ক্যাফে গল্পে রাকেশ ব্যানার্জী

উত্তরমেরুর পরিবেশ সঙ্কট
সম্প্রতি মেরুদেশীয় আবহাওয়া বিষয়ে গবেষক বিজ্ঞানীরা লক্ষ্যকরেছেন,যে উত্তর মেরু সারাবছর বরফাবৃত থাকে 2020 সালের মে মাসে তার বরফ গলে গিয়ে জল দেখা যাচ্ছে।এটা অনভিপ্রেত কারন এই ঘটনাটা কেবল উত্তরমেরুর উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রমাণ করে তাই না পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করে।এই উষ্ণতা বৃদ্ধি কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয়।এর ইঙ্গিত মানুষ অনেক আগেই পেয়েছে।
গত তিনদশকধরে দেখাযাচ্ছে উত্তরমেরুর বরফের পরিমাণ গড়ে দশ শতাংশহারে প্রতি দশকে কমে যাচ্ছে।উত্তরমেরু কোনমহাদেশ নয় এটি মহাসমুদ্র।এর বরফের নীচে আছে জল। সাধারনত প্রতি সেপ্টেম্বর মাসে এই বরফ জমা শুরু হয়।এপ্রিল-মে মাস পর্যন্ত বরফের পরিমাণ বাড়ে জুনমাস থেকে গলতে শুরুকরে অগাস্ট পর্যন্ত গলে আবার সেপ্টেম্বর থেকে এই চক্র শুরু হয়। কিছুটা গতবছরের বরফ থেকেই যায়।এইভাবে প্রত্যেকবছরেই সব বরফ গলে না।এইবরফ multi-year sea ice নামে খ্যাত। এর উপর প্রতিবছর নতুন বরফ জমা হয় যাকে first-year sea ice বলা হয়। প্রতি বছর কিছু তুষার যা multi-year sea ice-এর উপর জমা হয় তা পরের বছর থেকে যায়।এইভাবে জমা হওয়া বরফ উত্তরমেরুর বরফ চাদর তৈরী করে।কিন্তুপরিবেশদূষণের ফলে এই বরফ আজ গলে যাচ্ছে । প্রথমত পৃথিবী উষ্ণথেকে উষ্ণতর হয়ে যাওয়ার ফলে বরফ গলার সময় বেড়ে গিয়ে জমার সময় কমে যাচ্ছে।যেহেতু উত্তরমেরু চারদিকে কয়েকটি দেশ দিয়েঘেরা তাই পরিবেশ দূষণ ভীষন বেশী।বিভিন্ন কারখানা মোটরগাড়ী বা জৈবজ্বালানি থেকে নির্গত কালোকার্বন বাতাসে প্রচুরপরিমাণে মিশে যাচ্ছে যা তুষার হয়ে ঝড়ে পড়ে কালো রঙের বরফ রূপে জমা পড়ছে আগের বরফের উপর। এই বরফ স্বাভাবিকভাবেই লবণাক্ত।ফলে উপগ্রহচিত্র যে ছবি নিচ্ছে তা multi-year sea ice-এর পুরুত্ব বেশী দেখাচ্ছে।ফিল্ডস্টাডির মাধ্যমে দেখা গেছে এর পুরুত্ব অনেক কম যা উপগ্রহ চিত্র দেখাচ্ছে তার চেয়ে।যার ফলেআগে যে আশঙ্কা করা হয়েছিলো যে উত্তরমেরুর বরফ গ্রীষ্মকালে পুরো গলে যেতে 2050 সাল লেগে যাবে এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন যে তার বেশ কিছু আগেই এই ঘটনা ঘটবে।এছাড়া কালো বরফ অনেকবেশী তাপ শোষণ করে গলে যাচ্ছে যার ফলে নীচের সমুদ্রজল বেশী সূর্যতাপ পেয়ে উষ্ণতর হয়ে উঠছে।যা পক্ষান্তরে পৃথিবীর বাকি সাগর-মহাসাগরের জলের উষ্ণতা বাড়িয়ে ক্রান্তীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। করিওলিস বলের প্রভাবে মেরুপ্রদেশের এই বরফ ঘড়ির কাঁটার ঘুর্ণনপথে উত্তর মেরুকে কেন্দ্রকরে আবর্তিত হয় এবং গ্রীনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে আটলান্টিকের গরমজলের সংস্পর্শে এসে অধিকাংশই গলে যায়। উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পারমাফ্রস্ট যা মাটি পাথর ইত্যাদি জমে তৈরী হয় তাও গলে যায়এবং এরমধ্যে থাকা মিথেন ছেড়ে দেয়।মিথেন পরিবেশের উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। এইভাবে যখন মেরুর glacier কালো ধোঁয়ার প্রভাবে গলতে শুরু করবে যা সমুদ্রের জলের উচ্চতা বাড়িয়ে দেবে তা সমুদ্রতীরের অনেক জন বসতি ডুবিয়ে দেবে।
জন্য যখন বরফ ক্রমশঃ পাতলা হয়ে যায় তখন তা কেটে এগিয়ে যাওয়া জাহাজের পক্ষেআরও সহজ হয়ে যায়।ফলে পর্যটনের জন্য মেরুপ্রদেশ আরও উন্মুক্ত হয়ে যায়।উত্তরমেরু অঞ্চলে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেলের ভান্ডার থাকায় মানুষের লোভের কাছেএখানকার পরিবেশ আরও অসুরক্ষিত হয়ে পড়ছে।এইসব বাণিজ্যতরী থেকে নির্গত চুঁয়ে পড়া তেল এই জায়গার পরিবেশ আরও বিপজ্জনক করে দিচ্ছে।যা স্থানীয় মানুষের দৈনদ্দিন জীবিকারপক্ষেও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
মেরুর উষ্ণতা বৃদ্ধিরফলে বরফ যত গলে যায় সমুদ্রের জল ততবেশী সূর্যালোক পেয়ে উষ্ণ হয়ে জলের ফাইটোপ্লাঙ্কটন, অ্যালগি নষ্ট করে দেয় যা মেরুপ্রদেশের মাছের প্রধান খাদ্য।ফলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যই ধ্বংস হয়।যা মেরুভাল্লুক প্রভৃতি প্রাণীর খাদ্যের আকাল তৈরী করে। বরফ যেহেতু তাপের কুপরিবাহী সেহেতু বরফের চাদর এখানকার প্রানীদের জন্য ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষার উপায় ছিল। সেটাও না থাকা অনেক প্রানীর পক্ষে টিকে থাকাই ভবিষ্যতে মুশকিল হয়ে যাবে।স্থানীয় মানুষরাও তাদের বংশানুক্রমিক জীবিকা হারিয়ে তাদের চিরাচরিত বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য হবে।
কালক্রমে ব্যাপারটা এরকম হতেচলেছে যে গ্রীষ্মকালে উত্তরমেরুর বরফ সব গলে গিয়ে সমুদ্রজল সূর্যেরসামনে পুরো উন্মুক্ত হয়ে যাবে।এরফলে জলের উষ্ণতা আরও বেড়ে যাবে।মেরুসমুদ্রের তো বটেই সঙ্গে বাকি সমস্ত মহাসাগরেরও।অনিবার্য ফলশ্রুতি ক্রান্তীয় অঞ্চলে ঘনঘন আমফান,গুলাবের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে থাকবে।যদিও শীতকালে বরফ জমবে প্রচন্ড ঠান্ডার জন্য।এই অবস্থা থেকে পূর্বের অবস্থায় ফেরা তো সম্ভবই নয় অধিকতর খারাপ হওয়া থেকে বাঁচানোও সম্ভব নয়। নিজেদের আর্থিক এবং রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারনে উত্তর মেরুর কাছাকাছি থাকা দেশগুলিকে এখান কার প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অধিকার জারি রাখার প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে বাধ্য করবে বিভিন্ন বড় শিল্পগোষ্ঠি।যাদের আর্থিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা খর্ব হতে পারে এমন কোন পরিবেশবাদী আন্দোলন তারা সংশ্লিষ্ট দেশে সংগঠিত হতে দেবে না।