সম্পাদিকা উবাচ
by
·
Published
· Updated
নির্জন দুপুরের একটা নিজস্ব ভাষা আছে৷ নিস্তব্ধতার ভাষা৷ সে ভাষায় মিশে যায় হিজল গাছে বসে থাকা তিতিরের ডাক, হাঁড়িচাঁচার বিরামহীন কণ্ঠ, অলস ডাহুকীর ভেজা ডানার শ্লথ ওঠা নামার শব্দ, দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক কিংবা হেঁকে যাওয়া ফেরিওয়ালার বাহারিয়া সুর৷ মন কখনও হয়ে যায় ডাকহরকরার অমল, ঐ বুঝি দইওয়ালা এল সামনের পথ ধরে, আবার কখনও বা নষ্টনীড়ের চারুলতা -অপরাহ্নের তরুতলে, রহস্যময় ছায়াপাতে অমল ঠাকুরপোর সাথে সাহিত্যের মাদকরস পান, আর মন্দাকে ঠকাতে করা পরিকল্পনা “অমল ,গোটা কতক আমরা পেড়ে নিয়ে যেতে হবে, নইলে মন্দাকে কি হিসেব দেব ? ” নির্জন দুপুরের বুকের ভিতরে চলে বাতাসের কানাকানি৷ ডালপালা, পাতার মৃদু কম্পন সবকিছু শব্দের রূপ পায়,নির্জন দুপুরের ক্যানভাসে৷ দূর দূরান্তে গাছের ছায়ায় রাখাল ছেলের মোহন বাঁশী ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের গোপন ঘর৷ কখনও ঝরে পরা শিউলির গন্ধ ,কখনও বেল, জুঁই, বকুল, কখনও হাসনোহানার গন্ধে নেশা জাগে ,অনুভূতিগুলো অবশ হয়ে আসে৷ বৌ কথা কও পাখি, কেবলই ডেকে যায় -“বৌ কথা কও -বউ কথা কও”, লজ্জায় রাঙা হয় অনূঢ়ার কপোল৷ অপরাহ্নের সূর্য, সোনা ঝরায় নদীর বুকে, সেই সোনালী জলে মাঝি দাঁড় বেয়ে যায় ছলাৎ ছলাৎ শব্দে, গেয়ে চলে ভাটিয়ালী, নির্জন দুপুর হয়ে ওঠে আরও রহস্যময়৷ বসন্তের কোকিল ডেকে চলে অবিরাম,তার স্ত্রী সঙ্গীনির সঙ্গমের অভিপ্রায়ে৷ শ্যামলী গাইটা সবুজ কচি ঘাস চিবোতে চিবোতে, ডেকে ওঠে পরিতৃপ্তির ডাক৷ আপরাহ্নের আমবাগানে ডানপিটেদের ফিসফিস, আম গাছে উঠে আম লুকিয়ে লুকিয়ে আম পাড়ার দুষ্টামি, তাও মিশে যায় নির্জন দুপুরের নিস্তব্ধ ভাষায়৷ নদীর পারে ঘোমটার বউটির টুপটুপ ডুব, দুরন্ত দামালদের নদীতে ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে, এক সাঁতারে পারাপার, তাও ছুঁয়েছে নিঃশব্দের বুক৷ হরিৎ ক্ষেত্রের সীমাণায় বসুমতীর বুকে কৃষকের হাল চালানোর ছন্দ, চাষীর মুখ থেকে নির্গত সেই অতি চেনা গরু তাড়ানোর শব্দ,সবকিছু একটু একটু করে ভোরে তোলে নির্জন দুপুরের কলেবর৷ মেঠো পথ ধরে একতারায় সুর বেঁধে গেয়ে যায় উদাস বাউল তার প্রাণের গান৷ কখন যেন বোষ্টমী এসে কথা দিয়ে যায় -আমি বড় হলে আমাকে সে তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবে,যেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর একসাথে খেলা করে -তারও সাক্ষী হয়ে থাকে নির্জন দুপুর৷
নির্জনতার বুকে এই রকমারি শব্দেরা দ্বিপ্রহরের আচল জুড়ে রহস্যের জাল বোনে৷ নিস্তব্ধ দুপুর হয়ে ওঠে অনন্য সুন্দর৷ নির্জন দুপুরে রহস্যময় শব্দের মায়াজালে বন্দী হয় কত অনুভূতি, ভালো লাগা,খারাপ লাগার গল্প অপরাহ্ন্যের জমিতে এইসব শব্দেরা যেন হয়ে ওঠে শব্দকল্পদ্রুম৷ নির্জনতার বুকে তারা ভেসে বেড়ায়, একে অপরকে আলিঙ্গন করে৷ রচনা করে এক পৃথিবী কাব্য৷ নির্জনতার আকর খনন করে ,চয়ন করে নিই এক একটা মোতি,যা শব্দের রূপ পায় কল্পনার আলতো স্পর্শে৷শব্দই ব্রহ্ম৷ আর সেই ব্রহ্মের লীলা খেলা চলে হৃদয়ের অন্তর মহলে৷ ভাঙা-গড়ার নিরন্তর প্রবাহ৷ সেই প্রবাহে অবগাহন করে শব্দ নিয়ে করি জলকেলি| নির্জন দুপুরের মায়াচ্ছন্ন আবেশ জড়ানো মুহূর্তগুলো একে একে জুড়ে যায় পরস্পরের সঙ্গে৷ আর সেই জুড়ে জুড়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোর সাক্ষ্য দেয় শব্দেরা৷ হৃদয় নিঙড়ানো আবেগ আর অনুভূতির ছোঁয়া দিয়ে যায় সেইসব শব্দের গায়ে ,আর শব্দেরা হয়ে ওঠে রঙীন ,ভাষাময়৷ সেই ভাষা দিয়ে চলে স্বপ্ন বোনা৷ নির্জনতার বুকে শব্দের মিছিল আপরাহ্ন্যের শুণ্যতা ভরিয়ে তোলে কানায় কানায়৷ সেই শব্দেরা ক্রমে হয়ে ওঠে শব্দমালা, শব্দমালারা হয় অনুভূতি, আবেগ, ভালোবাসা, দুঃখ, সন্দেহ, অবকাশ৷ নির্জন দুপুরের জঠরে লালিত কবিতার ভ্রূণ৷ পরিচর্যা, প্রতিপালন যত্নের স্পর্শে অবশেষে জন্ম নেয় হৃদয়ের তরঙ্গ জুড়ে এক মানস সরোবর৷সেই মানস সরোবরে তরঙ্গায়িত শব্দেরা, অনুভূতি আর কল্পনার আলিঙ্গনে প্রস্ফুটিত হয় সতেজ নিষ্কলঙ্কিত পঙ্কজ রূপে ,যার ফুলরেণুগুলো কবিতা হয়ে ঝরে পরে নিস্তব্ধ অপরাহ্ণ্যের বুক, আর আমি সেইসব কবিতাকে যত্নে লালন করি মনের মনিকোঠায় হৃদয়ের আদুল ঘরে, চেতনার জ্ঞান-মন্দিরে ,স্বপ্নের শয়নকক্ষে৷ নির্জন দুপুরের শব্দরা এইভাবে জেগে থাকে আমার চেতনার ,অবচেতনার অর্ধ্বচেতনার মানসচক্ষে ,আর কবিতারা জন্ম নেয় হৃদয় জুড়ে অনাবীল আনন্দে কখনও বা নিদারুণ কষ্টে৷ দুপুরের নির্জনতায় এমনই এক ইন্দ্রজাল আছে ,যা ভাব পাগল মানুষদের অনুভূতিকে উস্কে দেয় আর আমরা কবিতায় কাল যাপন করি৷ কবিতা আঁকি ,কবিতা লিখি ,কবিতা চাখি ,কবিতা মাখি৷ নির্জন দুপুর আর কবিতারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় কখন , টেরই পাইনা৷
রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়