আজ বিখ্যাত জার্মান কবি হাইনরিশ হাইনর জন্মদিন। ১৭৯৭ সালে আজকের দিনে জার্মানির ডুসেলডর্ফ এ তিনি জন্মেছিলেন। কবিতার পাশাপাশি তিনি গদ্যকার ও সমালোচক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ইহুদি পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। বাবা স্যামসন হাইন ছিলেন বস্ত্র ব্যবসায়ী। মা, বেটি ছিলেন ডাক্তারের মেয়ে।বাবা মায়ের জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। নাম ছিল হ্যারি। তাঁর জন্মের সময় ডুসেলডর্ফ ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের পদানত ছিল। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের পতন ঘটলে ডুসেলডর্ফ প্রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। হাইনর মনের গঠন হয় নেপোলিয়নের শাসনের ছায়াপাতে। তিনি নেপোলিয়নের চিন্তা ভাবনা দর্শনের অনুগামী হয়ে নিজেকে গড়ে তোলেন। সাম্য মৈত্রী ও মুক্তির আদর্শ তিনি অন্তরে গ্রহণ করেন। বাবা মা হাইনকে ইহুদিদের স্কুলে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটু আধটু হিব্রু পড়তে শেখেন। পরে তিনি ক্যাথলিক স্কুলে পড়েন। তখন ফরাসি ভাষা শেখেন। ফরাসি হয়ে ওঠে তাঁর দ্বিতীয় মাতৃভাষা। যদিও তিনি জার্মান অ্যাকসেন্টে ফরাসি বলতেন। ১৮১৪ সালে হাইন ডুসেলডর্ফ এ একটি বিজনেস স্কুলে ভরতি হয়ে ইংরেজি ভাষা শেখেন। সে যুগে ইংরেজি হয়ে উঠেছে ব্যবসায়িক জগতের ভাষা। পরে, ১৮২৫ সালে ঊনত্রিশ বছর বয়সে হ্যারি হাইন লুথেরান ধর্মমত গ্রহণ করে পিতৃদত্ত নাম পরিত্যাগ করে হাইনরিশ হাইন হয়ে ওঠেন। তিনি নিজেকে স্পষ্ট করে নাস্তিক বলেন নি সেভাবে। আবার প্রথাগত সংগঠিত ধর্মতন্ত্রেও তাঁর আস্থা ছিল না।
প্রখ্যাত দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দার্শনিক অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্কস ছিলেন হাইনরিশ হাইনর দূরসম্পর্কের তুতোভাই। পরিণত বয়সে মার্কসের ক্ষুরধার বিশ্লেষণী প্রতিভা ও সমাজ বিকাশের নিয়মাবলীর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় আকৃষ্ট হন হাইনরিশ। গুণী ভাইয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
হাইনর প্রথম দিকের কবিতার ধারা পরের দিকে বেশ বদলে যায়। বদলে যায় গদ্যশৈলীও। শ্লেষপূর্ণ তির্যক বুদ্ধিদীপ্ত বাগ্ বৈদগ্ধ্যে তিনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তীব্র বৈপ্লবিক রাজনৈতিক মতপোষণের জন্য তাঁর বিস্তর লেখাকে জার্মান রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু আখেরে এই রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা হাইনরিশ হাইনকে বিখ্যাত করে তোলে। জীবনের শেষ পঁচিশটা বছর তাঁকে দেশান্তরী হয়ে নির্বাসিতের জীবন যাপন করতে হয়েছিল। দিন কাটত ফ্রান্সের পারীতে।
বছর কুড়ি বয়স হলে ব্যবসায়িক কাজের ভাষা ইংরেজি শিখিয়ে হাইন পরিবার তাঁদের বড়ছেলেটিকে পাঠান তার কাকা সলোমন হাইনর কাছে। সলোমন ছিলেন হাইন পারিবারিক বৃত্তের সবচাইতে সফল ও সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিত্ব। সলোমন ছিলেন কোটিপতি ব্যাঙ্ক মালিক। তাঁর ব্যাঙ্কিং ব্যবসা ছিল হামবুর্গ শহরে। কিন্তু অচিরেই টের পাওয়া গেল ওকে দিয়ে আর যাই হোক ব্যবসা হবে না। এমনকি কারবারী আবহাওয়াটাকে পর্যন্ত পছন্দ করে না ও ছেলে।
কিন্তু কাকার বাড়িতে গিয়ে অন্য একটা কাজ করে বসল হ্যারি, পরবর্তীকালে যিনি হাইনরিশ হয়ে উঠবেন। করলেন কি খুড়তুতো বোন আমেলিকে একতরফাভাবে ভালবেসে ফেললেন। আঠারো বছর বয়স থেকেই আমেলিকে মনের মানুষ ভাবতেন তিনি। আমেলি ওকে পাত্তা না দিলে, আমেলির বোন থেরেসাকে ভালবাসা নিবেদন করেন তিনি। সে মেয়েও হ্যারিকে পছন্দ করল না।
খুড়া সলোমন ততদিনে বেশ বুঝে গিয়েছেন ব্যবসাজগতে হ্যারির কিচ্ছু টি হবে না। তখন অভিভাবক হিসেবে তিনি ওকে পাঠালেন আইন পড়তে। আইনজীবী হিসেবে যদি ছেলেটা কিছু করতে পারে।
১৮১৯ সালে হ্যারি ভরতি হল বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন জার্মানির রাজনৈতিক আবহাওয়া রক্ষণশীল ও লিবারাল, এই দুইভাগে প্রবল ভাবে বিভক্ত। রক্ষণশীলরা বলে ফরাসি বিপ্লবের সব চিহ্ন মুছে অতীতের ধ্যান ধারণা পুনরুজ্জীবিত করো। আর লিবারালরা চায় রাজা রাজড়ার শাসন চলবে না। প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন চাই। সাংবিধানিক সরকার চাই। আইনের চোখে সকলেই সমান করো। আর প্রেসের স্বাধীনতা দাও।
বন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতা সহ সর্বপ্রকার স্বাধীনতার দাবিতে ছাত্রদল একজোট হয়ে রক্ষণশীল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল।
হাইন এমনিতেই ছিলেন র্যাডিক্যাল ধাঁচের মানুষ। সর্বদা প্রতিবাদে মুখর মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েই তিনি প্রতিবাদী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ছাত্র আন্দোলন দমাতে সরকার ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আইনের পড়াশুনায় মজা পেতেন না হাইন। ভাল লাগত ইতিহাস আর সাহিত্য। এই সময় হাইন বেশ কবিতা লিখছেন। বন শহরে কবি হিসেবে বেশ নামডাক ছড়িয়ে পড়ল।
বন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের পড়া জমল না বলে অভিভাবকদের চাপে আবার আইন পড়তে গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হল ওকে। কিন্তু আইনের ইতিহাস ততদিনে আয়ত্ত্ব করে ফেলেছে সে ছেলে। আইন যে প্রকৃত পক্ষে রক্ষণশীল ব্যবস্থাটাকেই টিঁকে থাকতে সাহায্য করে, তা বুঝে গিয়েছে সে। যে প্রতিক্রিয়া শীল সরকারি ব্যবস্থাটাকে সে তীব্র ভাবে অপছন্দ করে, আইন সেই প্রতিক্রিয়াশীলদের টিঁকিয়ে রাখে। ইতিমধ্যে কানে গেল ভালবাসার মানুষ বোন আমেলি আরেকটা লোকের বাগদত্তা হয়েছে, প্রেম করছে সেই মানুষের সাথে। কলেজের বিপক্ষ দলের ছাত্রদের সঙ্গে গণ্ডগোল বাধিয়ে বসল সে। কলেজ কর্তৃপক্ষ হাইনকে ছয়মাসের জন্য সাসপেন্ড করলেন। এবার কাকা সলোমন আবার আসরে নেমে ভাইপোকে ভরতি করে দিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইনর সাহিত্যচর্চার বিকাশ হয় গভীরভাবে। বিখ্যাত সব শিক্ষকদের সাথে হৃদ্যতা হয়। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন দার্শনিক হেগেল।
লিখতে লিখতে হাইন আরো তীব্র ভাবে একনায়কতন্ত্রের বিরোধী হয়ে ওঠেন। অভিজাত সমাজ আর ধর্মনেতাদের আচরিত প্রতিক্রিয়াশীল জার্মান অহমিকার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। আর সাধারণ মানুষের নির্বোধ সংকীর্ণতা তাঁকে বিরক্ত করে। সেই সময় জার্মান জাতীয়তাবাদ সবে সবে মাথা তুলছে। তার বিপদটাও তিনি টের পান।
জার্মান রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ হাইনর লেখা সেন্সর করে তছনছ করে দিতে থাকে। তখন তিনি বই ছাপাবার উদ্দেশ্যে লণ্ডন যান। বড়োলোক কাকা সলোমন তাঁকে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু ইংল্যাণ্ডকে তাঁর মনে ধরে নি।
১৮৩১ সালে, পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে হাইন জার্মানি ত্যাগ করে ফ্রান্সে চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি সেলিব্রিটি হয়ে যান। পারিতে তাঁর অনেক পরিচিতিও হয়। তবুও তিনি জার্মান ভাষাতেই লিখে যেতে থাকেন। ভেতরে ভেতরে তিনি যেন এক নির্বাসিত সত্ত্বা হয়ে দিন কাটাতে থাকেন।
এই সময় টুকটাক প্রেম আসছিল যাচ্ছিল হাইনর জীবনে। শেষে ১৮৩৪ সালে বছর আটত্রিশ বয়সে একটি ঊনিশ বছর বয়সী দোকান কর্মী মেয়ের চোখে গভীর ভালবাসা খুঁজে পেলেন হাইন। সে মেয়ে বয়সে ঠিক তাঁর অর্ধেক। তার উপরে নিরক্ষর। তায় মোটেও জার্মান জানে না। আর সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে সে মেয়ের কোনো কিছুই সম্বন্ধ নেই। বুদ্ধিদীপ্তি আন্দোলনের কিছুই জানে না সে। তবু তাকেই গভীর ভাবে ভালবাসলেন তিনি। ভালবেসে ডাকতেন মাতিল্ডা বলে। আর দুবছর সম্পর্কের পর তাকে আরো কাছে টেনে নিলেন ১৮৩৬ সালে। মাতিল্ডাকে বিয়ে করলেন ১৮৪১ সালে। জীবনভর টিঁকে রইল তাঁদের দাম্পত্য জীবন। ষাট বছরের জীবনের শেষ আট বছর পঙ্গু ও অথর্ব হয়ে কেটেছে হাইনর। ১৮৪৮ এর মে মাসে তিনি পঙ্গু হয়ে শয্যাগত হন। বিছানা ছেড়ে নড়ে বসার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে যায়। চোখের আলো নিভে আসে। তবু রোগশয্যা থেকেই লেখনী চালু রাখেন কবি। শেষ জীবনে নেপোলিয়নের দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে কার্ল মার্কসের চিন্তায় আস্থা রাখেন তিনি। মৃত্যুর সামান্য আগে ক্যামিলে সেলডেন নামে এক তরুণী মেয়ের চোখে আবার প্রেম খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। সে মেয়ে অসুস্থ কবিকে রোজ দেখতে আসত।
১৮৫৬ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি পারিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সমাধি ফলকে তাঁর Wo কবিতাটা লেখা আছে। বাংলা ভাষায় ওর মানে “কোথায়!”
আমি তো জার্মান জানি না। ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ থেকে মাতৃভাষার আখরে রূপ দিই Wo কে :
পথের শেষ কোথায়, কি আছে শেষে
কোথায় পাবো আমি দেবলোক, কোথায় আমার চির বিশ্রাম
আমার মাথার কাছে কি তাল খেজুরের বীথি থাকবে না কি
শুয়ে শুয়ে নদীর কলগান শুনবো
আমার মৃত্যু হবে কি মরুভূমে?
অন্ত্যেষ্টি হবে কি অচেনা পথিকের হাতে?
না কি সমুদ্র সৈকতে নরম মসৃণ বালিতে পাতব আমার শেষশয্যা
যাই হোক না কেন, এই পৃথিবীর চেয়ে সেখানে অনেকটা পরিসর
আর আকাশে দুলন্ত তারাগুলি
দেখতে দেখতে ঘুম নামবে চোখে।
ওঁদের কোনো সন্তান ছিল না। মাতিল্ডা ১৮৮৩ অবধি বেঁচে ছিলেন।