবর নিতে। বিত্ত ছিল তাদের। সুতরাং ধুমধামের সঙ্গে উৎসব পালনে বাধা ছিল না।

ইংরেজ আমলের মুসলমান চাকুরেদের আবেদনপত্রে দেখা যায়, তাঁরা আবেদন জানাচ্ছেন ঈদে ছুটি বৃদ্ধির জন্য। কিন্তু কর্ণপাত করা হয়নি তাতে। আর ছুটি বৃদ্ধি করলেই-বা কী হত? বড়জোর গ্রামের বাড়িতে ফিরে পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে কয়েকদিন কাটিয়ে যেতে পারতেন। ঈদকে উৎসবে পরিণত করা সম্ভব ছিল না তাঁদের পক্ষে। কারণ গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মুসলমান ছিলেন বিত্তহীন।

ঈদ মুসলমানদের প্রধান উৎসব হিসেবে পালিত না হওয়ার আকেটি কারণ, বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা। ফারায়েযী আন্দোলনের আগে গ্রামাঞ্চলে মুসলমানদের কোনো ধারণা ছিল না বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে। ইসলাম ধর্মে লোকজ উপাদানের আধিপত্য ছিল বেশি৷

১৮৮৫-এর দিকে জেমস ওয়াইজ লিখেছিলেন, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সরল অজ্ঞ কৃষক। ইসলাম ধর্মে যেসব বিজাতীয় রীতিনীতি প্রবেশ করেছিল তারা এখন তা উৎপাটন করতে চাইছে। কিন্তু এরপর ওয়াইজ যে উদাহরণ দিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে, কৃষকরা এর পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। লাক্ষ্য নদীর তীরে, কোরবানির ঈদের সময় গ্রামবাসীরা জমায়েত হয়েছেন ঈদের নামাজ পড়বেন বলে। কিন্তু জামায়েতের একজনও জানতেন না কীভাবে ঈদের নামাজ পড়তে হয়। তখন নৌকায় ঢাকার এক যুবক যাচ্ছিলেন। তাকে ধরে এনে পড়ানো হয়েছিল নামাজ।

অন্যদিকে, মুকুন্দরাম আবার চণ্ডীকাব্যে লিখেছিলেন, মুসলমানরা বড়ই ধার্মিক এবং প্রাণ গেলেও ‘রোজা নাহি’ ছাড়ে–
‘ফজর সময়ে উঠি, বিছানা লোহিত পাটি
পাঁচ বেরি করয়ে নামাজ।
সোলেমানি মালা ধরে জপে পীর পয়গম্বরে
পীরের মোকামে সেই সাজ।
দশবিশ বেরাদরে বসিয়া বিচার করে,
অনুদিন কিতাব কোরান।
বড়ই দানিসমন্দ, কাহাকে না করে ছন্দ
প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ে।’
মনে হয়, মুকুন্দরাম এ বর্ণনা লিখেছিলেন বহিরাগত মুসলমানদের দেখে।

মির্জা নাথানও বহিরাগত মুসলমানরা কীভাবে রমজান এবং ঈদ পালন করতেন তার বর্ণনা রেখে গেছেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতিনিধি সুবেদার ইসলাম খাঁ ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করেছিলেন ১৬১০ সালে। নাথান ছিলেন তাঁর একজন সেনাপতি। বাংলাদেশের মুঘল অভিধানের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন নাথান তাঁর গ্রন্থ ‘বাহারিস্তান ই-গায়বী’তে। রমজান সম্পর্কে তিনি লিখেছেন–

‘‘রমজান মাসের শুরু থেকে ঈদ পর্যন্ত প্রতিদিন বন্ধুবান্ধবরা পরস্পর মিলিত হত পরস্পরের তাঁবুতে। এটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাধারণ এক রীতি।’’

ঢাকার ঈদ প্রতিপালন সম্পর্কে সবচেয়ে পুরোনো তথ্যটি পাই আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর ‘নওবাহারই মুর্শীদ খান’ গ্রন্থে। ঐতিহাসিক আবদুর রহিম সে গ্রন্থ অবলম্বন করে লিখেছেন–

‘‘মুসলমানরা সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রা করে ঈদগায় যেত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা উৎসবের সময় মুক্ত হস্তে অর্থ ও উপহারাদি পথে ছড়িয়ে দিতেন।’’

এ বর্ণনা থেকে মনে হতে পারে, দু-তিনশ বছর আগে ঢাকায় বোধহয় খুব ধুমধামের সঙ্গে ঈদ পালিত হত। আসলে তা ঠিক নয়। এ বর্ণনাটির পরিপ্রেক্ষিত সঠিক নয়। আর এত ধুমধামের সঙ্গে ঈদ পালিত হলে অন্যান্য উৎসবের মতো ঈদের বর্ণনা থাকত বিভিন্ন গ্রন্থে। মূল ব্যাপারটি ছিল এ রকম [যদুনাথ সরকারের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে]–

‘‘দ্বিতীয় মুর্শীদ কুলি খাঁর সময় (১৭২৯) জয় করা হয়েছিল ত্রিপুরা। ২৯ রমজান নবাব এ খবর পেয়ে এত উল্লসিত হলেন যে, তিনি যেন দুটি ঈদ পালন করছেন। ঈদের দিন, এ কারণে তিনি মীর সৈয়দ আলী ও মীর মোহম্মদ জামানকে আদেশ দিলেন গরিবদের মধ্যে এক হাজার টাকা বিতরণ করতে। ঢাকা কিল্লা থেকে এক ক্রোশ দূরে ঈদগা যাবার পথে রাস্তায় ছাড়ানো হয়েছিল মুদ্রা।’’

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, ঈদের দিন যে হইচইটুকু হত তা বহিরাগত উচ্চপদধারী বা ধনাঢ্য মুসলমানদের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। এ সবের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ছিল যোজনব্যাপী ব্যবধান। আর রইসরাও ঈদের দিন ‘পথে প্রচুর পরিমাণ টাকাকড়ি ছড়িয়ে দিতেন’ না [একবার দেওয়া হয়েছিল বিশেষ কারণে]। তবে, কিছু দান-খায়রাত হয়তো করতেন।

এরপর এ শতকের আগের ঈদের বর্ণনা তেমন আর পাই না। তবে, মুঘলরা ঈদের গুরুত্ব দিতেন। তা বোঝা যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা [যেমন, ঢাকা, সিলেট] শাহী ঈদগাহের ধ্বংসাবশেষ দেখে। এ রকম একটি ঈদগা আছে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকায়, যার কথা একটু আগেই উল্লেখ করেছি।

ধানমণ্ডির ঈদগাহটি মাটি থেকে চার ফুট উঁচু একটি সমতলভূমি। দৈর্ঘ্য এর ২৪৫ ফুট, প্রস্থ ১৩৭ ফুট। বিস্তৃত তিনদিকে। পশ্চিমে ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর, যেখানে রয়েছে মেহরাব বা মিম্বর। পাশ দিয়ে তখন এর বয়ে যেত পাণ্ডু নদীর একটি শাখা। এই শাখা নদী জাফরাবাদের সাতগম্বুজ মসজিদের কাছে মিলিত হত বুড়িগঙ্গার সঙ্গে।

শাহ সুজা যখন বাংলার সুবাদার তখন তাঁর আমাত্য মীর আবুল কাসেম ১৬৪০ সালে নির্মাণ করেছিলেন ঈদগাহটি। সুবাদার, নাজিম ও অন্যান্য মুগল কর্মকর্তারা নামাজ পড়তেন এখানে। ইংরেজ আমলে জরাজীর্ণ ও জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় ছিল ঈদগাহটি।

ঐতিহাসিক তায়েশের বিবরণ থেকে জানা যায়, তবুও উনিশ শতকে [খুব সম্ভব শেষের দিকে] শহরের মুসলমানেরা ঈদের নামাজ পড়তেন এই ঈদগাহে এবং এখানে আয়োজন করা হত একটি মেলার। অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে, ঈদ উপলক্ষে এখানে হত মেলা, যেখানে যোগ দিতেন শহর ও আশেপাশের এলাকার লোকজন।

এখানে বলে রাখা ভালো, যে, মুঘল আমলে ঈদের দিন ঈদগাহে যেতেন মুঘলরাই, সাধারণ মানুষের স্থান সেখানে ছিল কিনা সন্দেহ। তবে, তায়েশ উল্লিখিত মেলার বর্ণনা থেকে অনুমান করে নিতে পারি, উনিশ শতকের শেষে এবং এ শতকের গোড়ায় ঈদের দিন আনুষঙ্গিক আনন্দ হিসেবে সাধারণ মানুষ যোগ করেছিলেন একটি লোকায়ত উপাদান– মেলা। তায়েশের বর্ণনা ছাড়া [তা-ও সম্পূর্ণ নয়] মেলার কথা আত্মজীবনীতে অবশ্য তেমন পাওয়া যায় না। বয়োবৃদ্ধদের কাছে শুনেছি, ছেলেবেলায় ঈদ উপলক্ষে তাঁদের কোথাও কোথাও মেলা বসার কথা মনে পড়ে।

সম্প্রতি, আশরাফউজ্জামান তাঁর আত্মজীবনীমূলক এক নিবন্ধে এই মেলার কথা উল্লেখ করেছেন–

‘‘ঈদের মেলা হত চকবাজারে এবং রমনা ময়দানে। বাঁশের তৈরি খঞ্চা ডালা আসত নানা রকমের। কাঠের খেলনা, ময়দা এবং ছানার খাবারের দোকান বসত সুন্দর করে সাজিয়ে। কাবলীর নাচ হত বিকেল বেলা।’’

আবদুস সাত্তারও প্রায় একই কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা যে সময়ের কথা লিখেছেন তা সম্ভবত ত্রিশ-চল্লিশের দশক। চকবাজার, কমলাপুরে এখনও হয়তো সেই মেলার রেশ ধরে মেলা বসে।

ঈদ সম্পর্কে যে স্বল্প বিবরণ পাওয়া যায়, তা থেকে ধরে নেওয়া যায়, রমজান মাস থেকেই শুরু হত ঈদের প্রস্তুতি। এ উৎসবের শুরু হত রমজানের ঈদের চাঁদ দেখা থেকে। মনে হয়, এটি মুঘল প্রভাবের কারণ এবং তা সীমাবদ্ধ ছিল শহরে বিশেষ করে ঢাকার এবং মফস্বল বা গ্রামের সম্পন্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে।

১৯৪৭-এর আগে, বাংলাদেশে একমাত্র ঢাকাতেই ঈদ যা একটু ধুমধামের সঙ্গে পালিত হত। ঢাকা ছিল পূর্ববঙ্গের প্রধান ও মুঘল শহর। তাই মুঘল ঈদের প্রভাব ছিল বেশি। তাছাড়া, এখানে থাকতেন নওয়াব ও অন্যান্য মুসলমান ধনাঢ্য ও শরীফ ব্যক্তিরা। ফলে ঈদ পেত পৃষ্ঠপোষকতা।

ঢাকার উপরের স্তরে যে রীতিনীতি চালু ছিল, তা হল খোসবাস বা সুখবাস সমাজ প্রভাবিত। হাকিম হাবিবুর রহমান লিখেছেন–

‘‘ঢাকার সমাজ ব্যবস্থা ও তাহযীব তমুদ্দন মূলত আগ্রারই সমাজব্যবস্থা ও তখনকার তাহযীব-তমুদ্দন। কিন্তু এই সমাজ কাঠামোতে ইরানিদের আধুনিক তমুদ্দন যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। এদের মাধ্যমে শিয়া মত-সংশ্লিষ্ট লোকদের মধ্যেও প্রবেশ লাভ করেছে। এই ধর্মীয় মতবাদটি অজ্ঞাতসারে উর্দুভাষী সুন্নীদেরকেও প্রভাবিত করেছে।’’

উনিশ শতকের শেষার্ধে ও এ শতকের প্রথম দু-তিন দশকের পরিপ্রেক্ষিতে এ মন্তব্য করেছিলেন হাকিম হাবিবুর রহমান। এর রেশ ঢাকা শহর থেকে এখনও মিলিয়ে যায়নি।

খোসবাস সংস্কৃতির একটি উদাহরণ ছিল ঢাকার ঈদের মিছিল। এ ধরনের মিছিল বাংলাদেশের কোথাও বেরোত না। এ সম্পর্কে জানা যায় আলম মুসাওয়ারের এক চিত্রমালা থেকে।

আলম মুসাওয়ার নামে এক শিল্পী, খুব সম্ভব উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকার ঈদ ও মুহররম মিছিলের ৩৯ টি ছবি এঁকেছিলেন, যা রক্ষিত আছে জাতীয় জাদুঘরে। এ চিত্রমালা দেখলে বোঝা যায়, নবাবি আমলের ঢাকার মুহররম ও ঈদ মিছিলের বর্ণাঢ্য রূপ ও ব্যাপকতা। ছবিগুলো দেখে অনুমান করে নিতে পারি, নায়েব নাযিমদের বাসস্থান নিমতলি প্রাসাদের ফটক থেকে [বর্তমান এশিয়াটিক সোসাইটির পেছনে] বিভিন্ন পথ ঘুরে, চকবাজার, হুসেনি দালান হয়ে সম্ভবত মিছিল আবার শেষ হত মূল জায়গায় এসে।

মিছিলে থাকত জমকালো হাওদায় সজ্জিত হাতি, উট, পালকি। সামনের হাতিতে থাকতেন নায়েব নাযিম। কিংখাবের ছাতি হাতে ছাতি বরদার, বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ছিল কাড়া-নাকড়া শিঙা। রঙবেরঙের নিশান মিছিলের রূপ দিত আরও খুলে। দর্শকরা সারি বেঁধে থাকতেন রাস্তার দু’পাশে, ছাদে। এঁদের মধ্যে ছিলেন দেশীয়, মুঘল। [বহিরাগত], ইংরেজ সাহেব, মেম। রাস্তায় রাস্তায় ফকির যেমন ছিল, তেমনি ছিল খেলা-দেখানেওয়ালা।

এ মিছিল কবে শুরু হয়েছিল, তা জানা যায়নি। খুব সম্ভব নায়েব নাযিমরা যখন থেকে নিমতলি প্রাসাদে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন [অষ্টাদশ শতকে], তখন থেকেই এই মিছিলের শুরু।

ঈদের মিছিল আবার কবে ঢাকা থেকে মিলিয়ে গিয়েছিল, তাও জানা যায়নি। খুব সম্ভব উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঢাকার নায়েব নাযিমদের বংশ লুপ্ত হয়ে গেলে, সমাপ্তি ঘটেছিল এ মিছিলের। কারণ, ধনাঢ্যের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত এ ধরনের মিছিল সংগঠিত করা দুরুহ।

এ শতকের বিশ-ত্রিশের দশকে ঢাকায় রমজানের শুরুতে ঘরবাড়ি মসজিদ সব সাফ সুতরো করে রাখা হত। রমজানের চাঁদ দেখার জন্য বিকেল থেকেই বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, হুসেনি দালানের ছাদে ভিড় জমে যেত। ‘‘চাঁদ দেখা মাত্রই চারিদিক হইতে মোবারকবাদ, পরস্পর সালাম বিনিময় এবং গোলাবাজি ও তোপের আওয়াজ হইতে থাকিত।’’

ঢাকার রমজান ও ঈদের বড় আকর্ষণ ছিল খাবার। রোজায় ঘরে অনেক রকম ইফতারি থাকলেও সবাই একবার চকে ছুটে যেত। চক সেই মুঘল আমল থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য, খাবার-দাবার, আড্ডার কেন্দ্র। চকের ইফতারির কিছু বিবরণ রেখে গেছেন আবু যোহা নূর আহমেদ। খাবারগুলো ছিল– শিরমাল, বাকেরখানি, চাপাতি, নানরুটি, কাকচা কুলিচা, নানখাতাই, শিক কাবাব, হাড্ডি কাবাব, মাছ ও মাংসের কোফতা, শামি ও টিকা কাবাব, পরোটা, বোগদাদি রুটি, শবরাতি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবত ও নানারকম ফল। চক এখনও প্রায় সে ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।

উপসংহার: এদেশে স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে ঈদ এবং এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। ইসলাম সম্পর্কে আগের অজ্ঞতাও তেমন নেই এখনকার মুসলমানদের মধ্যে। ফলে স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমপ্রধান দেশে ঈদ এখন নিজের গৌরবোজ্জ্বল, ঐতিহ্যম-িত স্থান করে নিয়েছে এবং আমাদের বাংলাদেশেও তা বিরাট গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। মুসলমানদের ধর্মীয় তামুদ্দনিক জাগ্রত করেছে এই ঈদুল ফিতর, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কবির ভাষায় বলতে গেলে-
“এসো মুসলিম তসলিম নাও,/নাও এ তোহফা বেহেশতের/তশতরী ভরে শীরনি বিলাও/নির্মল ইনসানিয়াতের।”
সবাইকে ঈদ মোবারক।

তথ্যসূত্র:

১| মো. জোবায়ের আলী জুয়েল : কলাম লেখক
২| দৈনিক যায় যায় দিন৷
৩| মুনতাসীর মামুন৷
৪| আবুল মনসুর আহমেদ৷
৫| দৈনিক জনকণ্ঠ৷
৬| মো. জোবায়ের আলী জুয়েল৷
৭| crimebarta.com
৮| ফেসবুক৷
৯| উইকিপিডিয়া৷
১০| অন্যান্য

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।