সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রঞ্জন চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২)

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ
উপন্যাস প্রসঙ্গে হেনরী জেমস মন্তব্য করেছিলেন – –“A novel is a living thing, all one and contimuous, like every other organism.” উপন্যাসের শৈল্পিক রূপ বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমেই যেটা মনে রাখা জরুরী সেটা হল এই সাহিত্যমাধ্যমটি জীবন নির্ভর শিল্প। উপন্যাসের দুটি দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ – প্রথমতবহুমাত্রিক জীবনবীক্ষা এবং দ্বিতীয়ত বাস্তবতার অভিব্যক্তি। ঔপন্যাসিক জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন ও তার বৈচিত্র্যময় রূপ নিজের মত করে বিশ্লেষণ করেন, কারণ জীবন হল সাহিত্যের মৌলিক উপকরণ। প্রবহমান জীবন ও পরিবর্তনশীল সমাজের ছবি উপন্যাসের আয়নায় প্রতিফলিত হয়। উপন্যাসের শৈল্পিক বিন্যাসের মধ্যে লেখকের যে জীবনবোধ প্রচ্ছন্ন থাকে তার সাহায্যে মানবচরিত্রের বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ঔপন্যাসিকের থেকে আশা করা যায় তিনি মানুষের মনের গভীরে গিয়ে অন্তর্লোকের খবর পাঠকের সামনে তুলে ধরবেন এবং জীবনের শিল্পরূপের ভাষাচিত্র আঁকবেন। যে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গী রোমান্টিক তিনি প্রাধান্য দেন ঘটনার চমৎকারিত্বকে। আর যে লেখক বাস্তববাদী তিনি জীবনের নানাভাবে বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দেন।
এখানে উপন্যাসের আঙ্গিক বা শিল্পরূপের কথা চলে আসে। উপন্যাসের আঙ্গিক বিশ্লেষণ করতে হলে তিনটি দিক খেয়াল রাখতে হয় – আখ্যান ভাগ, চরিত্রচিত্রণ এবং পরিবেশন রীতি (যাকে method of communication বলা হয়)। আর্নল্ড কেটল-এর মতে -“The novel does not simply convey life; it says something about life. It reveals some kind of pattern in life. It brings significance.” জীবন ও জগৎকে পর্যবেক্ষণ করে তার থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা, ধারণা ও বিভিন্ন উপাদানের সার্থক সমন্বয়ে উপন্যাস শিল্পরূপ পায়। উপন্যাসের বিভিন্ন উপাদানগুলি তাহলে কি কি? উপন্যাসের concrete element হল প্লট, চরিত্র, দৃষ্টিকোণ, পশ্চাৎপট, সময় ও ভাষা। আর abstract element হল ঔপন্যাসিকের নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা জীবন বিষয়ে ধারণা।
ঔপন্যাসিক যে কাহিনীটিকে উপন্যাসের বিষয় হিসেবে ভেবেছেন তাকে কার্যকারণ সম্পর্কের পরম্পরায় গেঁথে নিয়েপ্লট তৈরী করেন। গল্প (story) এবং প্লট (plot) কিন্তু এক নয়, এদের মধ্যে মূলগত পার্থক্য আছে। গল্পে সময়সরণি ধরে কয়েকটি ঘটনা পরপর সাজান থাকে, কিন্তু প্লট হয়ে উঠতে গেলে সেই ঘটনাগুলিকে কার্যকারণ সম্পর্কে গাঁথা কাহিনী হতে হবে। E. M. Forster প্রথম গল্পের সঙ্গে প্লটের পার্থক্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উপন্যাসের কাহিনী পরিবেশনের আধারকে বলা যেতে পারে form আর পরিবেশনের ঢং-কে বলা যেতে পারে style। এই style থেকেই লেখকের স্বকীয়তা বোঝা যায়। উপন্যাসের কাহিনীর মধ্যে সাহিত্যরস সঞ্চারিত করার আধারকে বলা যায় শিল্পশৈলী, যা কিনা উপন্যাসের শিল্পনির্মিতির বিচারে প্লট সৃষ্টি। উপন্যাসের মূল ভিত্তি এই প্লট আবার তিনপ্রকার – সরল (simple), জটিল (complex) ও যৌগিক (compound)। সরল প্লটে একটিই কাহিনী থাকে, তার কোন শাখাকাহিনী বা উপকাহিনী থাকে না। জটিল প্লটে একটি মূল কাহিনীর সঙ্গে পরিপূরক হিসেবে থাকে কয়েকটি উপকাহিনী, ফলে আখ্যানভাগ বিস্তৃততর ও জটিল হয়। যৌগিক প্লটে একাধিক কাহিনী থাকে যার প্রতিটিই আলাদা আলাদাভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু এদের মধ্য কোন কাহিনীই মুখ্য হয়ে ওঠে না। সুতরাং প্লট নির্মিতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে উপন্যাসের অন্তরঙ্গ গ্রন্থন যা লেখকের রচনারীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।