চার বছরের বাচ্চাটি খেলতে খেলতে পড়ে গিয়ে কপাল ফাটিয়েছে। রক্ত ঝরছে। বাড়ির লোক তাকে নিয়ে গিয়েছেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার সাহেব তুলো হাতে নিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করতে উদ্যত হলে, বাচ্চাটি ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা কপাল ফেটে যে রক্তটা বেরোলো, ওতে অক্সিহিমোগ্লোবিন আছে, না কি, কার্বোঅক্সিহিমোগ্লোবিন আছে? চার বছরের বাচ্চার প্রশ্নের রকম দেখে ডাক্তার হতবাক।
ছেলেটার নাম জ্যাক। জ্যাকের জন্ম ১৮৯২ সালের নভেম্বরের পাঁচ তারিখে।
আর শীতকালেই জ্যাকের মৃত্যু। ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরের ১ তারিখে। জায়গাটির নাম ভুবনেশ্বর। ভারতের অন্যতম রাজ্য ওড়িশার রাজধানী শহরে।
ক্যানসারে ভুগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন জ্যাক। মলদ্বারে কর্কটরোগ। যখন নিশ্চিত হওয়া গেল রোগটি চিকিৎসাশাস্ত্রের আয়ত্ত্বের বাইরে, তখন জ্যাক একটা মজার কবিতা লিখে ফেললেন। কবিতাটি ১৯৬৪ সালের নিউ স্টেটসম্যানের একুশে ফেব্রুয়ারি সংখ্যায়।
কবিতাটি বাংলা ভাষায় এই রকম শোনাবে:
“ক্যানসার একটা মজারু”
“ইচ্ছে করে, পেতেম যদি হোমার কবির কণ্ঠ,
গান শোনাতাম কারসিনোমার বাজিয়ে বীণাযন্ত্র।
ক্যানসার ভাই বিশ্ব জুড়ে লোক মেরেছে যত,
ট্রয়ের দারুণ যুদ্ধে ও ভাই লোক মরেনি অত।”
শেষের দিকে বলছেন,
“জানি ও ভাই কর্কট এক মারণ রোগই বটে
মরণ কিন্তু রাস্তা ঘাটে অ্যাক্সিডেন্টেও ঘটে।
খেলে বেশি ঘুমের বড়ি, মরণকামড় দেয়,
দাঁতের ব্যথায় অনেকের ভাই পরাণ বাহিরায়।
ঋণ করে ঘি খেও না বাছা, ঋণের ভারি বোঝা
ঋণের দায়ে বুক ফেটে যায়, নয় সে জিনিস সোজা।
কিন্তু ভায়া জানি আমি, বলছি আমি সাচ বাত,
হো হো হাসি হাসতে পারলে, থাকবে ভাল দিন রাত।
বদ্যি ভায়া চেষ্টা কতই করে ছুরি হাতে
প্রাণ খুলে ভাই হাসতে পারলে, সাহায্য হয় তাতে।”
জ্যাক চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ বিজ্ঞান বিকাশের কাজে লাগুক। সেই লক্ষ্যে বলেছিলেন, আমার মৃত্যুর পর আমার মরদেহ যেন বিজ্ঞানের কাজে লাগানো হয়। আমি মরণের পরে আর কোন অস্তিত্বে বিশ্বাস করি না। তাই মরণের পর ওই দেহ নিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। আমি চাই তা শিক্ষার্থী গবেষকদের কাজে লাগুক। যদি সেই লক্ষ্যে দেহটা ঠাণ্ডায় জমিয়ে রাখতে হয়, আমার রেখে যাওয়া টাকা পয়সা থেকে সেই বাবদে খরচ করাই হল আমার প্রথম নির্দেশ।
জ্যাক যেমন মৃত্যুর পরবর্তী কোনো জীবনে আস্থা রাখতেন না, তেমনি ভগবান তত্ত্বেও বিশ্বাস করতেন না। তিনি ভগবানকে নিয়ে মজা করতেন। একবার ধর্মতাত্ত্বিকগণ জ্যাককে প্রশ্ন করেছিলেন, এই বিশ্ব সৃষ্টি দেখে স্রষ্টা সম্বন্ধে আপনার কি মনে হয়? তুখোড় কৌতুকে জ্যাক বলেছিলেন, ভগবান কোথাও আছে বলে আমার মনে হয় না, তবে যদিওবা থাকে, লোকটা বিচ্ছিরি রকম বেশি করে গুবরে পোকা ভালবাসে। আর এত লক্ষ লক্ষ কোটি নক্ষত্রও বানিয়ে ফেলেছে।
জ্যাক মজা করে আরো বলতেন, আমার সন্দেহ হয় যে এই মহাবিশ্বকে আমরা যতটা আশ্চর্য রহস্যময় বলে আন্দাজ করে থাকি বাস্তবে সেটা তার থেকেও অনেক বেশি আশ্চর্যময়। এত আশ্চর্য আমরা ধারণা করতেই পারিনা।
মুখস্থবিদ্যানির্ভর পাণ্ডিত্য নিয়ে মজা করে জ্যাক বলতেন, পাখিদের মধ্যে ময়না শুনে শুনে চমৎকার কথা কয়, কিন্তু প্র্যাকটিকাল কাজের কথায় ঢুঁ ঢুঁ। তেমনি মানুষের মধ্যে কিছু ছাত্র পাঠ্যবইয়ের গোটা একটা পাতা মুখস্থ ঝাড়তে পারে। কিন্তু গবেষণা করতে বলো, তা আর পারবে না।
কথায় বলে, “জ্যাক অফ অল ট্রেড”, তো সেই আপ্তবাক্যের প্রথমাংশের সাথে সাযুজ্য রেখে আমাদের জ্যাক ছিলেন একজন জিনতত্ত্ববিৎ, ফিজিওলজিতে পণ্ডিত, বিবর্তনবাদী বায়োলজিস্ট। ওই সঙ্গে গণিতেও তাঁর দক্ষতা ছিল সুবিদিত। বায়োলজির সাথে রাশিবিজ্ঞান ও সংখ্যাতত্ত্বকে মিলিয়ে তিনি অন্যতম নব্য ডারউইনবাদী হয়েছিলেন। হিউম্যান বায়োলজির জগতে ক্লোন ও ক্লোনিং শব্দদুটি তিনি তৈরি করেন। হিমোফিলিয়া বর্ণান্ধতা রোগ কেন হয় তা বুঝতে প্রয়োজনীয় জিন ম্যাপ তিনি তৈরি করেছিলেন। তিনি বুঝিয়েছেন, সিকল সেল অসুখ মানুষের শরীরে কিছুটা ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী গুণ তৈরি করে। জীব অস্তিত্ব যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফসল, এই ধারণার ভিত্তিমূল গড়ে তুলতে জ্যাকের অবদান ছিল। বোন নাওমি মিচিসনের সঙ্গে গবেষণা করে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে জিনগত যোগাযোগের কথা তিনি বলেন। এই সূত্রে মেণ্ডেলের তত্ত্ব ও ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বচন তাঁর হাতে মিলেমিশে পপুলেশন জেনেটিক্স ও আধুনিক সংশ্লেষণী বিবর্তনবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে। জ্যাক তাঁর ১৯২৪ সালের দ্যাদালুস বা বিজ্ঞান এবং ভবিষ্যৎ নামে সন্দর্ভে এক্টোজেনেসিস নামে একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। ওই চিন্তার উপর ভিত্তি করে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা টেস্ট টিউব বেবির ধারণা গড়ে ওঠে।
আবার ওই আপ্তবাক্যের “মাস্টার অফ নান” অংশের মর্যাদাহানি করে আমাদের জ্যাক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউ কলেজে ১৯১৯ থেকে ১৯২২ অবধি ফেলো হিসেবে কাজ করে ফিজিওলজি এবং জেনেটিক্স নিয়ে কাজ করেছেন। এরপরে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বা জৈবরসায়ন বিভাগে রীডার হয়ে ১৯৩২ সাল অবধি শিক্ষকতা করেন। এই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সূত্রে জ্যাক এনজাইম ও জেনেটিক্স নিয়ে গবেষণা করেছেন। জেনেটিক্সের মধ্যে যে গণিতের বিষয় রয়েছে, সেখানেই জ্যাক বিশেষভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। এই কেমব্রিজ পর্বে জ্যাক জন ইননেস হর্টিকালচারাল ইনস্টিটিউশনের জীনবিষয়ক গবেষণা শাখার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৩০ থেকে ১৯৩২ অবধি জ্যাক রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে ফিজিওলজির ফুলারিয়ান প্রফেসর হিসাবে কাজ করেন।১৯৩২ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য বার্কলের ক্যালিফরনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৩৩ সালে জ্যাক লণ্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের জেনেটিক্স বিষয়ে পূর্ণ সম্মানের প্রফেসর হন। এই প্রতিষ্ঠানেই তিনি তাঁর অ্যাকাডেমিক জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন। চার বৎসর পরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের বায়োমেট্রি বিভাগে প্রথম ওয়েলডন প্রফেসর হন।
অথচ জ্যাক তথাকথিত অর্থে বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রাজুয়েট পর্যন্ত ছিলেন না। নিজের কলেজীয় পড়াশুনাটাই ঠিকমতো করে উঠতে পারেন নি। তাঁকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর সৈনিক হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল। তাতেই পড়াশুনায় ছেদ পড়ে। তিনি ১৯১৪ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে ব্ল্যাক ওয়াচ রয়্যাল হাইল্যাণ্ড রেজিমেন্টের তৃতীয় ব্যাটালিয়নের অস্থায়ী সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে নিযুক্ত হন। কয়েকটি মাস পরে ১৯১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে জ্যাক অস্থায়ী লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। আরো আটমাস বাদে ১৮ অক্টোবর তারিখে তিনি অস্থায়ী ক্যাপটেন পদে উন্নীত হন।
অবশ্য জ্যাক ১৯১২ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিষয়ে প্রথম শ্রেণীর সাম্মানিক ডিগ্রি অর্জন করেন। ওই অক্সফোর্ড থেকেই ১৯১৪ সালে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ওই কলেজ জীবনের উপান্তে তিনি সমাজবাদকে জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৩০ সালে তিনি মার্কসবাদী চিন্তার সাথে জড়িত হন। এর আগে তিনি ছিলেন সমাজবাদী। এইসাথে তিনি ছিলেন নাস্তিক এবং মানবতাবাদী বৈজ্ঞানিক। ১৯৩৮ সালে তিনি মার্কসবাদের উপর প্রগাঢ় আস্থাজ্ঞাপন করেন, এবং ১৯৪২ সালে তিনি গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ওই সংস্থার লণ্ডন শাখার মুখপত্র দি ডেইলি ওয়ার্কার এর সম্পাদক হন। পরে সোভিয়েত জীববিজ্ঞানী নামে পরিচিত ট্রফিম ডি লাইসেঙ্কোর ঘটনায় ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির অফিসিয়াল পার্টি লাইনের সঙ্গে তাঁর মতভেদ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সোভিয়েত রাষ্ট্র পরিচালনা নীতি নিয়ে তাঁর বিরক্তি জাগে। তিনি প্রকাশ্যে সোভিয়েত লৌহমুষ্টির নিন্দা করেন। ১৯৫০ এ তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।
তাঁর বাবা জন স্কট হ্যালডেন ছিলেন একজন ফিজিওলজিস্ট বিজ্ঞানী, একই সাথে দার্শনিক ও উদারপন্থী ব্যক্তিত্ব। মা ছিলেন ক্যাথলিন ট্রটার। ছোটবোন নাওমি মিচিসন ছিলেন লেখক। কাকিমা এলিজাবেথ হ্যালডেনও নামী গ্রন্থকার ছিলেন। এক ধর্মনিরপেক্ষ পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়েছেন তাঁরা। জ্যাক জেনেটিক্স নিয়ে বেশি মাথা না ঘামালে হয়তো প্রথম সারির গণিতবিদ হতেন।
জ্যাকের আসল নাম এবার বলে ফেলা দরকার। তিনি জে বি এস হ্যালডেন, পু্রো নাম জন বার্ডন স্যান্ডারসন হ্যালডেন (১৮৯২ – ১৯৬৪)। এই অসামান্য প্রতিভাবান বিজ্ঞানীকে গ্রেট ব্রিটেনের গণতন্ত্র সহ্য করতে পারে নি। ১৯৫৬ সালে তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। তিনি ভারতে চলে আসেন। পরে ১৯৬১ সালে তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করেন।
জেবিএস হ্যালডেন নিজেকে ভারতীয় বলতে ভালবাসতেন। ভারতীয় পোশাককে আপন করেছেন। একই সাথে নিজে বিশ্বনাগরিক হয়ে বাঁচতে চাইতেন।
হ্যালডেন সাহেব রচিত পুস্তক ও রচনারাজির তালিকাটিতে একবার চোখ বোলানো দরকার- ১ দ্যাদালুস বা বিজ্ঞান এবং ভবিষ্যৎ (১৯২৪); ২ এ ম্যাথামেটিক্যাল থিওরি অফ ন্যাচারাল অ্যাণ্ড আর্টিফিশিয়াল সিলেকশন (১৯২৪); ৩ ক্যালিনিকাস এ ডিফেন্স অফ কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার (১৯২৫); ৪ পসিবল ওয়ার্ল্ড অ্যাণ্ড আদার এসেজ (১৯২৭); ৫ অন বিয়িং দি রাইট সাইজ (১৯২৯); ৬ দি অরিজিন অফ লাইফ (১৯২৯); ৭ অ্যানিম্যাল বায়োলজি (১৯২৯); ৮ দি সায়েন্সেস অ্যাণ্ড ফিলজফি (১৯২৯); ৯ এনজাইমস (১৯৩০); ১০ ম্যাথেমেটিক্যাল ডারউইনিজম : এ ডিসকাসন অফ দ্য জেনেটিক থিওরি অফ ন্যাচারাল সিলেকশন (১৯৩১); ১১ দি ইনইকুয়ালিটি অফ ম্যান অ্যাণ্ড আদার এসেজ (১৯৩২); ১২ দি কজেস অফ ইভলিউশন (১৯৩২); ১৩ সায়েন্স অ্যাণ্ড হিউম্যান লাইফ (১৯৩৩); ১৪ ফ্যাক্ট অ্যাণ্ড ফেইথ (১৯৩৪); ১৫ হিউম্যান বায়োলজি অ্যাণ্ড পলিটিক্স (১৯৩৪); ১৬ এ ডায়লেকটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ ইভলিউশন (১৯৩৭); ১৭ হেরিডিটি অ্যাণ্ড পলিটিক্স (১৯৩৮); ১৮ দি মার্কসিস্ট ফিলজফি অ্যাণ্ড দি সায়েন্সেস (১৯৩৯); ১৯ সায়েন্স অ্যাণ্ড এভরিডে লাইফ (১৯৪০); ২০ অ্যাক্টা জেনেটিকা এট স্ট্যাটিসটিকা মেডিকা (১৯৫৬) ইত্যাদি আরো অনেক।
কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দৈবাৎ বেশি দিন বনত হ্যালডেন সাহেবের। এই অভ্যাসটা তিনি স্কুল জীবন থেকেই রপ্ত করেছিলেন। স্কুল জীবনে বড় ছাত্ররা তাঁকে খ্যাপাত। হ্যালডেন এমনকি অঙ্কের ক্লাসে মাস্টারদের অঙ্ক শিখিয়ে ছাড়তেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ এহেন বদতমিজ ছাত্রকে পছন্দ করতেন না। তিনিও প্রশাসনিক কড়াকড়ি কে পছন্দ করেন নি সারাজীবন। কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও মেলেনি বেশিদিন। জীববিজ্ঞান নিয়ে লাইসেঙ্কোর ভুলভাল কথাবার্তায় আর সেই মনগড়া ধারণায় সোভিয়েত জীববিজ্ঞানীরা গোটা পৃথিবীর বিজ্ঞানী সমাজের কাছে হাসির খোরাক হচ্ছিলেন। অথচ লাইসেঙ্কোর প্রতি অন্ধ সমর্থন জুগিয়ে চলেছিলেন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে জেনেটিক্সকে কোণঠাসা করার নায়ক লাইসেঙ্কোকে তোল্লা দেওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টিতন্ত্রের প্রতি তাঁর বিশ্বাস টলে গিয়েছিল। এমনকি সুয়েজ খাল কাণ্ডে ইঙ্গ ফরাসী হানাদার সুলভ ভূমিকায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকেও তিনি ওঁচা আর গুণ্ডা বলে অভিহিত করেছেন। ফলে ব্রিটেনের শাসকদের তিনি চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন। ইতিমধ্যে ১৯৫১ – ৫২ সালে তিনি ভারতে এসে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ ও তাঁর বরানগরের ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট এর ব্যাপারে অবহিত হন। ভারতীয় মূল্যবোধ ও জীবনযাত্রার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা গড়ে ওঠে। হিন্দু বৌদ্ধ জৈন ও মুসলিম ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। ইতিমধ্যে তাঁর প্রথম স্ত্রী শার্লট ফ্রানকেনের সঙ্গে তাঁর ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। শার্লট ছিলেন সাহিত্যিক ও জার্নালিস্ট। ১৯২৪ সালে শার্লটের সঙ্গে হ্যালডেন সাহেবের পরিচয়। হ্যালডেন তাঁকে বিয়ে করবেন বলেই শার্লট তাঁর স্বামীকে ছেড়ে চলে এসেছিলেন। শার্লটের সাথে যেভাবে ডাকাবুকো হ্যালডেন প্রেম করতেন, তাতে কেমব্রিজ চত্বরে ঢি ঢি পড়েছিল। শেষে ১৯২৬ এ তাঁদের বিয়ে হয়। অথচ ১৯৪২ এ শার্লটের সঙ্গে তাঁর কঠিন দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল।
এই সব ঝোড়ো সময়ে তিনি গভীর ভাবে গবেষণায় ব্যস্ত। ১৯৩৯ সালে লিখেছেন দি মার্কসিস্ট ফিলজফি অ্যাণ্ড দি সায়েন্সেস, ওই একই ১৯৩৯ সালে লিখেছেন এঙ্গেলস এর ডায়লেকটিক্স অফ নেচারের উপক্রমণিকা, ১৯৪০ সালে লিখেছেন সায়েন্স অ্যাণ্ড এভরিডে লাইফ, লিখেছেন হোয়াই আই অ্যাম এ মেটেরিয়ালিস্ট, ১৯৪১ এ সায়েন্স ইন পিস অ্যাণ্ড ওয়ার। লোকে বলত বউকে সময় দেন না বিজ্ঞানী। হ্যালডেন সাহেবের বন্ধু অলডাস হাক্সলিও এ নিয়ে ঠাট্টা করেছেন। শেষ অবধি ১৯৪৫এ ডিভোর্স। ওই ১৯৪৫ এই গবেষক ছাত্রী হেলেন স্পারওয়ে কে বিয়ে করলেন তিপ্পান্ন বছরের জ্যাক।
১৯৫১ – ৫২ য় ভারতে এসে মহলানবীশের ইন্সটিটিউট দেখে আকৃষ্ট হন হ্যালডেন। তখন তিনি ইণ্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশনে আমন্ত্রিত বক্তা। হ্যালডেন মহলানবীশের ইন্সটিটিউটে বারোটি বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা দেন। এরপর ১৯৫৪ সালে আবার সস্ত্রীক আসেন হ্যালডেন সাহেব।
১৯৫৬ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ লণ্ডন ছেড়ে সস্ত্রীক ভারতে এসে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ এর ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইন্সটিটিউট এ যোগ দিলেন। ১৯৫৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর কাউন্সিল মিটিং এ মহলানবীশ প্রস্তাব করলেন হ্যালডেনকে তিনি প্রফেসর পদে চান। বেতন ১৭০০ টাকা। আর তাঁর সহধর্মিণী হেলেন হবেন রীডার। এই সূত্রে ১৯৫৭ সালে তাঁরা আইএস আইয়ের কর্মীবাহিনীতে যুক্ত হলেন। হ্যালডেন এবং মহলানবীশের গণিতের উপর ভিত্তি করে বি স্ট্যাট পাঠক্রম গড়ে উঠল। বায়োমেট্রি নিয়ে একটি ছোটো গবেষণাগার গড়ে উঠল। একা হাতে বায়োমেট্রি নিয়ে একটা বৈজ্ঞানিক জার্নাল সামলাতেন হ্যালডেন।
কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছোটোখাটো তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ে গোলমাল বাধতে লাগল। হ্যালডেন সাহেব তখন বছর পঁয়ষট্টির প্রবীণ বিজ্ঞানী।
ঘরের পর্দা, হাজিরাখাতায় নামসই, হেলেনের অতিরিক্ত মদ্যপান, সহযোগী সহকারীর ভ্রমণভাতা ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যায় উত্যক্ত করা হল আইএসআই কর্তৃপক্ষকে।
এরপরে আলেক্সেই নিকোলায়েভিচ কোসিগিন ভারতে এলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় নেতা। খুব শীঘ্রই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী পদে বৃত হতে চলেছেন। এমন পদস্থ ব্যক্তিত্বকে কাছে পেয়ে তাঁকে নিজের ছাত্রদলের গবেষণা দেখাতে প্রবীণ বিজ্ঞানী নানাবিধ ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু কোসিগিনের প্রতি কোনো কারণে মহলানবীশ বিরক্ত ছিলেন। তাই প্রথমে কিছু না বলে, একেবারে শেষ মুহূর্তে তিনি হ্যালডেন সাহেবের সব উদ্যোগ বন্ধ করতে বললেন। এতে বিরক্ত হয়ে হ্যালডেন আইএসআইতে অধ্যাপনায় ইতি টানেন।
এরপর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ আসরে নামেন। তিনি তখন ভারতের উপরাষ্ট্রপতি। সিএসআইআর বা কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যাণ্ড ইণ্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ এর প্রধান ব্যক্তিত্ব এম এস থ্যাকারকে নির্দেশ দিলেন এমন কিছু ব্যবস্থা করতে যাতে হ্যালডেন সাহেব ভারতে থেকে গবেষণা করেন। রাধাকৃষ্ণণ চাইলেন চাইলেন হ্যালডেন সাহেব কলকাতায় জেনেটিক্স ও বায়োমেট্রি নিয়ে কাজ করুন। হ্যালডেন সেখানে যোগদান করলেন। কিন্তু হতাশ হয়ে হ্যালডেন দেখলেন সেখানে গবেষণা খাতে অর্থব্যয়ে সরকারের ঔদাসীন্য, অথচ প্রশাসনিক ব্যয়ে সরকার মুক্ত হস্ত। ব্যঙ্গ করে হ্যালডেন সিএসআইআর কে বললেন, কাউন্সিল ফর সাপ্রেসন অফ ইনডিপেনডেন্ট রিসার্চ। তিনি আরো বললেন, স্বল্প বেতনের জন্য মোটেও নয়, স্বাধীন ভাবে সম্মান নিয়ে কাজ করতে পায় না বলেই ভারতীয় মেধাবী ব্যক্তিরা বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হন।
শেষ কালে হ্যালডেন ভুবনেশ্বর শহরে একটি বায়োমেট্রি গবেষণাগারে কাজ করেন ও ১৯৬৪ সালের ১ ডিসেম্বরে সেখানেই ক্যানসারে ভুগে মারা যান।
কলকাতা তাঁকে ভোলেনি। একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নামে তাঁর স্মারক গড়েছে কলকাতা।