সম্পাদকীয়

খাজুরাহো মন্দির। অবশ্য নামেই মন্দির। আদতে খাজুরাহো বললেই আমাদের মনে যা ভেসে ওঠে অন্যকিছু! খাজুরাহো মানেই একটা কৌতূহল, রহস্য, ঠোঁট চাপা মুচকি হাসি। যৌনতাকে খুব কাছ থেকে দেখা!
প্রেম থেকে আকর্ষণ ও তা থেকে যৌনতার সম্পর্ক খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তবে প্রেম নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুললেও যৌনতা নিয়ে এখনো আড়ালেই আলোচনা হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো গ্রামে অবস্থিত ২২ টি প্রাচীন মন্দিরকে দেখলে মনেই হবে না এই দেশে কোনোদিন যৌনতা নিয়ে আদৌ কোনো গোপনীয়তা ছিল।
খাজুরাহো মূলত একটি গ্রামের নাম। গ্রামে আছে অসংখ্য মন্দির যা একবাক্যে খাজুরাহো মন্দির বলে খ্যাত। ভারতের মধ্যপ্রদেশের চত্তরপুর জেলার এই মন্দিরগুলোর খ্যাতির মূল কারণ মন্দিরের গায়ে খচিত ভাস্কর্যগুলো। শিল্পের বিচারে নিখুঁত এই ভাস্কর্যগুলোর তাৎপর্য অনেক। কিন্তু সাধারণ চোখে এগুলো যেন নিন্দার বিষয়, লজ্জার বিষয়। তাহলে নিন্দিত, লজ্জাকর একটা জায়গায় পর্যটকরা কেন যায়? যায় কারণ অনেকেই ভাস্কর্যগুলোর শিল্পবোধকে শ্রদ্ধা করে আর অনেকে নিছক মজা নিতে ঘুরে আসে। ৯৫০ থেকে ১০৫০ সালের মধ্যে নির্মিত হয় এই মন্দিরগুলো। খাজুরাহো ছিল ৮৫টি ভিন্ন ভিন্ন মন্দিরের আবাস। নানান সময়ে ধ্বংসের পর আজও টিকে আছে মাত্র ২০ টি মন্দির। মূলত মুসলিম শাসনামলে ধ্বংস করে ফেলা হয় অনেক মন্দির।
ঐতিহাসিক তেমন কোন নথি না থাকায় খাজুরাহো মন্দির নির্মানের উদ্দেশ্য কী ছিল সে সম্পর্কে জানা যায় না। তবে এই মন্দিরগুলো নির্মান প্রসঙ্গে বিভিন্ন মিথ প্রচলিত আছে। যদি মিথগুলোকে সত্য ধরা হয় তবে এর উদ্দেশ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে অল্প ধারণা পাওয়া যায়।
বলা হয়ে থাকে, বারানসীর এক ব্রাহ্মণের এক অনিন্দ্য সুন্দরী কন্যা ছিল। নাম তার হেম্বতী। কিন্তু ব্রাহ্মণের এই কন্যা খুব অল্প বয়সেই বিধবা হয়। জ্যোৎস্নাশোভিত গ্রীষ্মের রাতে এই বিধবা কন্যা পদ্মপুকুরে স্নান করতে গেলে চন্দ্র দেবতা তার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে পড়েন। পরে চন্দ দেবতা মানুষের রূপ নিয়ে পৃথিবীতে আসেন, এবং তারা দুই জনে একে অন্যের সাথে মিলিত হন। যখন তাদের মোহ কাটে তখন চন্দ্র দেবতা নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং নিজে নিজেকে অভিশাপ দিতে থাকেন একজন বিধবার সাথে এই ধরনের অনৈতিক কাজের জন্য। সেই সাথে চন্দ্রদেবতা হেম্বতীতে অর্শিবাদ করেন যে, তার গর্ভে যে সন্তান জন্ম হবে সেই সন্তান হবে সিংহ পুরুষ এবং বিশাল ক্ষমতার অধিকারী।
এই ঘটনার পর হেম্বতী নিজ গৃহ ত্যাগ করে খাজুরপুর (খাজুরাহো) আসেন এবং এখানে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানের নাম রাখেন চন্দ্রবর্মন। চন্দ্রবর্মনের সাহস ও শক্তি সম্পর্কে বলা হয় যে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে সে খালি হাতে বাঘ ও সিংহ শিকার করতে পারত। পরবর্তীতে তিনি চন্দ্র দেবতার আর্শিবাদের কারনে এই অঞ্চলের রাজা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি তার মায়ের ইচ্ছায় এই অঞ্চলে ৮৫টি মন্দির নির্মান করেন। এই মন্দিরগুলো হ্রদ ও বাগান দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। তিনি খাজুরাহোতে একটি যজ্ঞ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন যাতে তার মায়ের পাপ মোচন হয়।
এই মিথ টি অন্য এক উৎস থেকে একটু ভিন্নভাবে পাওয়া যায, সেটি হলো- হেম্বতী কালিঞ্জার রাজ্যের রাজ ব্রাহ্মণ মনি রামের বিধবা কন্যা। একদিন মনিরাম ভুলবশত অমাবশ্যাকে পূর্ণিমা রাত হিসেবে রাজার সামনে উপস্থাপন করে। এই বিষয়টি হেম্বতী জানার পর অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পাড়েন। বাবার এই ভুলের কারণে বাবার সম্মান যদি নষ্ট হয় তবে হেম্বতী তা সহ্য করতে পারবেন না। তাই তিনি চন্দ্র দেবতার নিকট প্রার্থনা করতে থাকেন। চন্দ্রদেবতা এরূপ সুন্দরী কিশোরীর রূপে অভিভুত হয়ে পড়ে এবং তারা একে অন্যের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে যখন মনি রাম এই বিষয়টি জানতে পারেন তখন নিজে নিজেকে অভিশাপ দেন এবং পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়। এরপর হেম্বতী গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং পুত্র সন্তানের জন্ম দেন, তার নাম রাখেন চন্দ্রতেয় এবং ধারণা করা হয় এই পুত্র সন্তাই পরবর্তী চান্দেলা রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। চান্দেলারা মনিরামের পাথরের মুর্তিটিতে মুনিয়া দেব নামে পূজা করে থাকেন।
অনিন্দ্য সুন্দর মন্দিরটির অধিকাংশ স্থাপনা, মূর্তি ও টেরাকোটা বেল পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছে। এই মন্দির মূলত শিব, বিষ্ণু ও জৈনদের মন্দির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খাজুরাহো মন্দিরে বিভিন্ন ধরনের মূর্তির প্রতীকৃতি রয়েছে এবং এই মূর্তি বা প্রতীকৃতিরগুলোর মধ্যে মাত্র ১০% যৌনতা নির্ভর। এই মন্দিরকে অনেক পন্ডিতই দেবতাদের প্লে-গ্রাউন্ড বা দেবতাদের যৌন উল্লাসের কেন্দ্র হিসেবে অভিমত দিয়েছেন। তাদের মতে এই মন্দিরগুলোতে দেবতাদের যৌন জীবন তুলে ধরা হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন , এই মন্দিরে তান্ত্রিক যৌনতাকে প্রধান্য দেয়া হয়েছে এবং তার প্রতিলিপিই এই মন্দিরে প্রতিফলিত হয়েছে। আবার আরেক দল বিশেষজ্ঞ মনে করেন , হিন্দু ধর্মে ও মানব জীবনে ‘কাম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই ‘কামের’ প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন মন্দিরে এই বিষয় গুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এত যে কথা এই ভাস্কর্য নিয়ে আসলে কি খচিত করা আছে খাজুরাহো মন্দিরের দেয়ালে দেয়ালে? মন্দিরের দেয়ালে খচিত আছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, শিব-পার্বতীর বিয়ে, পূজার দৃশ্য, নাচের দৃশ্য, অপ্সরাদের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি, নাচের প্রস্তুতি, যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি, সে সময়ের জীবনযাপনের চিত্র, সাধারণ মানুষ, কৃষক, কুমারের জীবনধারা, বিভিন্ন পশু-পাখি, শিল্প-সঙ্গিত চর্চার চিত্র। এতসব শিল্পকলার ১০ ভাগ জুড়ে রয়েছে কামসূত্রের নানান ভঙ্গিমার চিত্র। এখানে কোথাও এক পুরুষের সাথে একাধিক নারীর মিলন, কোথাও নারীদের সমকামিতা আবার কোথাও পশুর সাথে দেবতার মিলন হতে দেখা যাচ্ছে।
মিলনের দৃশ্য আমাদের কাছে একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। মন্দির মানেই ভক্তির জায়গা। তাই ধর্মীয় একটি স্থানে এমন ভাস্কর্যের অবস্থান নিন্দনীয় মনে করেন অনেকেই। কিন্তু নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ বলছে ভিন্ন কথা।
খাজুরাহো মন্দিরের দেয়ালে খচিত মিলনরত এই ভাস্কর্যগুলো বলে সে সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের কথা, চর্চার কথা। যৌনতা সে সময় কোনো অপবিত্র বা লজ্জার বিষয় ছিল না। যৌনাঙ্গকে বিষে করে পুরুষ যৌনাঙ্গকে বিশেষ ক্ষমতাধর বলে বিবেচনা করা হত। যেহেতু যৌনক্রিয়া থেকেই বংশ বিস্তার হয় এবং বিশ্বকে পরিচালিত করে যে শক্তি সেই মানব পৃথিবীতে আসে তাই এই প্রক্রিয়া ছিল পবিত্র, ঐশ্বরিক, পূজনীয়
শিব, বিষ্ণু, ব্রাহ্ম ও জৈন ধর্মের প্রতি উৎসর্গকৃত মন্দিরগুলো যে সময়ে নির্মিত হয় সে সময়কে ভারতবর্ষের সোনালী সময় বলা হয়। সোনার শহর বলে খ্যাত ছিল ভারত। প্রচুর ভাস্কর্য, শিল্প স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে সে সময়। মন্দিরগুলো ইন্দো-আর্য স্থাপত্য রীতির। খাজুরাহো গ্রামের পূর্বদিকের মন্দিরগুলো ব্রাহ্মণ্য ও জৈন মন্দির। পশ্চিমে রয়েছে যোগিনী, কেন্দ্রীয় মহাদেব, দেবী জগদম্বে, চিত্রগুপ্ত বিশ্বনাথ এবং নন্দীর মন্দির। দক্ষিণে আছে দুলাদেও মন্দির ও চতুর্ভুজ মন্দির। এছাড়াও আছে পার্বতী মন্দির, লক্ষণ মন্দির। প্রত্যেক মন্দিরের কেন্দ্রে আছে একটি করে দেবতার মূর্তি। তবে মন্দিরগুলোকে অন্যসব মন্দির থেকে পৃথক করেছে মানব্জাতির কামনার প্রতি এর উদার দৃষ্টিভঙ্গি।
খাজুরাহো মন্দিরকে ভারতের অন্যতম সৌন্দর্য্যমন্ডিত মন্দির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিল্পের দিক থেকে বিবেচনা করলে এই ধরনের মন্দির ভারতে আর দ্বিতীয়টি নেই। এই অঞ্চলে অনেকগুলো মন্দির রয়েছে তাই এই মন্দিরকে গুচ্ছ খাজুরাহো মন্দির বলা হয়। এই মন্দিরকে Temple of Love-ও বলা হয়৷
একথা ঠিকই যে সেইসব শিল্পীদের দলকে মন্দির নির্মাণের সময় বহিঃজগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হতো, এবং নারীসঙ্গ থেকে বঞ্চিত রাখা হতো, কিন্তু শিল্প রচনার ক্ষেত্রে তাঁদের ন্যূনতম স্বাধীনতা ছিল না। তাঁরা যা রচনা করতেন, তা করতে হতো রাজা, বাস্তুকার, বা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান পুরোহিতের নির্দেশমতো। তাঁদের নির্দেশ ভিন্ন সামান্য ফুলপাতার অলঙ্করণ রচনা করার ক্ষমতাও ভাস্করদের ছিল না। এসব মন্দিরের ভাস্কর্যগুলি যদি তাঁদের কামেচ্ছার প্রকাশ হয়ে থাকত, তবে শিল্পী স্বাধীনতার প্রকাশ হয়ে থাকত, তবে প্রাক মধ্যযুগ বা মধ্যযুগে বহু মন্দিরেই এই ভাস্কর্য দেখা যেত। কারণ সেসময় সর্বত্র শ্রমিক-ভাস্করদের অবস্থা ছিল একই রকম। এইসব নির্মাণকার্যের সঙ্গে যুক্ত ভাস্কর-মজুরদের বন্দীদশা কাটাতে হতো। তবে কেন এই মিথুন ভাস্কর্য নির্মাণ৷
মধ্যভারতের বহু প্রসিদ্ধ খাজুরাহোর মন্দিরগুলি নির্মিত হয় খ্রিষ্টীয় নবম-দশম শতাব্দীতে, চান্দেল রাজাদের রাজত্বকালে। কোনও একজন রাজা নন, বিভিন্ন রাজার শাসনকালে প্রায় দুশো বছর ধরে মন্দির নগরী খর্জুরবাহকের মন্দিরগুলি নির্মিত হয়। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো যৌন ভাস্কর্য সমৃদ্ধ কাণ্ডারীয় মহাদেবের মন্দির।
চান্দেলরাজ বিদ্যাধরের রাজত্বকালে কাণ্ডারীয় মহাদেব মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। শুধু মানব-মানবীর মিথুন দৃশ্য নয়, মানবের সঙ্গে ঘোটকী প্রভৃতি ইতর শ্রেণীর প্রাণীর মিলন দৃশ্যও অদ্ভুত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল এই মন্দিরগাত্রে।
যেসব সুর-সুন্দরীদের নিরাবরণ দেহে দাঁড়িয়ে থাকতে অথবা মিথুনরত অবস্থায় দেখা যায়, তাঁরা কিন্তু নিছকই কল্পনা ছিলেন না। গবেষকদের বক্তব্য, মিথুন ভাস্কর্য রচনার করার জন্য কাশ্মীর, উৎকল, ত্রিগর্ভ, চালুক্য, গন্ধর্ব রাজ্যের বিভিন্ন দামের হাট থেকে নারীদের সংগ্রহ করে আনা হতো। তারপর তাঁদের দেখে শিল্প রচনা করতেন ভাস্কররা। এদেশে ‘ন্যুড মডেল’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খাজুরাহোই পথপ্রদর্শক বলে মনে করা হয়।
আমাদের দেশ স্বাধীনতা লাভের পর এক রাজনৈতিক নেতা দাবি তুলেছিলেন যে ভারত সরকারকে মধ্যভারতের একটি মন্দির ভেঙে দিতে হবে। যিনি দাবি তুলেছিলেন, সেই নেতা কিন্তু অন্য কোনও ধর্মাবলম্বী ছিলেন না। তিনিও হিন্দু। মন্দির ভাঙার দাবির পিছনে তাঁর বক্তব্য ছিল যে মন্দিরগাত্রে খোদিত যৌন ভাস্কর্য ভারতীয় সমাজ সংস্কৃতির সাথে মেলে না। ওইসব ভাস্কর্য নাকি প্রকাশ্যে যৌনতার বিজ্ঞাপন। যা সমাজের পক্ষে ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। অতএব…। প্রবীণ ওই নেতা কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে ‘দেশের স্বাধীনতা’ এবং ‘শিল্পের স্বাধীনতা’ প্রসঙ্গে তাঁর ভাবনা ভিন্ন ছিল।
তবে সরকার সঙ্গত কারণেই মধ্যভারতের খাজুরাহোর কাণ্ডারীয় মহাদেব মন্দির বা উড়িষ্যার কোনার্ক মন্দিরের ক্ষেত্রে সেসব দাবি মানতে রাজি হন নি।
মজার ব্যাপার হলো, এই ধরনের ভাস্কর্য নির্মাণের পিছনে কিন্তু সে সময় কাজ করেছিল নানা লৌকিক বিশ্বাস, ধর্মভাবনা, অথবা রাজনৈতিক কারণ। আপনি যদি কোনোরকম মন্দির দর্শন করতে যান একজন সাধারণ দর্শনার্থী হয়ে, তবে দেখবেন এইসব মিথুন ভাস্কর্য নির্মাণের কারণ হিসাবে স্বল্পশিক্ষিত গাইডের দল প্রায়শই বলেন যে – এ মন্দির যখন নির্মাণ হচ্ছিল তখন শিল্পীদের ঘরে ফেরার অনুমতি ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে নারীসঙ্গহীন ভাস্কর-মজুরের দল নাকি তাঁদের অতৃপ্ত কামেচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন এই মন্দিরগাত্রে তাঁদের ছেনি-হাতুড়ির মাধ্যমে। এ বক্তব্য সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, এবং শিল্পের সম্বন্ধে বিরূপ ধারণার জন্ম দেয়।
মাইকেলঅ্যাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ নামের বিখ্যাত নগ্ন পুরুষমূর্তির ভাস্কর্য, পনেরো শতকে ইতালিয় চিত্রকর সান্দ্রে বত্তিচেল্লির আঁকা ‘বার্থ অফ ভেনাস’-এর নগ্ন নারী, বা হেমেন মজুমদারের ছবি ‘সিক্তবসনা সুন্দরী’ কে কী বলা যায়? শ্লীল না অশ্লীল? আসলে মনে হয়, শিল্পক্ষেত্রে শ্লীল-অশ্লীল বিচারের কোনও সার্বজনীন মাপকাঠি নেই। ব্যক্তি মানুষের ভাবনার ওপরেই ব্যাপারটা নির্ভর করে। একজনের চোখে যা প্রতিভাত হয় চূড়ান্ত সৌন্দর্য এবং সত্য হিসাবে, অন্যের চোখে তাই আবার ঘৃণ্য – চূড়ান্ত অশ্লীল।
বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন যুগের চর্যাপদ, মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, দোনা গাজী, দৌলত কাজী, আলাওলের সর্বত্র যৌনতার কথা এসেছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র হীরা মালিনীর সঙ্গে গোবিন্দলালের সম্পর্কও পাঠকের শরীর গরম করে তোলে। কিশোর রবীন্দ্রনাথের কাঁচাহাতে লেখা কবিতায় ‘তব কুচযুগ নিঙারি নিঙারি’ পড়লেও সমস্ত ইন্দ্রিয় একযোগে হইহই রইরই করে ওঠে। ‘বৌঠাকুরানীর হাটে’র নারী অঙ্গের প্রকাশের বর্ণনা, ‘চোখের বালি’র মহেন্দ্র—বিনোদিনীর সম্পর্ক উত্তেজনা জাগায়। ‘ঘরে-বাইরে’র সন্দীপের সাথে বিমলার সম্পর্ক কিংবা ‘চার অধ্যায়ে’র এলার মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যৌনতা প্রকাশ করেছেন। ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পে সোহিনীর মেয়ের মধ্যে উদগ্র কামনাও প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু তুলনামূলক আলোচনা করলেই দেখা যায় নগ্নতা মানেই অশ্লীলতা নয়। ‘চোখের বালি’তে মহেন্দ্র-আশার বিয়ের পরের জীবন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘দিনগুলিকে রাত আর রাতগুলিকে দিনের মতো লাগিল’ ধরনের বাক্যে স্পষ্ট যৌনতার কথা থাকলেও বিনোদিনীর সঙ্গে মহেন্দ্রের সম্পর্কের ভাষাহীন, সম্পর্কহীন বর্ণনা আরও বেশি যৌনতার ইঙ্গিত দেয় পাঠককে। ইন্দ্রিয় সজাগ করে তোলে।
নারী-পুরুষের প্রেম একটি চিরন্তন সত্য বিষয়। সকল প্রানীগোত্রের মাঝেই শারীরিক ক্রিয়া বিদ্যমান। সহজ-স্বাভাবিক একটি ক্রিয়া যা আমরা সবাই জানি তবু না জানার ভান করি। আদিযুগের মতো বিষয়টি স্বাভাবিক এবং স্বর্গীয় মাত্রাইয় বহাল থাকলে আজ হয়ত হত্যা, ধর্ষণের মতো ঘটনা আর ঘটত না।
অর্থাৎ প্রাচীনকালে ভারতীয় সংস্কৃতিতে মিলনের বর্ণনাকে অশ্লীল বলে চিহ্নিত করা হয়নি। তাহলে আজ কেন খাজুরাহোকে দেখতে এত লুকোচুরি? কেন খাজুরাহোর ভাস্কর্যের ছবি দেখলে আমরা মুখ ফিরিয়ে নিই ‘খারাপ’, ‘নোংরা’ বলে! অথচ ভেবে দেখুন প্রায় হাজার বছর আগেও মানুষ ভাবনা-চিন্তার দিক দিয়ে কেমন এগিয়ে ছিল! যৌনতা তাদের কাছে ছিল নিতান্তই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।

রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।