ক্যাফে ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ৫)

৪। কাচনলের ভিতর থেকে
আলো নিয়ে খেলতে খেলতে কত কিই না ঘটে গেল।
কাচের একটা বদ্ধ সিলিন্ডারের ভিতরে বাতাসের চাপ কমিয়ে দিয়ে দুই দিকে ধাতব তড়িৎদ্বার বা ইলেকট্রোড রেখে তাতে বিদ্যুৎ চালনা করলেন জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হাইনরিশ গাইসলার। সিলিন্ডারের ভিতরে রাখলেন নিয়ন বা আরগনের মতো গ্যাস। তার চাপ রাখা হল বেশ কম। তড়িৎদ্বারের মধ্যে হাই ভোল্টেজের বিদ্যুৎপ্রবাহ করলে ওই সিলিন্ডারের ভিতরে থাকা কম চাপের গ্যাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চলতে লাগল। গ্যাসের মধ্যে আলো দেখা গেল। কেননা বিদ্যুৎপ্রবাহ সিলিন্ডারের মধ্যে থাকা গ্যাসের থেকে ইলেকট্রন ছাড়িয়ে নিয়েছে, তৈরি হয়েছে আয়ন, আবার যেই ইলেকট্রন ওই আয়নের সঙ্গে আবার জোট বাঁধছে, দেখা দিয়েছে আলো, ওকে বলতে হবে ফ্লুওরেসেন্স।
এই ফ্লুওরেসেন্স এর চর্চার সূত্রে আরো অনেক কিছু ঘটতে থাকবে। এই কাচের সিলিন্ডারের নাম দেওয়া হল গাইসলার টিউব। সময়টা ১৮৫৭। বছর তেরো পরে ১৮৭০ সালের দিকে বদ্ধ কাচনলের থেকে আরো বাতাস বের করে দেওয়া সম্ভব হল। চাপ অনেক কমাতে পরিস্থিতি গেল বদলে। অতো হালকা করার কৃতিত্বটা উইলিয়াম ক্রুকস এর। তাই অমন কাচনলকে ক্রুকস সাহেবের নামে ক্রুকস টিউব বলা হল। এই ক্রুকস টিউবে বিদ্যুৎ চালালে নেগেটিভ তড়িৎদ্বার বা ক্যাথোডের বিপরীত দিকে কাচের মধ্য থেকে আলো দেখা গেল। ক্রুকস টিউবে ক্যাথোড থেকে এমন রশ্মি বেরোচ্ছে, এটা বেশ মনোযোগ সহকারে নজর করলেন জার্মান গণিতবিদ পদার্থবিজ্ঞানী জুলিয়াস প্লাকার ( ১৬ জুন ১৮০১ – ২২ মে ১৮৬৮)। সময়টা ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ। ক্রুকস টিউব নিয়ে বহু বিজ্ঞানসাধক গভীর চর্চায় মাতলেন। জোহান উইলহেলম হিটটর্ফ (২৭ মার্চ ১৮২৪ – ২৮ নভেম্বর ১৯১৪) এই ক্রুকস টিউবের নানাবিধ উন্নতি সাধন করলেন। এরপর থেকে এই ক্রুকস টিউবকে লোকজন বলতে শুরু করল ক্রুকস হিটটর্ফ টিউব। এই আলোর সামনে যা রাখা হল তার ছায়াও পড়ল। বেশ বোঝা গেল ওই নলের ভিতরের নেগেটিভ তড়িৎদ্বার বা ক্যাথোডের থেকে একটা রশ্মি নির্গত হচ্ছে, যা সরলরেখা ধরে চলছে আর সামনে থাকা কঠিন বস্তুর ছায়া দেয়ালে বা পর্দায় ফেলছে। ১৮৬৯ জোহান হিটটর্ফ এমনটাই টের পেলেন। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে গবেষণা করলেন জার্মান বিজ্ঞানী ইউজিন গোল্ডস্টাইন ( ৫ সেপ্টেম্বর ১৮৫০ – ২৫ ডিসেম্বর ১৯৩০)। তিনি ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ক্যাথোড থেকে বেরোচ্ছে বলে রশ্মিটির নাম দিলেন ক্যাথোড রশ্মি। ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে গবেষণা করতে করতেই ওই ক্যাথোডের বিপরীত দিকে ক্যানাল রশ্মির অস্তিত্ব টের পেলেন ইউজিন গোল্ডস্টাইন। ওর আরেকটি নাম দেওয়া হল অ্যানোড রশ্মি। টিউবের ভিতরে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের গ্যাস রেখে বিদ্যুৎ চালালে ঠিক কী হয়, তা নজর করতে গিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাসের বিশেষ কৃতিত্ব দেখা গেল। হাইড্রোজেনের উপস্থিতিতে ক্যানাল রশ্মি বা অ্যানোড রশ্মি পর্যাপ্ত ও চমৎকার ভাবে বেরোতে থাকে। বেশ বোঝা গেল, এই অ্যানোড রশ্মি আসলে হাইড্রোজেন আয়ন দিয়ে তৈরি। মানে সাধারণ হাইড্রোজেন পরমাণুর থেকে ইলেকট্রনটি ছাড়িয়ে নিলে যা পড়ে থাকে, তাই। ১৮৯৮ সালে এইসব লক্ষ করলেন উইলহেলম উইন ( ১৩ জানুয়ারি ১৮৬৪ – ৩০ আগস্ট ১৯২৮)। তিনি এই অ্যানোড রশ্মির চরিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বোঝালেন এটি আসলে প্রোটনের স্রোত। সাধারণ হাইড্রোজেন পরমাণুতে কেন্দ্রক বা নিউক্লিয়াসে থাকে একটি মাত্র প্রোটন। আর তাকে ঘিরে ঘোরে একটি মাত্র ইলেকট্রন। তাই ইলেকট্রনটুকু ছাড়িয়ে নিলে যা পড়ে থাকে তা প্রোটন ছাড়া আর কিছুই নয়। এই গবেষণার জোরে উইলহেলম উইন ১৯১১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
এই এক ক্রুকস টিউব নিয়ে গবেষণা করতে করতে কত যে বড় বড় মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া আবিষ্কার হয়েছে ভাবলে অবাক হতে হয়। প্রথমেই বলি জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেলম রন্টজেন ( ২৭ মার্চ ১৮৪৫ – ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯২৩) এর কথা। রন্টজেন সাহেব ১৮৯৫ সালের ৮ নভেম্বর তারিখে এই টিউব থেকে এক্স রে আবিষ্কার করেছেন।
এক্স রে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন বা তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণের খুব তীব্র প্রকাশ। এই রশ্মি এতটাই তীব্র যে এ মানুষের মাংস পেশি ভেদ করে যায়। তাই হাড় ভাঙার চিকিৎসার কাজে লাগল এই রশ্মি। ১৪৫ ইলেকট্রিক ভোল্ট থেকে শুরু করে ১২৪ কিলো ইলেকট্রিক ভোল্ট পর্যন্ত বিভবপ্রভেদের সাহায্য নিয়ে নানা মাত্রার এক্স রশ্মি তৈরি করা সম্ভব। ১০ পাইকোমিটার থেকে ১০ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য এবং ৩০ পেটাহার্ৎজ থেকে ৩০ এক্সাহার্ৎজ পর্যন্ত কম্পাঙ্কের এক্স রে তৈরি করা যায়। তা চিকিৎসা সেবাপ্রদান সহ স্ফটিকের গঠনবিচার ও যন্ত্রপাতির ধাতব অংশ যাচাই ও পরীক্ষা, ইত্যাদি বহু কাজে লাগানো চলে। এই এক্স রশ্মি আবিষ্কার চিকিৎসা পরিষেবায় বিরাট অবদান রাখল। তার সম্মানে আবিষ্কর্তা উইলহেলম রন্টজেনকে ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার সূচনা হতেই পদার্থবিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মানিত করা হয়।
ফিলিপ লেনার্ড (৭ জুন ১৮৬২ – ২০ মে ১৯৪৭) নামে হাঙ্গেরিয়ান জার্মান বিজ্ঞানী এই ক্রুকস টিউবের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। তাই জন্য নতুন পর্যায়ে টিউবের নাম হল লেনার্ড টিউব। লেনার্ড সাহেব ১৮৮৮ থেকে এই নিয়ে চর্চা করে চলেছিলেন। ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে তিনি গভীর গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেন যে তা আসলে নেগেটিভ চার্জ বা ঋণাত্মক আধানবিশিষ্ট কণার স্রোত। এই ঋণাত্মক আধানবিশিষ্ট কণাকে ফিলিপ লেনার্ড বললেন “কোয়ান্টা”। ফোটো ইলেকট্রিক এফেক্ট নিয়ে ১৯০২ সালে তিনি একটা সন্দর্ভ লেখেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন যে কোয়ান্টা শব্দটা তিনি পদার্থবিজ্ঞানী হেরমান ভন হেলমহোলৎজ ( ৩১ আগস্ট ১৮২১ – ৮ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪) এর বিদ্যুৎ সংক্রান্ত গবেষণাপত্র থেকে সংগ্রহ করেছেন।
ফিলিপ লেনার্ডকে ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার জন্য ১৯০৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।