সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৬)

সুন্দরী মাকড়সা
এমনিতে ঋষি যে নবকল্লোল পত্রিকার একজন আগ্রহী পাঠক সেটা কখনোই না। এই শারদীয়া পত্রিকাটা ঋষি কিনেছিলো স্নেহার অনুরোধে। স্নেহা আর ঋষি একই অফিসে চাকরি করে। সেক্টর ফাইভের কগনিজেন্টের ক্যান্টিনে স্নেহা যেদিন প্রথম ঋষিকে বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে আসা ফ্রায়েড মোমো ভর্তি টিফিনের কৌটোটাকে এগিয়ে দিয়ে বলেছিলো — আয়েম স্নেহা, ফ্রম সাউথ ক্যালকাটা, তুমি কি মোমো লাইক করো?
সেই মুহূর্তে বনজঙ্গলে জন্ম নেওয়া,আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ে ওঠা নিপাট সাধাসিধা একজন যুবক ঋষিকে, তোতলামো রোগে পেয়েছিলো। ও ঠিক কি উত্তর দিয়েছিলো সেটা ওর কখনোই মনে পড়বে না। স্নেহাও ঠিক সেই মুহূর্তেই ওর সহকর্মী যুবকটিকে আদ্যোপান্ত বুঝে নিয়েছিলো। হাতে করে দুটো মোমো এগিয়ে ধরেছিলো ঋষির দিকে।
— শোনো, তুমি যখন গাছতলা থেকে অফিস আসবে না, তখন দেখবে গাছতলায় ফুটপাথে পেপার ভেন্ডারের দোকান পাবে, সেখান থেকে একটা শারদীয়া নবকল্লোল কিনে এনে দেবে ঋষি?
ঋষি সেদিনই বাড়ি ফেরার পথে কিনে নিয়েছিলো পত্রিকাটা। আর রাতে চোখের সামনে মেলে ধরেছিলো পত্রিকাটাকে।
কিন্তু কী আশ্চর্য, সেই নতুন পত্রিকাটার বুকে এই পুরোনো ঝুরঝুরে কাগজের টুকরোটা এলো কীভাবে?
যাকগে যাক, নিশ্চয়ই কোনোরকমে চলে এসেছে। ঋষি কাগজের টুকরোটাকে টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে ফের পত্রিকাটাকে বুকের ওপর ধরে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
একটা হাসির ছোটো গল্প পড়ার পর একটা প্রেমের গল্প পড়া শুরু করলো ঋষি। কিন্তু বেশীদূর এগোতে পারলো না। কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়তে না পড়তেই দুচোখে ঘুম জড়িয়ে এলো ওর। ও বইটাকে টেবিলের ওপর রেখে উঠে একগ্লাশ জল খেয়ে শুতে যেতে টেবিলটার ওপর চোখ গেলো ওর। চমকে উঠলো ঋষি। ফের সেরকমই একটা হলুদ হয়ে যাওয়া বিবর্ণ আরেক টুকরো কাগজ আগের কাগজটার পাশে পড়ে আছে। উত্তেজনায় কাগজের টুকরোটাকে তুলে ধরলো ঋষি। দুটো টুকরো একই রকমের হলেও দুটো কাগজের টুকরোর হাতের লেখা একজনের না। প্রথমটি মহিলার ও দ্বিতীয়টির লেখাটা অবশ্যই পুরুষালি হাতে লেখা রয়েছে — আমার ভদ্রতাবোধকে তুমি কিন্তু আমার দুর্বলতা ভে…
ব্যাস, এটুকুই। এরপর আর কিছু নেই, পৃষ্ঠাটা ওখানেই ভাজ খেয়ে টুকরো হয়ে গেছে।
ঋষি কাগজের টুকরোদুটোকে দুহাতে ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। কী করে টুকরো দুটো এখানে এলো সেটা বুঝে উঠতে পারছিলো না সে। প্রথম টুকরোটাতো পরিষ্কার পত্রিকাটার ভেতর থেকে ঝরে পড়লো। কিন্তু দ্বিতীয়টা! মাথাটা ভারী হয়ে আসছে ঋষির। ও টুকরো দুটোকে বইটার ভাঁজে রেখে বেড সুইচে হাত দিলো। অন্ধকার ঘরের বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিলো ঋষি।
ক্রমশ