সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১৫)

পিরিচ পেয়ালার ও একটি সন্ধ্যা

পিরিচ পেয়ালার ঠুংঠাং- এ ভরে ওঠে সন্ধ্যা, সাথে ভীমসেন মেজাজী আড্ডা৷ কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কচ্ছ থেকে কোহিমা গোটা ভারতটা ঘুরে ফেলি কিংবা বলা কি যায় গোটা পৃথিবীটাই হয়ত ঘুরে ফেলি আমরা আড্ডা দিতে দিতে৷ আর বিষয়? সম্পর্ক থেকে রসায়ন, রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি কোন বিষয়ে আলোচনা হয় না বলুন তো এই আড্ডায়! যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বারেবারে ধরা পড়ে পিরিচ পেয়ালার এই সন্ধ্যার আড্ডায়৷

তেমনই এক সন্ধ্যায় “জীবন পথ চলা নিয়ে” বাঁধল গোল৷ কোনটা ভুল আর কোনটা অন্যায় তাই নিয়ে চলল বিস্তর তর্ক৷
একেবারে চুলচেরা বিচার৷ নিত্তি মেপে এগানো৷ সমানুপাত ব্যস্তানুপাত কিছু কি বাকি থাকল? আমার আবার হিসেব কষাকষির এমন বহর দেখলে কেশব চন্দ্র নাগের কথা ভারি মনে হয়৷ আর ঐ বাঁদরটার কথা
তেল মাখা ডান্ডায় কিছুটা উঠছে আবার স্লিপ করে ততটাই নেমে আসছে৷

মুহূর্তের খুদকুঁড়ো আগলাচ্ছি জীবনের বন্ধুর পথে৷ আগুনের পথ বেয়ে শব্দেরা বানভাসি হলে আউল বাউল মনকে খানিক জিরিয়ে নিতে দিই৷ হেমন্তের ঘুমন্ত বিছানায় যে উপন্যাস আলো আঁধারের খেলায় মাতে, শীতের অরণ্যে তার রূপ খানিক বিবাগী৷ বনহরিনীর অমল ছন্দে বাতাসের জায়গিরদারী৷ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা অমলতাস গাছের সংসার৷ উঠোনে পড়ে থাকা ছিটেফোঁটা অন্ধকার কুড়িয়ে বাড়িয়ে বাষ্পের মত উড়িয়ে দেওয়া মেঘেদের অন্দরমহলে৷

অনন্ত উত্তাপে গলতে থাকে জীবনের বিভাজন রেখা, কখনও বা সে মিলন উৎসবের মত বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠে৷ আকাশের মেখলা থেকে ঝরে পড়া বাহারি পালক দিয়ে ঢাকা পড়ে অতীতের ক্ষতচিহ্ন৷ পুড়ে যাওয়া বসতবাটী থেকে ধূমায়িত সুখ শুধু ছাই প্রসব করে৷ হেমাঙ্গ বালুচর জুড়ে অনাবীল স্বপ্ন ভঙ্গের হাতছানি৷ দ্রিমি দ্রিমি ধ্বনিতে পাহাড়ের বুক চিরে উঠে আসা দমকা শব্দেরা অসহিষ্ণু আবদারে, বাসা বাঁধে অশরীরী চালে৷

গড়লের ভাগ যত বাড়ে শরীরী জানালায় জেগে থাকে রাত৷ অসূয়া জমছে যত, গাঢ় হয়৷ বিষাদের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া৷ নদীর ঘাটে জমে ওঠে রাশি রাশি আবর্জনা, অযাচিত পাহাড়৷ পূণ্যলোভাতুর আমি, তুমি, সবাই৷ পাপস্খালনের নেশায় কন্ঠ অবধি ডুবে থাকা স্রোতোবহা পূণ্যসলিলায়৷ আক্ষেপ ঘিরে ধরে৷ দেওয়া নেওয়া হিসাবের খাতে বড়সড় গোলযোগ৷ দিনান্তে পড়ে থাকা কিছু কানাকড়ি সম্বল৷ অক্ষয় কিছু নয়, তবু দড়ি টানাটানি৷ জীবনের শেষ ধারাপাতে শুধু আকুতির সুর৷ স্বয়ং চূর্ণিত হয়ে বিশ্ব চরাচরের মাঝে নিজেকে ছড়িয়ে দিই আতরের মত৷

আসছে সপ্তাহে আমাদের সন্ধ্যার আড্ডায় আবার কী নিয়ে দক্ষযজ্ঞ বাঁধে দেখি! চিন্তা করবেন না, একেবার সেই বিষয়টা নিয়েই চলে আসব আগামী সপ্তাহে ” পেয়ালা পিরিচ ও একটি সন্ধ্যা”-র পরের পর্বে৷ ভালো থাকুক সকলে৷

*বিঃদ্রঃ পেয়ালা পিরিচ সহযোগে সন্ধ্যায় আপনিও জমিয়ে আড্ডা মারুন

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।