বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধাকৃষ্ণের সম্পর্কের শেষ পর্যায়ে মাথুর ও ভাবসম্মিলন। বৃন্দাবনে রাধাকে ছেড়ে কান্তদয়িত নন্দনন্দন চিরতরে মথুরা চলে গেলেন। আর ফিরে তাকালেন না। যোগাযোগ রাখলেন না। এইসময় রাধার যে তীব্র আর্তি, বেদনা, হাহাকার, তা ধরা রয়েছে মাথুরের পদে। কাঁদতে কাঁদতে একসময় কান্নাও শুকিয়ে যায়। মনে মনে রাধা একসময় ভাবতে থাকেন মুরলীধারী কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর চৈতন্যলোকে মিলন হচ্ছে। ওই হল ভাবসম্মিলন। রক্ত মাংসের মানুষের সঙ্গে নয়, ভাবলোকে দুইটি সত্ত্বার মিলন।
মৈথিল কোকিল বিদ্যাপতি গেয়েছেন, মাধব হাম পরিণাম নিরাশা। মাধবও কৃষ্ণের একটি নাম। ভানুসিংহের পদাবলীতে “মরণ” কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন,
“মরণ রে,
শ্যাম তোঁহারই নাম।
চির বিসরল যব নিরদয় মাধব
তুঁহুঁ ন ভইবি মোয় বাম।”
লিখলেন,
“তুঁহুঁ নহি বিসরবি, তুঁহুঁ নহি ছোড়বি,
হিয় হিয় রাখবি অনুদিন অনুখন,
অতুলন তোঁহার লেহ।।”
মাথুর আর ভাবসম্মিলন অদ্বয় করে তুলে রবীন্দ্রনাথ লেখেন,
“ভুজপাশে তব লহ সম্বোধয়ি,
আঁখিপাত মঝু আসব মোদয়ি,
কোর-উপর তুঝ রোদয়ি রোদয়ি
নীদ ভরব সব দেহ।”
লেখেন,
” দূর সঙে তুঁহুঁ বাঁশি বজাওসি,
অনুখন ডাকসি, অনুখন ডাকসি
‘রাধা’ ‘রাধা’ ‘রাধা’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে ভানুসিংহের রাধা আর যেন নন্দপুরচন্দ্রকে ডাকেন না, মৃত্যুকে আবাহন করেন, বলেন,
“তুঁহুঁ মম তাপ ঘুচাও।
মরণ তু আও রে আও।।”
মৃত্যুকে বলেন,
“তাপবিমোচন করুণ কোর তব
মৃত্যু অমৃত করে দান।
তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।।”
মরণকে শ্যামের সমান, এবং মরণের থেকে প্রিয় আখ্যা দিয়ে আরো একটি অস্তিত্বের কল্পনা করে, সেই অস্তিত্বকে মাধব নাম দিয়ে, আর তাকে নিজের প্রভু বলে ভানুসিংহের কলমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বললেন,
“মাধব পহু মম, পিয় স মরণসে”।
তরুণ রবীন্দ্রনাথ শ্যাম আর মাধব, এই দুই সত্ত্বার একটা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিলেন।
তাঁর একেবারে প্রথম দিকের কবিতার বই “ছবি ও গান” প্রথম মুদ্রিত হয়েছিল ১২৯০ এর ফাল্গুন মাসে। সেই কাব্যগ্রন্থ থেকে “রাহুর প্রেম” নামে একটা কবিতা সংকলিত হয়েছে সঞ্চয়িতায়। এই কবিতায় তিনি এক অদ্ভুত অস্তিত্বের নাম রেখেছেন রাহু। এ জ্যোতিষীর গণনার রাহু নয়, এ এক ডাকিনীসদৃশ অস্তিত্ব।
এই কবিতার রাহু বড়ই কঠিন এবং সাংঘাতিক। পায়ে বিঁধে থাকলে সেই কাঁটা যেমন করে কষ্ট দিতে থাকে, সেইভাবে রাহু নামের এক উৎকট অস্তিত্ব প্রাণকে যন্ত্রণায় জর্জরিত রাখে।
রোগ যেভাবে শরীরে অবস্থান করে ব্যক্তিকে সমস্যায় ফেলে, জীবনে রাহুর ভূমিকাও সেই রকম। তার হাসির ধ্বনিতে মানুষের ভয় হয়। সে সব সময় দুঃস্বপ্নের মতো ঘিরে রাখে। এভাবেই কবি রাহুর আঁধার অস্তিত্ব এঁকেছেন।
জীবন এবং মরণের মধ্যে এমন আরেকটি অদ্ভুত কবিতা পাওয়া যায় ১৩০২ বঙ্গাব্দের ২০ ফাল্গুন তারিখে লেখা “সিন্ধুপারে” কবিতায়। এটি “চিত্রা” কাব্যগ্রন্থে রয়েছে। এখানেও এক অলৌকিক রহস্যময়তার ছবি আঁকেন রবীন্দ্রনাথ। পৌষ মাসের প্রখর শৈত্যজর্জর নিশীথে আপন শয্যায় আরামে শুয়ে থাকা ব্যক্তি নিশির ডাকে উন্মাদ হয়ে আবরণহীন বেরিয়ে পড়লে যেমনটি হয়, তার বর্ণনা রয়েছে ‘সিন্ধুপারে’ কবিতায়।
কে এক অজানা অস্তিত্ব বাইরে থেকে তার নাম ডেকে তাকে যাদু করে নিয়েছে। সেই অলৌকিক অস্তিত্ব ভয়ঙ্কর এক অমঙ্গল ছায়া ঘনিয়ে আনে। কবিতাটিতে এই অমঙ্গল ছায়ার বর্ণনা দিতে শ্মশানের অনুষঙ্গ এনেছেন কবি। শেয়াল ডেকে উঠছে, নিশাচর পাখি ডেকে উঠছে। শ্মশানের চিতার ধূম্রজালে তৈরি এক কালো ঘোড়া, আর তার উপরে এক রমণীমূর্তি। চতুর্দিকে শূন্যতা, শুষ্কতা, নগ্নতা এবং খণ্ডতা। সমস্ত কবিতা জুড়ে সেই রহস্যময়ী রমণী কিভাবে তাকে এক অন্ধকার গুহার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়, তার বর্ণনা দেন। এই “সিন্ধুপারে” কবিতার রহস্যময়ী রমণী জীবনকে ব্যথিয়ে তোলেন। কবিতার একেবারে সূচনাতেই তার স্বরের আভাস দিয়েছেন কবি। সে স্বর তীক্ষ্ণ শাণিত তীরের মত মর্মে আঘাত দেওয়া। সে রমণী কবির দিকে চাউনি ছুঁড়লে কবির সর্ব শরীর ভয়ে শিউরে কেঁপে ওঠে। তাঁকে কঠিন দৃষ্টিতে মন্ত্রমুগ্ধ অচেতন করে দেয়। সে রমণী যখন ইঙ্গিত করে কবিকে পাশে বসায়, তখন কবি জানান :
“হিম হয়ে এল সর্বশরীর, শিহরি উঠিল প্রাণ–
শোণিতপ্রবাহে ধ্বনিতে লাগিল ভয়ের ভীষণ তান!”
তারপর সেই রমণীমূর্তির মধ্যেই কবি তাঁর জীবন দেবতাকে খুঁজে পান, যে তাঁকে চিরদিন হাসালো, কাঁদালো, এবং চিরদিন ফাঁকি দিয়েছে বলেও জানান কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বারে বারে এই রহস্যময়ী নারী অস্তিত্ব আর তার হাতে ফাঁকির প্রসঙ্গ ঘুরে ঘুরে আসবে।
আরেকটি ফাল্গুনে লেখা কবিতার কথা বলা সঙ্গত মনে করি। “সোনার তরী” কাব্যগ্রন্থে ১২৯৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে শিলাইদহে বোটে করে যেতে লেখা “সোনার তরী” শীর্ষক কবিতাটিতে ভরা শ্রাবণের অনুষঙ্গ এনেছেন রবীন্দ্রনাথ।
ঘন ঘোর বর্ষায় নদীর কূলে বসে থাকা এক কৃষকের মতো করে নিজেকে ভাবেন তিনি। ধান কাটা হয়ে গিয়েছে। কর্তিত সেই ধান এখনো মাঠে। যদিও ফাল্গুন মাসে লেখা কবিতা, তবু তিনি লেখেন আকাশ মেঘে ঢাকা, এবং বজ্রগর্ভ সেই মেঘ। সকালবেলাতেই গ্রামটি মেঘে আচ্ছন্ন। নদীর পরপারের গাছগুলি কালো ছায়াচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। এমন আবহাওয়ায় ছোটো একটি ক্ষেতে কবি একাকী। চারিদিকে জল, আর সেই জলের বিশেষণ হিসেবে “বাঁকা” শব্দটি ব্যবহার করেছেন তিনি।
নদীটি জলে ভরে আছে আর প্রচণ্ড গতিবেগে স্রোত বহমান। সে স্রোতের ধারা ক্ষুরের মতোই ধারালো। স্পর্শ মাত্রেই সেই খরতা টের পাওয়া যায়।
এমন সময় কবি যেন দেখতে পান চেনা না চেনায় মেশা এক অস্তিত্ব নৌকা বেয়ে পালের জোরে সেই বহমান স্রোত উপেক্ষা করে ছুটে চলেছে। কোনো দিকেই না চেয়ে তরীকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে সে।
কবির দিকে তার কোনো লক্ষই নেই। কবি স্বেচ্ছায়, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগে তাকে আহ্বান করেন, আবেদন করেন, তাঁর সোনার ফসল যেন সে দয়া করে নিয়ে যায়। শুধু হাসি মুখটি করে কবির সাধনসম্ভারটুকু তরীতে ঠাঁই দিলেই তিনি কৃতার্থ হবেন। এই সম্পদ নিয়ে যেন কবি এতকাল নদীকূলে ভুলে ছিলেন। সোনার ধান তাঁর, তবু তা তিনি থরে বিথরে সবটুকু তরণীতে তুলে দিতে পেরে খুশি। এবার সামান্য একটু করুণাভিক্ষা করার মতো করে বলেন কবি, এবার তরীতে তাঁর সম্পদের সাথে তাঁকেও স্থান দেওয়া হোক।
নিজের সাধনদুর্লভ সোনার ফসল নিঃশর্তভাবে তরীতে তুলে দিয়ে কবির যৎসামান্য আকাঙ্ক্ষা, তরীতে যেন তাঁকেও তুলে নেওয়া হয়।
কিন্তু রহস্যময় ওই নৌকা কবির শ্রমার্জিত ধানে সম্পূর্ণ ভরে গিয়েছে। সেখানে কবির আর জায়গা হবে না। সমস্ত জীবনের সোনার ফসল সেই রহস্যময় সত্তা নিয়ে চলে গেল; কবি পড়ে রইলেন পরিত্যক্ত প্রত্যাখ্যাত অবহেলিত হয়ে।
একত্রিশ বছর বয়সে পৌঁছনোর কয়েকটি মাস আগেই লেখা এই কবিতাটি মৃত্যু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনার জগতে পাড়ি দেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
সঞ্চয়িতায় সংকলিত ‘সোনার তরী” কাব্যগ্রন্থের আরো দুটি কবিতা “নিদ্রিতা” এবং “সুপ্তোত্থিতা” কবিতায় যেন সিন্ধুপারে কবিতারই স্কেচ এঁকেছিলেন। এই দুটি কবিতা যত্ন করে পড়লে ‘সিন্ধুপারে’ র সঙ্গে বেশ মিল পাওয়া যাবে।
“মানসসুন্দরী” কবিতাতেও রহস্যমধুরা শব্দটি ব্যবহার করেছেন তিনি। বলেছেন —
“এসো সুপ্তি, এসো শান্তি,
এসো প্রিয়ে, মুগ্ধ মৌন সকরুণকান্তি,
বক্ষে মোরে লহো টানি; শোয়াও যতনে
মরণসুস্নিগ্ধ শুভ্র বিস্মৃতি শয়নে।।”
সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের “ঝুলন” কবিতাটিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুচেতনা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কবিতা। এখানেও চৈত্রমাসে এক দুর্যোগপূর্ণ বর্ষানিশীথের ছবি এঁকেছেন তিনি। প্রথম পংক্তিতে লেখেন–
“আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা
নিশীথবেলা।”
এখানেই প্রাণের সঙ্গে মরণখেলার ছবি আঁকতে গিয়ে আরেকটি অস্তিত্বকে দাঁড় করিয়ে দেন কবি। একা একা তো খেলা যায় না। কবি লেখেন,
“আজি জাগিয়া উঠিয়া পরান আমার বসিয়া আছে
বুকের কাছে।”
এখানেও নিবিড় বন্ধন সুখের সঙ্গে এক নিষ্ঠুরতা মেশানো মরণখেলার কথা ভেবেছেন তিনি। ত্রাস এবং উল্লাস একইসাথে প্রাণকে ব্যাকুল করে। বড় চমৎকার করে লেখেন —
“মরণদোলায় ধরি রশিগাছি
বসিব দুজনে বড়ো কাছাকাছি,
ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া মারিবে ঠেলা;
আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে ঝুলনখেলা
নিশীথবেলা।।”
শেষ পর্যন্ত ঝঞ্ঝাকে আহ্বান করেন কবি। প্রাণকে নিজের বধূরূপে কল্পনা করছেন এবং চাইছেন, ঝঞ্ঝা এসে তাকে অনাবৃত করুক। রক্তমাংসের জীবন্ত শরীরে প্রাণ এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। কিন্তু ঝুলন কবিতায় কবি বলেন, পরান তাঁর বুকের কাছে বসে আছে, তাকে কবি কত সোহাগ করেছেন, চুম্বন করেছেন, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেছেন, গান শুনিয়েছেন, স্নেহভরে দিয়েছেন কত কিছু। তবুও তাকে যেন হারাই হারাই ভাব। তবুও সে যেন থেকেও নেই, তাকে খুঁজে বেড়াতে হয়। এবার রাত্রিবেলা ঝুলনে মাতবেন পরানবধূর সঙ্গে। আর সেই দোলার পরিচয় দিয়ে রেখেছেন কবি, সে হল মরণদোলা।
প্রাণ কি কবির কাছে এক রহস্যময় পৃথক অস্তিত্ব? এই প্রাণকে চিনতে চাইছেন কবি। ঝঞ্ঝা সেই বধূর অবগুণ্ঠনকে অপসারণ করুক, লুণ্ঠন করুক। অবগুণ্ঠিতা এক রহস্যময়ীকে চিনতে চেয়ে বলছেন,
“প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ
চিনি লব দোঁহে ছাড়ি ভয় লাজ
বলছেন,
বক্ষে বক্ষে পরশিব দোঁঁহে..”
আর স্বপ্নিলতা নেই, সমস্ত ভয় লজ্জা পরিত্যাগ করে প্রাণের সঙ্গে তিনি মুখোমুখি বৈঠক চাইছেন।
এই সূত্রে ১৩০০ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসের ২৭ তারিখে লেখা “নিরুদ্দেশ যাত্রা” কবিতার কথাও মনে করতে হবে।
এখানেও এক কঠিন হৃদয়া রহস্যময়ী সুন্দরীর সঙ্গে অচেনা জগতে তাঁর নৌকাযাত্রা। এই রমণী কথা বলতে চায় না। চেষ্টিত নীরবতায় অভ্যস্ত সে। কথাটি না বলাই তার স্ট্র্যাটেজি। সুন্দরী শুধু তাৎপর্যপূর্ণ নীরবহাসি হেসে চলে। কবি চাইছেন স্নিগ্ধ মরণ। কিন্তু তার আগে একটিবারের জন্য তার স্পর্শ প্রার্থনা করছেন। বাতাসে সেই রহস্যময়ীর অস্তিত্বের মৃদুগন্ধ ভাসছে। এমনকি তার খোলা কালো চুল যেন কবিকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। তবুও রহস্যময়ী ধরা দেননা, কথাও কন না। এমনকি মৃত্যুর পূর্বে নীরব হাসিটুকু থেকেও কবিকে বঞ্চিত করেন তিনি। এই রহস্যময়ী সুন্দরী সত্তার হাতে কঠিন বঞ্চনার বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এক স্থায়ীভাব হয়ে উঠেছে।